• September 27, 2022

ঘুমের সার্কাস

 ঘুমের সার্কাস

ব্রজ সৌরভ চট্টোপাধ্যায়

আর সেই রাতে শ্যামলের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।আশেপাশের জগৎকে তখন সে বোধ দিয়ে ভেবে দেখে , সেই বোধ নিতান্ত প্লাস্টিকের মতো একঘেয়ে , ছেয়ে আছে তার সব।তার ঘরের পোষা গাছ – আদুরে জল পেয়েও চুপ।দমবন্ধ করে আছে দেওয়াল।শুধু রাস্তাটুকু , যেহেতু তার চোখের পাতা নিভছিল আর খুলছিল , শ্যামল দেখল সেগুলো পুরনো, পুরনো অনাদি স্বপ্নের সাপ সব।জিভ চিড়ে চিড়ে তৈরি হয়েছে গলি।আর বাবিন মাস্টার গলির একপ্রান্তে , নেহাতই উঠোন বলা সাজেনা এমন এক হতভম্ব অর্ধেক সিঁড়ি ওয়ালা ঘিরতে ভুলে যাওয়া জায়গায় বাজাচ্ছে বাঁশি।

বাবিন মাস্টারের সঙ্গে শ্যামলের বন্ধুত্ব।পুরনো খাট আর আসবাব , যা সবে লোকজন শুত ,সঙ্গমে ব্যবহার করত , ব্যবহৃত হতো ঝগড়ায় , আলাদা থাকায় , যা সব ইউজ টু হয়ে এসেছিল মানুষের -ঝেড়ে দেয় একসময়। দিয়েছেও। বাবিন কিনে রাখে। রেখেছে কিছু কিছু।বাজারের মোড়ে চুরাশি বছরের পুরনো খিটখিটে বুড়ির মতো পাতাওয়ালা এক বুড়ো পাকুড়ের নিচে বাবিনের দোকান – ‘ মেসার্স নিত্য নতুন এন্টারপ্রাইজ ‘।তলায় স্পষ্ট ছিল এককালে , এখন ক্ষয়ে গিয়ে দজ্জাল বেশ্যার পুরনো কাজলের মতো আঁকা – ‘ সততাই একমাত্র মূলধন ‘।শ্যামল শুরুর দিকে হেসেছিল।বলেছিল -‘ মাস্টার , পারলে লিখে দাও,সততাই একমাত্র বাজারে কিনতে পাওয়া যায়না।’ চায়ের কাপ সমেত , বেকারির বিস্কুট সমেত , হাত সমেত , অল্প দোহারা ভুঁড়ি সমেত , দাঁত সুদ্ধু হেসে উঠেছিল দুজনের।লেখাটা পাল্টানো যায়নি।সততা অবলম্বন করে দোকানটা চালিয়ে যায় মাস্টার বাবিন।

শ্যামল একদিন সেখানে ওরকম একটা আয়না ওয়ালা দেরাজের কাছে গিয়ে দেখছিল কেমন দেখাচ্ছে নিজেকে তখন।শ্যামল ভূত দেখেনি কোনোপক্ষে।সে দেখেছে জ্যোৎস্না এসে পড়লে গাছের পাতা অনর্থক দামী রেস্টুরেন্ট এর টেবিলে রাখা অপদার্থ পাতাওলা জন্তুর মতো দেখায়।চিড়বিড় করে ওঠে পাতাগুলো। কেউ ছুটি চায় গাছ থেকে।কেউ ঝগড়া করে লতায় পাতায়।কেউ অভিমানী। কেউ খুব চুপচাপ।এক একটা গাছে বহুবিধ এসব সঞ্চার শ্যামলের ধুকপুক বাড়িয়ে দেয়।তার ঘুম আসেনা।জলে ছায়া পড়ে।আর সে ভাবে , শুধুমাত্র সততা নিয়ে পৃথিবীতে কোনো অলঙ্কার হয়না।বাঁশির সুরে , সে বুঝতে পারে তার চোখের সামনে মরে যাচ্ছে বহুদূরের দাদু।বাঁশির সুরে সে বুঝতে পারে , খাদ মেশাতে মেশাতে চকচক করে উঠছে সোনার দোকান।তার বোনের গলা।তার পুরনো বান্ধবীর বাজুবন্ধ।থকথকে স্বর্ণগোধিকা রূপে দেওয়ালের টিকটিকি ভবিষ্যত বলে শ্যামলকে।আর ভবিতব্য, দু কান কাটা নাপিতের মতো ঝুলে থাকে শ্যামলের নিজস্ব সেলাই মেশিনের এক কোণে।লাল সুতো , নীল সুতো , সাদা সুতো শুক্ল আলোকে যে অদ্ভুত বেড়াজাল তৈরি করে , সেখানে শ্যামল শুধুমাত্র জাঙ্গিয়া পরে ঘুমোতে চায়।সে ঘুমে দেখাতে চায় , দেখতে চায় নিজের একটুকু বাদে সব।ধীরে সুস্থে ঝুল জমে শ্যামলের ফুসফুসে।ধীরে সুস্থে মাকড়শা বলীয়ান হয়ে ওঠে ভেতরে ভেতরে।ঘুমের রাজনীতি দেখে শ্যামল নিজেকে নির্দল ঘোষণা করে। ইঁদুরের দাঁতের মতো ছিঁড়ে নেয় বিস্কিট।ম্যাজিকের মতো খুলে নেয় জলের সবুজ বোতল।

শ্যামল দেখেছে কৃষ্ণপক্ষ ঘুমের উপযোগী। স্বপ্নের উপযোগী। যেহেতু মাস্টার বাঁশি বাজায় মাঝরাতে উঠে , আর সুর ক্রমশ ভাঙতে ভাঙতে তৈরি করে কৃত্রিম আলো।আলোর বিচ্ছুরণ ঘটে তখন শ্যামলের খুলির ভেতর।নিজের খুলিকে তখন আপন সন্তানের মতো লাগে।ইচ্ছে হয় প্রশস্ত কোনো বিছানায় একমাত্র একাধিক সঙ্গমের।তৈরি করতে ইচ্ছে হয় অবাধ , বাঁধভাঙা ক্লান্তি।জলের হিসেব রাখা অফুরন্ত বালির তীরে ডুবে যেতে ইচ্ছে হয় শ্যামলের।বুকে চাপ লাগে।চাপ চাপ রক্ত ছড়িয়ে পড়ছে ভেতরে।অথচ দেখার কে আছে ? এই টিকটিকি ? এই মাকড়শা ? এই সুর ? তলপেট ভরে ওঠে সমুদ্রে। আস্ত সমুদ্র সমান হিসু পেয়ে ওঠে শ্যামলের।বাথরুমের সস্তা ঝর্ণাতলায় স্নান নিতে ইচ্ছে হয় শ্যামলের তখন।

আয়না ওয়ালা দেরাজের কাছে দাঁড়াতেই সেদিন শ্যামলের চোখ দেখেছিল বহুদিন পর নিজেকে। গায়ে হেমন্তের রং।ওপরে নিজের তৈরি জামা।নিচে নিজের তৈরি প্যান্ট।শ্যামল দেখেছিল একজন সাদাসিধে জোকার।যে কেবলমাত্র নিজে হাসতে পারে।একজন রঙচঙে জোকার এর চাইতে আলাদা।সে হাসেনা।’ ওহ লর্ড ‘ বলে একটুখানি বিলিতি হওয়ার ইচ্ছে হয়েছিল শ্যামলের।আয়নার শ্যামলের চোখে শরতের মেঘ।আয়নার শ্যামলের চোখে কয়লার আঁচ।সে সময় কেউ একজন এসেছিল দোকানে।দেরাজটা পছন্দ করেছিল শেষমেশ।আয়না থেকে শ্যামল সরে গেছিল।আর পাকাটে মহিলা ঠিক সেসময় তার নধর বুড়ো বরকে বলেছিল – ‘ ওহ লর্ড ! এটা তো অ্যান্টিক ‘ । রোগাটে শ্যামল নিজের গালে হাত বুলিয়ে দেখে নিচ্ছিল ওদের দুজনকে।অ্যান্টিক ! শব্দটা ভেতরে ভেতরে এত বিচ্ছিরি রকমের ওয়াক তুলে দিচ্ছিল শ্যামলের , বাথরুমে গিয়ে বমি করেছিল।আর বমির সঙ্গে বিটের থ্যাঁতলানো রং কিছুটা বেরিয়েছিল।রক্ত দেখে ভয় পায়না শ্যামল।সারাক্ষণ তো পুষেই রাখা আছে শরীরে বালতি বালতি।বরং ভয় পেয়েছিল বাবিন।লোকাল ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গেছিল শ্যামলকে।সে ডাক্তারের মাথাভর্তি টাক।আর জ্বলন্ত নীল শিরা ফুলে ফুলে ওঠা হাতময়।টেস্ট করানো তো হলো কতকিছু।শ্যামল কিছুদিনের জন্যে ঘুম চেয়েছিল এই কৃষ্ণপক্ষ জুড়ে।বদলে পেয়ে গেল ঘুম সমেত অফুরন্ত সব স্বপ্ন। শস্যক্ষেতের স্বপ্ন। বীজের স্বপ্ন।হাওয়া , জল , বাতাসের স্বপ্ন।এরপর নিজেকে কৃষ্ণপক্ষ এলেই শ্যামল মাঝে মাঝে পুরনো কাকতাড়ুয়া ভাবতে শুরু করল।ভাবলো , তার কাজ এসবগুলো তাড়িয়ে দেওয়া।ভাবলো , তার কাজ হাওয়ায় ভেসে থাকা।আর অন্ধকারে দেখা মাঠভর্তি শুধু প্রজাপতির রূপেলা সঙ্গম।

বাবিন বুঝেছিল কিছু।তরী ধরে মেরেছিল টান।সে টানের পর কব্জিজুড়ে এক প্রশস্ত ঘরের ছোট্ট খাটে শ্যামলের বিঁধে রাখা হয়েছিল সূচ।সূচ ,এর অফুরন্ত মহিমা এই ,ধারালো অথচ খুন করে করে ক্লান্ত নয় এমন।শ্যামল ঘুমিয়েছিল অঘোরে রাতজুড়ে।শ্যামল দিনেও জাগতে পারত না আর বেশি তখন।এমন দামী ঘুমের জন্যে বেড ভাড়া ছিল অনেক। বাবিন শুনেছিল – জল কম আছে শরীরে।শুনেছিল আস্ত কিছু মাকড়শা এমনিই এমনিই বাসা বেঁধেছে শরীর জুড়ে। সে মাকড়শার প্রিয় খাদ্য এখন শ্যামল।প্রায় শেষ হয়ে এসেছে খাওয়াটুকু।আর কিছু পরেই আসবে মিঠাপাতি পান।তারপর আসবে ক্যাটারারের ভাড়া করা বাগদি বৌ।তুলে দেবে থালা।পড়ে থাকবে সামান্য হাড়।সামান্য রক্ত।সামান্য খাবার বলতে ঠিক যতটা ছোট্ট করে অপচয় হয় আর কী !শ্যামলও শুনেছিল এসব। আধোঘুমন্ত মানুষ , শুধু যেটুকু শোনার সেটুকুই ঠিকঠাক শোনে।


জল কম ? রক্ত কম ? ঝুল খুব ? শেষ হয়ে গেছে পুরো ? পুরনো ভূগোল জ্ঞান ছিঁড়ে দিতে ইচ্ছে হয়েছিল শ্যামলের।ইচ্ছে হয়েছিল দুজনের। আয়নাওলা দেরাজ বিক্রির টাকা তখনও দোকানে ছিল বাবিনের। বাবিন আনতে গিয়েছিল সেই টাকা।চুরাশি বছরের হতকুচ্ছিত গাছ সেই হেমন্তে কী বিশ্রী ! বাবিন অযথায় দোকানে গিয়ে চিল্লিয়ে উঠেছিল জোরে।তার চিৎকারে ভেবলু এসেছিল।বরাবর কর্মচারী ভেবলু।বরাবর একটা মিষ্টি তোয়ালে কাঁধে ঝোলানো তার।বাবিন চিল্লিয়ে বলেছিল – ‘ কী অবস্থা দেখতে পাসনা ! খাট , পালঙ্ক , সোফা , চেয়ার , এমনকী আমার চেয়ারে পর্যন্ত ঝুল জমেছে।হারামজাদা , ঝাড়তে কি ইয়েতে লাগে !’ ভেবলু হাতের খৈনিটুকু টুক করে মুখে ফেলে অদৃশ্য ঝুল খুঁজে পেয়ে ঝাড়তে শুরু করেছিল সেদিন।অবাক হয়েছিল কিছুটা।যে লোক বাঁশি বাজায় , আর যার বন্ধু একজন হাসিখুশি সাদা সিধে জোকার , সেই লোক এত চিৎকার করে কী করে ! বাবিন ক্যাসবাক্স খুলে লাল , নীল , সাদা , কালো গার্ডার দেওয়া বান্ডিল বান্ডিল টাকা নিয়ে বেরিয়ে গেছিল দোকান থেকে।

শ্যামলের পাশের যে খাট, যেটা ফাঁকা ছিল কয়েকঘন্টা। সেখানে টেনে হিঁচড়ে শুইয়ে দেওয়া হয়েছিল কবর থেকে বহুদিন পর তুলে আনা ফিনফিনে এক বুড়োকে।সে বড্ড রসিক।এতই রসিক,তাকে টুপি পরা নার্স বা হাতমোজা পরা ডাক্তার পাত্তা দিলেই খুচরো পয়সার মতো ঝনঝন করে শব্দ উঠত আর উঠে আসত নিশ্বাসের কঙ্কাল।শ্যামলের ঘুম আসেনি সেই বুড়ো আসার পর।রাতজুড়ে শ্যামল দেখছিল মানুষের বুক কী সুন্দর ওঠে আর নামে।ওরকম ওঠা নামা সে একবার মাত্র পরখ করেছিল হাত দিয়ে শুধু। ছাদের কার্নিশ থেকে সে ইশারায় ডেকেছিল গুড্ডিকে।দিয়েছিল ঠিকঠাক বানানে লেখা একটা চিঠি।আর পাপড়ি দুমড়ে যাওয়া হালকা রক্তখেকো একটা গোলাপ। গুড্ডি হেসেছিল।এমন হাসি , যা খুব ভেবলে দেয় মানুষকে।আকাশে এমন একখানা ছাতার মতো মেঘ এসেছিল তখন।শ্যামল ভেবেছিল , ইস ! গোলাপের বদলে একটা রঙিন ছাতা দিলে বেশ ভালো হতো।শ্যামল দেখেছিল স্বপ্ন।একসঙ্গে ছাতার ভেতরে থেকে হেঁটে যাওয়ার।দেখছিল রাত জুড়ে সেই রাত্তিরে এসব।বোধ হয় জীবনের প্রথম নির্ঘুম রাত সে সেদিন কাটিয়েছে।অতঃপর ছুঁয়েছিল গুড্ডিকে।নিজেকে ছুঁতে দিয়েছিল গুড্ডি।পরপর তারপর ফেরত এসেছিল চিঠি।পরপর তারপর ফেরত এসেছিল ছাতা।পরপর তারপর ফেরত এসেছিল ইমিটেশনের ঝুমকো , নাম লেখা লকেট।আর সবশেষে শুকনো গোলাপ।সে গোলাপ তখন পানখেকো মানুষের প্রিয় দোক্তার মতো ঝুরঝুরে।প্রতিটা ফেরতে শ্যামলের ঘুম কমতে থাকে তারপর।নিজের মেশিনে বসে অর্ডার মতো বানাতে থাকে ব্লাউজ।আর ভাবে ওঠা নামা।আকাশে ছাতার মতো মেঘ করে গেছিল কত তারপর ! শ্যামল শুধু অনেক অনেকদিন পর দেরাজ এর আয়নায় নিজের চোখের নিচে দেখেছিল শরতের মেঘ।

বাবিন মাত্র আধঘন্টা ছিল সে কামরায়।তার বেশি ওখানে শুয়ে পড়তে না পারলে , দাঁড়িয়ে থাকা কাউকে বেশিক্ষণ থাকতে দেওয়া হয়না। বোঝার মতো লিফট বাবিনকে নামিয়ে দিয়েছিল নিচে।টুকরো টুকরো করে হাঁটতে শুরু করেছিল বাবিন নিচে এসে।দোকানে গিয়েছিল একবার।ভেবলুর জন্যে কিনে নিয়ে গেছিল মাংস।আর নিজের জন্যে তড়কা।রুটি ছিল অবশ্যই সঙ্গে।গোলাকার এবং কোণগুলো ধারালো।সঙ্গে গরম।আর ঠান্ডা পেয়াঁজকুচি।মন ছিলনা ভেবলুর খাওয়ায় তেমন।মন ছিলনা বাবিনেরও।অনর্থক অভিনয় করছিল দুজনে খাওয়ার।দেখে মনে হতেই পারে এমন , যে একটা নিদারুণ গেম শো চলছে দুজনের মধ্যে। শুধুমাত্র হারলে প্রাইজ আছে সে খেলায়।আর আশ্চর্যের হলো , দুজনেই সে খেলায় হেরে গেছিল। খাবার গুলো ফেলে দেওয়া হলো খিটখিটে গাছটার গোঁড়ায়।গাছ এসব খায়না।তবুও …

১০

ছাদে গিয়েছিল ওরা দুজনে তারপর।বাবিন সঙ্গে নিয়েছিল বাঁশি ।হাজার হাজার ছাতার মতো মেঘ আকাশ ঘিরে ফেলেছিল তারপর আস্তে আস্তে।যেন খুব ধীরে সুস্থে আক্রমণ।হ্যাঁ , তারপর গোলাগুলির মতো বৃষ্টি এসেছিল একটা ধুম করে।বৃষ্টিতে ভেবলু ভেজেনি। বাবিনকে একা রেখে নেমে গেছিল নিচে।আরও একবার অদৃশ্য ঝুল খুঁজে মুছে রাখছিল পুরনো ভালোবাসার – ঝগড়ার আসবাবগুলোকে।ল্যান্ড ফোন বেজে উঠেছিল। ঈশ্বরীর মনখারাপের মতো গলায় গুড্ডি বলেছিল – ‘ তোর দাদা কি আসবেনা আজ ভেবলু ? দোকানেই থাকবে ?’। ভেবলু তখনও শুনছিল বাঁশির আওয়াজ।ওর কাছে আওয়াজমাত্র। ভেবলু ইচ্ছে করে কোনো জবাব না দিয়ে ফোন কেটে দিয়েছিল শুধু।

১১

বৃষ্টির জল স্নানজলের মতো লোভনীয় লাগে।শ্যামল একটিই মাত্র অবশিষ্ট শ্বাস ছুঁড়ে দিয়েছিল সেই রাতে বৃষ্টি তাক করে।যদি ছোঁয়া পাওয়া যায় !বাঁশির সুর অতদূর হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছয়নি।ঠান্ডা কামরার ভেতর আসেনি বৃষ্টির কোলাহল।শ্যামল দুখানি প্রশ্ন রেখেছিল বাবিন চলে যাওয়ার পর।একখানি নিজ মুখে – ‘ বাইরে কি মেঘ করেছে ?’।চাদর ঘাঁটতে ঘাঁটতে সিস্টার তাকে বলেছিল – ‘ হ্যাঁ।আপনি কথা বলেন না প্লিজ।’ দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল ইশারায়।নাক মুখ ঢাকা ছিল তার যন্ত্রে।শ্রবণ শক্তি কমছিল ধীরে ধীরে।জন্মপথে হারিয়ে যাচ্ছিল তার নিভন্ত দৃষ্টি।চোখের নিচের মেঘ সে দেখছিল ছাতা হয়ে ঘিরে ধরছে তাকে ক্রমশ।নিজের খুলির ভেতর সে আবিষ্কার করেছিল কতদিনের পুরনো গ্রুপফটো।সাদা সাদা পায়রা অথচ শিকারী, ঠুকরে দিচ্ছিল শ্যামলকে তখন।কী হিংস্র তারা ! তাড়ানোর জন্যে শেষ শক্তি পর্যন্ত ক্ষয় করে উঠে তবেই না ঘুমিয়ে পড়ল শ্যামল।তবেই না বৃষ্টি ধীরে ধীরে কমে এল বাইরে।তবেই না এক মদ্যপ হুমড়ি খেয়ে উল্টে গেল রাস্তার ধারে।ঘুমোলো তো সে – ও।

১২
পাশের ফিনফিনে বুড়ো দু এক দিন পর ঢুকে গেছিল হয়তো কবরে ফের।নয়তো , জীবনকে কথা দিয়েছিল আবার পুজোয় বা ইদে , হেমন্তে বা শীতে সে আসবে ফের। ডাক্তাররা বারবার শুধু আমাদের দেখতে চান।নার্সরা বারবার শুধু সেবা দেবেন বলে , খোঁপা লুকিয়ে রাখেন তাঁদের।বুড়ো হয়তো আসবে।অথবা আসবেনা।তার জায়গায় অন্য কেউ আসবে।আমাদের প্রশস্ত বিছানা খালি থাকে।আমাদের পুরনো আসবাব আমরা ঝেড়ে দি।আমাদের পুরনো কান্না আমরা লুকিয়ে কাঁদি টাটকা পেঁয়াজে।পুরনো গ্রুপফটো কাঁচি দিয়ে কেটে শহর থেকে চলে গেল তারপর বাবিন আর তার বউ গুড্ডি।দোকানটা ভেবলু সামলাতে পারলনা ঠিকঠাক আর।সাইনবোর্ড আস্তে আস্তে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে জ্যোৎস্নার মধ্যে মিলিয়ে গেল এক রাত্তিরে।

১৩
অনেক অনেকদিন পর কোনো প্রান্তের এক দিগন্তে বসল সার্কাস।শ্যামল বাবিন আর গুড্ডি মিলে ভুল সুরে নামতা পড়ছে সেখানে খুব জোড়ে।একশ থেকে এক পর্যন্ত কাউন্টিং তাদের প্রিয় খেলা।ফিনফিনে বুড়ো সেখানে রিং মাস্টার।তার হাত মুঠো।মুঠোয় ধরা আস্ত একটা থুত্তুরে গাছ।সে গাছের বয়স কত ? ঠিক নেই কোনো।ওরা প্রত্যেকে বসে আছে পুরনো অ্যান্টিক চেয়ারে।ওদের সামনে আয়না ওয়ালা দেরাজ। অ্যান্টিক।তাতে প্রত্যেকে নিজেকে দেখছে চোখ বন্ধ অবস্থায়।ওদের পিছনে পুরনো মস্ত পালঙ্ক।অ্যান্টিক।সেখানে থোকা থোকা ঘুমের ফুল।তার চাদরে লাল , নীল আরও অজস্র মিহি সুতোর রঙে বোনা ঘুম। বুড়োর মুঠোয় ধরা গাছ।তাঁবুর বাইরে ঝোলানো ঝকঝকে সাইনবোর্ড।শুধু বৃষ্টি পড়ছে আর বৃষ্টি পড়ছে বলেই সেখানে লেখা যাচ্ছেনা কিছুই।শুধু বৃষ্টি পড়ছে আর বৃষ্টি পড়ছে বলেই এই সার্কাস বোঝা যাচ্ছেনা কিছুই।

ব্রজ সৌরভ চট্টোপাধ্যায়: বিশ্বভারতীর বাংলা বিভাগের পিএইচ . ডি গবেষক

Featured Image:Art and Anthroposophy on Word press.com

Leave a Reply

Your email address will not be published.