• December 4, 2021

নানা ভাবনার আলোকে হুল দিবস ও আদিবাসী সমাজজীবনঃ

 নানা ভাবনার আলোকে হুল দিবস ও আদিবাসী সমাজজীবনঃ

অর্পণ মূর্মু :- প্রথমেই হুল দিবসকে সামনে রেখে আমাদের ঠিক নিতে হবে আমাদের কী করণীয়। হুল দিবস কী এবং কেন এটা আগে বুঝে নিতে হবে। হুল দিবসে কী করব এবং কেন করব। করার কি প্রয়োজন আছে না নেই এটা আগে ভাগে আমাদের বুঝে নিতে হবে। আগে বুঝে নিতে হবে আমাদের কি অভাব-অনটন শেষ হয়ে গেছে ? না তাহলে কাদের কারণে আমাদের এখনো অবধি এইভাবে জীবন যাপন করে যেতে হচ্ছে তাদের আগে চিনে নিতে হবে। যারা আমাদের ভাল চায় না তাদের ভাল আমরা সবাই চেয়ে থাকি। অথচ তারাই আমাদের ভাল চায় না। তারা যদি আমাদের ভাল চাইত তাহলে তারা আমাদের ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্ছিত করত না। ন্যায্য মজুরি কত হওয়া যথাযথ সেটা আর বলতে লাগে না। যারা আদিবাসীদের ন্যায্য মজুরি দিতে হাত কাঁপে তারা কি করে আমাদের বেনামি জমি তুলে দেবে। যদিওবা গ্রামে গ্রামে অনেক বেনামি জমি আছে , খাসজমি আছে , পঞ্চায়েতের নামে জমি আছে , দেবোত্তর জমি আছে। পারে না তারা সেগুলো তুলে দিতে। বিশেষ করে দেবোত্তর জমি গুলো। দেব দেবী তো সবার। তাহলে সবার খাবার একজন কেনো এক ভোগ দখল খেয়ে পরে বাঁচবে। আর আদিবাসীরা না খেতে পেয়ে পরে পরে মরবে। সে জমিগুলো আসলে আদিবাসীদের জমিই ছিল। যে জমি বিদ্রোহ করার কারণে কেড়ে নিয়ে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। সেই জমিগুলো খাস হয়ে যায় পরবর্তীতে। এই কথাগুলো জানতে হয়। এগুলো জানাতে হয়। না জানলে বাবুরা আজীবন ভুল বুঝিয়ে চলেছে। আর আদিবাসীরা ঘাড় নেড়ে বুঝে চলেছে। এই কাজ বাবুরা যুগ-যুগান্তর ধরে করে চলেছে। এরাই অমানুষ। এরাই রাক্ষস। এরা আদিবাসীদের জমি চুরি করে খেয়ে পরে চলেছে। আবার আদিবাসীদেরই সেই জমিতে খাটিয়ে কম মজুরি দিয়ে বঞ্ছিত করে চলেছে। তারাই আসল শত্রু যারা এখনো অবধি আদিবাসীদের ভাল চায় না। আদিবাসী পাড়ায় রাস্তা হোক কল পায়খানা হোক ইস্কুল হোক স্বাস্থ্যকেন্দ্র হোক কেউ চায় না। আদিবাসীরা কাজ করে ন্যায্য মজুরি পাক কজন বাঙালি চায়। আদিবাসীরা পড়াশোনা করলে তাদের গায়ে ফোস্কা পরে। আদিবাসীরা পড়াশোনা করে চাকরি করলে তাদের গায়ে জ্বালা ধরে যায়। তারা আদিবাসীদের মজুর করে রাখতে চায়। তাই আদিবাসী মজুর কাজ হয়ে গেলে নগদ মজুরি নিয়ে বাড়ি ফিরুক কজন মানুষ চায়। তারা আজও কাজ করে খালি হাতে ফিরে আসে। আদিবাসীরা দু বেলা দু মুঠো পেট ভরে খাবার পাক কজন নেতা নেত্রী চায় !!! এরাই শত্রু। এদের চিনে নিয়ে এদের থেকে দূরে থাকতে হবে। আদিবাসীদের কোন গোপন কথা এদের বলা যাবে না। ইটা বলতে খারাপ শুনতে খারাপ লাগলেও বলতে হয় আমরা আদিবাসীরা আমাদের সমাজের গণ্য মান্য মানুষদের কথার চেয়ে বাবুদের কথাটা চলতে ভাল বাসি। শুনে চলতে ভাল বাসি। এটা যতদিন না ছাড়তে পারব ততদিন আদিবাসীদের কিছু হবে না। যতই পিরিত থাক। বাবুরা আদিবাসীদের সাথে কথা বলছে বলে আমি বা আমরা ভাবতে শুরু করেছি কি না কি যেন হয়ে গেছি। বাবুরা আমাদের সাথে কথা বলছে এমনি এমনি নয় তার প্রয়োজন আছে বলে। আদিবাসীদের ছাড়া তার কাজ হবে না। কিন্তু আদিবাসীদের বিশেষ বাবু ছাড়া চলে যাবে অন্য বাবুর কাজ করেও। বাবুরা কমে যায়নি। বাবুরা যে কজন ছিল সবাই রয়ে গেছে এইরকম শত্রুরা এখনো বাঙালি সমাজে রয়ে গেছে। আমাদের জীবন শাসন শোষণেই শেষ হয়ে গেছে ? যদি শাসন শোষণ শেষ হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে সারা দেশে আজ আমরা আক্রান্ত হচ্ছি কেন ? কেন শুকদেব টুডুর মতো আদিবাসী যুবকদের ধরে নিয়ে যাওয়া হবে। এটা কি জরুরি সময় চলছে না সেনা শাসন চলছে দেশ জুড়ে যে আমাদের সমাজ কর্তাদের না জানিয়ে আমাদের কাউকে যখন খুশি তখন তুলে নিয়ে যাবে। এটা করা যায় না। আর এইরকম কাজ আমরা কেন করতে দেব। কেন আমরা পাড়ায় বা গ্রামের অন্যদের জানাবো না। কেন পাশের গ্রামের মানুষদের ডাকবো না। এই ডাকা বা জানাতে গেলে প্রথমে আমাদের কি করতে হবে না সব গ্রামের আদিবাসী মানুষদের নিয়ে পুলিশি জুলুমবাজি প্রতিরোধ কমিটি গড়ে তুলতে হবে। এদের কাজ হবে সব গ্রামের মানুষের সাথে যোগাযোগ গড়ে তুলতে হবে। যোগাযোগ গড়ে তুলতে গেলে প্রতিটা পঞ্চায়েত সমিতি বা ব্লকে একটা করে হোয়াট্সআপ গ্ৰুপ গড়ে তুলে জনসংযোগ বাড়াতে হবে। সবাইকে সবার বিপদে পাশে দাঁড়াতে হবে।

পুলিশি জুলুমবাজির মতো ঘটনা ঘটলেই গ্ৰুপে পোস্ট করে জানাতে হবে। আর সবাইকে ঝাঁপিয়ে পরে পাশে দাঁড়াতে হবে। এটা করলে পরে তবে বাঁচা যাবে। নাহলে একা পরে পরে মরতে হবে। বাঁচতে গেলে সবাইকে লড়াই করে বাঁচতে হবে। এক ডাকে সবাইকে বেরিয়ে আস্তে হবে। একা বোকা। একার মতো বোকা এই দুনিয়ায় আর কেউ হয় না। শুকদেব টুডু একা হয়ে পড়েছিল তাই তাকে পুলিশ লকআপে পিটিয়ে মারার সাহস দেখিয়েছিল। আমরা মানুষ হয়ে যদি মানুষের পাশে না দাঁড়ায় তাহলে কে দাঁড়াবে। পশুরা তো আমাদের ভাষা বোঝে না তাই দাঁড়াতে পারে না। কিন্তু আমরা তো বুঝি তাহলে কেন না বোঝার ভান করে দূরে সরে থাকব। আজ থেকে দু বছর আগে যেদিন শুকদেব টুডুকে ধরা হয় তখন আমাদের থানা ঘেরাওয়ের প্রয়োজন ছিল। এমনি দিন থানা ঘেরাও না করে এই দিনগুলোকে বেঁচে নিতে হবে। যেমন হুল দিবসের দিনই আমরা এখানে বসে অনুষ্ঠান না করে এই অনুষ্ঠান করার দরকার ছিল বর্ধমান টাউনে পুলিশ সুপারের অফিসের সামনে। সেখানে আমাদের পুলিশি জুলুমবাজি নিয়ে নানা ধরণের আলোচনার মধ্যে দিয়ে পুলিশ প্রশাসনের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া যে আমরা সরল শান্তি প্রিয় আদিবাসী মানুষ। আমাদের বিরুদ্ধে পুলিশি জুলুমবাজি বন্ধ করতে হবে। আমাদের মিথ্যা মামলায় জেরবার করে দেওয়া হচ্ছে। এটা বন্ধ করতে হবে। মিথ্যা মামলায় যে সব আদিবাসী যুবক বিনা বিচারে পরে পরে জেলখানায় মরছে তাদের মুক্তি দিতে হবে। এই কাজগুলো কোন দল করবে না। আমরা আদিবাসী আমাদেরই করতে হবে। আমাদের জন্য তৃণমূল বলো বিজেপি বলো কেউ কোনদিন কাজ করেনি আর করবেও না। এরা সব সমান। এরা লুটে পুটে খাবে। এই জন্যই এরা ক্ষমতার গদিতে বসতে চায়। আর এতো লুটপাট চালায় যে ভাবা যায় না। প্রকাশ্য ক্যামেরায় বসে টাকা লুটে পুটে খায়। এদের জেল হয়না। এদের শাস্তি হয় না। পুলিশ এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে আদিবাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে উঠে পরে লাগে। একথা পুলিশদের বলতে হবে। পুলিশের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারলে পুলিশ ভয় পাবে। যারা ভয় দেখায় তাদের পুলিশ ভয় পায়। আর যারা পুলিশকে ভয় পায় পুলিশ তাদের পেয়ে বসে।

আদিবাসীরা কোনদিন অন্যায় করে নি আর করবেও না। তাই পুলিশদের আমাদের পাড়ায় ঢুকতে দেওয়া যাবে না। আমরা চুরি করি না ডাকাতি করি না আমরা বধূহত্যা করি। যারা করে তাদের পাড়ায় পুলিশ আপনারা যাবেন। আমাদের পাড়ায় মিথ্যা জুলুমবাজি করতে আসবেন না। একথা বলা যাবে না। এই কথা বলতে ভয়ের কিছু আছে কি। যাক সবাই ভাল থাকবেন সুস্থ থাকবেন।

ছোটদের ভালবাসা দুলোর , বন্ধুস্থানীয়দের গাতে সোহাগ আর বড়দের নমস্কার জানিয়ে শেষ করছি।
আমরা এতকাল ধরে হুল দিবসে যা যা দেখে এসেছি স্বাভাবিকভাবে সেই সব কথা এই প্রসঙ্গে উঠে আসে। হুল দিবসের দিনে নাচ-গানের পাশাপাশি গায়ান বাংলায় যাকে নাটক বলে সে সব অভিনীত হতে দেখেছি। আর এতবড় কর্মকান্ড সব নিজেরাই নিজেদের দায়িত্বে সম্পন্ন করতে দেখে ভাল লাগত। তখন হয়তো চাকচিক্য বা জৌলুষ ছিল না হয়তো তবে প্রাণ ছিল। আর আজ এই সময়ে দাঁড়িয়ে যা দেখছি তা অভিপ্রেত নয় বলে মনে করি। কাঁড়িকাঁড়ি সরকারি টাকা অপচয় করা হচ্ছে। বাইরে থেকে ভাড়া করে নাচিয়ে-গাইনাহারিদের আনা হচ্ছে। আর যেসব গান নাচ সেদিনের উপযোগি নয় সেসব নাচ-গান করে আদিবাসী সংস্কৃতিকে কলুষিত করা হচ্ছে। আদিবাসীরা এমন এক জাতি যাদের সব কিছু রয়েছে। অর্থাৎ নিজেরা স্বনির্ভরশীল বলা যায়। এ প্রসঙ্গে আমরা নাচ-গানের কথায় বলব। এদের মধ্যে ঋতুবিষয়ক গান এখনও বেঁচে রয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে ভিন্ন ভিন্ন গান। এছাড়া সুখের গান-দুঃখের গান তো আছেই। হুল দিবসে এরা এই দুঃখের গানই গেয়ে থাকে। সে সব চল আসতে আসতে হারিয়ে যাচ্ছে। হারাতে হারাতে না একদিন সব কিছু হারিয়ে যায়। সময় থাকতে না বুঝলে যেদিন সব হারিয়ে যাবে সেদিন আর কিছুই করার থাকবে না। এজন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাকেই আমি দায়ী করব। পৃষ্ঠপোষকতার নাম করে আদিবাসী সংস্কৃতিকে বিপন্নতার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। শুধু প্রাণ ত্যাগ করাটা মৃত্যু নয়। নিজের ধর্ম ও সংস্কৃতির উপর আঘাত হচ্ছে জেনে চুপ করে থাকাটাও একপ্রকার মৃত্যু। এটা বন্ধ করা ভীষণ জরুরী হয়ে পড়েছে। না হলে আদিবাসী সংস্কৃতি একদিন সব হারিয়ে পূর্ববঙ্গ থেকে আগত বাঙালিদের মতো অবস্থা হয়ে যাবে।

হুল দিবস নিয়ে আমার কিছু ভাবনা — শুধু হুল দিবসের দিনে অনুষ্ঠান করেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সবচেয়ে ভাল কাজের মতো কাজ হবে প্রতি বছর ওই দিনে জেলার বিশেষ জায়গায় আমাদের এই বঞ্চনার কথা নিয়ে একটি অনুষ্ঠান করা। তারপর নিয়ম মতো সরকারি অফিস সে বিডিও বা এস ডিও অফিসে গিয়ে কর্তাদের সাথে দেখা করে নিজেদের বঞ্চনার কথাগুলো তুলে ধরা। নিজেদের নতুন নতুন দাবি দাওয়া নিয়ে বিডিও বা এসডিও দের সাথে দরবার করা। তারজন্য দলে দলে গিয়ে জমায়েত করতে হবে নিজেদের তাগিদে যেতে হবে। কেউ যেন এই দিনগুলোতে বাড়িতে বসে না থাকে। সারাদিন এইসব কাজ শেষ করে রাত্রিরের দিকে নিজেদের অনুষ্ঠান গ্রামে গ্রামে করতে হবে। গ্রামে গ্রামে অনেক অনুষ্ঠান হয়েছে। আর শুধু নিজের পাড়ায় নিজের গ্রামে অনুষ্ঠান করে খুব বিশেষ লাভ নেই দিন বদলের সাথে সাথে আমাদের মানসিকতার বদল ঘটাতে হবে। আমাদের লক্ষ্য যদি হয় হয় সমাজ বদল। সমাজের সব মানুষের অভাব অভিযোগ দূর করা যদি আমাদের লক্ষ্য হয়ে থাকে তবে আমাদের সরকারি পদস্থ কর্তাদের ঘুম ভাঙাতে হবে। তাদের কাছে যেতে হবে। তাদেরকে আমাদের অভাব অভিযোগের কথা জানাতে হবে। তাই এই দিনটিকে বেছে নিতে হবে। এই দিনটি এই কাজের পক্ষে দারুণ উপযুক্ত। তবে হুল দিবস পালন সার্থক হয়ে উঠবে। এতকাল ধরে যা হয়ে এসেছে তাই হয়ে চলবে। সমস্যার গোড়া চিহ্নিত করে তারপর সুরাহার ব্যবস্থা করতে হবে। নাহলে যে অবস্থায় পড়েছিলাম সেখানেই পড়ে থাকব। আমাদের অভাব অভিযোগ নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট যেমন করব তেমনি পাশাপাশি এই কাজগুলোও করতে হবে।

ইংরেজ আর আজকের এই সরকার যারা এখন রাজ্য চালাচ্ছে দুই সমান। একই মুদ্রার দুই পিঠ। ইংরেজ আমলে জোতদার-জমিদার-সুদখোর মহাজন আর মহেশ দারোগা যেভাবে শাসন-শোষণ-জুলুমবাজি চালিয়েছিল আজকের এই সরকার সব জুলুমবাজিকে ছাড়িয়ে গেছে। আজ দিকে দিকে জমিদারি ব্যবস্থা নতুন করে গড়ে উঠছে। নতুন করে শুরু হয়েছে জমি-ভিটে-মাটি কেড়ে নেওয়ার খেলা। আর জাহের থান জবর দখল করে নেওয়া এই ভোটের পরে দিকে দিকে শুরু হয়েছে। এর বিরুদ্ধে যেভাবেই হোক রুখে দাঁড়াতে হবে। ঘরে ঘরে পাড়ায় পাড়ায় প্রস্তুতি শুরু করে দাও। আমাদের এই সরকার বাঁচতে দেবে না। তাই করোনার নাম করে আসলে গরিব আদিবাসীদের ভাতে মারার ব্যবস্থা করেছে। যারা মরার তারা মরবে তাদের বাঁচানো যাবে না। আর যারা বাঁচতে চায় তাদের কেন লকডাউন করে দিয়ে মারার বন্দোবস্ত কেন করা হয়েছে। এ তো জ্যান্ত মানুষদের মেরে ফেলার ব্যবস্থা ছাড়া আর কিছু নয়। একদিকে এই গেল অন্যদিকে নতুন করে আমাদের শেষ অবলম্বন অযোধ্যা পাহাড়ের অধিকার কেড়ে নিতে উঠে পরে লেগেছে। যা আমাদের আদিবাসীদের কাছে আজাদিয়া বুরু বলে পরিচিত। যা আমাদের পরম পবিত্র জায়গা বলে পুরুষানুক্রমে পরিচিত। এই পাহাড়ে বছরে একটা দিন শিকার করার রেওয়াজ ছিল। সেই রেওয়াজ আজ শিকেয় তুলে দিয়েছে এই সরকার। আর আমরা কোনদিন এই পাহাড়ে শিকার করতে পারব না সেই ব্যবস্থা এই সরকার করে ফেলেছে। তাহলে এই সরকারকে ভাল আর বলা যায় না। আমরা যারা ভাল বলে ভেবেছিলাম সেটা আমাদের ভুল ভাবা। কুমীর কোনদিন ভাল হতে পারে কি ! কুমির যেমন সুযোগ পেলেই গিলে সব কিছু খেয়ে ফেলে। তেমনি এই সরকার ঠিক করেছে আদিবাসীদের সর্বস্ব খেয়ে নিতে চায়।

আগের সরকার আমাদের যে সব অধিকার দিয়েছিল এই সরকার সব অধিকার কেড়ে নিতে চায়। প্রথমে চাকরির অধিকার কেড়ে নেওয়া হল। এখন চাকরি ক্ষেত্রে কোন সংরক্ষণ মানা হচ্ছে না। চাকরি ক্ষেত্রে যে নিয়ম-নীতিগুলো ছিল সেগুলো মানা হচ্ছে না। চাকরীর পরীক্ষার একটা নির্দিষ্ট তারিখ থাকে। বছরে এই সময় পরীক্ষা হবে। এই সময় যারা পাশ করেছে তাদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হবে। এই সময় মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হবে। কখন কাদের কোন সময় মৌখিক পরীক্ষা হবে সব বিশদে অনলাইন ও অফলাইনে তার তালিকা দেওয়া হবে। তারপর প্যানেল তৈরি হবে। সেটাও অফলাইনে ও অনলাইনে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হবে। কিন্তু এই সরকারই প্রথম দেখাল যে কিভাবে সবাইকে ফাঁকি দিতে হয়। কিভাবে অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতি করতে হয়। কিভাবে যোগ্য প্রার্থীদের বঞ্ছিত করতে হয়। আর কিভাবে টাকার বিনিময়ে চাকরি বিক্রি করতে হয়। সব দেখতে হল। ৭২ সাল ৭২ সাল দেখা হয়ে গেল। কিভাবে মানুষের ভোট চুরি করতে হয় সব দেখা হয়ে গেল। ৭২ সালে যা হয়নি তা অবধি দেখা হয়ে গেল। সেটা হচ্ছে আদিবাসীদের বঞ্চনা। আদিবাসীদের সাথে এইরকম বঞ্চনা এর আগের কোন সরকারই করে নি। এ আর কিছুই না আদিবাসীদের চাকরি দেওয়া যাবে না। আদিবাসীদের খুব তেল হয়েছিল আগের সরকারের আমলে সেই তেল শেষ করে দেওয়ার জন্য এই সরকার এসেছে। আজ পাড়ায় পাড়ায় গ্রামে গ্রামে কত কত আদিবাসী বেকার ছেলে মেয়ে চাকরি না পেয়ে মরতে বসেছে সেদিকে আমাদের খেয়াল আছে কি ! আর কতদিন মুখ বুজে পরে পরে আদিবাসীরা মার খাবে বলতে পারো কী। আর নয় ১০ বছর পেরিয়ে ১৫ বছর হতে চলল। আদিবাসীদের দশ হাল বইয়ে ছেড়েছে। এবার পনেরো হালের দিকে চলেছি। আর মুখ বুজে এ অনাচার মেনে নেওয়া যায় না। জেগে ওঠ আদিবাসী ভাইয়েরা। নিজেদের অবস্থার দিকে তাকাও। নিজেদের বাঁচার অধিকার আজ কেড়ে নিয়ে দয়ার দানে আজ বাঁচতে হচ্ছে। লজ্জা করে না। হাতে কাজ নেই। ন্যায্য মজুরী নেই। তার উপর লকডাউন করে ঘর বন্দি করে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র চলছে। আর নয় এবার হাতে তীর ধনুক তুলে নাও। দিকে দিকে নতুন করে হুল করার জন্য আওয়াজ তোলো।

আদিবাসীদের দুর্দশা উত্তরোত্তর বেড়ে গেছে , এই সময় অরণ্য আইন দেখি ( এই আইনই আদিবাসীদের সর্বনাশের মূল – এই আইন তুলে দেওয়ার জোরালো দাবি তোলা হোক , সংরক্ষণ না তুলে অরণ্য আইন বাতিল করা হোক , এই আইন বাতিল না হলে আদিবাসীরা বাঁচবে না- পরিবেশ বাঁচবে না ),সেদিন অবিভক্ত বঙ্গদেশের ক্ষত্রিয় বংশের ধারক বাহকেরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। বিদ্রোহ বা হুল করার ডাক দিয়েছিল। তারপর থেকে সমস্যা বিশেষ করে সামাজিক সমস্যা বহুগুণ বেড়ে গেছে। দেশ-দশের ভাল করতে গিয়ে সবার কাছে খারাপ হয়ে গেল , সমাজে বৈষম্য-বিদ্বেষ বেড়ে যায়। পদে পদে হেনস্তা , পদদলিত করার মানসিকতা বেড়ে যায়। সাথে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা বেড়ে যায়। এখন সময় এসেছে আদিবাসীদের বাঁচার স্বার্থে একত্রিত হতে হবে। নচেৎ বাঁচা যাবে না। একে অপরের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। কারোর ডাকের অপেক্ষায় থাকলে পড়ে পড়ে মরতে হবে। আজকে রামের হয়েছে আমার হয়নি বলে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকব না। আজ শুকুলের হয়েছে কালকে আমাদের সবার সাথে হতে পারে। তাই সময় থাকতে রুখে দাঁড়াতে হবে। আর কতকাল ঘুমিয়ে থাকবে। আর কতকাল তাবেদারি করে জীবন কাটাবে। তাবেদারি না করে নিজের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি পাড়ায় পাড়ায় শুরু করে দাও। তাবেদারী তোষামোদ করে একদিন দুদিন খেয়ে পরে বাঁচা যায়। বংশ পরম্পরায় যায় না। আজ চাকরি নেই। মাঠে ঘাটে , খেত-খামারের কাজ শেষ। আজ আদিবাসীরা না খেতে পেয়ে মারার ব্যবস্থা করেছে বর্তমান সরকার। আর ভিক্ষা দিয়ে বাঁচানোর ব্যবস্থা করেছে। আওয়াজ তোলো দিকে দিকে ভিক্ষা নয় অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। দয়ার দান নয় , ভিক্ষা দিয়ে নয় স্থায়ী সরকারি কর্ম পাইয়ে দিয়ে বাঁচার অধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে। আজকে বেসরকারিকরণের মধ্য দিয়ে কৌশলে সংরক্ষণ তুলে দেওয়ার বন্দোবস্ত পাকা করা হল। আর আদিবাসীরা না বুঝে সে ফাঁদে পা দিয়ে আজ মরতে বসেছে। আজকে যে সিভিক ভলান্টিয়ার নিয়োগ করা হয়েছে ১ লক্ষের মতো এতে আমাদের ভাগ কত হতে পারত হিসেব করে দেখেছেন ? প্রায় ১০ হাজার কই ১০ হাজার আদিবাসী যুবক যুবতীকে সরকার চাকরি দিয়েছে কি ? আদিবাসী দাবি- দেশের ত্রিপাতাকা থেকে দেশের তিন অংশের কথা প্রমাণিত , এইরকম বঞ্চনা চলতে পারে না। এর বিরুদ্ধে আমাদের শাসক দলের বিধায়কেরা কোনদিন মুখ খুলেছে। এতজনকে নেতা মন্ত্রী হতে দেখলাম কেউ কিছু বলেছে কি। আমাদের এই অবস্থার জন্য শাসক দলের নেতা-মন্ত্রীদের দায়ী করব। তাদের কাঠগড়ায় তুলব। বলব ঠুঁটো জগন্নাথ ও কলের পুতুল হয়ে না থেকে চেয়ার ছাড়ুন। উঠে দাঁড়ান। মেরুদন্ড সোজা করুণ। তাবেদারি করা ছাড়ুন। এইরকম বঞ্চনা চলতে পারে না। এর বিরুদ্ধে আমাদের শাসক দলের বিধায়কেরা কোনদিন মুখ খুলেছে। এতজনকে নেতা মন্ত্রী হতে দেখলাম কেউ কিছু বলেছে কি। আমাদের এই অবস্থার জন্য শাসক দলের নেতা-মন্ত্রীদের দায়ী করব। তাদের কাঠগড়ায় তুলব। বলব ঠুঁটো জগন্নাথ ও কলের পুতুল হয়ে না থেকে চেয়ার ছাড়ুন। উঠে দাঁড়ান। মেরুদন্ড সোজা করুণ। তাবেদারি করা ছাড়ুন। আলাদা রাজ্যের দাবি তুলুন। খিদে পেয়েছে না বললে কেউ যেমন খেতে দে না। তেমনি আমাদের দাবি দাওয়া পূরণ করা না হলে আমাদের আলাদা রাজ্য দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। আমরা আপনাদের সাথে থাকব না। আমরা আলাদা হয়ে যাবে। আমাদের পাওনা-গন্ডা বুঝিয়ে দেওয়া হোক। না দিলে আমরা জোর করে কেড়ে নেব। আমরা এই সরকারের শাসনে ভাল নেই। আপনি আদিবাসী বেকারদের দয়া করছেন। ঠিক আছে আপনাকে দয়া করতে হবে না। আপনি তাদের অধিকার বুঝিয়ে দিন। মাথায় রাখবেন তারা কিন্তু শিক্ষা-দীক্ষার দিক দিয়ে আপনার চেয়ে অনেক উঁচুতে অবস্থান করছে। তাদের অধিকার দিন , সুযোগ সুবিধা দিন। নয়তো নতুন রাজ্য দিয়ে তাদের অধিকারকে যথাযথ মর্যাদা দিন। আপনার রাজ্যে আদিবাসীরা সুরক্ষিত নয়।

আদিবাসীদের প্রাপ্য অধিকার থেকে দিনের পর দিন বঞ্ছিত করে পিছিয়ে রেখেছেন। প্রতি বছর ১০০ জন করে আদিবাসী বেকার যুবক যুবতীর কর্মসংস্থান হত এই রাজ্যে। আজকে এই সরকার এসে সেই অধিকার থেকেও আদিবাসীদের বঞ্ছিত করেছে। আজ হিসেবে করলে ১০ বছরে ১০০০ জন আদিবাসীর চাকরি পাওয়ার কথা। কোথায় গেল এই সরকারের আদিবাসী প্রীতি। উবে গেল !!! না সেটা ছিল মুখোশ। মুখ আর মুখোশের মধ্যে আকাশ আর পাতাল ফারাক। এগুলো আর কবে বুঝবেন। আর ঘুমিয়ে থাকলে চলবে না আদিবাসী ভাই বন্ধুরা এবার তো অন্তত জেগে উঠুন আর নিজেদের অধিকার বুঝে নিন। এভাবে আর পড়ে পড়ে কতদিন মার খাবেন। নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে শিখুন। আমাদের চাল-ডাল-তেল-নুন পাইয়ে দেওয়া কোন অধিকার নয়। এসব দয়ার দান গর্জে উঠে বলে উঠুন এসব দয়ার দান আমাদের চাই না। আমাদের ন্যায্য মজুরী দিন যে হারে কেরালা সরকার ক্ষেত্রে মজুরদের মজুরি দেয় সেই হরে আমাদের মজুরি দিন। বছরে ১০০ দিন মানে ৩ মাস কাজ কি হবে এতে। এটা বাড়িয়ে ২০০ দিন করে দিন। আমাদের আর দয়া-ভিক্ষা দিতে লাগবে না।
উত্তরবঙ্গে গোর্খাদের দেখুন তারা কিভাবে দাবি-দাওয়া আদায়ে একত্রিত হয়ে গোর্খাল্যান্ড দাবি করে আজ হাতের মুঠোয় পেতে চলেছে।
আজকে আমরা অতিমারির সাথে লড়াইয়ের মধ্য দিয়েও অতীত ঐতিহ্যকে ভুলি নি। বা ভুলতে পারি না। ভোলা যায় না। তাই হুল দিবস নিয়ে আলোচনা হলেও অতিমারির কথা এ প্রসঙ্গে চলেই আসে। প্রথম যেদিন আদিবাসীরা পরিবেশ বাঁচানোর জন্য লড়াই করেছিল সেদিন আজকের এই সভ্য সমাজ তাদের সমর্থন করেনি। তাই আজ যা হবার তাইই হয়ে চলেছে। সময় থাকতে সাবধান না হলে এই পরিণতিই নেমে আসা স্বাভাবিক। আর এ তো গেল প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কথা। এবার আসি মনুষ্য সৃষ্ট বিপর্যয়ের কথা। এ বিপর্যয় বলে কয়ে আসে না। আর মানুষ কর্তৃক বিপর্যয় বলে কয়ে নেমে আসে। আমি এ প্রসঙ্গে পুলিশি তান্ডবের কথা বলতে চলেছি। পুলিশের সব ভাল তেমনি খারাপ দিক গুলি হল এরা গরিব দুঃখীদের উপর জুলুমবাজি করে বেশি। আর প্রভাবশালীদের বেলায় ভিজে বেড়াল। কিছুই করতে পারে না। সেই দৃশ্য আমরা এই বাংলার মানুষ চাক্ষুস করার সুযোগ পেয়েছি সারদা নারোদার বেলায়। আর এই ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনের সময়। যারা তান্ডব করে তাদের পুলিশ কিছুই বলতে পারে না। চোর ডাকাত গুন্ডা বাইক বাহিনী লুঙ্গি বাহিনী এদের বেলায় এনারা নীরব থাকেন। আর আদিবাসীদের বেলায় সরব হয়ে ওঠেন। ইটা আমরা সেকালেও দেখেছি মহেশ দারোগার দাপটের কথা শুনেছি। এবার আসি মোদ্দা কথায় পুলিশকে বেশি পাত্তা দেবেন না। দিলেই পেয়ে বসবে। চোখে চোখ রেখে তাদের সাথে কথা বলুন। পাড়ায় পুলিশ এলে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। নারী বাহিনী রুখে দাঁড়াবেন দেখবেন ভয়ে পালাবার পথ পাবে না।

অতীত কোনদিন ভোলা যায় না। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে হয়। আমরা আদিবাসীরা অতীত থেকে শিক্ষা নিয়েছি কি ! নিজেদের প্রশ্ন করুন। উত্তর পেয়ে যাবেন। আমরা অতীত থেকে শিক্ষা নিলে ঠিক ঘুরে দাঁড়াতাম। আমরা অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরিবর্তে অতীত ভুলতে বসেছি। তাই নয় কি ! অতীত ভুলতে বসেছি বলেই হয়তো আজকে আমরা শোকের দিনে , দুঃখের দিনে নাচ গানের আনন্দে মেতে উঠি। নিজের বিবেককে প্রশ্ন করব না , আমরা যা করে চলেছি ঠিক করছি কিনা। আর আমাদের মাঝি পারগানা মহলের পদে যারা বসে আছে তারা নিজেদের সংস্কৃতির কলুষতাকে মুখ বুজে মেনে নিচ্ছে কেন সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন। আমরা কেন সমাজের মানুষের দরবারে গিয়ে তাদের শেখাব না। বলব না যে সমাজে আমরা না জেনে যা করে চলেছি সেটা ঠিক নয়। এটা শুধু মাত্র স্মৃতিচারণমূলক আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাক। তাই মাঝি পারগানা মহলের কর্তাদের সম্মান জানিয়েও বলছি সাঁওতালি বুদ্ধিজীবী মহলকে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতাকে এড়িয়ে যেতে পারিনা। সিধু কানুর পূরিত না হওয়া লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমাদের সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বভার কাঁধে তুলে নিতে হবে। সেদিন কী কারণে হুল ব্যর্থ হয়েছিল তা মূল্যায়ণ করতে হবে। তারপর আগামীর লক্ষ্য স্থির করতে হবে। মাথায় রাখতে হবে দাবি দাওয়া আদায়ের মোক্ষম অস্ত্র হুল। হুল না করলে সভ্য সমাজে কানে তুলো গুঁজে বসে থাকা মানুষেরা জানতেই পারবে না আমাদের অভাব-অনটনের কথা। তারা আজও মিথ্যা প্রচার করে চলেছে আদিবাসীরা ভাল আছে , সুখে আছে , শান্তিতে আছে। এটা তাদের দোষ নয়। আমাদের ব্যর্থতা। একশ্রেণীর মানুষ স্বাধীনতার পরে প্রচার করে দিয়েছে। দেশ স্বাধীন তাই দেশে আর কোন সমস্যা রইলো না। সব সমস্যা সমাধান হয়ে গেছে। না এটা অপপ্রচার। রাতারাতি কোন সমস্যার সমাধান হয়ে যায় না। সমস্যা সমাধান করতে গেলে পরিকল্পনার দরকার। সে পরিকল্পনা বাবা সাহেব আম্বেদকর করে গিয়েছিলেন বটে। তাকে মান্যতা দেয়নি এই ভন্ড দেশ সেবকেরা। বাবা সাহেব রচিত সংবিধান এরা বদলে দিয়েছে। তাই আমরা শান্তিতে আছি জঙ্গল মহল হাসছে এগুলো সব চটকদারি প্রচার ছাড়া আর কিছু নয়। এতে বিশ্বাস করলে পড়ে পড়ে মরতে হবে।

সেকাল বলতে পরাধীন দেশে আদিবাসীরা ভাল ছিল না। একাল বলতে এই সময়েও আদিবাসীরা ভাল নেই। আমরা যে যাই বলি না কেন এটাই বাস্তব সত্য। আগে তবু শাসন শোষণ মাত্রা ছাড়ালেই বাঁচার তাগিদে আদিবাসী সাঁওতাল জাতির মানুষেরা ফোঁস করে উঠত। নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য মাঝে মাঝে লড়াই সংগ্রামও করতে দেখেছি। আর এখনকার আদিবাসীরা লড়াই করতেই বোধহয় ভুলতে বসেছে । এখন আমরা শৌখিন তোতাপাখি হয়ে গেছি সবাই। পিঠ বাঁচিয়ে চলাতেই এখন সবার আনন্দ। কেউ কারোর জন্য কিছু করি না , কিছু ভাবিনা। কারোর বিপদে পাশেও দাঁড়ায় না। এখনকার আদিবাসীরা নিজেদের অধিকারের দাবিতে লড়াইয়ের পরিবর্তে দয়ার দানে বেঁচে থাকাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তাই আজকে সবাই কমবেশি দলদাস হয়ে গিয়ে নিজেরাও কিছু বলে না। অন্যকেও বলতেও দেয় না। আদিবাসী বলতে বোঝাত প্রতিবাদী মুখ। কোন অন্যায়ের সাথে আপস না করা , প্রবল প্রতিকূলতার কাছে নতি স্বীকার না করা ভয় ডরহীন আদি মানব। আজ তারা কোন জাদুমন্ত্রে বশীভূত হয়ে প্রতিবাদ করাও ভুলতে বসেছে। আদিবাসীদের পরিচয় শুধু তাদের ভাষা-সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে বহিঃপ্রকাশিত হয় তা নয়। তাদের সব চেয়ে বড় অহংকারের জায়গা ছিল তারা প্রতিবাদী। সেই জায়গাটা আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে তাদের মৌলিকতা , হারিয়ে যাচ্ছে তাদের লড়াকু মানসিকতা। হারিয়ে যাচ্ছে তাদের সংস্কৃতি , হারিয়ে যাচ্ছে তাদের ভিটে-মাটি। তবু সব জেনে বুঝে তাদের একাধিক সংগঠন চুপ করে আছে। আজ অবধি কোন পদক্ষেপ করতে দেখিনি। তারা শুধু ভাষা আর ধর্ম নিয়েই পড়ে রয়েছে। এর বাইরে তারা বেরিয়ে আসতে পারিনি। তার বাইরেও যে ভূমি সমস্যা , শিক্ষা,সমস্যা, সামাজিক-রাজনৈতিক সমস্যা রয়েছে তারা এখনও অবধি এগুলো নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামায় না।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post