• December 4, 2021

মুর্শিদাবাদের আম চর্চা তৃতীয় পর্ব

 মুর্শিদাবাদের আম চর্চা তৃতীয় পর্ব

সুশান্ত বিশ্বাস :- আম বিশেষজ্ঞরা মনে করেন মুর্শিদাবাদে গাঙ্গেয় জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ। যার জন্য প্রাকৃতিক কারণেই এই জেলায় আমের প্রচুর ফলন হয়। জানা যায় 1704 সালে মুর্শিদকুলি খাঁ মুর্শিদাবাদের রাজধানী স্থানান্তরিত করার আগে এই অঞ্চল গভীর অরণ্যে পূর্ণ ছিল। এই অরন্যের মধ্যে প্রাকৃতিক নিয়মে কিছু আমগাছ‌ও অযত্নে বেড়ে উঠেছিল। এইসব আম গাছের মধ্যে “সবুজা” নামে একটি আম গাছ‌ও ছিল। অনেকেই মনে করেন এই “সবুজা” প্রজাতির আম থেকে মুর্শিদাবাদের বিখ্যাত “কালাপাহাড়” আমের জন্ম। পরবর্তী সময়ে কালাপাহাড়ের সঙ্গে অন্য আম গাছের মিলন ঘটিয়ে নামি দামি আমের জন্ম দেওয়া হয়।

(১৩) বাতাসা – বাতাসা আম মূলত জঙ্গিপুর, রঘুনাথগঞ্জ, লালগোলা অঞ্চলে বেশি পাওয়া যায়, বাতাসা আমের গাছ ও রয়েছে ওই অঞ্চলেই। বাতাসা আম একটু ছোট আকারের, গোল ও সামান্য চ্যাপ্টা, রানী আমের মতো অনেকটা দেখতে। পাকলে এই আম হলুদ রঙের সঙ্গে বোটার নিচে হালকা লাল রংয়ের হয়। আঁটি ছোট ও চ্যাপ্টা, আঁশবিহীন, শাঁস মোলায়েম খেতে বেশ মিষ্টি (বাতাসার মতই) কড়া মিষ্টি নয়। তবে বেশ রসালো, অন্য আমের তুলনায় একটু ভিন্ন স্বাদের, মিষ্টি সঙ্গে হালকা টক মিশেল করলে যেমন হয়।

(১৪) লক্ষণভোগ – বেশ বড় সাইজের এই আম, 500 থেকে 600 গ্রাম এর মত হয়। লম্বা ও চ্যাপ্টা আকারের। একেবারে নিচের থেকে একটু উপরে মোটা নাকের মত অংশ লক্ষণভোগ আমাকে চিনিয়ে দেয়। পাকলে হালকা হলুদ রং ধরে। খোসা একটু মোটা , আঁট খুব পাতলা, একদম আঁশ নেই, শাঁস এর উপরের অংশ একটু মোটা নিচের অংশের শাঁস মোলায়েম। মাঝারি মিষ্টি স্বাদের এই আম খুব রসালো এবং আলাদা সুঘ্রান আছে। খোশবাগ, লালবাগ, গৌরীপুর, ভগীরথপুর এলাকায় এই আমের গাছ আছে।

(১৫) পাঞ্জা পসন্দ (হীরা) – পাঞ্জা পসন্দ এর আর এক নাম ” হীরা” । নবাব ওয়াসেফ আলী মির্জার প্রিয় এটি। পাঞ্জা পসন্দ নামটিও নবাবের‌ই দেওয়া। খুব তাড়াতাড়ি পেকে যায় এই আম। মাঝারি সাইজের এই আম 300 গ্রাম থেকে 400 গ্রাম’এর মত হয়। একটু গোল আকারের বোটার নিচে কিছুটা মোটা, পাকলে হালকা লাল রঙ ধরে ও সারা গায়ে সাদা কালো ফুটকি দাগ হয়। ভিতরের শাঁস গাঢ় লাল রংয়ের হয়, খেতে খুব সুন্দর লাগে। খোসা পাতলা, শাঁস খুব মোলায়েম ও রসালো, আঁশবিহীন খুব মিষ্টি ও সুঘ্রাণ রয়েছে এই আমে। বেশি পেকে গেলে এই আমের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়।

(১৬) বিমলি – মুর্শিদাবাদের নবাবী আমলের লুপ্তপ্রায় যে 8 থেকে 10 রকমের নামি প্রজাতির আমকে নতুনভাবে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে তারমধ্যে “বিমলি ” একটি। পাকলে খুব মিষ্টি স্বাদের এই আমের নিজস্ব সুঘ্রান আছে। ছোট সাইজের গোল আকারের এই আম পাকলে গাঢ় হলদে রং ধরে। খোসা পাতলা, আটি ছোট, ভেতরের শাঁস হলুদ ও মাঝের অংশ লাল হয়। বিমলি আমের গাছ এখন মূলত লালবাগেই বেশ কয়েকটি আছে। লালবাগের বাইরে জিয়াগঞ্জ বা লালগোলায় অল্প কিছু গাছ থাকলেও থাকতে পারে। বাজারে বিমলি আম পাওয়া খুব মুশকিল। লালবাগে বাগানে গিয়ে সংগ্রহ করা যেতে পারে।

(১৭) ল্যাংড়া – ল্যাংড়া আমের তিন রকমের প্রজাতি আছে।
১ – ল্যাংড়া (বেনারস), ২ – ল্যাংড়া (দ্বারভাঙ্গা) , ৩ – ল্যাংড়া (হাজিপুর)
মুর্শিদাবাদে মে ল্যাংড়া আম পাওয়া যায় তার প্রজাতি, ল্যাংড়া (হাজিপুর)। এই প্রজাতির আম এর আদি নিবাস বিহারের হাজিপুর,ল্যাংড়া ফকির এর নাম থেকেই এই আমের নাম হয়েছে ল্যাংড়া। ল্যাংড়া আম কে নিয়ে একটি প্রচলিত কথা আছে। বিহারের হাজীপুরে একটি আমগাছ কে ঘিরে কিছু ঘটনা ঘটে, সেই জন্য সিপাই নিযুক্ত করা হয়। এই আম গাছের কলম যেন কেউ না জানতে পারে, তার জন্য বেতিয়া দ্বারভাঙ্গা, ভুসরাও’এর রাজারা হাজার হাজার টাকা খাজনা মুকুব করতে রাজি ছিলেন, কিন্তু ল্যাংড়া আমের কলম দিতে রাজি নন, কারণ ওই ল্যাংড়া আম গাছের নিচে বাস করতেন প্রবাদপ্রতিম এক ল্যাংড়া ফকির, যার নামে ওই গাছের আমের নাম ল্যাংড়া।
ল্যাংড়া আম তার স্বাদ ও গন্ধে এখনো জনপ্রিয়তার শীর্ষে। মুর্শিদাবাদের ল্যাংড়া (হাজিপুর) আমের সাইজ একটু ছোট কিন্তু স্বাদ অসাধারণ, ল্যাংড়া আমের ভিন্ন ধরনের সুঘ্রাণই চিনিয়ে দেয় তার প্রজাতিকে।

(১৮) মধু চুষকী :- ছোট সাইজের মধু চুষকী একটু লম্বা ও গোল আকারের হয়। পাকলে এই আমের বোটার দিকে হালকা লাল রং বাকি অংশ হালকা সবুজ রঙ ধরে। খেতে কড়া মিষ্টি স্বাদের, তবে রস কম। আটির কাছে অল্প আঁস আছে, শাঁস একটু মোটা ।অন্য আমের চেয়ে ভিন্ন স্বাদের মধু চুষকী আমের বেশ কদর রয়েছে বাজারে।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post