• December 4, 2022

রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য, প্রয়াণোত্তর চর্চা ও কিছু কথা

 রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য, প্রয়াণোত্তর চর্চা ও কিছু কথা

অশোক চট্টোপাধ্যায়

গত ২ অক্টোবর (গান্ধিজির জন্মদিনে) মাত্র পঁচাত্তর বছর বয়সে প্রখ্যাত মার্কসবাদী চিন্তক এবং লেখক-বুদ্ধিজীবী রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য প্রয়াত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই তাঁর ঘনিষ্ট জনমহলে তাঁকে নিয়ে চর্চার সূত্রপাত হয়েছে। এটি একদিক দিয়ে শুভসূচক। রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আমারও পরিচয় ছিল। এবং সেই পরিচয় খুন কম দিনের নয়। তাঁকে অন্য অনেকের মতো ‘স্যর’ না বলে তাঁকে আমি সরাসরি রামকৃষ্ণদা বলেই ডাকতাম। আর বলাইবাহুল্য আমার এই অ্যাড্রেস-কে তিনি হৃষ্টচিত্তে স্বাগত জানিয়েছিলেন। স্বভাবতই এই প্রতিবেদনে আমি তাঁকে রামকৃষ্ণদা বলেই সম্বোধন করছি।
২ অক্টোবর তাঁর নিষ্প্রাণ দেহ তাঁর শ্যামবাজারের বাড়িতে আনা হলে সেখানে প্রচুর মানুষের স্বাভাবিক সমাগম ঘটেছিল। সেখানে উপস্থিত থেকে আমি এবং আমার কয়েকজন বন্ধু অনেক কিছুই লক্ষ্য করেছিলাম। সেখানে শোকে মূহ্যমান অনেকের পাশাপাশি অনেককে কেমন যেন নিস্পৃহ মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল অনেকেই যেন একটা ‘দায়’ সারতে এসেছিলেন। অনেক প্রত্যাশিত ব্যক্তিকে সেদিন তো সেখানে দেখতে পাইনি। তবে প্রত্যাশিতভাবে অনেক লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক এবং কর্মীরা এসেছিলেন এক আত্মিক টানের কারণেই।
সেদিন আবেগের আতিশয্যতায় শ্লোগান দেওয়া হয়েছিল ‘আমৃত্যু’ ছাত্রনেতা রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য ‘অমর রহে’। আগের একটি প্রকাশিত প্রতিবেদনে (‘ন হন্যতে’, অক্টোবর ১৪, ২০২২) এই কথাটি উল্লেখ করেছিলাম। তবে কারও নাম উল্লেখ করিনি। আমার সঙ্গে থাকা বন্ধুরা এই শ্লোগান শোনার পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করেছিলেন। ভেবেছিলাম, শোক এবং অনবদমিত আবেগের কারণে এরকম ঘটনা ঘটতেই পারে। কিন্তু প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর দেখা গিয়েছে জনৈক অনুজ বন্ধু সেই শ্লোগান শাউটের দায় (যথার্থভাবেই) নিয়ে জানিয়েছেন তিনি ওই শ্লোগান দেন নি! বরং তিনি যে শ্লোগান তুলেছিলেন বলে জানিয়েছেন সেখানেও আবার আর এক বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছেন!
অন্যদিকে গত ১১ অক্টোবর কলেজস্ট্রিটের কফি হাউজের ওপরে ‘বইচিত্র’-এর সংকীর্ণ পরিসরে রামকৃষ্ণদার স্মরণসভায় আশাতীত মানুষের ভিড়ের কারণে বহু মানুষ সেই সভাঘরে প্রবেশ করতে না পারায় হতাশ হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গটি উত্থাপন করে আমার পূর্বোক্ত প্রতিবেদনে প্রশ্ন তুলেছিলাম এই সংকীর্ণ পরিসরের সভাঘরে উদ্যোক্তারা কেন যে এই সভার আয়োজন করেছিলেন তা বোধগম্য নয়। এরই সূত্রে প্রশ্ন তুলেছিলাম তাঁরা হয়তো ভেবেছিলেন রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের স্মরণ অনুষ্ঠানে কজনই বার আসবেন! আর সেই সভায় এমন অনেক বক্তাকে আহ্বান করা হয়েছিল যাঁরা রামকৃষ্ণদার একবগগা মতাদর্শিক অবস্থানের শরিক নন।—পূর্বোক্ত প্রতিবাদকারীর মতো এই প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় জনৈক বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী-লেখক জানিয়েছেন যে এই সভার জন্যে ‘ময়দান ভাড়া নেওয়ার সাধ্য’ উদ্যোক্তাদের ছিলনা। একটি ‘ক্ষুদ্র সংস্থা’ হিসেবে ‘বইচিত্র’ এই সভায় আয়োজন করেছিল। ভালো কথা। কিন্ত প্রশ্ন হলো এই সভার জন্য ‘ময়দান ভাড়া’ নেওয়ার কথা কোত্থেকে এলো? কোনও স্মরণসভার জন্য কখনও কি কোথাও ময়দান ভাড়া নেওয়ার নজির আছে? জানা নেই। সংকীর্ণ পরিসরের ‘বইচিত্র’-এর বিপ্রতীপে একেবারে ময়দানের কথা উত্থাপন করে আসলে প্রতিবাদকারী তাঁর ক্রোধোন্মত্ত মানসিকতার প্রকাশ ঘটিয়ে ফেলেছেন। হঠাৎ এতো ক্রোধের মতো কী এমন ঘটলো যে বইচিত্রের বিপ্রতীপে তাঁকে ময়দান ভাড়া করার মতো শিশুসুলভ কথা বলতে হলো? সমস্যাটা সম্ভবত অন্য জায়গায়, যার জন্যেই এই ক্রোধের বেলাগাম প্রকাশ।

রামকৃষ্ণদার এক ছাত্রপ্রতিম, আমার অনুজ লেখক-বন্ধু, লিখেছেন যে তিনি বিদ্যাসাগরকে দেখেন নি, কিন্তু রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যকে দেখেছেন। তিনি তাঁর ভক্তি এবং শ্রদ্ধার সম্মিলন থেকে একথা বলেছেন। এখানে এই প্রক্ষোভ চাঞ্চল্য অনুভূতিকে স্পর্শ করে, সন্দেহ নেই। দুইজনই সমসময়ের প্রভূত বাধা-বিপত্তির অচলায়তনকে অগ্রাহ্য করে তাঁদের অভিগমনকে অব্যাহত রাখতে চেয়েছেন—এমনটাই সেই লেখকের প্রতিপাদ্য বলে মনে হয়। সামাজিক দিক থেকে দেখতে গেলে এই দর্শনের কিছুটা ভিত্তি আছে। আবার রাজনীতিগত বিষয়টিকে মাথায় রাখলে এই প্রতিপাদ্য বিষয়টি প্রশ্নাকীর্ণ না হয়ে পারে না। আসলে রাজনীতির প্রশ্ন বাদ দিয়ে তো আর সামাজিক অস্তিত্ব, কর্ম এবং দর্শনের বিষয়টি নির্ণীত হতে পারে না।
একজন মানুষ যদি আদ্যোপান্ত সৎ হন, তবে তিনি তাঁর জীবনাচরণের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার অনুশীলনগত চর্চার সাক্ষ্য রেখে যাবেন। শুনেছি রামকৃষ্ণদা তাঁর বাড়ির কাজের লোকদেরও ‘আপনি’ বলে সম্বোধিত করতেন। প্রয়াত কবি কমলেশ সেনের মুখে শুনেছি মুজফফর আহমেদও নাকি সবাইকেই ‘আপনি’ বলে সম্বোধিত করতেন। আমি তো আমাদের কলেজে একজন অধ্যাপককে সমস্ত ছাত্রছাত্রীদের ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করতে প্রত্যক্ষ করেছি। আসলে এটা একটা বিশেষ শিক্ষার অনুশীলন। রামকৃষ্ণদা এই শিক্ষাকে অনুশীলনীয় করে তুলেছিলেন নিজের চর্যা এবং চর্যায়। আমাকেও তিনি আপনি বলেই সম্বোধন করতেন আমি আপত্তি করা সত্ত্বেও।
নিজের লেখা নিয়ে তিনি ছিলেন খুবই খুঁতখুঁতে। সামান্যতম ভুলের সঙ্গেও আপস করতে নারাজ ছিলেন। আমরা আমাদের পত্রিকার (‘সাংস্কৃতিক সমসময়’) প্রথম এবং দ্বিতীয় প্রুফ তাঁকে দিয়েই দেখাতাম। কখনও তিনি নিজে দেখতেন, কখনো দেখতেন তাঁর ছাত্রপ্রতিম ও স্নেহধন্য এক ব্যক্তি, যিনি নানা বিষয়ে রামকৃষ্ণদাকে নিরবচ্ছিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন। এরপরও যদি কোনও ভুল থেকে যেত তবে তা পরের সংখ্যায় সংশোধনী হিসেবে ছাপতে হতো। এর মধ্যে দিয়ে তিনি নির্ভুল মুদ্রণের একটা নিরুচ্চার শিক্ষা দিয়ে যেতেন। নিজের ভালো লাগলে অন্যের অনেক লেখা (বুক রিভ্যু, চিঠি, নিবন্ধ ইত্যাদি) আমাদের টীকাটিপ্পনি সহ দিয়ে দিতেন যাতে আমাদের কোনও সমস্যা না হয়। এটাও তো একটা শিক্ষাই। এই প্রক্রিয়াকে আমাদের পত্রিকার ক্ষেত্রে তিনি জারি রেখেছিলেন। তাঁর সৌজন্যে আমরা অনেক ভালো লেখা পেয়েছিলাম আমাদের পত্রিকায় প্রকাশের জন্যে। আর তাঁর লেখা আমাদের চাইতে হতো না। তিনি লেখা হয়ে গেলেই বলে দিতেন, লেখা রেডি আছে, সময় করে চলে আসুন।—এই অভিজ্ঞতা যেমন একটি লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক হিসেবে আমার ক্ষেত্রে সত্য, তেমনই অন্যন্য লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদকদের ক্ষেত্রেও তা সমানভাবে সত্য বলেই মনে হয়।
প্রতিষ্ঠানবিরোধী লড়াইয়ে রামকৃষ্ণদা নিজের সুদৃঢ় অবস্থানকে অনমনীয়চিত্তে অনুশীলন করে গিয়েছেন। কোনরকম আপস তিনি করেন নি। তাঁর অনেক তথাকথিত সহযোদ্ধা তাঁদের বাকচাতুর্যের সঙ্গে কর্পোরেট হাউসের মুখপত্রে লেখার ক্ষেত্রে কোনরকম বৈরিমূলক দ্বন্দ্বের সন্ধান পান নি। তাঁরা দিব্যি ধর্মে এবং জিরাফে বিচরণের সুখানুভবে আত্মতৃপ্তি লাভ করেছেন। কিন্তু রামকৃষ্ণদা আদর্শের স্খলনকে এতটুকু প্রশ্রয় দিতে নারাজ ছিলেন। নিজের যাবতীয় লেখা প্রকাশের জন্যে তিনি নিঃসংকোচে বেছে নিয়েছিলেন শহর, শহরতলি এবং গ্রাম থেকে প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিনগুলিকে। তাঁর মতো বড়ো মাপের লেখক-বুদ্ধিজীবীর এই চর্চাগত অনুশীলন তাঁর তথাকথিত সহযোদ্ধাদের বিন্দুমাত্র প্রভাবিত করেনি। অন্যেরা যেখানে কর্পোরেট হাউসের পত্রিকার লেখার ডাক পেলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গদগদচিত্ততার বিসদৃশ নজির স্থাপন করেন, রামকৃষ্ণদা সেখানে অবলীলায় কর্পোরেট হাউসের পত্রিকায় লেখার আহ্বান সদম্ভে প্রত্যাখ্যান করার হিম্মত রাখেন। তাঁর এই টানটান ব্যক্তিত্বের পাশে তাঁর তথাকথিত সহযোদ্ধাদের অনেককেই নিছক বামন বলেই মনে হয়। অবশ্য এতে তাঁদের আত্মম্ভরিতা বিন্দুমাত্র হ্রাস পায় না!

কলেজ জীবনে একটা সময় ছাত্র রাজনীতির উত্তাপ নিলেও অনতিকাল পরেই রামকৃষ্ণদা সেই প্রত্যক্ষ উত্তাপের আঁচ থেকে সরে এসে নিজের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক চর্চায় মনোনিবেশ করেছিলেন। একটা সময় অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য থাকলেও, শোনা যায়, সত্তরের দশকের প্রত্যূষলগ্নে সেই দললগ্নতা থেকে তিনি নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। অন্য কোনও দলীয়তার সমর্থক না-হলেও তাঁর চিন্তাচর্চার অন্তঃসলিলায় একটা রাজনৈতিক চিন্তাপ্রবাহ সজীব থেকে গিয়েছিল। তিনি গত শতকের নব্বুইয়ের দশকের প্রথমার্ধেই এক নিবন্ধে লিখেছিলেন যে পরিদৃশ্যমান গণ‘সংগঠন’গুলো তো ‘পার্টির আদলে’ চলছে। একদম ঠিক কথা। পার্টি এবং গণসংগঠনের মধ্যেকার পার্থক্যের অপসারণ তাঁকে রীতিমতো পীড়া দিত। গত শতকের নব্বুইয়ের দশকের অন্তিমপর্বে আর একটি লেখায় তিনি প্রসঙ্গত লিখেছিলেন : এখনকার রাজনৈতিক দলগুলি তো ‘নিজেদের দল বাড়ানো আর ভোটবাজি ছাড়া আর কিছু বোঝে না।’
এই হলেন রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য যিনি সত্যের সন্ধিৎসায় জীবন অতিবাহিত করেছেন। তাঁর এই চর্চার পরিসরে যে কোনরকম প্রশ্নের আবির্ভাব ঘটেনি এমনটি নয়। তবে ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি তাঁর একটি লেখায় অকপটে লিখেছিলেন : ‘আমি তো পার্টিছাড়া হয়ে আছি পঁচিশ বছর। আমায় কেউ তাড়িয়ে দেয়নি, আমিই বেরিয়ে এসেছিলুম। কিন্তু যে-লক্ষ্য নিয়ে পার্টিতে ঢুকেছিলুম, তা-ও ছাড়িনি, কাজও বন্ধ করে দিইনি। কারণ: আমি কখনোই ভাবিনি যে আমি পার্টিতে নেই। এখনও আমি বিশ্বাস করি : আমি পার্টিতে আছি।’ আসলে তিনি সমাজ পরিবর্তনের লক্য্ে নিয়েই তো একটা সময় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে গিয়েছিলেন। পরে তিনি দেখেছিলেন তাঁর লক্য্ন আর পার্টির লক্যে।কর মধ্যে ফারাক তৈরি হয়েছে। তিনি পার্টি ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন তবে যে লক্ষ্য নিয়ে তিনি একদিন পার্টিতে গিয়েছিলেন তাতেই জীবনের শেষদিন পর্যন্ত অবিচল থেকেছিলেন।
এখানে একটা তথ্য প্রকটিত হচ্ছে। প্রচলিত তথ্য হচ্ছে রামকৃষ্ণদা ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ছেড়ে দিয়েছিলেন ১৯৭০-এ। এখানে দেখা যাচ্ছে ১৯৯৩-এ প্রকাশিত এই লেখার পঁচিশ বছর আগে তিনি পার্টি ছেড়েছিলেন। অর্থাৎ সময়টা ছিল ১৯৬৮, নকশালবাড়ির অভ্যুত্থান ঘটার পরের বছর। বিষয়টি মনোযোগের দাবি রাখে।
অক্টোবর ১৮, ২০২২

বামপন্থী দার্শনিক রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের স্মৃতিচারণ করলেন বিশিষ্ট কবি ও সাংস্কৃতিক সমসময় পত্রিকার সম্পাদক অশোক চট্টোপাধ্যায়।

1 Comments

  • ১৯৭০ সালে পার্টির সদস্যপদ ছেড়ে দিয়েছিলেন রাকৃভ।
    ওঁর সমসাময়িক কমরেডদের মধ্যে একাধিক ব্যক্তি এখনও জীবিত আছেন, এবং তাঁদের বেশ কয়েকজনের সঙ্গেই রাকৃভ-র যোগাযোগ অক্ষুণ্ন ছিল। তাঁরাও জানিয়েছেন,সালটা ১৯৭০(সোভিয়েত -চেকোশ্লোভিয়া বিতর্কের কারণে ১৯৬৮ সালে নয়)।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post