• June 29, 2022

জন্মভূমির বর্ণ-পরচয়

 জন্মভূমির বর্ণ-পরচয়

তানিয়া লস্কর

একটি ভূভাগ যার নাম আসাম। সেখানে দুটি ভাষা বাংলা এবং অসমিয়া। তাদের সম্পর্ক কোন এক কিংবা একাধিক ঐতিহাসিক কারণে রূপকথার সুয়োরাণী-দুয়োরাণীর মতো। সেই স্বাধীনত্তোর কাল থেকেই সম্মূখ সমরে দাঁড়িয়ে আছেন দুটি ভাষাগোষ্ঠীর লোক। এর মাঝখানে হারাদন-রংমন ইত্যাদি নানা আপত সেকুলার বাণি আওড়ানো হয় যদিও। তবে আসল সত্যটি হলো সেই ১৮ শতকের শেষ দশক থেকে বাঙালিরা  চক্ষশূল হয়ে আছেন অসমে। স্বাধীনতার সময় থেকেই  ‘অসম শুধু অসমিয়াদের জন্য’ ধরনের গর্জন শুণতে হয়েছে। এর দু-দশক যেতে না যেতেই ১৯৬১ সালে অসমিয়া ভাষাকে একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা করার ফরমান জারী হয়। এর প্রতিবাদে আমজনতা রাস্তায় নেমে এলে শিলচর রেলষ্টেশনে গুলি চলে। ১১টি তাজা প্রাণের আত্মাহুতির বদলে বাংলার প্রানপ্রতিষ্টা হয় আসামে। এরপর  ১৯৭২ এ যগন-যিশু। ১৯৮৬ তে বাচ্চু চক্রবর্তী।  প্রতি দশকে বাঙালিকে এক একবার শহীদ হতে হয়েছে। দগদগে ঘা এ ভরা অসমে বাঙালির আত্মপরিচয় গাঁথা। সার্কুলার যুগের পর শুরু হয় আইন আর জাজমেন্টের যুগ।এনারসি-ডিভোটার-ডিটেনশন। ৯০ এর দশক থেকে রাস্তা ছেড়ে কোর্ট কাছারিতে কাঁটা-ছেড়া হতে হচ্চে আমাদের। । আক্রমণ আজও অব্যাহত। তবুও লড়ে যাচ্ছেন মানুষ। কিন্তু প্রশ্ন হলো সেই অসম লড়াইয়ে কার ভূমিকা কি?

 একদিকে তারা যাদের হাতে শাসন-ক্ষমতা। সাহিত্য-সভা, এস-সি-আর-টি, ট্রাইবুনাল। তাই তো তারা প্রতিনিয়ত সার্কুলার আর নিয়ম-নীতি নিয়ে ধেয়ে আসেন। অথচ বাঙালি কি পেরেছে সেরকম কৌশলগত কিংবা ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। এখন যদি জিজ্ঞেস করা হয় অসম সাহিত্য সভাকে টেক্কা দেওয়ার মতো বাঙালির ক’টি সংঘটন আছে? একটি সংঘটনও বুকে হাত রেখে বলতে পারবে না যে আমরা আছি। আমরা এখনো একটি শহীদ মিউজিয়াম, কিংবা ভাষা রিসার্চ ইনস্টিটিউট গড়তে পারলাম না। সংগ্রামের স্মৃতি বিজড়িত অসম বিশ্ববিদ্যালয়ে অত্যন্ত একটি মিউজিয়াম হতে পারতো। এমনকি শহীদের নামে একটি স্কলারশিপও নেই, ভাবা যায়? শুধু আছে শহরজুড়ে কিছু শহীদ বেদী। সেগুলো অবশ্যই সাধারণ মানুষের চাঁদায় তৈরি।

  সহজ উপপাদ্য কথাটি হলো বাংলা ভাষার এই টিকে থাকার লড়াইটা সর্বতোভাবেই লড়ে যাচ্ছেন সাধারণ মানুষেরা। তারা একদিকে লড়ছেন ডিটেনশন আর অন্যদিকে রক্ষা করছেন শহীদের স্মৃতি। তারা আজও ভরসা রাখছেন  বাংলা মাধ্যমের বিদ্যালয়গুলোর উপর। তাদের ছেলেমেয়েদের আর্চি কমিকস আর হিন্দি কার্টুন বুঁদ হতে দিচ্ছেন না। কিন্তু শহরে বাবু-বিবিরা শহীদ দিবসের দিন মাটির গয়না-গাটি, আর কটন পাঞ্জাবি পরে গান-কবিতা গাইতে আসলেও ভাষা কিংবা জাতি প্রশ্নে আজ আর পথে বেরিয়ে আসেন না। সিএএ নিয়ে যখন সারা দেশে উত্তাল প্রতিবাদ চলছিল। কোন এক বিষমন্ত্রে বরাক উপত্যকায় তেমন হেলদোল ছিল না। ডি-ভোটার কিংবা ডিটেনশন নিয়ে প্রতিবাদী কর্মসূচির ডাক দিলে মানুষ হন হাতেগোনা। একদল আবার ইড-পোল বলে রসিকতাও করেন। তারা হয়তো ভুলে যান দীর্ঘকাল ধরে রাষ্টীয় ও প্রাদেশিক আগ্রাসনবাদকে মোকাবিলা করতে ভাষা মানুষের বর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাঙালির আরেক ভূগোল  বাংলাদেশে ভাষা আত্মনিয়ন্ত্রণের আন্দোলনের মাধ্যম ছিল। কেনিয়ার ঔপনিবেশিক বিরোধী আন্দোলনে বিশ্বজাদা তাত্বিক ও নেতা নাওগুগি ওথিওঙ্গো ও তার কমরেডরা ভাষাকে হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়ে ছিলেন। এমনকি ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক শাষণকে মোকাবিলা করতে ফাঞ্জ ফানো, এইমে সেজায়ার এরাও ভাষাকে মানুষের গণতান্ত্রিক,  সাংসস্কৃতিক, সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি  দিয়েছেন। কারণ ভাষা জাতি গঠণের একটি ভিত্তিও বটে। মানুষ ভাষার মাধ্যমে নির্দিষ্ট জাতি নির্দিষ্ট দেশের রাজনীতি -সংস্কৃতি-অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালায়।ফলে ভাষা জনসমষ্টির ভেতর সামাজিক চেতনার জন্ম দেয়।যার মাধ্যমে জাতীয় জীবনে ঐক্য প্রতিষ্ঠা পায়।  তাছাড়া অসমে শুরু থেকেই ভাষাকে শোষণ এবং বৈষম্যর কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এমতাবস্থায় আমাদের বাঙালি হিসেবেই নিজেদেরকে প্রতিরোধ গড়তে হবে৷ শ্রেণী এবং জাতির প্রশ্নতো আসবেই ইন্টারসেকশনলিটি হিসেবে। বাংলার আরেক ভূখণ্ড বাংলাদেশে সংঘটিত ৫২ এর ভাষা আন্দোলন আমাদের সেই শিক্ষায় দিয়ে যায়। এইসকল প্রশ্নগুলোকে একসাথে এনে রাত জেগে আমাদের লিখতে হবে একখানা ইস্তেহার।’ হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ চেতনায় উনিশ ‘ এই মন্ত্রে পুনঃদিক্ষাগ্রহণ করে এগিয়ে যেতে হবে সর্বান্তকরণে। তবেই আমাদের আত্মপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন হয়ে উঠবে সামগ্রিক।  ‘রাজেশ্বরী জননী’ র উপোস কেটে তবেই হবে নতুন দিনের সূর্যদয়।

তানিয়া লস্কর : আসামের শিলচরের বাসিন্দা। উকিল ও সমাজকর্মী।

  •  
  •  
  •  
  •  

1 Comments

  • অতি শক্তিশালী ও সময়োপযোগী লেখা। তানিয়া লস্করকে আন্তরিক অভিনন্দন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post