• August 18, 2022

শুধুই আমাকে দেখো

 শুধুই আমাকে দেখো

জয়শ্রী ভূষণ

রাজনীতি থেকে সংস্কৃতি, ফেইসবুক এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই এক হয়েছে নমুনা। শুধুই আমাকে দেখো। ছবি, গান, বন্যা, রাজনীতি, কূটনীতি, হেন তেন, যাই কিছু হোক, মূল বিষয় ছেড়ে শুধুই আমাকে দেখো। চব্বিশ ঘন্টা যেন নিজেকে নিয়ে মডেলদের মত র‍্যাপিং এ ব্যস্ত। দেখতে দেখতে এই সব নমুনা মাথাছাতা খারাপ হয়ে গেছে । এই দুর্যোগেও কিছু নমুনাদের নমুনার শেষ নাই। আজকাল আমি আর লিখি না তেমন। ভাবি লিখে কি হবে। ধুত্তোরিকা বলে যা লিখি তাও পড়ে থাকে আমার মোবাইল ফাইল বন্দী হয়ে। জানি না আজও এই লেখার বন্দীদশা ঘুচাতে পারবো কি না। হয়তো পড়েই থাকবে। আসলে এই লেখাগুলো লিখে আমি আমার মন মেজাজ হালকা করি। রাগে গা রিরি করলে এই লেখাগুলো কিছুটা রিলিফ দেয়। না বন্যার রিলিফ নয়, মনের রিলিফ।

বন্যার কথায় আসি। রগরগে বিষয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় এবার আমরা নিজেরাই এতটাই বন্যাক্রান্ত যে অনেকেরই ফেইসবুকে সেলফি, তারপরে খিচুড়ি রান্না করে ইলিশ মাছ ভাজা খেতে খেতে গল্প কবিতা সংস্কৃতি, গান এসব আর তেমন করে করা হয়ে উঠলো না, বন্যা ঘুরে দেখাটাও তেমন জমলো না, মানে মানুষ কেমন জলে ডুবে ঘর বাড়ি ছেড়ে রান্নাবান্না করছে রাস্তায় সেসব আর চুটিয়ে উপভোগ করা হলো না, দেখা হলো না ওমা কি নোংরা এই রিফিউজিরা, যারা স্কুল, কলেজ এর আশপাশের সব কিছু যাচ্ছেতাই করে রাখে তবুও তাদের বাড়ি মানে বস্তিতে ফিরে যেতে চায় না বন্যার পরেও, এবার দেখা হলো না । কে কিভাবে মরলো কিছুই সেভাবে এনজয় করা হলো। যাহোক তবুও অনেকেই চেষ্টা করছেন এবং তা ছবি ও ভিডিও দেখে বোঝা যাচ্ছে।

তো যে বিষয়ে ছিলাম আর কি, আমিও বিষয়ের থেকে বেরিয়ে পড়ি ছিটকে। তারপর বিষয়ের পর বিষয় মিশিয়ে আমার লেখারা অক্ষরের বন্যায় হারিয়ে যায়। আসলে ভালো করে লিখে ‘আমাকে দেখো শুধুই আমাকে দেখানোটা’ শিখতে পারলাম না আজও। তাই আজ নিজেকেই ধুরছাই।

বিষয় বন্যা, হ্যাঁ আসামের বন্যা। আমি যতটুকু জানি আসামে ব্যাঙে হিসু করলেও বন্যা হয় এমন জায়গার অভাব নেই। আমাদের এই বরাকেও তাই। কিন্তু আমরা যারা বাবুবিবিরা আছি, যারা দূর থেকে বন্যা পীড়িতদের রিফিউজি বলে চিরকাল ক্ষমাঘেন্নার চোখে দেখি, সেই আমরা এবার জলবন্দী, ঘরবন্দী, আমাদের বাড়ি ঘর সব অথৈ জলের নীচে, ঘরে খাবার নেই, জলের মাঝে থাকলেও খাবার জল নেই, বিদ্যুৎ নেই, নেটওয়ার্ক নেই, মোবাইলে চার্জ নেই, আমরাও আছি কি নেই অনেকেই নিজেরাও জানি না। আসলে আমরা কেউ রাজনীতি করি না, আমরা সবাই শুধু নিরাপদ দূরত্বে থেকে কি হতে পারে আর কি হতে পারে না তাই নিয়ে বুলি কপচিয়ে আরামে আমাদের দৈনন্দিন রোজনামচায় অতিব্যস্ত। আমাদের সবাই এক বোতামের টিপে সরকার নামক সর্বংসহা বিশ্বপরিত্রাতার হাতে নিজেদের সবকিছু সমর্পণ করে আমরা দিবা নিদ্রায় অভ্যস্ত। আমরা তর্জনী তুলে অন্যের ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করতে করতে ভুলেই গেছি যে বাকি আঙুলগুলো আমাদের নিজেদের দিকেই তাক করা। সে হুঁশ আমাদের নেই। আমরা আসলে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে বেঁচে থাকতেও বেশ ভালো ভাবেই রপ্ত করে নিয়েছি, বড্ডই সুখের কথা।

এবার আবার বন্যায় মানে বিষয়ে ফিরে আসি। দেখছি কিছুদিন ধরে কিছু মানুষ খুব খাপ্পা, কেন সর্বভারতীয় স্তরে এই যে শিলচর তথা আমাদের শহর বরাক ডুবে আছে তা কেন খবর হলো না, কেন কলকাতায় খবর হলো না। তা ভাই খবরটা করবে কে। তা এই বরাক উপত্যকার কোন খবর কোনদিন সর্বভারতীয় স্তরে নিউজ হয়েছিল, যদি কেউ মনে করান বড্ড উপকৃত হই। এই বরাক তথা বরাক উপত্যকার মানুষ কোন হরিদাস পাল। একদম সবাই তেলেবেগুনে জ্বলে শেষ আমাদের এই জলে চোবানি অবস্থা কেন নিউজে এলো না, নিদেনপক্ষে আমার বাড়িটাও যদি এন ডি টিভিতে দেখা যেতো তাহলে তো কেল্লা ফতে আরকি। বরাকের বন্যার জল হুউউস করে সব উবে যেত মনে হচ্ছে। বিষয় হচ্ছে বন্যা এবং বন্যা কবলিত মানুষ এবং তাদের জন্য কি করা যায়, এটাই আজকে আমাদের সবার বিবেচ্য হওয়া উচিত। তা না বন্যা নিয়েও শুরু করে দিয়েছেন দূরদর্শিতা । এইসব চিন্তা ধারা গুলি আরেকটু বের করুন তারপরে বন্যা বিষয়টিকে হাওয়া করে দিয়ে বন্যায় চোবানো মানুষগুলোর চিন্তা ভাবনাকে চোবানি খাইয়ে দেখুন গোটা বন্যা বিষয়টিকেও আমাদের মন থেকে উৎখাত করা যায় কিনা। যত্তসব…।

আচ্ছা এই যে এত এত নিউজ খবর যাই বলুন না কেন , এই অঞ্চলের ছেলে মেয়েরা করছে তাদের একটু উৎসাহিত করুন না, তাদের বাহবা দিন, চলুন না এনডিটিভির থেকেও বড় এবং দূরন্ত কিছু আমরা তো আমাদের এই ছোট সাধন দিয়েও করে নিতে পারি কিনা সেই ভাবনাটা ভাবুন না। করছে তো, অনির্বান রায় চৌধুরীরা তো করছে। খবর গুলো হলুদ মিডিয়ায় নাই বা যাক, মানুষের কাছে পৌঁছে দিক সেই ব্যবস্থা করি চলুন সবাই মিলে। সাংবাদিক প্রণবানন্দ দাস এর যে ভাইরেল নিউজটি সেই রাতের এন ডি এফ আর এর টিমকে নিয়ে, সেইসব যাতে আর কখনো না হয়, আসুন না সবাই সেই চেষ্টা করি। প্রণবানন্দ দাসের মত প্রশাসনের খামতি গুলো তুলে ধরার মানে এই নয় যে তিনি দেশদ্রোহী, বা সরকার বিরোধী কথা বলছেন, সাংবাদিক এবং জনগণের কাজই হচ্ছে প্রশাসন এবং সরকারের কাজের পুঙখানুপুঙখ বিশ্লেষণ করে সেই কাজের মান আরও উন্নত থেকে উন্নততর করে তোলা যাতে দেশবাসী আরও ভালো থাকে। তাই তো আসল সরকারি কাজ এবং সরকারি আমলাদেরও তাই কাজ । সাংবাদিক অরিজিৎ আদিত্য বাবুর যে দুষ্কৃতিদের দ্বারা বাঁধ ভাঙ্গা এবং প্রশাসনের অদূরদর্শীতা নামক লেখাটি ভাইরাল হয়েছে, যে লেখাটি তিনি লিখেছেন, সেটির অন্তর্বতী বিষয় বন্যা তথা বন্যার কারণ দর্শানো নিয়ে বিশদ হলেও, উনার লেখাটি ভাইরাল হয়ে শিরোনামে দুষ্কৃতিদের বাঁধ কাটা ও প্রশাসনিক অদূরদর্শীতার লেখাটি ভেতরের খবরকে বন্যার জলের ভাসিয়ে দিয়ে শুধু “দুষ্কৃতির বাঁধ কাটা” ভাইরেল এবং বন্যা বিষয়টি হাপিস হয়ে এবার বিষয় দুষ্কৃতি এবং অবশ্যই সেই দুষ্কৃতি কারা হতে পারে আজকের ভারতবর্ষে সহজেই অনুমেয়। এই লেখাটি লিখে তিনি কাদের সুবিধা বেশি করলেন ভাবছি।তাই আমার মত সাধারণ মানুষের বিনীত অনুরোধ থাকবে ছোট বড় সবার কাছে বিশেষ করে বরিষ্ঠ সাংবাদিক অরিজিৎ আদিত্য বাবুদের মত মানুষের প্রতি, যে শিরোনামটি একটু ভেবে চিন্তা করেই দেবেন। আমাদের এই অঞ্চলের জ্ঞানী গুণী মানুষ শুধু শিরোনাম পড়েই অনেক কিছু বুঝে নেন। যাই হোক আবারও আমার আসল কথা বানের জলে ভেসে গিয়ে বন্যা বিষয়টি ভেসে যাচ্ছে।

তা যা বলছিলাম, ব্যাঙে হিসু করলেও শিলচর শহরের সব ইয়া ইয়া মানুষের বসবাসের অঞ্চল আর আর সোম রোড যেটি সব থেকে আগেই গলা জলে ডুবে থাকে, সেইখানের একটি মেয়ে এনাক্ষী এবং তার ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বন্ধুরা, সবাই মিলে অনবরত যারা বন্যার গোটা শহরে আটকে আছেন তারা তাদের সাহায্য করার চেষ্টা করছে ঘরে বসেই। যাদের মা বাবা শিলচরে, যারা চাকুরী বাকুরীর জন্য বাইরে আছে, পরিবার মা বাবা বা চেনা জানা বন্ধুবান্ধবরা জলবন্দী তারা তাদের খবর নেবার চেষ্টা করছে এবং বরাকের বাইরে ভারতের বাইরে পরিবার পরিজনের থেকে ঠিকানা নিয়ে তাদের জলবন্দী অবস্থার মধ্যে জল, ওষুধ এবং এরা যে ভালো আছে তার খবর পৌঁছে দিচ্ছে প্রিয়জনের কাছে। যারা উদ্ধার কাজে নিয়োজিত তাদের সাথে তারা যোগাযোগে আছে, যদিও তারা নিজেরাও জলবন্দী।

একদল ছেলে মিলে গোটা শহরে স্বেচ্ছাসেবকের মত ঘুরে ঘুরে জল, খাবার মেডিসিন পৌঁছে দেবার কাজ করছে, তার কোনো ফেইসবুক আপডেট দিতে পারছে না কারণ তারা গুরুত্বপূর্ণ কাজ মানুষের জানমালের হেফাজতে ব্যস্ত। কৃশানু ভট্টাচার্য , জয়দীপ ভট্টাচার্যদা, সাংবাদিক অনির্বাণ রায় চৌধুরী, মোকসদুল ভাই, নীল ভাই, রাহুল দেব, সায়নরা, প্রণবানন্দ দাসেরা, আরও নাম না জানা কয়েক শো, কয়েক হাজার ছেলেমেয়েরা অনবরত নীরবে এই অঞ্চলের বন্যার্তদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এই দলের ছেলেমেয়েদের মধ্যে শুধু শহর নয়, উধারবন্দ, পয়লাপুল, ফুলেরতল, লক্ষ্মীপুর, গ্রামেগঞ্জের, করিমগঞ্জ হাইলাকান্দি এবং বাইরের অনেক আছে যারা মানুষের জন্য সব বিপর্যয়ের মাঝেও অনেক ঝুট ঝামেলার মধ্যে এই কাজগুলো নীরবে করে যাচ্ছে। বন্যার আশ্রয় নেওয়া পরিবার নিয়ে একটি ছেলে যে আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে এবং আমার ছেলেটি দূরে থেকেও এই কাজে নিজেদের নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। কিছু মানুষ অনবরত গরীব দুখীদের খাবার বানিয়ে দেওয়া থেকে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মত হাটু জল ভেঙ্গে মানুষের ঘরে জল খাবার পৌঁছে দিচ্ছে। শুধু মাত্র একজন রাজনৈতিক পিতা বা এককভাবে কাউকে প্রশংসায় ভরিয়ে দেবার আগে এই অজানা অচেনা বাচ্চা বুড়োদের কথাও জানুন। এই পৃথিবীতে একা কিছুই করা যায় না। ধ্বংস করা যায় কিন্তু বেঁচে থাকতে হলে একে অপরের সাহচর্য খুব দরকার এবং আজও মানবতা, মানবিকতা,মানুষ আছে বলেই আমরা আশায় বাঁচি। তাই যদ্দিন আমরা সাধারণ মানুষ পাশাপাশি থাকবো সব বাধাঝঞ্জা পেরিয়ে যাবার প্রয়াস করতে পারবো।

আমি ও আমরা যারা অনেক কিছুই করবার ইচ্ছা আছে, খুব সীমিত আমাদের করণীয় কর্মক্ষমতা এই দুর্দিনে, তার যন্ত্রণা কুরেকুরে খাচ্ছে। তবু যারা করছেন তাদেরকে ভালোবাসা এক আকাশ। সেই সমস্ত কেন্দ্রীয় এবং আসামের রাজ্যিক কর্মচারী, কর্মকর্তারা যারা এই যুদ্ধে সেনার ভূমিকায়, তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কুর্ণিশ। সবাই যে যার মত কাজ করে গেলেই হয়তো আমরা তীরের দেখা পাবো।

আর যারা এক মিনিটের এক চুটকির ম্যাজিকে বিশ্বাসী, তাদের প্রতি আমার করুণা। তাদের জানান দেই, আসামের ধলপুরের এক হাজার পাচশো পরিবারের আট হাজার মানুষ যাদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল, এই বন্যায় আমরাও কি তাদের খোঁজ করেছি। ওই আট হাজার মানুষও এই আসামের বাংলাভাষী মানুষ। যে ২০০ টা বুলডোজার দিয়ে ১২ মে ২০২২ শের এক সকালে বিশাল ডলু চা বাগান, জলাশয়, হাজার হাজার চা বাগানের শ্রমিকের আর্তনাদকে উপেক্ষা করে প্রায় আড়াই লক্ষ চাগাছ, সেই সঙ্গে অগুনতি বিশাল বিশাল ছায়া গাছ অবলীলায় কেটে ফেলা হয়েছিল পরিবেশের চিন্তা না করেই, তখন এই বরাকবাসীরা কোথায় ছিলেন, কোথায় ছিলেন যখন গত মাসের বন্যার রংপুর করাতিগ্রাম, শিমূলতলা, ইটখোলার বাঁধের নীচের ঘরগুলো জলের তলায় চলে গেছিল, অগুনতি মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল কাটিগড়া অঞ্চলে, বাচ্চা, শিশু মহিলারা জলে ডুবে মারা পরেছিলেন, গোটা ডিমা হাসাও যখন ধসে ধূলিসাৎ হয়েছিল,তখন কেরালা, কলিকাতা, দূরের কথা এই শহরের বাবুবিবিরা কি করেছিলেন আপনাদের গ্রামের মানুষের জন্য, একটু ভেবে দেখা দরকার। আগের নিজের মানুষদের দেখুন অন্যদের জন্য উদাহরণ তৈরি করুন দেখবেন দেশদশ আপনাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠবে।

এন ডি এফ আর সূদুর উড়িষ্যা থেকে একশ কেন দুশো জন এলেও,আমাদের নিজের মানুষ থাকতে হবে বাইরের মানুষের পাশে, কোথায় বেশি জল, কোথায় পানীয় জল একেবারে নেই, কোথায় বিপদ বেশি এই কথাগুলো আমাদের মানুষ এসে প্রশাসন এবং উদ্ধারকাজে কর্মরত মানুষের পাশে আমাদের দাঁড়াতে হবে, হেলিকপ্টার থেকে তিনি আমাদের হাহাকার আমাদের দুঃখ কষ্ট উবে নিতে পারবেন না, সব বানের জল, চোখের জল শুষে নিতে পারবেন না এটা আমাদের বুঝতে হবে। এক লহমায় সব ধ্বংস করা সহজ, কিন্তু প্রকৃতির ধ্বংস লীলার তাণ্ডবের সমাধান ঠাণ্ডা মাথায় আমাদের সবাইকে হাত হাত রেখে আমাদের এই বরাকের সহজাত সম্প্রীতি বজায় রেখে আগেও যেভাবে করেছি এবারও করবো। আমরা এই অঞ্চলে যুদ্ধ করেই বেঁচে আছি, এই নতুন যুদ্ধেও আমরা জয়ী হবো এই আশায় আমিও আশাবাদী। এই কথাগুলো এই জন্য লিখছি যে বাইরের মানুষরা আমাদের সাহায্য করতে এলেও হয়তো পারবে না, কারণ তারা জানে না, কোনটা নদী আর কোনটা রংপুর কোনটা ন্যাশনাল হাইওয়ে। সবই তো জলমগ্ন। একে অপরের শ্রাদ্ধ না করে চলুন অন্তত আমরা সাধারণরা এক হয়ে মানুষের জন্য আমাদের জন্য কাজ করি।

যারা আগে থেকেই বিভিন্ন স্কুল কলেজে গরীব মানুষেরা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ধর্মের মানুষরা এক সাথে আছে, শোনা যাচ্ছে ত্রান যথেষ্ট এলেও বণ্টনে অনিয়ম হচ্ছে, অনুরোধ থাকবে যারা প্রশাসন ও সাংবাদিকরা আছেন, তারা যেন সচেষ্ট হন, বন্যার্তরাই যেন ত্রান পান। এই কাজগুলো মুখ্যমন্ত্রী একা করতে পারবেন না। আমাদের থেকে কিছু মানুষ প্রশাসনের সাথে মিলে মিশে মানুষের পাশে যেন থাকে এই আশা করছি। সুষ্ঠু বন্টন ব্যবস্থা করতে ভলান্টিয়ারদের সাহায্য নিক প্রশাসন, কারণ প্রশাসন কিছু মুষ্টিমেয় মানুষের দ্বারা মানুষের জন্যই প্রচলিত একটি ব্যবস্থা। ওরাও মানুষ, ওদেরও ক্ষমতা সীমিত, ওদের মধ্যেও ভালো মন্দ আছে। আমরা যারা সাধারণ তাদের উচিত নিরপেক্ষ ভাবে প্রশাসন এবং সরকারের সাহায্য করা। সেই সাথে সরকার ও প্রশাসনেরও যে কোন প্রতিবাদ, অনু্যোগের জন্য পুলিশ লেলিয়ে না দিয়ে বোঝা উচিত যে তাদের কাজই জনগণের সেবা। মুখ্যমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে এই সংবিধান দেশের সেবা করার জন্যই ওই সব পদে বসিয়েছেন। ওদের ভগবান ভাবা বোকামি এবং নিরর্থক।

এবারের বন্যায় বরাক ছাড়াও, হোজাই, বরপেটা, নগাঁও, এবং আসামের প্রায় বত্রিশটি জেলা ও আরও অন্যান্য জায়গা সব ডুবে গেছে। এই আসামের প্রায় চুয়ান্ন লক্ষ মানুষ বন্যাক্রান্ত। মানুষ নিজেদের ফসল,খাদ্য, গরু বাছুর, বাড়িঘর কিছুই বাঁচাতে পারেনি। এত বিশাল সংখ্যক মানুষের পাশে কে দাঁড়াবে। কেউ নেই আমরা সাধারণ ছাড়া এই কথা গত কয়েকদিনে গৌহাটির রেডিসন ব্লু এর খবরে নিশ্চয়ই দেখেছেন বুঝেছেন। আর না বুঝলে কি করা কচুপাতার জলে ডুবে মরুন। ন্যাশনাল নিউজ কি করবে আপনার যদি দিল্লিতে খবর না যায়, আসামের বন্যা কেন রাষ্ট্রীয় বিপর্যয় ঘোষিত হয় না, এই প্রশ্নগুলো কে করবে কলকাতাবাসীরা না দিল্লিবাসীরা। আর আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কি দোষ, ভোটই তো দিয়েছেন যাতে ব্যক্তিগত উন্নতি হয়, যদি সমাজ এবং দেশের উন্নতি চান তাহলে নিজেরাই আসুননা সরাসরি রাজনীতিতে, না আমরা রাজনীতি করিনা এই ন্যাকামি বাদ দিয়ে । না তখন নিরাপদ দূরত্বে থেকে হয় নাটক নয় কবিতা গল্পের সংস্কৃতি। তখন পাশের বাড়ি ছেলে হবে ক্ষুদিরাম আর আমার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। এবারের বন্যার চোবানিতে যদি এইসব স্বভাব ত্যাগ কিঞ্চিৎ পরিমাণেও না বদলাতে পারেন তাহলে পরের বন্যায় কাউকে এক্সপেক্ট করবেন না৷ তার আগে অবশ্য দিল্লি,মুম্বাই বা ব্যাঙ্গালোরের চৌদ্দ তালায় প্রবাসী হয়ে চলে যাবার প্রয়াস শুরু হবে অনেকেরই ।

আর এবার অন্তত বুঝুন, এক বন্যার ঠেলায় বাবুবিবিরা শহরে থেকে গাড়ি বাড়ি ফ্রিজ টিভি জলের তলায় গেলে কেমন লাগে, সারা জীবন সেই নীচু এলাকায় গোটা আসামে বানভাসি মানুষগুলো কিভাবে বাস করে আর কিভাবে এন আর সি এর জন্য কাগজপত্র গুলো গুছিয়ে রাখে। তাদের ছাদ আকাশ, তারা বেঁচে থাকার জন্যই নিজেদের ভাগ্যবান মনে করে। সেই সাথে নুন পান্তা অমৃত সমান।

এবার একটু শুধুই নিজের দিকে দেখবো ভাবছি। না বিষয় বন্যাই সেই সাথে নিজেকেই গুলিয়ে একটা ককটেল বানানোর চেষ্টা। গত মাসের বন্যায় ফিরে তাকাই চলুন। আমার বাড়িতে আশি বছরের শ্বশুর এবং সত্তর পার হওয়া অসুস্থ শাশুড়ী দুদিন বাড়ির ভালোবাসায় জল মগ্ন হয়ে থাকলেও তৃতীয় দিন বাথরুম ডুবে যাওয়ায় এবং জলস্তর বাড়ায় বাধ্য হয়েই পাখির বাসা চারতলার ফ্ল্যাটে আসেন। প্রায় পাঁচ দিন পর বাড়ির মায়ায় বাড়ি দেখতে গিয়ে পড়ে হার্ট এট্যাক, তারপর আরো বারো দিন নার্সিংহোম বেড়িয়ে বন্যার জল পরিষ্কার করে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে এলেও বাই পাস সার্জারির জন্য গৌহাটি যেতে যেতেই আবার বন্যা। এবার শাশুড়ী বাড়ির ভালোবাসায় আরো গোঁ ধরলেন ইবার আর বাড়ি ছাড়িয়া যাইতাম না জল আউক। পাখির বাসায় বিছানায় শয্যাশায়ী অসুস্থ মা, অসুস্থ শাশুড়ী বাড়িতে জলের বাড়বাড়ন্ত দেখে ভয়ে এলেন। এবার বাড়ির সবই প্রায় জলে ডোবানো। নোয়াস আর্কের মত মনে হচ্ছে একমাত্র আমিই ডাঙায়। বাকি সব জলের নীচে। গত শনিবার দিন শেষ অফিসে গেছিলাম, যাবার সময় রাঙ্গিরখারি এলাকার জল দেখেই বুক ধুকপুক করছিল। প্রায় এক ঘন্টা চেষ্টা করে একটি অটো চড়ে রাঙ্গিরখাড়ি থেকে কাঠাল পয়েন্ট অব্ধি জলে মগ্ন রাস্তা পেরিয়ে শিলচর মেডিকেল এর দিকে গেলেও ফেরার সময় এন আই টির ওদিকে বাইপাস হয়ে তারাপুর করিমগঞ্জ রোড হয়ে ঘুরে ঘরে আসতে পেরেছি। সেদিন রাঙ্গিরখারি, দাস কলোনিতে যারা কলিগরা, যাদের ঘরে কোনদিন জল উঠেনি, রবিবার থেকেই সবার একতালা ডোবানো, গলির গলা জল পার হয়ে কোনমতে প্রশান্তদা পাশের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন বলে জেনেছি। জল বাড়ার সাথে আজ অব্ধি কোন যোগাযোগ করতে পারিনি। আমার পেনশনার দিদিরা যারা সব সময় আমার খোঁজ খবর নেই, মায়াদির খবর পাচ্ছি না। এল আই সি তে কাজ করে, সীমান্ত শহরের স্কুলের ছোটবোন অর্পিতা মা বাবাকে বাচ্চাদের কে নিয়ে ন্যাশনাল হাইওয়েতে কিভাবে আছি জানি না। পাব্লিক স্কুলের সত্তর ছুঁই ছুঁই অবিবাহিত একলা ভাস্বতীদির পরিচর্যাকারী মায়ার সঙ্গে হোটেল মারুতীতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, আজও জানি না কেমন আছেন। অনেকেই অনবরত বিভিন্ন ভাবে আমার খবর নিচ্ছেন আমি ও আমরা এখনো নোয়াস আর্কে ভেসে আছি। এটিমে টাকা নেই, বাজারে আগুন, তবু দুই বৃদ্ধাকে নিয়ে ভালো আছি। পরশু বিকেল থেকে গতকাল সন্ধ্যে অব্ধি বিদ্যুৎ, মোবাইল নেটওয়ার্ক কিছুই ছিল না। রাতে সব স্বাভাবিক হয়েছে। আমাদের আশেপাশের সবাই ঠিকই আছি।জানি না কি হবে একটু আগেই খবর পেলাম মিজোরামের একটি বাঁধ ভেঙ্গেছে। সব সাংবাদিক বন্ধুদের বলবো সজাগ থাকুন। মানুষ যাতে আর বিপদে না পড়ে সেই চেষ্টা করি সবাই মিলে। আর যারা আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারছেন না সবাইকে জানাই আমি ও আমরা ভালো আছি।

ও হ্যাঁ আর একটি কথা, বলছি টেঁ ফু হলেই এখন সবাইকে থানায় ডেকে পাঠানো হয়। কিন্তু বেথুকান্দির বাঁধ সম্বন্ধে মহিষাবিল ও আশেপাশের মানুষের দীর্ঘদিনের অনুযোগ, অসুবিধা এমনকি শুনেছি ও পড়েছি বাঁধের মেরামত নিয়ে প্রশাসনের এই নিস্পৃহতা নিয়েই প্রশ্নটা জোরালো হওয়া উচিত এবং আমাদেরও সবাইকে ভবিষ্যতে এধরণের ঘটনা জানার পরপরই নিজেদের দায়িত্ব নিয়ে প্রশাসনকে চাপ দেওয়া উচিত যাতে নদী এসে শহরকে গ্রাস না করে। হ্যাঁ আরও একটা কথা জল, আগুন কাউকে ছেড়ে কথা কয় না। এই বন্যার তোড়ে হিন্দু মুসলমান ক্রিশ্চিয়ান, প্রায় সবাই ক্ষতিগ্রস্ত। তাই দুষ্কৃতি বলে আবার নতুন যুদ্ধ থেকে অতি জ্ঞানীরা এবার অন্তত বিরত থাকবেন এই নিয়েও আমি খুবই আশাবাদী যদিও পত্রিকার হেডলাইনে আলতোভাবে আসা শুরু হয়ে গেছে।

আসলে এই হচ্ছে আমাদের চরিত্রগত কু অভ্যাস। বিষয় থেকে বেরিয়ে যাবার প্রবণতা। একটা কথা মানে একটা গানের কথা খুব মনে পড়ছে। আমিও শুনছি আপনারাও ইচ্ছে হলে শুনে দেখতে পারেন “….পরের জায়গা পরের জমিন ঘর বানাইয়া আমি রই…আমি তো সেই ঘরের মালিক নই..”। এই পৃথিবীটা সবার। কারও বাপের সম্পত্তি নয়। আর এই পৃথিবী থাকলেই আমরাও থাকবো। আমাদের যা কিছু প্রয়োজনীয় সব এই প্রকৃতি থেকেই পাচ্ছি আর দুদিনের এই পৃথিবীতে আজ ভালোভাবে বেঁচে থাকাটাই পরম প্রাপ্তি এটা মনে থাকলে এই জিনিসপত্র টাকাপয়সার মায়া কমে যায় আর নিজেও অনেক বেশি ভালো থাকা যায়। আর আমরা ভালো থাকলেই আমাদের ভগবান আল্লা ঈশ্বর যেশাস ক্রাইস্ট সবাই ভালো থাকবেন, মন্দির মসজিদ গীর্জা গমগম করবে ভক্তদের ভীড়ে। ও হ্যাঁ আর একটা কবিতা আমার খুব প্রিয়, বিপদ এলেই আর বেশি জ্ঞানীদের সমাবেশ দেখলেই এই কবিতাখানির কথা আমার মনে পড়ে,প্রিয় কবি সুকুমার রায়ের কবিতা “জীবনের হিসাব”। পড়ে দেখতে পারেন।

জয়শ্রী ভূষণ : আসামের শিলচরের বাসিন্দা। নাট্যকর্মী ও প্রাবন্ধিক।

3 Comments

  • খুবই সত্যি কথা বলেছেন- সেবা আজ যতটা আত্মত্যাগের- অন্তত যা হবার কথা ছিল, তার ঠাঁই নিয়েছে আত্মনাদ ! সেবা মানে সেল্ফি দেয়ার অপূর্ব সুযোগ!
    এই ‘আমাকে দেখো’দের চাপে আত্মত্যাগিরা আজ আড়াল পড়ে গেছেন। তবু আশার আলো ওরাই দেখিয়ে চলছে যাদের প্রচার নেই সোশ্যাল মিডিয়ায়।
    ধন্যবাদ কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরার জন্য।

    • পড়লাম, খুব খারাপ অবস্থা। সত্যি কলকাতা, দিল্লি বহির্ভারত নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। কি দুর্বিষহ অবস্থা। খুব খারাপ লাগলো। সাবধানে থাকবেন। দুর্যোগ কেটে যাক তাড়াতাড়ি, এই আশা করছি।

  • খুব সুন্দর করে নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরেছ জয়শ্রী। দারুণ দারুণ , রিপোর্টিঙের খুব চোরা গোপ্তা অথচ ভয়ানক দিকটা আলোকপাত করে আমাকেও আলোকিত করেছো । কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post