• December 4, 2021

আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম

 আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম

স্বাতী মিত্র দত্ত :- বড় হলে সারাক্ষণ ছোটবেলার কথাই যেন বলতে ইচ্ছে করে। আসলে শিশু দিবস বড়দের জন্যই পালন করা দরকার, যারা ছোটবেলায় আর কখনো ফিরতে পারবেনা। বরং এই একটা দিন তারা তাদের শৈশবের কথা শেয়ার করে আনন্দ পাক।

কী সব দিন ছিল আমাদের ছোটবেলায়, আহা, পাড়ায় রাত্তির বেলা ছাড়া কারুর সদর দরজা বন্ধ হোতো না, সকাল, দুপুর, বিকেল হাট করে খোলা। তার জন্য অনেক বিপদ আপদও যে ঘটতো না তা নয়। যেমন একদিন দেখলাম আমার স্কুলের অঙ্ক খাতার ওপর বড় বড় করে আনাড়ি হাতে শ্রেষ্ঠা রায় লেখা, কবে যে সেই পাশের বাড়ির মেয়েটা সদ্য নাম লিখতে শিখে আমার খাতায় তার বিদ্যে ফলিয়ে গেছে তা কেউ জানেনা। আবার সাধ করে জীবনে একবার ফুল গাছ লাগিয়েছিলাম, কে যে উঠোনে এসে সেটা ছিঁড়ে দিয়ে গেল জানতেই পারলো না কেউ।

এছাড়া পাড়ায় একদল স্কুলছুট ছেলে ঘুরতো যারা সারা দুপুর এর গাছের পেয়ারা, ওর গাছের আম পেড়ে বেড়াতো, ধরা পড়লে যে শাস্তি তারা পেত তার থেকে চুরি করার আনন্দটা অনেক বেশি ছিল বৈ কী। আমার এক বন্ধুর মুখে শুনেছিলাম সে তার নিজের স্কুলের স্যারের বাড়িতেই পেয়ারা পাড়তে গিয়ে ধরা পড়ে গিয়েছিল। স্যার বলেছিলেন কল্যাণ, বলে পাড়া যেত না? গাছ থেকে ছাত্র জবাব দিয়েছিল, স্যার, বললে পাওয়া যায় না। এছাড়াও দুপুর বেলায় আমার বিশেষ করে আনন্দের কাজ ছিল মায়ের উনুনের নিভু নিভু আঁচে কাঁচা চা তৈরি করে খাওয়া, আইসক্রিমওয়ালার থেকে লুকিয়ে আইসক্রিম কিনে খাওয়া, ভাঙা কাচের চুড়ি মোমের আগুনে ধরে শিকল বানানো,আনন্দমেলা কিংবা শুকতারার গল্প পড়া, ছেলে পুতুল মেয়ে পুতুলের বিয়ে দেওয়া আর আরো ছোটবেলায় রান্নাবাটি খেলা। আগান বাগান থেকে লুচি পাতা ছিঁড়ে আনা, মায়ের ছেঁড়া শাড়ির পাড় দিয়ে পুতুলের শাড়ি করা, আরো কত কী কাজ ছিল সারা দুপুর। মা ঘুমোলে পর সব বাড়ির ছোটরাই এরকম ক্রিয়টিভ হয়ে উঠতো।
প্রতিদিন বিকেলে খেলতে বেরোনো মাস্ট ছিল আমাদের। স্কুল থেকে ফিরেই একটু খেয়ে বেরিয়ে পড়তাম খেলতে। পাড়ায় তখন সব বাড়িতেই ছোটদের এই রেওয়াজ ছিল। কী খেলিনি! পঞ্চাশ চোর চোর, গাদি, ক্রিং, ব্যাডমিন্টন, পিট্টু, ক্রিকেট, ডাংগুলি, গুলি, কবাডি এমনকি কদিন স্কুলে শেখানো খো খো ও খেলেছি। বিকেলের খেলার এমন নেশা ছিল যে একদিন বিকেলে না খেললে সন্ধেবেলার পড়া হতো না ঠিকঠাক, বিকেলে বৃষ্টি হলে ভারি কান্না পেতো, সবচেয়ে বাজে লাগতো যদি শীতের ছোট্ট বিকেলে দুপুরের ঘুম ভেঙে উঠে দেখতাম সন্ধে হয়ে গেছে।

সন্ধেবেলায় জলখাবার খাওয়ার একটা ঘটা ছিল। খেলে এসে হাত পা ধুয়ে পড়তে বসার আগে খেতে হবে। তার জন্য প্রচুর বায়না বাজি ছিল, এটা খাবনা, ওটা ভালোনা, এহেন নানাবিধ ঝামেলা রোজ পাকাতাম, তাতে পড়তে বসাটা বেশ কিছুটা পিছিয়ে যেত। আসলে কোনদিনই তো নিজের ইচ্ছেয় পড়িনি, ফেল করলে লোকে কী বলবে এই ভেবে পড়া! এরপরেও আবার বুধবার চিত্রহার আর বৃহস্পতিবার চিত্রমালা দেখার ব্রেক ছিল পড়তে বসে। শনিবার ভালো বাংলা বই হলে তাও দেখতে হত বৈকি। আসলে সেসব দিনে পড়ার তেমন চাপ ছিল না কোন স্কুলেই। যখনই পড়তে বসি না কেন, রাত দশটা মানে এনাফ ইজ এনাফ। তখন বসব দিদির সাথে ফল ফুল নাম দেশ, নয়তো মেমরি গেম খেলতে। সাড়ে দশটায় রাতের খাবার। এর মাঝে একেকদিন ছিল লোডশেডিং এর মিষ্টি মিষ্টি সন্ধে, সে রাতে আর পড়ার ঝক্কি নেই, বারান্দার চৌকিতে শুয়ে শুয়ে গানের লড়াই আর বাবার হাতের হাতপাখার শব্দ আর মশার কামড়, কখনো কখনো রেডিওতে বিবিধ ভারতী। আলো এলে কোথা থেকে যেন একসাথে আওয়াজ উঠতো “এসে গেছে।” বাবা বলতো “দ্যাখ তো, টিভিটা খুলে, দশটার খবরটা হয়ে গেল কী না। ” টিভি খুলে হয়তো দেখা গেল ছন্দা সেন বলছেন, “আজকের বিশেষ বিশেষ খবরগুলো আরেকবার।” বাবার মুখে তখন উজ্জ্বল আলোর দ্যুতি। আমিও খুশি, যাক পড়ার টাইমটা পেরিয়ে গেছে।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post