• December 4, 2021

ফাদার স্ট্যান স্বামী হত্যাঃ প্রতিবাদে সরব বাংলার নাগরিক সমাজ

 ফাদার স্ট্যান স্বামী হত্যাঃ প্রতিবাদে সরব বাংলার নাগরিক সমাজ

পূর্বাঞ্চল নিউজ ডেস্ক:- অধিকার আন্দোলনের আপোষহীন যোদ্ধা, আদিবাসী মানুষদের অকৃত্রিম বন্ধু, প্রান্তজনের স্বার্থরক্ষায় সতত সরব জেসুইট পাদ্রী ফাদার স্ট্যান স্বামী আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। অধিকার আন্দোলনের কর্মীদের ভাষায় তাকে পরিকল্পিত ভাবে রাষ্ট্র হত্যা করেছে।এই ৮৪ বছর বয়সী মানুষটিকে ২০২০ সালে ভীমা কোঁরেগাও মামলায় মাওবাদী সংযোগের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।তিনি পারকিন্সন সহ নানান রোগের কারণে অসুস্থ ছিলেন। বারংবার জামিনের আবেদন করা সত্বেও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার পক্ষে বিপদজনক — এই দোহাই দিয়ে অতিমারীর সময়েও তার জামিন মঞ্জুর করা হয় নি।জেলে তার চিকিৎসার ব্যবস্থাও ছিল না।এই মৃত্যু তাই হত্যা।পূর্বাঞ্চল নিউজ ডেস্কের পক্ষ থেকে আমরা কথা বলেছিলাম নাগরিক সমাজের বিভিন্ন মানুষদের সঙ্গে।তাদের প্রতিক্রিয়া আমরা লিপিবদ্ধ করলাম।

সুজাত ভদ্র ( অধ্যাপক ও মানবাধিকার কর্মী):– ২০১৮ সালের ভীম করেগাঁওন বা এলগার পরিষদের মিথ্যা মামলায় ভারতের মানবাধিকার আন্দোলনের ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ১৬ জন তিন বছর ধরে বন্দি; বহু টাল বাহানার আদালত কঠিন শর্ত সাপেক্ষে কবি ভারা ভারা রাও কে ছয় মাসের জন্য জামিন দিয়েছেন। বাকিদের জামিনের আবেদন নাকচ করেছেন নিয়ার আপত্তি তে। যাজক স্ট্যান স্বামী কে,যিনি আদিবাসী সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষা ও অর্জনের লড়াইতে অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন, ৮ অক্টোবর ,2020 সালে গ্রেপ্তার করে বোম্বে তাওলোজা জেল রেখে দেওয়া হয়। ৮৪ বছরের অসুস্থ স্ট্যান কার্যত বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেন। না, বিনা চিকিৎসায় নয়। জামিন না দিয়ে, বিলম্বিত চিকিৎসার মধ্য দিয়ে, ন্যায় বিচারের আড়ালে স্ট্যান স্বামীকে ভারতীয় রাষ্ট্র হত্যা করলো। গ্রেপ্তার থেকে প্রলম্বিত বিচার প্রক্রিয়াটাই শাস্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে আজ ; এর জন্য দায়ী এই অমানবিক নিষ্ঠুর প্রশাসন এবংবিচার ব্যবস্থার যুগলবন্দী নীতি — ন্যায়, সুষ্ঠু বিচার প্রক্রিয়া তে এনারা বেকসুর নির্দোষ প্রমাণিত হবেন। অতএব, ছেড়ো না, জেলেই পচিয়ে মার। স্ট্যান স্বামী তার সর্বশেষ শিকার। স্রশ্রদ্ধ স্যালুট শহিদ স্ট্যান স্বামীকে। অপূরণীয় ক্ষতি হলো মানবাধিকার আন্দোলনের ,আদিবাসী মানুষের।

স্বাতী ঘোষ ( চিকিৎসক ও মানবাধিকার কর্মী):– ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের পরিকল্পনা সফল হল। অশীতিপর, পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত, জীবনভর দলিত-আদিবাসীদের অধিকারের জন্য কাজ করা জেসুইট ফাদার স্ট্যান স্বামীর নিধন আজ সম্পূর্ণ। সাধারণ মানুষের পক্ষে কথা বলা এখন রাষ্ট্রের চোখে চরম অপরাধ, যার একমাত্র শাস্তি মৃত্যু। ভীমা-কোরেগাঁও মামলায় অন্যান্য বন্দিদের জন্য‌ও রাষ্ট্র এক‌ই পরিণতি ভেবে রেখেছে। এবার রাষ্ট্রের এই দানবীয় হত্যা-পরিকল্পনা প্রতিহত করার পথ আমাদের খুঁজতে হবে — সেটাই হবে নিহত ফাদারের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

অশোক চট্টোপাধ্যায় ( কবি ও প্রাবন্ধিক):– এটা অবশ্যই রাষ্ট্রের তরফে হত্যাকাণ্ড। তাঁর বয়সকে গুরুত্ব না দিয়েই অসুস্থ এই অশীতিপর যোদ্ধার জামিনের আবেদন খারিজ করা হয়েছে। চারু মজুমদারকেও এভাবেই হত্যা করেছিল রাষ্ট্র। আদিবাসী জনজাতির অধিকার আন্দোলনের এই যোদ্ধা স্টান স্বামীকে হত্যার দায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারের পদত্যাগ করা উচিত।

জয়ন্ত ভট্টাচার্য ( চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের কর্মী):– দলিত এবং আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে বহু বহুদিন ধরে অহিংস জেস্যুইট ফাদার স্ট্যান স্বামী আজ প্রয়াত হলেন।
ভীমা কোরেগাঁও মামলায় এই বৃদ্ধ অশক্ত মানুষটিও নাকি সশস্ত্র উপায়ে সরকারকে উচ্ছেদ করতে চেয়েছিলেন। এজন্য জেল বন্দী। কোন কোর্ট কোন বিচার মৃত্যুর আগে পর্যন্ত দিতে পারেননি।
নির্মম উল্লাসে রাষ্ট্র দেখেছে এই পরিণতি। একি মৃত্যু নাকি হত্যা? ক্রম সংকুচিত তৃতীয়/নাগরিক পরিসর একে কি বলবে? কতদিন আগে বাংলার এক কবি বলেছিলেন – “এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না।”
কিন্তু এ দেশেইতো আমাদের বাস। ফাদার স্ট্যান স্বামী আমাদের মতো মেরুদণ্ডহীনদের ক্ষমা কোরো। যদি “আমার প্রতিবাদের ভাষা” আবার খুঁজে পাই!

আলতাফ আমেদ(মানবাধিকার কর্মী) :- আদিবাসী জনজাতি আন্দোলনের কণ্ঠস্বর স্ট্যান স্বামীকে ভারতীয় রাষ্ট্র-ব্যবস্থায় ঠান্ডা মাথায় খুন করা হলো, এ দেশের ‘স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্স’ এর নবতম উদাহরণ! অধিকার আন্দোলনের অন্যতম প্রাণ ফাদার স্ট্যান স্বামীর হত্যার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে তীব্র ধিক্কার জানাই!

সুমন সেনগুপ্ত ( সাংবাদিক, নিউজ পোর্টাল সহমনের সম্পাদক) :- একজন ৮৪ বছরের পার্কিনসনে আক্রান্ত মানুষ, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কি এমন ষড়যন্ত্র করতে পারে, যে তাঁকে রাতের অন্ধকারে গ্রেপ্তার করা হয়, ঝাড়খন্ডের রাঁচি থেকে? তিনি এত বড় অপরাধী যে জল খাওয়ার জন্য স্ট্র এবং জেলে পরার জন্য একপাটি হাওয়াই চটির জন্য তাঁকে ৫০ দিন অপেক্ষা করতে হয়। তিনি ফাদার স্ট্যান স্বামী, যিনি দীর্ঘদিন ঝাড়খন্ডের আদিবাসী মানুষদের অধিকার নিয়ে সরব ছিলেন। তিনি কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার পরেও তাঁর চিকিৎসার কোনও বন্দোবস্তই সরকার করতে চায়নি। আসলে তাঁকে রাষ্ট্র খুনই করলো, প্রকাশ্য দিবালোকে। এই সমস্ত ইউএপিএ, এনআইএ যতদিন এই ঔপনিবেশিক আইন থাকবে, ততদিন রাষ্ট্র নির্বিচারে হত্যা করে যাবে আর আমরা নীরব দর্শকের ভুমিকায় থেকে যাবো। আমরা কি পারবো, আমাদের হাতেও যে রক্তের দাগ আছে তা মুছে ফেলতে? আমরা কি পারবো, নিজেদের ক্ষমা করতে? যা ফাদার স্ট্যান স্বামীর ওপর হলো, তা আসলে একটা বড় ষড়যন্ত্র যা রাষ্ট্র তাঁর নাগরিকদের ওপর করছে।

তবে একটা কথা, এই সমস্ত কিছু মনে রাখা হবে, সব কিছু মনে রাখা হবে। কিভাবে আবার আজকে ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার, ভারতীয় সংবিধানের মৃত্যু হল তাও মনে রাখা হবে।

সোমেন বসু ( সাংবাদিক ও গল্পকার) :- এরই প্রতীক্ষা চলছিল। রাষ্ট্র সাগ্রহে এবং আমরা সশঙ্ক চিত্তে বোধহয় এই খবরটারই প্রতীক্ষা করছিলাম। কতটা সশঙ্ক ছিলাম আমরা? ভয় পেলে মানুষ তো তা দূরীকরণে সচেষ্ট হয়, কতটা চেষ্টা করেছি আমরা? বা করছি এখনও? রাষ্ট্রের মতলব পরিষ্কার। এলগার পরিষদ মামলার বাকি বন্দিরাও যাতে ফাদারের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন, রাষ্ট্র তার জন্য চেষ্টার কসুর করবে না! আমরা কী করব?

মৌতুলি নাগ সরকার ( মানবাধিকার কর্মী) : – স্ট্যান স্বামী নয় মাস জেলে থাকার পর আজ মারা গেলেন। স্ট্যান স্বামীর বিরূদ্ধে রাষ্ট্রের অভিযোগ মাওবাদীদের সাথে তার যোগাযোগ ছিল। এই অভিযোগ রাষ্ট্র কিসের ভিত্তিতে করল , আমরা জানিনা । কোনো প্রমাণ বা তথ্য কি পাওয়া গিয়েছিল? আমরা জানি তাও পাওয়া যায়নি । তবে? সন্দেহ । রাষ্ট্রের সন্দেহ হয়েছিল যে তার সাথে নাকি মাওবাদীদের যোগাযোগ ছিল। শুধু সন্দেহের বশেই এই চুরাশি বছরের অশীতিপর বৃদ্ধ জেলে বন্দী ছিলেন। যিনি পারকাশন এর মত গুরুতর স্নায়ুরোগে আক্রান্ত ছিলেন, কানে ঠিক মত শুনতেও পেতেন না ।তার ওপর বন্দীদশায় কোভিডে ও আক্রান্ত হলেন। তার আইনজীবি, অধিকার আন্দোলনের বন্ধুরা বারম্বার তার সুচিকিৎসার দাবি জানিয়ে কোর্টকে হসপিটালে রাখার আবেদন করেছিলেন কিন্তু অন্যদিকে NIA এর পুলিশ সেই আবেদন খারিজের জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলেন ।তারা ফাদার স্ট্যান স্বামীর অসুস্থতা ও হসপিটালে চিকিৎসার সপক্ষেযথেষ্ট কারণ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। আমরা কেউ কেউ এই খবর জেনেছি। এবং প্রশ্ন করাকে এড়িয়ে গিয়েছি যে কতটা অসুস্থতা NIA এর কর্তাব্যক্তিদের প্রয়োজন ছিল এই অধিকার আন্দোলন কর্মী , আদিবাসী সমাজের প্রতিনিধি স্ট্যান স্বামীর জন্য ? কতটা অবহেলা রাষ্ট্রের প্রয়োজন ছিল ওনাকে হত্যা করার জন্য ! আসলে আমরা যথেষ্ট প্রশ্ন করিনি , তুলিনি যথেষ্ট আওয়াজ যতটা তুললে এই হত্যা গুলো বন্ধ হতে পারত। ফাদার স্ট্যান স্বামী রাঁচির একটি মিশনারী আবাসিক স্কুলের প্রধান ছিলেন। পাথলগিরি তথ্যানুসন্ধানে সেই আবাসিক স্কুলের হোস্টেলেই আমরা ছিলাম। অনেক রাত অবধি আমাদের আলোচনায় উঠে এসেছিল কিভাবে পাথলগিড়ি আন্দোলন আদিবাসী জনগণ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন । তিনি বলেছিলেন , পিছিয়ে পড়া আদিবাসী ছেলেমেয়েদের প্রযুক্তি বিদ্যা ও নূন্যতম শিক্ষা দিয়ে স্বনির্ভর করে তোলার উদ্দেশ্যেই তিনি তার জীবন ব্যয় করার শপথ নিয়েছেন। ওখানেই দেখেছিলাম আদিবাসী মহিলাদের সেলাই , আচার ও নানারকম খাবার বানানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে । সম্ভবত সেই প্রথম খ্রীস্টান মিশনারী স্কুল চাক্ষুস করেছিলাম যেখানে প্রতিস্থাপিত হয়েছিল যীশু নয় , বীরসা মুন্ডার মূর্তি । কিন্তু বীরসার লড়াইয়ের ইতিহাস তো রাষ্ট্র আমাদের ভোলাতে চায় ।রাষ্ট্র তো মুছে দিতে চায় আদিবাসী জনজাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি , সমাজকে । তাহলে স্ট্যান স্বামীর এই কাজ রাষ্ট্রের পছন্দ হবে কেন? হবেনা বলেই আজকের স্ট্যান স্বামী রাষ্ট্রের চোখে দেশদ্রোহী হয়েছিলেন। দেশদ্রোহের পরিণতিতে রাষ্ট্র আজ তাকে হত্যা করল। এই হত্যা কি নাগরিকদের চিন্তাহীন মস্তিষ্ক, অনুভূতিহীন হৃদয়ে কোনো সংবেদন জাগাতে পারবেনা ?

  •  
  •  
  •  
  •  

1 Comments

  • রাষ্ট্রের কর্মকর্তারাই রাষ্ট্রদ্রোহী হয়ে উঠেছে। বিচার করো জনতার আদালত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post