• May 18, 2022

‘অ আ অন্নদাতার আন্দোলন’

 ‘অ আ অন্নদাতার আন্দোলন’

মনোজ কর

সম্প্রতি বইমেলায় প্রকাশিত হল সাম্প্রতিক কৃষক আন্দোলনের আধারে সমীর সাহা পোদ্দার রচিত ‘অ আ অন্নদাতার আন্দোলন’ । বইটির প্রকাশক বহুবচন প্রকাশনী।
বইটির সম্বন্ধে আলোচনার আগে আমাদের প্রজন্মের অর্থাৎ মোটামুটি পঞ্চাশের দশক থেকে এখন অবধি ভারতবর্ষের কৃষক আন্দোলনগুলির কথা একবার স্মরণ করে নেওয়া যেতে পারে। বর্তমান প্রজন্মের অনেক পাঠকই এই আন্দোলনগুলি দেখেননি বা যখন দেখেছেন তখন সেই আন্দোলনগুলিকে অনুধাবন করার মতো বয়স তাদের ছিল না। আমাদের পরের প্রজন্মের কাছে এগুলি ইতিহাসমাত্র।
তেভাগা আন্দোলন ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বরে শুরু হয়ে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত চলে। বর্গা বা ভাগচাষিরা এতে অংশ নেয়। মোট উৎপন্ন ফসলের তিন ভাগের দুইভাগ পাবে চাষি, এক ভাগ জমির মালিক, এই দাবি থেকেই তেভাগা আন্দোলনের সূত্রপাত। আগে বর্গাপ্রথায় জমির সমস্ত ফসল মালিকের গোলায় উঠত এবং ভূমিহীন কৃষক বা ভাগচাষির জন্য উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক বা আরও কম বরাদ্দ থাকত। যদিও ফসল ফলানোর জন্য বীজ ও শ্রম দু’টোই কৃষক দিত।
তেলেঙ্গানা আন্দোলনের সময়কাল ১৯৪৬ থেকে ১৯৫১। তেলেঙ্গানাতে প্রায় সমস্ত চাষের জমি ছিল সামন্তপ্রভুদের দখলে। এই অঞ্চলের কৃষকরা ছিলেন সামন্তপ্রভুদের ক্রীতদাসের মতো। পাঁচের দশকের গোড়ার দিক থেকেই কম্যুনিস্টদের নেতৃত্বে কৃষকরা সংগঠিত হতে থাকেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে খাদ্যসঙ্কট দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। সামন্তপ্রভুদের হাতে এক কৃষকের হত্যাকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলন জঙ্গী চেহারা নেয় ১৯৪৬-এর জুলাই মাসে। বিপ্লবীরা প্রতিষ্ঠা করেন প্রায় ৪০০০ গ্রামরাজ্যম বা কমিউন এবং ১৯৪৮ সালের মাঝামাঝি প্রায় সমস্ত তেলেঙ্গানা বিপ্লবীদের দখলে আসে। ১৯৫১ সালের শেষের দিকে নেহেরু সরকারের নির্দেশে আকস্মিক সামরিক হানায় পরাজিত হয় আন্দোলনকারীরা। তৎকালীন কম্যুনিস্ট পার্টির নির্দেশে অস্ত্র ত্যাগ করেন বিপ্লবীরা।
নকশালবাড়ি কৃষক আন্দোলনের শুরু উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি অঞ্চলের নকশালবাড়ি ব্লকে ১৯৬৭ সালে। আদিবাসী এবং কম্যুনিস্ট কৃষক নেতাদের নেতৃত্বে এই আন্দোলন তীব্রতা লাভ করে সি পি এম থেকে বেরিয়ে আসা সি পি আই (এম এল)-এর নেতৃত্বে ১৯৬৯ সালে। জোতদারদের হাত থেকে জমি দখল থেকে শুরু হয়ে এই আন্দোলন ক্রমশ বৃহত্তর রূপ নেয় ও চিন, ভিয়েতনাম এবং কিউবার মতো দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধের পথে চলতে থাকে। কিন্তু নানা কারণে এই আন্দোলন সফল হতে পারেনি।
এর পরে বিগত জুন ২০২০ থেকে শুরু হয়েছে পাঞ্জাব হরিয়ানার কৃষক আন্দোলন। সেই আন্দোলন এখনও শেষ হয়নি। ৫ই জুন ২০২০তে কেন্দ্রীয় সরকার কৃষকদের স্বার্থের পরিপন্থী এক অধ্যাদেশ জারি করে। সংসদের বাদল অধিবেশনে এই অধ্যাদেশ তিনটিকে বিল হিসেবে পেশ করে বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে পাশ করিয়ে নেওয়া হয়। রাজ্যসভায় অনৈতিকভাবে ধ্বনিভোটে প্রস্তাবটি গ্রহণ করিয়ে নেওয়া হয় এবং ২৭শে সেপ্টেম্বর এই বিল তিনটি আইন হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এরই প্রতিবাদে শুরু হয় ইদানিংকালের সর্ববৃহৎ কৃষক আন্দোলন।
এই আইন তিনটি এবং কেন এই আইনগুলি কৃষকস্বার্থবিরোধী তার ব্যাখ্যা থেকে শুরু করে আন্দোলনের প্রতিটি দিনের গতিপ্রকৃতির তথ্যনিষ্ঠ এবং বিশদ বিবরণ লিপিবদ্ধ করে এক অসাধ্যসাধন করেছেন সমীর ‘অ আ অন্নদাতার আন্দোলন’ বইটিতে । বিগত কৃষক আন্দোলনগুলি এবং এই আন্দোলন সম্বন্ধে অনেক রচনা, আলোচনা প্রকাশিত হয়েছে এবং হবে কিন্তু এমন বিস্তারিত তথ্যনিষ্ঠ দলিল এই প্রথমবার প্রকাশিত হল । ২০২০ সালের জুন থেকে ২০২১ এর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের বিস্তারিত এবং শ্রমসাধ্য দলিল রচনা করে আক্ষরিক অর্থেই ইতিহাস সৃষ্টি করলেন সমীর। সমীরের কঠোর পরিশ্রম, ঐকান্তিক অধ্যাবসায় এবং আন্তরিক প্রচেষ্টার ফসল এই বইটি বিভিন্ন কারণে ব্যতিক্রমী।
মানবাধিকারকর্মী সমীর এই দলিল গ্রন্থন করে কেবলমাত্র গণআন্দোলনের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতার পরিচয় দেননি, এই প্রজন্ম এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গণআন্দোলনকর্মী ও গবেষকদের হাতে ৩৫০ পাতাব্যাপী এক অমূল্য তথ্যভান্ডার তুলে দিলেন। এই বই পড়া হয়ে গেলে ধারে সরিয়ে রাখা যাবে না, অন্য কাউকে পড়তে দেবার ঝুঁকি নেওয়া যাবে না, সযত্নে বই-এর আলমারিতে রেখে দিতে হবে আর মাঝে মাঝেই খুলে দেখে নিতে হবে এই আন্দোলন সংক্রান্ত নানা জিজ্ঞাসার উত্তর যা আন্তর্জালে খুঁজে পাওয়া যাবে না। কালের নিয়মে আমরা চলে যাব, বইটি রয়ে যাবে আলমারিতে পরবর্তী প্রজন্মগুলির তৃষ্ণা নিবারণের জন্য।
এই বইটির অমূল্য সম্পদ সমীরের বস্তুনিষ্ঠতা। সমীর রাজনীতিসচেতন সুতরাং নিরপেক্ষ নন। আমরা কেউই নিরপেক্ষ নই। নিজস্ব রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে অননুকরণীয় ভঙ্গিতে এই আন্দোলনের ব্যাখ্যা এবং মূল্যায়ন যুক্ত করে বইটিকে বিতর্কিত এবং জনপ্রিয় করে তোলার এক সুবর্ণ সুযোগ ছিল সমীরের সামনে। সমীরের মতো লেখকেরাই পারেন সেই লোভ সংবরণ করে নির্ভেজাল বস্তুনিষ্ঠতার পথে হাঁটতে। সচেতন ভাবেই নিজস্ব চিন্তার খাদ মিশিয়ে খাঁটি সোনাকে সুদৃশ্য গয়নায় পরিণত করতে চাননি সমীর। করলে হয়ত সাময়িক জনপ্রিয়তা কিছুটা বাড়তে পারত কিন্তু কালজয়ী হওয়ার গৌরব নাগালের বাইরে থেকে যেত।
বস্তুনিষ্ঠ তথ্য একান্তভাবেই সত্য এবং সব সমালোচনার ঊর্ধ্বে ভালমন্দের বিচার এক্ষেত্রে অবান্তর। যে উত্তাল সময়ে শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের একটা বিরাট অংশ নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইতে দায়বদ্ধতা দূরে সরিয়ে মিটিং, মিছিল, মঞ্চ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন পাদপ্রদীপের আলোয় আসার জন্য, সেই সময়ে যিনি নিভৃতে বসে অপরিসীম পরিশ্রমে আর পরম একাগ্রতায় নির্মাণ করেছেন এই দলিল তাকে কুর্নিশ জানাতেই হয়। দীর্ঘ উল্লেখপঞ্জী থেকে তাঁর এই পরিশ্রমের একটা আন্দাজ আমরা পেতে পারি।
সুজাত ভদ্রের মুখবন্ধটি এই বই-এর একটি মূল্যবান সংযোজন।
পরিশেষে সন্দীপ সাহার ফটোস্টোরিগুলির কথা না বললে এই বই সম্বন্ধে আলোচনা অপূর্ণ থেকে যাবে। বলা বাহুল্য এই ফটোস্টরিগুলি এই বইটির অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। সংকল্প , সংঘর্ষ এবং সেবার মন্ত্রে চালিত এই আন্দোলনের বর্ণময় চরিত্রের বিভিন্ন দিক মূর্ত হয়ে উঠেছে এই ছবিগুলিতে। এই আন্দোলন যে কেবলমাত্র কৃষকদের সমস্যার বিরুদ্ধে নয়, এই আন্দোলন সমগ্র দেশবাসীর খাদ্য সুরক্ষার সাংবিধানিক অধিকারকে রক্ষা করার আন্দোলন সেই সত্য বাঙময় হয়ে উঠেছে এই ছবিগুলিতে।
আন্দোলন চলছে। আমরা জানি বিগত ১৯শে নভেম্বর আন্দোলনের চাপে কেন্দ্রীয় সরকার কৃষি আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু আন্দোলন এখনও শেষ হয়নি। এই আন্দোলন যতদিন চলবে ততদিন চলবে সমীরের কলম। ব্যস্ত হয়ে থাকবে এই আন্দোলনের ঘটমান বর্তমানের নিপুণ চিত্রণে। দ্বিতীয় এবং তার পরবর্তী খন্ডগুলির অপেক্ষায় আছি আমরা সবাই।

অ আ
অন্নদাতার আন্দোলন
(প্রথম খন্ড ২০২০ – ২০২১)

সমীর সাহা পোদ্দার

ফটো স্টোরি – সন্দীপ সাহা

প্রচ্ছদ শিল্পী –সোহম চক্রবর্ত্তী

বহুবচন প্রকাশনী

মূল্য – ৩৬৫ টাকা

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post