• December 4, 2021

কোভিডের প্রেক্ষাপটে নারীদের দুর্দান্ত নেতৃত্ব

 কোভিডের প্রেক্ষাপটে নারীদের দুর্দান্ত নেতৃত্ব

কোয়েল রায় চৌধুরী :- কোভিডের প্রেক্ষাপটে, তৃণমূল থেকে নীতি নির্ধারক; সমাজের নানা স্তরের, নানা জীবিকার লড়াকু নারীদের দুর্দান্ত নেতৃত্বের গল্পগুলো উঠে আসছে চারিদিক থেকেই। সামনের সারিতে লড়াই রত স্বাস্থ্যকর্মী থেকে কোভিডে ফেরত আসা প্রবাসী শ্রমিক বা মাইগ্রেন্ট লেবারদের এক অংশ; একাধারে সংসার, সন্তান এবং ওয়ার্ক ফ্রম হোম সামলানো মমতাময়ী মাতৃমূর্তি থেকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসা একরোখা স্কুল- কলেজ পড়ুয়ার দল, প্রতি ক্ষেত্রেই সে রেখে চলেছে তার অসীম সহনশীলতা এবং সংগ্রামের চিহ্ন। একই ভাবে আবার লড়ে চলেছে বিভিন্ন দেশের নারী নেতৃত্ব।

১৯৪ টি দেশকে নিয়ে করা এক গণনা অনুযায়ী যেসব রাষ্ট্রের শীর্ষে রয়েছে নারীনেতৃত্ব তারা অতিমারী নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলকভাবে বেশি সফল। কারণস্বরূপ বলা চলে মহিলা- পরিচালিত বহু দেশেই বহুবিতর্কিত ভাবে অপেক্ষাকৃত তাড়াতাড়ি লকডাউনের সিদ্ধান্ত ঘোষনা করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত অর্থনীতির ওপর বাজে প্রভাব ফেললেও, এই সিদ্ধান্তের দ্বারা নিঃসন্দেহে বহু মৃত্যু আটকে রাখা গেছে। লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ সুপ্রিয়া গারিকাপাটির ভাষায় “মহিলা নেতৃত্ব অতিমারির মোকাবিলায় অধিক তৎপরতার সঙ্গে অধিক কার্যকরী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।”

ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, জার্মানী এবং স্লোভাকিয়ার মতন ১৯ টি দেশ যাদের শীর্ষে রয়েছে মহিলা নেতৃত্ব, আন্তর্জাতিক ভাবে সেইসব দেশগুলিই অতিমারির মোকাবিলায় অধিক তৎপরতা দেখিয়েছে এবং সারা পৃথিবীর সামনে তুলে ধরেছে নারী নেতৃত্বের এক বর্ণোজ্জ্বল চিত্র। নরওয়ে এর প্রধানমন্ত্রী এর্না সোলবার্গ বাচ্চাদের নিয়ে কোভিড ১৯ বিষয়ক এক শিক্ষামূলক আলোচনার আয়োজন করেন, যা তাদের মধ্যে অহেতুক উদ্রেক কমাতে সাহায্য করবে। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্নের সহানুভূতির সঙ্গে যৌক্তিক আচরণ এবং জনসাধারণের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগের দক্ষতা সংকটকালীন সময়ে সুনেতৃত্বের এক অন্য উদাহরণ। এমনকি ফেসবুক লাইভে Q&A আয়োজনের মাধ্যমে তিনি যেভাবে তার দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিজেকে এক করে তুলতে পেরেছেন তা নিঃসন্দেহে প্রসংশনীয়। অন্যদিকে জার্মানীর চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল তার জনগনের থেকে তথ্য গোপন করার পরিবর্তে তাদের সঠিক তথ্য ও পরিসংখ্যান জানিয়ে তাদের মধ্যে প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও তৎপরতা তৈরীতে বিশেষ সাহায্য করে নিজের যোগ্য নেতৃত্বেরই প্রমাণ দিয়েছেন। বিভিন্ন বিজ্ঞানবিদের সাথে সাধারণ জনগনের সরাসারি কথোপকথনের ব্যবস্থা করানোর মাধ্যমে জনগনকে অহেতুক রটনা থেকে দূরে রাখতে পেরেছেন। ডেনমার্কের মেটে ফ্রেডেরিক্সন লকডাউন ঘোষনা করেন ১২ ই মার্চ, ইউ.কে লকডাউন ঘোষনা করার ১২ দিন আগে। কোভিড মোকাবিলায় বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং জনগণ যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে, সে বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যেমে বিশ্বের কাছে এক উদাহরণ হয়ে দাড়িয়েছেন তাইওয়ানের সাই ইন-ওয়েন, বাংলাদেশের শেখ হাসিনা এবং আইসল্যান্ডের ক্যাট্রিন জ্যাকুবসদুহির। এক্ষেত্রে প্রশংসার দাবি রাখেন কেরালার প্রাক্তন স্বাস্থ্যমন্ত্রী কে. কে শৈলজাও।

ছোট ছোট এই সব ছবি মিলিয়ে দেখলে বড়সড় স্পষ্ট যে ছবিটি ফুটে উঠছে তা নারীজাতির অদম্য মনোবল এবং তার নেতৃত্বের সহজাত গুণের দিকটিকেই তুলে ধরে। আর এইসব কিছুই একসাথে প্রতিধ্বনিত হয়েছে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ২০২১ এর প্রতিপাদ্যে—উইমেন ইন লিডারশিপ: অ্যাচিভিং অ্যান ইকুয়াল ফিউচার ইন আ কোভিড-১৯ ওয়ার্ল্ড।

এখানে অনেকের মনেই এই প্রশ্ন জাগতে পারে যে যদি নারীজাতির মধ্যে এমনই এক সহজাত নেত্রী স্বত্ত্বা বর্তমান হয়ে থাকে, তবে ১৯৪ টি দেশের কেবল ২১ টির শীর্ষেই কেন সে? উত্তর টা আমাদের সামনেই, কেবল আমরা তা দেখতে নারাজ। যোগ্যতা নয়, বাহ্যিক আড়ম্বরে বিশ্বাসী আমরা। আজও আমরা আসল যোগ্যতা ও দক্ষতার কদর করা শিখে উঠতে পারিনি। আমরা আজও মেয়েদের সেই চোখেই দেখি যেই দৃষ্টিভঙ্গি তে বিভিন্ন উপণ্যাস, নাটক ও সিনেমা আমাদের সামনে তাকে উপস্থাপন করে এসেছে যুগ যুগ ধরে। আমাদের চোখে মেয়েরা আজও অসহায়, সে সংসার চালাতে পারে, তবে দেশ নয়। প্রতিটি অ্যাঞ্জেলা মার্কেল এর জন্যই রয়েছে প্রচুর জেয়ার বলসোনারো এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পেরা। না, কেবল রাজনীতিই নয়, ব্যবসা, গবেষণা এবং প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রেই চলেছে একই বৈষম্য।

এর নির্মূল কোথায় তা বলা কঠিন। তবে আমাদের বারেবারে সকলের সামনে তুলে ধরতে হবে এইসব লড়াকু নারীদের কাহিনী। সমাজের গভীরে প্রোথিত লিঙ্গ বৈষম্য এত সহজে মুছে ফেলা সম্ভব নয়, এবং তা কেবল তখনই সম্ভব যখন সমাজ নিজে তৈরী তার মানসিকতার পরিবর্তনে।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post