• December 4, 2021

জাতিস্মর যখন ডিরোজিও

 জাতিস্মর যখন ডিরোজিও

সুমন ভট্টাচার্য :- টেলর সুইফট আর এড শিরান। আমার কন্যা এই দুই শিল্পীতে সম্মোহিত তাঁর কম্পিউটারের স্ক্রিন সেভারও টেলর সুইফট।আর এড শিরান অহর্নিশি বাজতে থাকে কন্যার মোবাইলে।আজকের সময়ের এই দুই পপ তারকায় হয়তো শুধু আমার কন্যা নয়, একটা গোটা প্রজন্মই আচ্ছন্ন।

যদি কেউ একটু খেয়াল করে আজকের প্রজন্মের পছন্দের কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করতেন, তাহলে একটা অদ্ভুত মিল খুঁজে পেতেন।টেলর সুইফট এবং এড শিরান আসলেই আজকের সংস্কৃতির প্রতিবাদী মুখ।টেলর যদি মার্কিন নির্বাচনে প্রকাশ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে গিয়ে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের সমর্থন করে থাকেন তো এড শিরান ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের সোচ্চার সমর্থক ছিলেন। অর্থাৎ দুজনেই নিজেদের রাজনৈতিক পছন্দ অপছন্দকে গোপন করেন না, বরং খোলাখুলি সেগুলিকে সামনে নিয়ে আসেন।

যদি পশ্চিমী দুনিয়ার দুই সবচেয়ে বড় পপ আইকন, যাঁরা জনপ্রিয়তায় এবং বিক্রির দিক থেকে সব রেকর্ডকে গত কয়েকবছরে বারবার ভেঙেছেন, নিজেদের অনূকূলে আবার গড়েওছেন, তাঁরা এতটা রাজনীতি সচেতন হন,অতি দক্ষিণপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধাচরণে এতটা সক্রিয় হন, জনমত তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা নেন, তাহলে টেলর সুইফট বা এড শিরান কে নিয়ে বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয় বইকি! আমিও সেইজন্য মন দিয়ে এদের গান শুনি।

আমার মেয়ে যখন এড শিরানের নতুন গান আমাকে পাঠায় কিংবা মার্কিন মুলুকে কৃষ্ণাজ্ঞদের আন্দোলনের সমর্থনে এই পপ তারকার বিবৃতি হোয়াটসআপে ফরোয়ার্ড করে,তখন আমিও তাঁকে মনে করিয়ে দিই আমাদের প্রজন্মের একজন কবীর সুমন ছিলেন। যিনিও অতি দক্ষিণপন্থী রাজনীতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অনায়াসে লিখতে পারেন এবং উচ্চারণ করতে পারেন, পুড়ছে আমার স্বদেশ…

এবং এই কারণেই কবীর সুমন বাংলা গানের বব ডিলান।

গত শতকের ছয়ের দশকে একদিকে ভিয়েতনাম যুদ্ধ অন্যদিকে উত্তাল ছাত্র আন্দোলন, আর সেই সময়ের প্রতিবাদী রাজনীতি যেমন বব ডিলানের লেখায় নিজেকে খুঁজে পেয়েছিল, তেমনই নব্বই পরবর্তী বাঙালি মননের গতিমুখকে কবীর সুমন বারবার বদলে দিয়েছেন। তিনি যেমনই বাঙালিকে ভালবাসায় মন দিতে, কলকাতাকে নিয়ে গর্ব করতে শিখিয়েছেন, তেমনই প্রতিবাদের এবং প্রতিরোধের শব্দ যুগিয়েছেন।কিন্তু শুধু এইটুকু বললে গত তিরিশ বছরে বাঙালির সমাজজীবনে কবীর সুমনের অবদানকে বোঝা যাবে না।তিনি যে ভাবে ছেনি হাতুড়ি দিয়ে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাকে আক্রমণ করেছেন,একেবারে টুকরো টুকরো করে দিয়েছেন তা হয়তো উনবিংশ শতাব্দীতে ডিরোজিও কে মনে করাবে| সাম্প্রদায়িকতা বা অন্ধ বিশ্বাসকে আক্রমণে তিনি হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও র মতোই নির্মম, হয়তো কখনও কর্কশও।কিন্তু ভারতে বা এই বঙ্গে অতি দক্ষিণপন্থী, কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বাড়বাড়ন্ত দেখলে মনে হয় কবীর সুমনের এই পাল্টা আক্রমণের দরকার ছিল।

আমি নিজে যেহেতু সমাজবিজ্ঞানের সামান্য ছাত্র হিসেবে আমেরিকায় কৃষ্ণাজ্ঞদের অধিকারের আন্দোলন, সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে ভারতে মুসলিমদের চ্যালেঞ্জকে একই জায়গায় দেখি, সেহেতু ক্যাসিয়াস ক্লের মহম্মদ আলি হয়ে যাওয়ার সঙ্গেই একমাত্র সুমন চট্টোপাধ্যায়ের কবীর সুমনে পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ার তুলনা করতে পারি। কিন্তু ক্যাসিয়াস ক্লের শহর লুইভিল বা মার্কিন মুলুকের কেন্টাকি তে বেশ কয়েকবার যাওয়ার সুবাদে বলতে পারি একজন কৃষ্ণাজ্ঞ হিসেবে অলিম্পিকে স্বর্ণপদকজয়ী বক্সারকে যেসব বাধ্যবাধকতার মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে ইসলামকে বেছে নিতে হয়েছিল, সুমন চট্টোপাধ্যায়কে তার অনেকগুণ বেশি চ্যালেঞ্জ এবং সামাজিক বাধাকে অতিক্রম করে কবীর সুমন আইডেন্টিটিকে ধারণ করতে হয়েছে। সেই দিক থেকেও তিনি গত দুই দশকের বাঙালি সমাজ জীবনে তিনি নিজেকে আইকনিক পর্যায়ে তুলে নিয়ে গিয়েছেন।

আমি নিজে অবশ্য মনে করি কবীর সুমন হিসেবে তাঁর আইডেন্টিটি, বাংলার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে তাঁর ভূমিকা কিংবা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রতিস্পর্ধী হিসেবে সাহসী উচ্চারণ…এগুলি সবই তাঁর শিরোপায় বাড়তি পালক। শিরোপা টা হচ্ছে কবি হিসেবে, লেখক হিসেবে তিনি যেভাবে বাঙালির হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন।সেটাই হয়তো আজ থেকে ১০০ বছর বাদেও কবীর সুমন কে স্মরণীয় করে রাখবে।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post