• May 29, 2022

চীন-পাকিস্তান সংযোগকারী ঐতিহাসিক সেতুর সলিল সমাধি বনাম জলবায়ু পরিবর্তন

 চীন-পাকিস্তান সংযোগকারী ঐতিহাসিক সেতুর সলিল সমাধি বনাম জলবায়ু পরিবর্তন

সন্তোষ সেন

গত ৭ই মে, ২০২২ চীন-পাকিস্তান সংযোগকারী একটি ঐতিহাসিক ব্রিজ সম্পূর্ণভাবে ভেঙ্গে পড়ল, তলিয়ে গেল জলের তলায়। পাকিস্তানের কারাকোরাম হাইওয়ের সন্নিকটে চীনের সাথে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক এই ব্রীজটির নাম ‘হাসানাবাদ সেতু’। ব্রীজটির ভেঙ্গে পড়ার কারণ সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে তা হলো– এপ্রিল মাস জুড়ে পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাপমাত্রা ছিল ৪০ থেকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ওখানকার গড় স্বাভাবিক তাপমাত্রার থেকে আট থেকে দশ ডিগ্রি বেশি। অত্যধিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং তাপপ্রবাহের কারণে একটি বিশাল আকারের বরফের পাহাড় (Shisper glacier) সম্পূর্ণরূপে গলে যায়, যার ফলে নদীতে প্রবল জলস্ফীতি ভাসিয়ে নিয়ে গেল এই ব্রীজকে।
বাজারী সংবাদপত্রে এইসব হাড়হিম করা খবর আমরা দেখতে পাব না তা নিশ্চিত। কিন্তু বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্রীজটির ধ্বংসসাধনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে প্রচুর মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে তাদের উদ্বেগ উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলো থেকে জানা যাচ্ছে – প্রবল জলস্রোতের কারণে সেতুর সাথে সাথে দুটি জল-বিদ্যুৎ কেন্দ্র, প্রচুর বাড়ি, আবাসন, প্রশাসনিক ভবনও জলের তলায় তলিয়ে গেছে।

আসলে এসবই মনুষ্যসৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ-ঘনঘটা, বলা ভালো প্রকৃতির মধুর প্রতিশোধ। বিগত কয়েক দশক ধরে নির্বিচারে অরণ্য ধ্বংস, সবুজ বনানী নিধন এবং জীবাশ্ম জ্বালানির অপরিমিত ব্যবহারের কারণে ভূউষ্ণায়ন, তীব্র তাপপ্রবাহ এবং এসবের হাত ধরে অস্বাভাবিকহারে মেরু বরফের গলন বেড়েই চলেছে। তথাকথিত ছিন্নমস্তা উন্নয়ন, নগরায়ন এবং সভ্যতার (!) রথের চাকাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যেভাবে প্রকৃতির নিষ্পেষণ, অত্যাচার ও লুঠ বেড়েই চলছে, তারই বদলা নিচ্ছে এবার প্রকৃতি-মা।

পাকিস্তানের জলবায়ু দপ্তরের মন্ত্রী এপ্রিল মাসে রয়টার্স সংবাদ সংস্থাকে জানিয়েছিলেন– “আমাদের দেশে বসন্ত উধাও, শীতকালের পরপরই শুরু হয়ে যাচ্ছে গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহ। মন্ত্রীমশায়, আপনার বক্তব্য ভারতবর্ষের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। তিনদিকে সমুদ্র ও উত্তরে হিমালয় বেষ্টিত ছয় ঋতুর ভারতবর্ষে এখন শুধুই গ্রীষ্ম আর বর্ষা (— পালই ভরসা), মাঝে কয়েকদিনের হালকা শীত। এই বছরের এপ্রিল মাসে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বীরভূম, বর্ধমানের অনেক অঞ্চলে তাপমান ছিল ৪০ থেকে ৪৪ ডিগ্রি (স্বাভাবিকের থেকে ৪-৬ ডিগ্রি বেশি) এবং ভারতবর্ষের বেশ কিছু অঞ্চলে তা ছিল ৫০ ডিগ্রি ছুঁই ছুঁই। তার আগে ডিসেম্বর, ২০২১ ও জানুয়ারি, ২০২২’এ অসময়ে প্রবল বৃষ্টিপাত, প্লাবন একরের পর একর কৃষি জমিকে ভাসিয়ে দিলে কৃষিপণ্যের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, চাষীরা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন বারেবারে।

তীব্র তাপপ্রবাহ, অত্যধিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দাবানল, কখনও বা অসময়ে অতিবৃষ্টি, বন্যা, প্লাবন– এসবই নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা লক্ষ্য করা যাচ্ছে বিশ্বের নানান প্রান্তে একই সাথে একই সময়ে। বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদরা বারবার হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন– জলবায়ুর এইসব অস্বাভাবিক পরিবর্তন আগামী দিনে আরও দ্রুত ও ঘন ঘন হবে। এতকিছু দেখে শুনেও আমাদের হুঁশ কি ফিরবে না, মানব সভ্যতা ধ্বংসের শেষ দিন পর্যন্ত আমরা কি ঘুমিয়েই থাকব? নিজেদের ও আমাদের অতি আদরের সন্তান-সন্ততি, নাতিপুতিদের এই গ্রহে টিকিয়ে রাখতে হলে পরিবেশ মেরামতির দাবিতে এখনই ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত হওয়া ভীষণ জরুরী হয়ে পড়েছে। নাহলে অদূর ভবিষ্যতে আর ভাবার সময়ও পাওয়া যাবে না, আমরা নিশ্চিতরূপে পৌঁছে যাব ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’ এর দেশে। আগুন লেগেছে পড়শির ঘরে, আমাদের বাড়িতে আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ার আগেই জল নিয়ে তৈরি থাকাটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

  •  
  •  
  •  
  •  

1 Comments

  • প্রকৃতির ধ্বংস হচ্ছে, আর পৃথিবীর জন্য যে একটা অভিশপ্ত সময় আসতে যাচ্ছে,, সেটা প্রকৃতি আমাদেরকে বারবার ইঙ্গিত দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু আমরা শুধুমাত্র উন্নতি দেখি নিজেদের জীবনের জন্য কিন্তু আমরা একটাবারের জন্য পরবর্তী প্রজন্মের কথা ভাবি না। পাকিস্তান এবং ভারতে যে বিষয়টা উল্লেখিত করেছেন যে বসন্তকাল নেই বললেই চলে এটা সত্যি সত্য কথা। আমরা বাঙলাদেশীরা এটা লক্ষ্য করে দেখছি কি-না জানি না কিন্তু আমি লক্ষ্য করে দেখছি,, যে বসন্তকালের প্রথম মাস ফাল্গুন সেই ফাল্গুন মাসে আমি শীতের অভিজ্ঞতা পেয়েছি আর আর চৈত্র শুরু হলে যেন মনে হয় গ্রীষ্মকাল শুরু। আর বর্তমান সময়ে এবং আজকের ঘটনা আমি বলি আজকে সকাল থেকে বৃষ্টি ছিল আমি গাইবান্ধায় থাকি। সেই গাইবান্ধায় সকালে ঝড় হলো এবং এরপরেই বৃষ্টি শুরু হলো। এখন ঝড়টা সবাই হয়তো বলবে যে এটা অতীত থেকেই আছে কারণ এটাকে কালবৈশাখী ঝড় বলে কিন্তু কালবৈশাখী ঝড় থাকলেও হয়তোবা তার থেকেও ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি হচ্ছে। আমার গবেষণা এবং আমার জ্ঞান আমাকে এটাই বলে,, যে আমরা জলবায়ু জন্য সঠিক সমাধানের যদি না আসি তাহলে এরকম এক বছরে ১৫ থেকে ১৬টাকে ঝড় হতে থাকবে, ধন্যবাদ আপনাকে আমি আমার স্বল্প জ্ঞানে যা উপলব্ধি করতে পেরেছি একজন জলবায়ু কর্মী হিসেবে সেটুকুই তুলে ধরলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post