• December 4, 2021

মুর্শিদাবাদের আম চর্চা প্রথম পর্ব।

 মুর্শিদাবাদের আম চর্চা প্রথম পর্ব।

সুশান্ত বিশ্বাস :- কথায় আছে আম প্রিয় বাঙালি। আম খেতে ভালোবাসে না এমন বাঙালি পাওয়া ভার। আমকে ঘিরে বাঙ্গালীদের রয়েছে গর্বের ঐতিহ্য। আর সেই বাংলার মধ্যে অভিজাত আমের বসতি আবার মুর্শিদাবাদে। দর্শনে, স্বাদ এ, গন্ধে এখনো মুর্শিদাবাদের আমের বিশ্বজোড়া খ্যাতি রয়েছে। ভারতবর্ষের সর্বত্রই এখনো মুশিদাবাদের আম খুব জনপ্রিয়।
আমি নিজেও খুব আম বিলাসী, নবাবি আমলের ঐতিহ্যবাহী প্রজাতির আম গুলোকে বাজারে বাজারে খুঁজে বেড়াই, সংগ্রহ করে চেষ্টা করি অভিজাত সেই আমের স্বাদ, গন্ধ গ্রহণ করতে। যদিও এখন আর নবাবী আমলের সেই সব নামজাদা প্রজাতির সকল আম বাজারে আসে না। মুর্শিদাবাদের আমের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে করতে চেষ্টা করব, মাঝে মাঝে সচিত্র সেইসব আমের আকার, স্বাদ, গন্ধ নিয়ে আলোচনা করতে।

১) সারেঙগা (নবাবী নাম- সাফদার পসনদ) :- পুষ্টু ও গাছপাকা সারেঙগা আম বৈশাখ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহেই পাকতে শুরু করে । সর্ব প্রথম এই আম পাকে বলে চাহিদাও বেশি থাকে। নবাবি বাগানে বহু নামজাদা আমের মধ্যে সারেঙগা একটি।সারেঙগা আম একটু লম্বা ও ছোট আকারের হয়। এই আম চিনবার সহজ উপায়, এই আমের মাথার দিকে ছোট্টো একটা নাকের মতো উঁচু অংশ থাকে। এই আমের আঁটি ও খোসা খুব পাতলা হয়। পুষ্টু সারেঙগা আম পাকলে খুব রসালো মিষ্টি ও সুস্বাদু হয় ।

(2) চন্দন খোসা মুর্শিদাবাদে আমের ইতিহাস খুব প্রাচীন, এ নিয়ে একটি গল্প প্রচলিত আছে। 1704 সালে মুর্শিদকুলি খাঁ তার দেওয়ানী দপ্তর মুখসুদাবাদে তুলে আনার সময় হঠাৎ করেই তিনি মুর্শিদাবাদের আম খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
কিন্তু তখন ছিল শীতকাল আম পাওয়া কষ্টসাধ্য, সমস্ত পাইক বরকন্দাজ মিলে শুরু করলেন আমের সন্ধান।
শেষ পর্যন্ত আম পাওয়া গিয়েছিল কিনা জানা যায়নি। কিন্তু অসময়ে দেওয়ানের এই আম খাওয়ার ইচ্ছা কে গুরুত্ব দিয়ে শুরু হয় আম সংরক্ষণের প্রচেষ্টা। সেকালে দেশীয় পদ্ধতিতে কিভাবে আম সংরক্ষণ করা হতো সে কথা জানাবো পরে।
মুর্শিদাবাদে অভিজাত ও নামজাদা আমের বাগান তৈরীর সূচনা করেন, মুর্শিদকুলি খাঁ এর জামাতা নবাব সুজাউদ্দিন । তিনি দেশ-বিদেশ থেকে নামি, নামি নানা প্রজাতির আমের চারা আনিয়ে বাগান তৈরি করিয়েছিলেন। তার আমলেই আম্বাখানা নামে একটি পৃথক সেরেস্তা খোলা হয়েছিল। সেই সেরেস্তার ভার থাকতো আম সম্বন্ধে অভিজ্ঞ এক দারোগার উপর। সেই দারোগার কাজ ছিল নানা জায়গা থেকে ভাল জাতের আমের চারা এনে যত্নসহকারে রোপন করা, প্রতিপালন ও পরিচর্যা করা। তাছাড়া আম সংরক্ষণের ব্যবস্থা করাও ছিল তার কাজ। আমের মরশুমে নবাবদের আম খাবার সেই যে নিয়ম চালু হয়েছিল, সেই নিয়ম শেষ নবাব পর্যন্ত চালু ছিল। নবাব সুজাউদ্দিন ও পরবর্তী নবাবদের প্রচেষ্টায় 250 প্রজাতির আম ছিল মুর্শিদাবাদের নবাবী আম বাগানে।
চন্দন খোসা আমের সঙ্গে বেশিরভাগ মানুষেরই পরিচিতি নেই। অথচ এক সময় নবাবী আমবাগানে খুব যত্নের সঙ্গে শোভা পেত এই আম। বাজারে খুব অল্প কিছুদিনের জন্য পাওয়া যায় এই আম, তাছাড়া পরিমাণেও খুব কম ওঠে নবাবী আমলের এই আম। এই আমের গড়ন একটু লম্বাটে, মাঝারি সাইজের হয়। পুষ্টু আম পাকলে খুব রসালো, সুস্বাদু ও মিষ্টি হয়।
ল্যাংড়া আমের মতো হালকা গন্ধ আছে চন্দন খোসা আমে। আর এই জন্যই চন্দন খোসা আমের আলাদা চাহিদা রয়েছে।

৩)রওগনি :- নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ছিলেন খুব আম প্রিয়, তিনি দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আমের চারা আনিয়ে বাগানে রোপণ করাতেন। আর এই কাজ করার জন্য নিয়োজিত ছিল কিছু অভিজ্ঞ পারদর্শী ব্যক্তি। সিরাজউদ্দৌলার সময়ে নবাবী বাগানে প্রায় 147 প্রজাতির আম গাছ ছিল।
এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে একাধিক নবাব বিভিন্ন প্রজাতির আমের গাছ পুঁতে ছিলেন নিজেদের বাগানে।
নবাবরা নিজেরাই অত্যন্ত আম প্রিয় ছিলেন, তাই মুর্শিদাবাদে মূলত তাদের উদ্যোগেই গড়ে উঠেছিল অতি উচ্চমানের বহু প্রজাতির আমের বাগান।
আম প্রিয় মানুষের কাছে র‌ওগনি আম কম পরিচিত। নবাবদের খুব প্রিয় ছিল এই আম। মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত পাওয়া যায় এই আম। লালবাগ শহরের যেকোনো আমের বাজারে এই আমটি পাওয়া যায়, কিন্তু লালবাগের বাইরে খুব কম পাওয়া যায়। ছোট ও গোল আকারের এই আম পাকলে হালকা বাদামী রংয়ের হয়, খুব মিষ্টি ও হালকা সুঘ্রাণের জন্য খেতে খুব ভালো লাগে। আঁশবিহীন, রসালো চ্যাপ্টা আঁটি বিশিষ্ট এই আমের দাম কিছুটা বেশি হয়।

( ৪) বোম্বাই :- সারেঙ্গা এর পরেই বাজারে আসে বোম্বাই আম। বোম্বাই আম মুর্শিদাবাদে খুব পরিচিত একটি আম। বোম্বাই আম পেলে কেউ জিজ্ঞেস করেনা খেতে কেমন, কারণ এর স্বাদ, গন্ধ সম্পর্কে সকলেই পরিচিত। বোম্বাই আমের গড়ন অন্য সাধারণ নামের মতই, তবে এই আমের সারা গায়ে সাদা ফুটকি দাগ থাকে। বোম্বাই আম চেনার এটাই সহজ উপায়। আকারে খুব বড় নয়, মাঝারি সাইজের হয় বোম্বাই আম। খোসা পাতলা আশ‌হীন বোম্বাই আমটি খেতে বেশ মিষ্টি ও সুস্বাদু, তবে একটু কম পাকিয়ে খেলে আঁটির কাছে হালকা টক ভাব থাকে।

(৫)রানী পসন্দ :- বোম্বাই আম’ এর পরে পরেই রানী পসন্দ আম বাজারে আসে । মুর্শিদাবাদে রানী পসন্দ আম’এর খুব জনপ্রিয়তা রয়েছে। মুর্শিদাবাদে সাদোললার পরেই প্রচুর রানী আমের গাছ আছে। বাজারেও প্রচুর পরিমাণে রানী আম পাওয়া যায়। অন্যান্য আমের চেয়ে এই আমের গড়ন একটু ভিন্ন রকমের হয়। রানী আম সাধারণত একটু ছোট ও গোল আকৃতি , বোটার নিচে একটা দিক মোটা হয়ে হঠাৎ শুরু হয়ে শেষ হয়। পাকলে এই আমের রং হয় গাঢ় হলুদ বা বাদামি। সম্পূর্ণ আঁশবিহীন রসালো এই আম । রানী আম ধরে নিচের দিকে চাপ দিলে শাঁস ছাড়া আঁটি বেরিয়ে আসে একটু বেশি পাকিয়ে খেলে আঁটির কাছের টক ভাবটা কেটে যায়।

৬) চম্পা :- নবাব এস্টেট এর আমবাগান ছিল প্রচুর। নবাবী আমলে আম বাগান পরিচর্যা ও দেখভালের জন্য অভিজ্ঞ লোক থাকতো। তাদের আম-কেরানি বা আম- পেয়াদা বলা হত। তাদের ছিল জহুরীর চোখ, দেখলেই বলে দিতে পারতো কখন কোন আমকে গাছ থেকে পাড়তে হবে, কোনটিকে জলে ভেজাতে হবে।
নবাবী আমলে চুনাখালির আম ছিল সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মানের। 1975-1976 সালের দিকেও মুর্শিদাবাদে একশরও বেশি উৎকৃষ্ট জাতের ও মানের আম পাওয়া যেত। সমস্ত আম ই কেবল আকারে নয় স্বাদে ও গন্ধে পৃথক। একসময় মুর্শিদাবাদে আমের কলম তৈরি হয়ে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে চলে যেত।
সাধারণত জ্যৈষ্ঠের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে চম্পা আম পাকতে শুরু করে এবং বাজারে আসে। মুর্শিদাবাদের নামি ও দামি আমের মধ্যে চম্পা একটি। চম্পা আম আকারে একটু ছোট ও গোল আকৃতির হয়, অনেকটা দেশি গুলগুলি আমের মতো। কড়া মিষ্টি স্বাদের এই আমের সুন্দর গন্ধ আছে। চম্পা আম পাকলে বোঁটা থেকে কিছুটা নিচ পর্যন্ত হালকা লাল রঙ ধরে। অন্য আম যখন বাজারে 25 থেকে 30 টাকা কেজি চম্পা আম তখন 50 টাকা কেজি।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post