সুশান্ত বিশ্বাস :- কাঁথা শিল্প বাংলার মেয়েদের একান্ত নিজস্ব। বহু প্রাচীন এই কাঁথা শিল্প। একটা সময় ছিল যখন গ্রামের গরীব মানুষদের তুলো দিয়ে লেপ তৈরি করার মতো অর্থনৈতিক সংস্থান ছিলনা। তখন পুরনো ছেঁড়া কিছু কাপড় চোপড় একটির উপর একটি চাপিয়ে সেলাই করে কাঁথা তৈরি করে তাই ব্যবহার করত, গায়ে ঢাকা দেওয়ার জন্য, পেতে শোয়ার জন্য, শিশুদের গায়ে জড়িয়ে নেবার জন্য। তবে কাঁথা সেলাইয়ের কাজ বাড়ির যেকোনো মহিলারা করতে পারত না। যারা সেলাইয়ে বেশি অভিজ্ঞ বাড়ির ঠাকুমা, দিদিমা, মায়ের মত বয়স্ক মহিলারাই কাঁথা সেলাই করতো। আগে কাঁথা পেতে শোয়ার জন্য বা শীতকালে গায়ে দেবার জন্য ও শিশুদের ব্যবহারের জন্যই কাঁথা তৈরি করা হতো। কিন্তু এখন নানা রকম ভাবে কাঁথার ব্যবহার হয়ে থাকে। যেমন-শীতে গায়ে দেয়ার জন্য মোটা কাঁথা, বালিশের ঢাকনা কাঁথা, বিছানার চাদর হিসাবে ব্যবহারের জন্য সুদৃশ্য নকশি কাঁথা, আয়নার উপর ঢাকা দেয়ার জন্য আরশিলতা কাঁথা। বর্তমানে নকশি কাঁথা এমন উচ্চপর্যায়ে গিয়েছে যেখানে অভিযাত সম্প্রদায়ের লোকজন গায়ে দেয়ার জন্য নকশিকাঁথাকে ব্যবহার করছে।


পরবর্তী সময়ে এই কাঁথা শিল্পের চর্চা যত বেড়েছে, তার সেলাইয়ের সূক্ষ্ম কারুকার্যতা ততোই বেড়েছে। কাঁথা শিল্প ধীরে ধীরে নকশিকাঁথায় রূপ নিয়েছে। দক্ষ শিল্পীর সূক্ষ্ম তুলির টানের মত নিপুণ হাতে সুচ , সুতোর সাহায্যে বিভিন্ন রকমের নকশা ফুটিয়ে তোলা, নকশীকাঁথার মানকে বাড়িয়ে দিয়েছে। কাঁথা শিল্প এখন বাণিজ্যিক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, এখন বাড়ির দিদিমা, ঠাকুমারাই নন, অল্প বয়সের মেয়েরাও কাঁথা শিল্পে চলে আসছে। কারণ কাঁথা তৈরি করে তা বাজারে বিক্রি করে কিছু আয় হচ্ছে, যার ফলে মেয়েদের উপার্জনের একটা দিক খুলে গেছে। কাঁথা শিল্প একদিন ছিল গ্রামের লোকায়ত সংস্কৃতির পরিচায়ক। বর্তমানে বাংলার নকশি কাঁথা অপূর্ব এক লোকশিল্পের নিদর্শন। পূর্বে কাঁথা সেলাই এর মূল সময় ছিল বর্ষাকাল, বর্ষার সময়ে মেয়েরা জলকাদায় বাইরে বের হতে পারত না। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া সেরে মাদুর বিছিয়ে বসে কাঁথা সেলাই করতে বসত, আবার শীতকালের দুপুরেও মেয়েরা কাঁথা সেলাই করতো। তবে কাঁথা সেলাই এখন আর সেই গণ্ডিতে আবদ্ধ নেই, এখন উপার্জনের জন্য বারোমাস‌ই কাঁথা সেলাই করে মেয়েরা।
কাঁথার আবার প্রকারভেদ আছে যেমন-(১) কাপড় কাঁথা ,(২) চটের কাঁথা , (৩) পাড়ের কাঁথা, (৪) আরশি লতা কাঁথা।
কাপড়ের কাঁথা সাধারণত এই ধরনের হয় যেমন-সুজনি কাঁথা, লেপ কাঁথা, ওয়াড় কাঁথা , নতুন শিশুর কাঁথা, খাবারের ঢাকনি দস্তুরখান , নকশি কাঁথা, বোঁচকা কাঁথা, আসন কাঁথা, মাজার কাঁথা, পর্দা কাঁথা, দেওয়ালে টাঙানো নকশি কাঁথা।