• December 9, 2021

কালের সেপাই নবারুণ ভট্টাচার্য

 কালের সেপাই নবারুণ ভট্টাচার্য

মৌতুলি নাগ সরকার :- ভালোবাসা আর বন্দুকের আগুনকে সম্বল করে যারা এই ‘বুজরুকির সার্কাস’কে বুড়ো আঙুল দেখাতে পারেন- তারাই কেবল ফ্যাতাড়ুর জন্ম দিতে পারেন,হতে পারেন নবারুণ ভট্টাচার্য। ষাট ও সত্তরের দশক ছিলো প্রেম ও ঘৃণার দশক- যা ঠিক-ভুল,ভ্রান্তি-সত্যির গণ্ডী পেরিয়ে জন্ম দিয়েছিল একটা নক্ষত্রের। নবারুণ ছিলেন ওই দশকের অন্যতম বারুদ মানুষ। সময়ের সাথে সাথে সেই দশকের অনেক বুদ্ধিজীবী, লেখক, কবিরাই পিঠ বাঁচাতে গিরগিটির মত রঙ পাল্টিয়েছেন কিন্তু এর বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে থেকেছেন আগ্নেয়গিরির উত্তাপে বাঁচা নবারুণ। ‘কালের সেপাই’ হয়ে উঠতে পারার দায়বদ্ধতাই তাকে তার বিশ্বাসে অবিচল রেখেছিল মৃত্যুর শেষ দিন পর্যন্ত। আজীবন না বলতে পারার প্রতিরোধী স্পর্ধায় শাণিত হয়েছে তাঁর ঘৃণা ও ভালোবাসা। রাজনীতি বিমুখ শুদ্ধ সাহিত্যচর্চায় তাই তাঁর ফ্যাতাড়ুরা বমি করতে পারে,লাথি মারতে পারে।খিস্তি খিল্লিও করতে পারে।আর তাই হয়তো সুরম্য মার্জিত ভাষায় পেলব সাহিত্যচর্চার মোহময়তা ছেড়ে তিনি অনার্যদের ব্যবহারের ভাষাকে নিলেন আপন ক’রে।রাজনৈতিক কচকচানি নয়,নবারুণ শিখিয়েছেন, পার্টি,রেজিমেন্টেশনের বাইরে মানুষের জীবনের স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারের মধ্যেই বেঁচে থাকাটা অনেক বেশি জ্যান্ত। হার্বাটের আত্মহত্যার মধ্যেই আছে এ সমাজের অসহায়তা ও বঞ্চনার নগ্ন চেতনা।যে রাজনীতি আমাদের দালালে পরিনত করে,যে সংস্কৃতি আমাদের মন ও মস্তিষ্ককে পিঠ চাপড়ানো কেরাণীতে পরিণত করে তাদের মুখে লাথি মেরে সেই নবারুণ বলতে পারেন ” দেখো আকাশের উত্তোলিত হাতে সূর্যের গ্রেনেড। ” গ্রেনেড ফেটে পড়বার সাহস যা কিনা ব্যক্তি ও সমাজের সাথে অর্ন্তঘাত ঘটাতে পারে,অর্ন্তঘাত ঘটাতে পারে ব্যক্তি মননে পরস্পর বিরোধী সত্তা ও চিন্তার সাথে নবারুণ সেই অর্ন্তঘাতের রাজনীতিতেই বিশ্বাস করেন।দলীয় রাজনীতি বদ্ধ জলাভূমিতে পরিনত হবে জেনেই তিনি নিজেকে সরিয়ে এনেছিলেন ‘কালমন’দের কলোনিতে। তাদেরই একজন হতে চেয়ে যে কোনো সামাজিক আন্দোলনে তিনি থেকেছেন সামনের সারিতে।রাজপথের রোশনাই নয়,বরং কলোনি আর বস্তির গলি-উপগলির ঘুটঘুটে অন্ধকারেই তার লেখনীর কীট আর কুকুররা শহর শাসন করে।তিনি লিখেছেন,

“একটা জিনিস আমি বুঝেছি
একটা মিথ্যে কবিতা যত মিথ্যে কথা বলতে পারে
কিন্তু একটি সত্যি কবিতা
ঘুমন্ত শিশুদের সারারাত বিমান আক্রমণ থেকে আড়াল করে”

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কবিতার শব্দের উত্তাপে এভাবেই তিনি বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছেন ঘুমন্ত শিশুদের নিরাপরাধ মুখ।মানুষের প্রতি ছিলো তাঁর অগাধ আস্থা- আস্থা ছিলো মানুষের মধ্যে নিজের বেঁচে থাকায়,তাই তিনি বলেন “আমি রাজ পথে ফেলে রাখা বোমা নই।আমি মানুষ। আমি লিখি।এবং আমি সংক্রামক। আমার ক্রাচের শব্দ আপনাকে ডাকছে।”


সত্তের দশকের কবিতাগুলো ছিলো ‘রক্তাক্ত’,’ঝোড়ো’,হাওয়ার ঝান্ডায় যে কবিতার শব্দেরা উড়েছিলো।যদিও তার পরবর্তী সময়ে নবারুণ দাঁড়িয়ে থেকেছেন বাইশ বছরের যুবক অথবা একটা ‘পোস্টার’ এর মত –

” ছোট এক হাত মুঠো করা ন্যাড়ামাথা পোস্টার

সে বলছে
অন্ধ আকাশ লক্ষ বিদ্যুৎ
লক লক করে উঠলেও
ছোট ও নিরীহ গাছেরা ভয় পায় না।”

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post