• December 4, 2021

বিবেক মানসে বঙ্গ-যুব

 বিবেক মানসে বঙ্গ-যুব

সুদীপ পাল : একটি গল্প দিয়ে শুরু করা যাক – বিখ্যাত গান্ধীবাদী ও সর্বোদয় আন্দোলনের নেতা বিনোবা ভাবে ছিলেন একজন আধ্যাত্মিক মানুষ। বৃদ্ধ বয়সে তিনি বদ্রীনাথ যাবেন ঠিক করলেন। তখনকার দিনে বদ্রীনাথ যাওয়া কঠিন ছিল, কেননা তখন কোন সহজ রাস্তা ছিল না, পাহাড় অতিক্রম করে যেতে হত। বিনোবা ভাবে চলতে শুরু করলেন। দেখলেন, কয়েকজন শ্রমিক পাহাড়ের পাথর ভাঙছে রাস্তা তৈরির জন্য। তিনি তাদের মধ্যে থেকে একজনকে প্রশ্ন করলেন, “তুমি কি করছ?” শ্রমিকটি বলল, “আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না আমি পাথর ভাঙছি।” বিনোবা ভাবে আবার প্রশ্ন করলেন, “তুমি এটা কেন করছ?” শ্রমিকটি রেগে উত্তর দিল, “রোজগারের জন্য। আমি যাতে ভালো জিনিস খেতে পারি সেজন্য।” আরো কিছুদুর যাবার পর বিনোবা ভাবে অন্য একটি শ্রমিককে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি করছ?” শ্রমিকটি বলল, “আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না আমি পাথর ভাঙছি।” বিনোবা ভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, “কেন করছ?” উত্তর এল, “আমার পরিবারের জন্য।” বিনোবা ভাবের সহসঙ্গীরা ভাবছিলেন কেন ইনি বারবার নিজে থেকে অপমানিত হচ্ছেন! আরো কিছুদুর যাবার পর বিনোবা ভাবে একটি শ্রমিককে আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমিকি করছ?” শ্রমিকটি শান্ত ভাবে উত্তর দিল, “বাবাজী, আমি পাথর ভাঙছি।” বিনোবা ভাবে আবারও জিজ্ঞাসা করলেন, “কেন করছ?” শ্রমিকটি উত্তর দিল, “আমি রাস্তা তৈরি করছি, যাতে বদ্রীনাথ দর্শনকারীদের বেশি সমস্যার সম্মুখীণ হতে না হয়।” বিনোবা ভাবে শ্রমিকটিকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “আমি এবার শান্তিতে মরতে পারব এই জেনে যে, আমার দেশে অন্তত একজন যথার্থ নাগরিক আছে।”

গল্পটিতে তিন শ্রেণীর মানুষ পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রথম শ্রমিকটি একক স্বার্থকেন্দ্রিক। দ্বিতীয় শ্রমিকটির মনন ক্ষুদ্র সংসার কেন্দ্রিক কিন্তু শেষের জন সমষ্টি চিন্তন কেন্দ্রিক। সব দেশের সব সমাজেই এই তিন শ্রেণীর মানুষ রয়েছে। অবশ্য বলাবাহুল্য, শেষের জনের মত উত্তম শ্রেণীর মানুষের সংখ্যা বর্তমান সব সমাজেই একেবারেই কম। বাঙালী সমাজেও তাই। স্বামী বিবেকানন্দের একাধিক চিঠিতে ও একাধিক বক্তৃতাতে দেখা যায় তিনি যেমন বাঙালী জাতীর সমষ্টি ও ব্যষ্টির উন্নতির আশা পোষন করছেন তেমনি আমাদের ভুলগুলিও ধরিয়ে দিচ্ছেন যথার্থ অভিভাবকের মত।
স্বামী বিবেকানন্দ ২৮ জুন ১৮৯৪ সালে মাদ্রাজী শিষ্যকে লিখছেন – “বাঙালীরা কেবল বাক্যসার-তাদের হৃদয় নেই, তারা অসার।” এই কথার প্রতিধ্বনী দেখা যায় বৈকুন্ঠনাথ সান্যালকে লিখিত পত্রে – “আমি বাঙলা দেশ জানি, ইন্ডিয়া জানি-লম্বা কথা কইবার একজন, কাজের বেলায় – (০) শুন্য।” বাঙালীরা যে অত্যন্ত ঈর্ষাপ্রবন সে সর্ম্পকে স্বামী রামকৃষ্ণানন্দজীকে লিখছেন – “ঐ যে “অহং”-ফাঁকা “অহং’-তার আবার আঙ্গুল নাড়াবার শক্তি নাই, কিন্তু কাউকে উঠতে দেবে না-বললে কি চলে? ঐ jealous (ঈর্ষা), ঐ absence of conjoined action (সংঘবদ্ধ ভাবে কার্য করিবার শক্তির অভাব) গোলামের জাতের nature (স্বভাব); কিন্তু আমাদের ঝেড়ে ফেলতে চেষ্টা করা উচিৎ। ঐ terrible jealousy characteristic (ভয়ানক চারিত্রিক বিশেষত্ব ঈর্ষা) আমাদের, বিশেষ বাঙালীর। কারণ, We are the most worthless and superstitious and the most cowardly and lustful of hindus. পাঁচটা দেশ দেখলে এটি বেশ করে বুঝতে পারবে। … গোলাম কীটগুলো, এক পা নড়বার ক্ষমতা নাই – স্ত্রীর আঁচল ধরে তাস খেলে গুডুক ফুঁকে জীবনযাপন করে, আর যদি কেউ এগুলোর মধ্যে এক পা এগোয়, সবগুলো কেঁউ কেঁউ করে তার পিছু লাগে –।”
অন্য একটি চিঠিতে রামকৃষানন্দজীকে লিখছেন – “আহার গেঁড়ি গুগলি, পান প্রসাব-সুবাসিত পুকুরজল, ভোজনপাত্র ছেঁড়া কলাপাতা এবং ছেলের মলমৃত্র-মিশ্রিত মাটির মেজে, বিহার পেত্নী শাঁকচুন্নীর সঙ্গে —- মুখে যত জোর!”

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “বঙ্গমাতা” কবিতাটি –
“সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী,
রেখেছ বাঙালী করে – মানুষ কর নি।।”
স্বামীজী চিকাগো থেকে চিঠিতে লিখছেন – “এখানে আসবার পর মেকলে ও আরো অনেকে বাঙালী জাতকে যে ভয়ানক গালাগাল দিয়েছেন, তার কারণ কিছু কিছু বুঝতে পারছি। এরা সর্বাপেক্ষা কাপুরুষ আর সেই কারণেই এতদূর ঈর্ষাপরায়ণ ও পরনিন্দাপ্রবণ। হে ভ্রাতঃ, এই দাসভাবাপন্ন জাতের কাছে কিছু আশা করা উচিৎ নয়া ব্যাপারটা স্পষ্টভাবে দেখলে কোন আশার কারণ থাকে না বটে, তথাপি তোমাদের সকলের সামনে খুলেই বলছি – তোমরা কি এই মৃত ভবিষ্যতের উন্নতির জন্য একদম চেষ্টা নেই, যারা তাদের হিতৈষীদের ওপরই আক্রমন করতে সদা প্রস্তুত, এরূপ মড়ার ভেতর প্রাণসঞ্চার করতে পারো? তোমরা কি এমন চিকিৎসকের আসন গ্রহণ করতে পারো, যিনি একটা ছেলের গলায় ঔষধ ঢেলে দেবার চেষ্টা করছেন, এদিকে ছেলেটি ক্রমাগত পা ছুঁড়ে লাথি মারছে এবং ঔষধ খাব না বলে চেঁচিয়ে অস্থির করে তুলছে?” প্রশ্ন জাগে বাঙালীদের ভবিষ্যৎ সর্ম্পকে – বাঙালী যুব সমাজ সর্ম্পকে – আমরা কোন পথে?

১৮৯৭ সালে ২৬ ফেব্রুয়ারী মাসে শোভাবাজার রাজবাড়িতে কলকাতাবাসীদের পক্ষ থেকে স্বামী বিবেকানন্দকে অভিনন্দন পত্র প্রদান করা হয়। অভিনন্দনের উত্তরে স্বামীজী বলেন, “তোমাদের নিকট আমি সন্ন্যাসী ভাবে উপস্থিত হই নাই, ধর্মপ্রচারকরূপেও নহে, কিন্তু পূর্বের মতো সেই কলিকাতার বালকরূপে তোমাদের সহিত আলাপ করিতে আসিয়াছি। হে ভাতৃগণ! আমার ইচ্ছা হয়, এই নগরীর রাজপথের ধূলির উপর বসিয়া বালকের মতো সরল প্রাণে তোমাদিগকে আমার মনের কথা সব খুলিয়া বলি। অতএব তোমরা যে আমাকে ‘ভাই’ বলিয়া সম্বোধন করিয়াছ, সেজন্য আমি তোমাদিগকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাইতেছি। হাঁ, আমি তোমাদের ভাই, তোমরাও আমার ভাই। —উচ্চ অধ্যাত্মসম্পদের অধিকারী মহাপুরুষগণের নামে আমরা সম্মিলিত হইতে চাই – সকলে মাতিতে চাই। ধর্মবীর না হইলে আমরা তাঁহাকে আদর্শ করিতে পারি না। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের মধ্যে আমরা এমন এক ধর্মবীর- এমন একটি আদর্শ পাইয়াছি। যদি এই জাতি উঠিতে চায়, তবে আমি নিশ্চয় করিয়া বলিতেছি- এই নামে সকলকে মাতিতে হইবে৷ —আমি তোমাদের নিকট এই মহান আদর্শ পুরুষকে স্থাপন করিলাম। এখন বিচারের ভার তোমাদের উপর। ——- হৃদয়ে উৎসাহাগ্নি ভ্বালিতে হইবে। লোকে বলিয়া থাকে, বাঙালী জাতির কল্পনাশক্তি অতি প্রখর, আমি উহা বিশ্বাস করি। আমাদিগকে লোকে কল্পনাপ্রিয় ভাবুক জাতি বলিয়া উপহাস করিয়া থাকে। কিন্তু বন্ধুগণ! আমি তোমাদিগকে বলিতেছি, ইহা উপহাসের বিষয় নয়, কারণ প্রবল উচ্ছাসেই হৃদয়ে তত্ত্বালোকের স্ফুরণ হয়। বুদ্ধিবৃত্তি-বিচারশক্তি খুব ভালো জিনিস, কিন্তু এগুলি বেশি দুর যাইতে পারে না। ভাবের মধ্যে দিয়াই গভীরতম রহস্যসমূহ উদঘাটিত হয়। অতএব বাঙালীর দ্বারা-ভাবুক বাঙালী দ্বারাই এ কার্য সাধিত হইবে। ——– কলিকাতাবাসী যুবকগণ, উঠ, জাগো, কারণ শুভমুহূর্ত আসিয়াছে। এখন আমাদের সকল বিষয়ে সুবিধা হইয়া আসিতেছে। সাহস অবলম্বন কর, ভয় পাইও না,—–উঠ, জাগো, কারণ তোমাদের মাতৃভূমি এই মহাবলী প্রার্থনা করিতেছেন। যুবকগণের দ্বারা এই কার্য সাধিত হইবে। “আশীষ্ঠ দ্রঢ়িষ্ঠ বলিষ্ঠ মেধাবী” যুবকদের দ্বারাই এই কার্য সাধিত হইবে। আর কলিকাতায় এইরূপ শত সহস্র যুবক রহিয়াছে। তোমরা বলিয়াছ, আমি কিছু কাজ করিয়াছি। যদি তাহাই হয়, তবে ইহাও স্মরণ রাখিও যে, আমি একসময় অতি নগণ্য বালকমাত্র ছিলাম-আমিও এক সময় এই কলিকাতার রাস্তায় তোমাদের মত খেলিয়া বেড়াইতাম। যদি আমি এতখানি করিয়া থাকি, তবে তোমরা আমা-অপেক্ষা কত অধিক কাজ করিতে পার। উঠ, জাগো, জগৎ তোমাদিগকে আহান করিতেছে। ভারতের অন্যান্য স্থানে বুদ্ধিবল আছে, ধনবল আছে, কিন্তু কেবল আমাদের মাতৃভূমিতেই উৎসাহাগ্নি বিদ্যমান। এই উৎসাহাগ্নি প্রজ্জ্বলিত করিতে হইবে। অতএব হে কলিকাতাবাসী যুবকগণ! হৃদয়ে এই আগুন জ্বালিয়া জাগরিত হও। —–আমি তো এখনও কিছুই করিতে পারি নাই, তোমাদিগকেই সব করিতে হইবে। —— আমার দেশের উপর আমি বিশ্বাস রাখি, বিশেষতঃ আমার দেশের যুবকদলের উপর। বঙ্গীয় যুবকগণের স্কন্ধে অতি গুরুভার সমর্পিত। আর কখনো কোন দেশের যুবকদলের উপর এত গুরুভার পড়ে নাই। আমি প্রায় গত দশ বছর যাবৎ সমগ্র ভারতবর্ষ ভ্রমণ করিয়াছি- তাহাতে আমার দৃঢ় প্রতীতি হইয়াছে যে, বঙ্গীয় যুবকগণের ভিতর দিয়াই সেই শক্তি প্রকাশিত হইবে, —–নিশ্চয় বলিতেছি, এই হৃদয়বান উৎসাহী বঙ্গীয় যুবকগণের মধ্য হইতেই শত শত বীর উঠিবে —–।”
বঙ্গীয় যুব সমাজের প্রতি স্বামী বিবেকানন্দ যে ধারণা পোষণ করেছিলেন এবং ভাবীকালে বঙ্গের যুব সমাজ থেকে যে শত শত বীর উঠে আসবে বলে স্বামীজী দৃঢ় প্রত্যয়ী ছিলেন সেই বীরদের সশ্রদ্ধ প্রণাম আর গুরু বিবেকানন্দকে প্রার্থনা তিনি আমাদের জীবনের ধ্রুবতারা হোন।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post