• December 4, 2021

আমাদের স্কুল শিক্ষা ব্যবস্থা এবং নারীর ক্ষমতায়ন

 আমাদের স্কুল শিক্ষা ব্যবস্থা এবং নারীর ক্ষমতায়ন

শ্রীমঞ্জরী গুহ :- ‘স্কার্ট টা ঠিক করে বসবে তিন্নি, আর অতো জোরে জোরে হাসবে না ‘ – কথোপকথনটি আপাতভাবে কাল্পনিক মনে হলেও আমরা প্রত্যেকেই এই জাতীয় অনুরোধ বা নির্দেশ বা আদেশে অভ্যস্ত। স্কুল জীবন থেকেই শুরু হয়ে যায় ভালো মেয়ে হয়ে ওঠার এই অনুশাসন। ‘ভালো মেয়ে’ পিতৃতন্ত্রের অন্যতম হাতিয়ার। স্কুলজীবন থেকে শুরু হওয়া’ ‘ভালো মেয়ে’ হয়ে ওঠার এই প্রয়াসের উৎপত্তি বাড়ি থেকে হলেও ভারতবর্ষের মতো উন্নয়নশীল দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি এর অন্যতম বাহক।
বিভিন্ন গবেষণায় বর্তমানে এটি সুপ্রতিষ্ঠিত ধারনা যে লিঙ্গ সমতা প্রিতিস্থাপনের অন্যতম উপায় মেয়েদের শিক্ষা। UNESCO ‘Education 2030 agenda’এর অন্যতম লক্ষ্য হলো নারীর শিক্ষা, লিঙ্গ সমতা এবং নারীর ক্ষমতায়ন। আমাদের তথাকথিত স্কুল শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা পরবর্তীতে চাকরির দরজা খুলে দিলেও লিঙ্গ সমতা গড়ে তুলতে পারেনি। বরং প্রতিটা পদে স্কুল কর্তৃপক্ষের আচরণ, ছাত্রীদের নিয়ন্ত্রণের প্রবল প্রচেষ্টা লিঙ্গ বৈষম্যের ধারণাকেই প্রকট করেছে, নিজের ব্যক্তিগত স্কুল জীবন ও বহু পরিচিত মহিলার স্কুলজীবনের অভিজ্ঞতা আমাদের জানায় ছাত্রীদের অত্যাধিক কথা বলা, তাদের স্কার্টের উচ্চতা, অত্যাধিক পুরুষ বন্ধু, গলার উঁচু স্বর, ‘চুলের ছাঁট ‘ তাদের যখন তখনই তকমা দিয়েছে ‘খারাপ মেয়ের’। স্কুল প্রদেয় এই তথাকথিত শিক্ষা ও চারিত্রিক মূল্যায়নের ভার আজীবন বহন করে চলে মেয়েরা। উন্নয়নশীল দেশের বিদ্যালয় গুলি এই ভাবেই হয়ে ওঠে পিতৃতন্ত্রের ধারক ও বাহক। পরবর্তী ব্যক্তিগত জীবনেও ক্রমাগত চলতে থাকে ‘ ভালো হয়ে ওঠার প্রচেষ্টা’। পারিবারিক জীবনেও দেখা যায় যে মেয়েরা বহুক্ষেত্রেই অর্থ উপার্জনের তুলনায় প্রাধান্য দেয় সংসারকে। ‘NSSO’ এর ‘Time use survey 2019’ র রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা যায় মেয়েরা তাদের ৯৫% সময় দেন সন্তান প্রতিপালনে। যেখানে পুরুষের, দিনের মোট সময়ের, মাত্র ২.৫% সময় বিনিয়োগ করতে হয় এই কাজে। উচ্চবিত্ত পরিবারে মহিলাদের শিক্ষা শুধুমাত্র তাদের পারিবারিক মর্যাদার চিহ্ন বহন করে, তার অর্থ এই যে মহিলাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পরিবারের ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে না। বহু ক্ষেত্রেই পারিবারিক সম্পত্তির বৃদ্ধির পর পরিবারের মহিলারা কাজে যাওয়া বন্ধ করে দেন।
জীবনের প্রথম শিক্ষাক্ষেত্র, বিদ্যালয়-ই হয়ে ওঠে পিতৃতন্ত্রের ধারক ও বাহক। স্কুল মেয়েদের শেখায় নিয়মানুবর্তিতা, ধৈ, প্রশ্নহীন আনুগত্য, বাধ্যতা, যৌন ইচ্ছার অবদমন – এর প্রতিটিই পিতৃতন্ত্র ও সার্বিক ভাবে ধনতন্ত্রের চালিকাশক্তি। এই বাধ্যতা ও আনুগত্যের শিক্ষার মাধ্যমে সরাসরি লাভবান হয় পিতৃতন্ত্র এবং পরক্ষভাবে পুজিঁবাদ। বিদ্যালয়ের শিক্ষা মেয়েদের স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার সুযোগ করে দিলেও নারীর ক্ষমতার প্রশ্নে তা মৌন বা উদাসীন রয়েছে একেবারেই।

লেখাটা শেষ করছি এক বান্ধবীর প্রশ্ন দিয়ে,
‘why in order to enjoy anything we have to revolt, why can’t we enjoy it just as it is’
এই প্রশ্ন বোধহয় শুধু তার না, পৃথিবীর সব প্রান্তের সব মেয়েদের। সর্বোপরি সব মানুষের।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post