• December 4, 2021

বাঁদর নাচের গানে জীবন-জীবিকার ছবি

 বাঁদর নাচের গানে জীবন-জীবিকার ছবি

তপন পাত্র :- এখন হাজার মনস্তাপে মাথা কুটলেও তাঁদের আর খুব একটা দেখা মেলে না । আজ থেকে দশ-পনের বছর আগেও দু’চারজন নজরে আসতেন । বিশেষ করে কৃষকের ক্ষেতের ধান খামারে , খামার থেকে ঘরে এলে এরা বাঁদর নাচ দেখিয়ে দেখিয়ে এ গ্রাম থেকে সে গ্রামে ঘুরে বেড়াতেন ।

তুলনামূলকভাবে বাঁদর নাচের সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংখ্যা অল্প । বাঁদর নাচের গানের সংখ্যাও বড়ই স্বল্প । এইগান আসলে পটগান, সাপ খেলানোর গান, পুতুল নাচের গানের মতোই জীবিকাশ্রয়ী গান । এক বিশেষ আর্থ-সামাজিক পরিবেশ থেকেই গানগুলি উঠে এসেছে বা তৈরি হয়েছে ।

বাঁদর নাচের সর্বাপেক্ষা পরিচিত গানটি আজও এই অঞ্চলের অনেক গ্রামীণ বৃদ্ধ-বৃদ্ধার মুখে মুখে ফেরে । তাঁরা নাতি-নাতনিদের সঙ্গে রঙ্গ-তামাশা করতে করতে গেয়ে ওঠেন । অনেক সময় বাবা কাকারাও তাঁদের ছেলেমেয়েদের উদ্দেশ্যে হাস্য-কৌতুকের ছলে এই গান গেয়ে বসেন । গানটি হল —

“নাচ বাঁদরি নাচ
পয়সা দিব পাঁচ ।
আর্-অ দিব এক মুঠ চাল
ঘুরে ঘুরে নাচ ।

কী খাবার মন বাঁদরি
কী খাবার মন ,
হাটের্-অ চিঙ’ড়্ মাছ
বাড়ির্-অ বাগ’ন ।।”

গানটিতে বা’জকার

বাঁদরিকে উদ্দেশ্য করে যা বলতে চেয়েছেন, তাতে তাঁর নিজের জীবনকথাই বলা হয়ে গেছে । যে সমাজ ব্যবস্থায় তার দু’মুঠো ভাতের একমাত্র পথ বাঁদর নাচ দেখিয়ে বেড়ানো , সেখানে অতি আদরের ধন বাঁদরিকে বলছে , নাচলে পয়সা পাবে । এক মুঠো চালও পাবে । সামান্য পয়সার বিনিময়ে হাট থেকে কিনে আনবে চিংড়ি মাছ আর বেগুন । তাই দিয়ে তরকারি বানাবে । এখানে যেন ‘বাঁদরি’–এই ছদ্মনামে তাঁর ও তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের পেটের ক্ষুধা বাঁদরটিকেই আশ্বস্ত করা হয়েছে ।

আলোচিত গানটি বহুকালের প্রাচীন । তুলনায় অর্বাচীনকালের একটি গান উল্লেখ করা যেতে পারে ; যে গানটি ওই পুরাতন গানেরই নবতর সংস্করণ বলে মনে হয় —

“নাচ বাঁদরি নাচ
কুঁঢ়া খাঁইয়েই বাঁচ ,
ফল-পাকু’ড় সব ফুঁরাই গেল
নাই রে হাতের পাঁচ ।

কী খাবার মন বাঁদরি
কী খাবার মন ,
কাটে-কু’টে ফুরাঁই গেল
ক্যাঁদ ভুড়রুর বন ।।”

পশ্চিম-সীমান্ত-বাংলার খেটে খাওয়া দরিদ্র মানুষ একসময় নানারকম বনজ ফলমূল এবং তা থেকে তৈরি সাধারণ মানের খাবার খেয়েও দিনাতিপাত করতো । ক্রমে সেই বন ফুরিয়ে এলো । বসত বাড়লো । তথাকথিত সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে অরণ্য নিধন হলো ।”… ফুরাঁই গেল ক্যাঁদ-ভুড়রুর বন “। ক্ষুধা নিবৃত্তির “হাতের পাঁচ” অর্থাৎ নিতান্তই শেষ সম্বল যা ছিল এই জঙ্গলমহল এলাকায় , সেই “ফল-পাকু’ড় সব ফুরাঁই গেল …।”

পশ্চিম-সীমান্ত-বাংলা থেকে ক্যাঁদ-ভুড়রু-পাকু’ড় গাছ ক্রমশ বিলীন । দুঃখ জাগে মনে । বনের ফলমূল ছিল বলিষ্ঠ ও উপাদেয় খাবার । ক্যাঁদ থেকে ছাতু তৈরি হয় —‘ ক্যাঁদকুঢ়া ‘, যা অতি সুস্বাদু ও লোভনীয় খাবার । তা নেই আর । তাই সাধারণ ছাতু অর্থাৎ নিম্নমানের কোনও ধান , গম থেকে তৈরি ছাতু খেয়ে জীবনধারণের কথা বলা হয়েছে ।

অঘ্রাণ-পৌষ-মাঘ-ফাল্গুন —এই চারটি মাস সীমান্তবঙ্গে মোটামুটিভাবে স্বচ্ছলতার মাস । তাই এখানে এমন লোকপ্রবাদের জন্ম হয় –“পৌষ মাসে চু’টারও সাতটা বহু” । এই অতুলনীয় প্রবাদটির তাৎপর্য বিশাল ! তবে নির্যাস এটুকুই যে , এ সময় সাধারণত অভাব থাকে না । সর্বশ্রেষ্ঠ সামাজিক অনুষ্ঠানের সর্বশ্রেষ্ঠ সময় মাঘ ও ফাল্গুন মাস । নতুন ধান উঠেছে অগ্রহায়ণ মাসে । ঢেঁকি ছাঁটা চাল প্রস্তুত । ফাগুন মাসে বিবাহ অনুষ্ঠান । চৈত্রমাস ফি-বছরই মলমাস । তখন আর বিবাহের মতো পবিত্র সামাজিক অনুষ্ঠান হবে না ।
—এসব কৃষিনির্ভর বাংলার আর্থ-সামাজিক প্রসঙ্গ চলে এসেছে বাঁদর নাচানোর গানে ।

” আঘন কুটা ছাঁটা চাল
ফাগুন মাসে বিহা ,
চৈৎ মাসের বাউ প’ড়ল্য
নাই হ’ল্য বিহা ।। “

আর একটি গানে অভাব-অনটনের বাস্তব চিত্র । ক্ষুধার জ্বালায় সেদ্ধ-ধান শুকিয়ে ভাতের চাল প্রস্তুতের অবকাশ নেই । ক্ষেত থেকে ধান কেটে এনে ঝেড়ে শুকিয়ে আতপ চাল তৈরি করে তা-ই সিদ্ধ করে খাবার ব্যবস্থা । আতপ চাল কে এই এলাকার মানুষ “আলোচাল” বা “আলচাল” বলে , উজ্জ্বল শুভ্র বর্ণের জন্য । আবার হ’তে পারে এই চাল দ্রুত ক্ষুধার অন্ধকার দূর করতে পারে ,সেই কারণে । আতপ চালের ভাতের সঙ্গে সবজি বলতে “কানা শাক”, ক্ষেতে খামারে আপনি গজিয়ে ওঠা এক ধরণের ভোজ্য পত্র । অনেকে একে বলে — “কানছিঁড়া শাক “।

“আল চালের মাড় রাঁ’ধেছি

কানা সাগের বেসাতি ,
সাঁঝেরবেলা দেওয়র শালা
লুচকাঁই খায় বেসাতি ।।”

অভাব থাকতেই পারে, তবুও একান্নবর্তী পরিবারে দেবর-বৌদির মধুর সম্পর্কটি ফুটে উঠেছে এই গানে ।

আবার সামাজিক রীতিনীতির পরিবর্তনের, আধুনিকতার ছবিও ধরা পড়েছে এইসব ছোট ছোট গানের মধ্যে । পশ্চিম-সীমান্ত বাংলা , তথা পুরুলিয়ার মানুষ বর্ধমান যায় ক্ষেত মজুরের কাজ করতে । সম্ভবত বর্ধমানে যখন বিধবা বিবাহের প্রচলন শুরু হয়েছিল, তখনও পুরুলিয়ায় তার প্রভাব পড়ে নি ‌। বাঁদর নাচের গানে সেই প্রসঙ্গটি এসেছে এইভাবে —

“আম ফলে থকা থকা
তেঁতুল ফলে বাঁকা,
নামাল দ্যাশে দে’খ্যা আ’লম্
রাঁঢ়ীর হাতে শাঁখা ।।”

বলা তো মুশকিল — নারীর প্রথম বিবাহ আমের সাথে আর স্বামীর মৃত্যুর পর দ্বিতীয় বিবাহ তেঁতুলের সাথে তুলনীয় কি না ! তবে “নামাল দ্যাশে” অর্থাৎ “পূব দেশ” তথা বর্ধমান এলাকায় বিধবা বিবাহ দেখেই এই গানটির সৃষ্টি –এই অনুমান বৃথা নয় ।

এইসব গান আর সৃষ্টি হয় না , মানুষের মুখে মুখে ফেরে না । সেই বাঁদর-বাঁদরি আজ আর খুব একটা নজরে আসে না । যাযাবরদের সেই রূপে দেখা মেলে না বললেই চলে । কোন কোন “বা’জকারে”র সঙ্গে সঙ্গী হিসাবে দু’একটি বাঁদর থাকলেও তারা আর নাচ দেখিয়ে বেড়ান না । কথা বলে দেখেছি, বাঁদর নাচানোর গানও তাঁদের এই প্রজন্মের স্মৃতিতে-সংস্কৃতিতে নেই , নাচের আঙ্গিক ও গতি-প্রকৃতি নিয়েও তাঁরা মুখ খুলতে নারাজ । বাঁদর নাচ এখন এক ইতিহাস মাত্র । গানগুলিও লুপ্তপ্রায় । অথচ গানগুলির শব্দে শব্দে কৃষিভিত্তিক পশ্চিম-সীমান্ত-বাংলার আর্থ-সামাজিক জীবনের ছবি সুচিত্রিত । সময়ের সাথে সাথে যাযাবরদের জীবন ও জীবিকার বদল ঘটে গেছে । এটাই বাস্তব । এটাই মহাকালের নিয়ম । তথাকথিত উচ্চতর সভ্যতার আলোর ঝলকানিতে প্রাচীন লোকজীবনের সংস্কৃতি টিকে থাকতে পারে না । টিকে থাকা সম্ভব নয় । বড়জোর কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার একটি কৃত্রিম রূপ কিছুকাল রক্ষা করা সম্ভব।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post