• May 29, 2022

আঙ্কেল স্যামের নামে খোলা চিঠি

 আঙ্কেল স্যামের নামে খোলা চিঠি

পূর্বাঞ্চল ডেস্ক

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পৃথিবীতে আঙ্কেল স্যাম (আমেরিকা) ও মামা মালেনকফ (সোভিয়েত ইউনিয়ন) নিজেদের মধ্যে অন্যরকম এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। এই দুই পরাশক্তি— মানে চাচা ও মামা— দুজনেই নিজ আদর্শ, ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করতে গিয়ে সারা বিশ্বকে মহাযুদ্ধের সময়কার মতো দু’ভাগ করে ফেলেন। ফলে বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রে ‘যুদ্ধ হবে হবে’ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। চাচা স্যাম চাচ্ছিলেন গণতন্ত্র ও ব্যক্তি স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে পুঁজিতন্ত্রের পতাকা ওড়াতে, ওদিক থেকে মামা মালেনকফ চাচ্ছিলেন দুনিয়ার সব প্রলেতারিয়াতকে এক করে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাত গুঁড়িয়ে দিতে। কিন্তু কেউ তো কারো চেয়ে কম নয়। আবার যুদ্ধের ভয়াবহতা দুজনেরই চাক্ষুষ ছিল। তাই তারা চাচ্ছিলেন রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সামরিক কলাকৌশলের মাধ্যমে একে অপরকে পরাভূত করতে। বোমা ছুড়াছুড়ি হয়নি বটে, তবুও যেহেতু যুদ্ধ, তাই ভাগ্নে-ভাতিজারা এই যুদ্ধের নাম দিয়েছে কোল্ড ওয়ার বা স্নায়ুযুদ্ধ।

কিন্তু সবসময় তো আর শীত থাকে না। তাই গরম আবহাওয়া নিয়ে মঞ্চে হাজির হলেন উত্তর কোরিয়া।
কাহিনি অনেকটা এমন—
১৯১০ সাল থেকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ পর্যন্ত কোরিয়া ছিল জাপানের অধীনে। যুদ্ধে জাপান পরাজিত হলে চাচা স্যাম ও মামা মালেনকফ উভয়ে কোরিয়াকে দাবি করে। ১৯৪৭ সালে কোরিয়া সেনা প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হলে চাচাজান অস্বীকৃতি জানান। ওদিকে মামাও কম যান না, তিনিও নিজ সৈন্য নিয়ে ঘাঁটি গাড়েন। অবশেষে ১৯৪৮ সালে কোরীয় উপদ্বীপের দক্ষিণে চাচার মদদে প্রতিষ্ঠিত হয় রিপাবলিক অফ কোরিয়া নামে নতুন রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রপ্রধান হন ডানপন্থী সিঙগমান রি। এর প্রতিশোধ নিতে মামাজান উত্তরে কিম-ইল-সাঙের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত করেন সাম্যবাদী রাষ্ট্র— পিপলস ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কোরিয়া। ফলে ৩৮তম সমান্তরাল রেখাকে মাঝামাঝি রেখে এক দেশ থেকে দুই দেশ হয়ে যায় কোরিয়া। প্রথমে ভাবা হয়েছিল এই বিভাজন ক্ষণস্থায়ী হবে। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই দুই পক্ষই নিজ নিজ অধিকৃত এলাকায় নিজ নিজ মতাদর্শ বাস্তবায়নে জোর দিলে সৃষ্টি হয় উত্তপ্ত পরিস্থিতি। এরই মধ্যে সীমানাপাড়ে বেশ কয়েকবার বিচ্ছিন্ন লড়াইও সংঘটিত হয়। এবং… শেষমেশ যুদ্ধ বেঁধেই যায়,— ১৯৫০ সালের ২৫ জুন মামাজানের সহায়তায় উত্তর কোরিয়ার প্রায় ৭৫০০০ সৈন্য আচমকা দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর আক্রমণ করে বসে।

চাচাজান এটাকে সমাজতন্ত্রের আগ্রাসী পদক্ষেপ বলে দক্ষিণ কোরিয়ার সাহায্যে এগিয়ে আসেন। কারণ তিনি পূর্বেই ঘোষণা দিয়েছিলেন পৃথিবীর যেখানেই সমাজতন্ত্রীরা আগ্রাসন চালাবে, সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। চাচাজানের রাষ্ট্রপতি ট্রুম্যান উত্তর কোরিয়াকে আক্রমণকারী বলে ঘোষণা করে এবং জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্রের কাছে দক্ষিণ কোরিয়ারকে সাহায্য করার আবেদন জানান। এবং কৌশলে চাচাজানেরই সেনাপতি [ম্যাক আর্থার] জাতিসংঘের পতাকা হাতে তিন লাখের অধিক সৈন্য নিয়ে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন।
প্রথম দিকে কেবল প্রতিরক্ষা করে যাচ্ছিলেন, কিন্তু উত্তর কোরিয়ান সৈন্য যখন তিন মাসেই দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় ৯৫ শতাংশ ভূখণ্ড দখল করে নেয় এবং রাজধানী সিউল আক্রমণ করে, চাচাজান তখন জাতিসংঘ থেকে আরো সৈন্য নিয়ে কঠোর মোকাবেলা করে দক্ষিণকে মুক্ত করেন। সেনাপতি ম্যাক আর্থার এখানেই ক্ষান্ত দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি অতিউৎসাহী হয়ে উত্তর কোরিয়া দখল করে চীনের সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে যান। চেয়ারম্যান মাও-সে-তুং সাহেব চাচাজানের এই মাতবরি মেনে নিতে পারলেন না, তিনি তাৎক্ষণিক দক্ষিণে আক্রমণ করে সিউল দখল করে নিলেন। এভাবে এই যুদ্ধে চীনও জড়িয়ে পড়ল।

ঠিক ওইসময় চাচাজানের এশিয়ায় ঘাঁটি ও সৈন্য সংগ্রহের প্রয়োজন বোধ হলো। ভারত কিছুটা সাড়া দিলেও পাকিস্তান সেই আবেদন নাকচ করে দিল। ব্যাপারটা চাচাজানের মনে আঘাত হানল। ভেবেচিন্তে তাই ভিন্নভাবে কাজ হাসিলের ফন্দি আঁটলেন— লেখক-বুদ্ধিজীবিদের নিজের দলে ভেড়াবার অভিযান শুরু করলেন, যেন তাদের কলম দিয়ে নিজের কুকীর্তি জায়েজিকরণ ও নিজ প্রভাববলয় নির্মাণ করা যায়। বলা আবশ্যক নয়, এটা ছিল ঠাণ্ডা যুদ্ধেরই একটি অংশ।

১৯৫১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মান্টো ‘চাচা স্যাম কে নাম এক খত’ প্রবন্ধটি লেখেন। (প্রবন্ধটি পরে ‘উপর, নীচে আওর দরমিয়ান’ নামক বইতে সংকলিত হয়।) চাচা স্যামকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন তার গণতন্ত্র ও ব্যক্তিস্বাধীনতার হাকিকত কী। আধিপত্য বিস্তারের নিয়তে অন্য দেশের বেলায় যে-নীতি খাটানো হয়, নিজ রাষ্ট্রে কি তা চলে? আর এই যে দেশ দুই ভাগ করার খেলা, এর পরিণতি নিয়ে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার মূর্তপ্রতীক চাচা স্যামের কী কোনো মাথা ব্যথা আছে? মান্টো মনে করিয়ে দেন যে, ভারত-পাকিস্তান ভাগেও তার হাত ছিল। কিন্তু এই কথা তো চাচাজান স্বীকার করবেন না, এবং জনগণের বর্তমান দারিদ্রের দায়ভারও গ্রহণ করবেন না, উল্টো চেষ্টা করবেন ফ্রি গম পাঠিয়ে নিজেকে মসিহ প্রমাণ করতে। মান্টো লিখেন :
‘আমি দরিদ্র, এইজন্য যে আমার দেশ দরিদ্র। আমার তো তারপরেও দুবেলা রুটি কোনো না কোনো উপায়ে জুটে, কিন্তু আমার অনেক ভাই আছে যাদের এতটুকুও নসিবে হয় না।
আমার দেশ দরিদ্র, জাহিল—কিন্তু কেন? এ তো আপনি খুব ভালো করেই জানেন চাচাজান। আপনি ও আপনার ভাই জন বুল (যুক্তরাজ্য) দুজন যৌথভাবে যে-কাহিনি ঘটিয়েছেন… থাক, সেই কাহিনির সুতা এখন টানতে চাই না।… ’

অথচ এই যুদ্ধের পেছনে তারা কারণ দর্শান বিশ্বশান্তি। মান্টো তাই লিখেন : ‘শুনিছে আপনি হাইড্রোজেন বোমা স্রেফ এই জন্য বানাচ্ছেন যে, পৃথিবীতে যেন পরিপূর্ণ শান্তি ও নিরাপত্তা কায়েম হয়ে যায়। এটা তো আল্লাহ, কেবল আল্লাহ তায়ালাই পারেন। কিন্তু তার পরেও আপনার কথায় আমার আস্থা আছে, কেননা প্রথমত আমি আপনার দেওয়া গম খাই, দ্বিতীয়ত আমি আপনার ভাতিজা। বড়দের কথা ছোটদের বিনাবাক্য ব্যয়ে মেনে নিতে হয়, তবু একটা জিজ্ঞাসা— পৃথিবীতে যখন শান্তি ও নিরাপত্তা কায়েম করবেন, তখন পৃথিবীটা কতটুকু ছোট হবে? মানে, কতটা দেশ দুনিয়ার পৃষ্ঠা থেকে মুছে ফেলবেন?
আমার এক ভাতিজা ইস্কুলে পড়ে, গতকাল আমার কাছে এসে পৃথিবীর একটা ম্যাপ এঁকে দিতে বলে। আমি তাকে বলি— এখন না এখন না, আমি আগে চাচাজানের সাথে বাতচিত করে জেনে নিই কোন কোন দেশ থাকবে আর কোন কোন দেশ থাকবে না, তারপর তোমাকে একদম লেটেস্ট মডেলের ম্যাপ এঁকে দিব, কেমন?’

প্রবন্ধগুলোতে হাইড্রোজেন বোমার পাশাপাশি চাচার তেল লুণ্ঠনের প্রসঙ্গও এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা তৈরি, ইরানের ওপর অবৈধ হস্তক্ষেপ এবং মুসলিম শাসকদের কিনে নেওয়ার কাহিনি অকপটে মান্টো বলে গেছেন— গত একশ বছর ধরে যেসব কাহিনি প্রতিমুহূর্তের জন্য বাস্তব। পড়তে পড়তে মনেই হবে না এই কথাগুলো ৭০ বছর আগের। উপমহাদেশের ধর্ম রাজনীতি অর্থনীতি ও বুদ্ধিজীবিদের স্বভাব নিয়ে তীব্র খোঁচা-মারা এই লেখা পড়ে আপনি হাসবেন না কাঁদবেন ঠাওর করতে পারবেন না। একই সত্যের মধ্যে আমরা ঘুরপাক খাচ্ছি, মান্টো যা খুব ভালো করেই বুঝেছিলেন। বই শেষ হতে হতে আপনার চোখেও স্পষ্ট হয়ে যাবে বিশ্বরাজনীতির অনেক অন্ধকার দিক।

আঙ্কেল স্যামের নামে খোলা চিঠি : বইটি অনুবাদ করেছেন মওলবি আশরাফ। বাংলাদেশের একুশে বইমেলায় স্বদেশ শৈলীর স্টলে (১১০) বইটি পাওয়া যাবে।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post