• December 8, 2022

হুমায়ূন আহমেদ: যার কলমে হেসে উঠতো গদ্য

 হুমায়ূন আহমেদ: যার কলমে হেসে উঠতো গদ্য

ড. শিবলী চৌধুরী

আজ নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের দশম মৃত্যুবার্ষিকী। কেনো যেনো তাঁকে নিয়ে দুটো কথা লিখতে ইচ্ছে হলো এখানে! কারণ হয়তো এর সাথে আমাদের নব্বুইয়ের দশকের কিছু স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম কিংবা দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। ভারতীয় লেখকদের উপন্যাস পড়তাম। সমরেশ মজুমদারের বই-ই বেশি পড়েছিলাম মনে পড়ে। সুনীল, শীর্ষেন্দু, বুদ্ধদেব গুহ, বুদ্ধদেব বসুও বাদ যায়নি। আর মনে পড়ে স্টেশন প্রিন্ট নামে কিছু বই খুবই কম দামে পাওয়া যেত রেলওয়ে স্টেশনের বুকস্টলগুলোতে, এই দশ থেকে তিরিশ টাকার মধ্যে। মনে উঁকি দিচ্ছে বিমল মিত্রের ‘সাহেব বিবি গোলাম’, বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ বা ‘কপালকুণ্ডলা’, আর শরৎ চন্দ্রের (কোনটা ছেড়ে কোনটা বলবো) বইগুলো নামমাত্র মূল্যে কিনে পড়তাম। সোনালী সেই সময়ে পড়া আরও দুটি বইয়ের কথা মনে পড়লো। ভারতীয় লেখিকা মৈত্রেয়ী দেবীর ‘ন হন্যতে’ বইটা পড়েছিলাম একাদশ কিংবা দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময়। লেখিকার fiancee বিদেশি ইঞ্জিনিয়ার মির্চা এলিয়াদের লেখা ‘লা নুই বেঙলি’ বইটির কথাও কেনো যেন আজ হঠাৎই মানসপটে ভেসে উঠলো। সম্ভবত মির্চা এলিয়াদই প্রথম তাঁদের প্রেম কাহিনী নিয়ে বইটি লিখেন তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে। আর এরই প্রত্যুত্তরে মৈত্রেয়ী দেবী লিখেছিলেন ‘ন হন্যতে’। এই তথ্যে কিছুটা ভুলও থাকতে পারে। সেই কবেকার কথা! এতোদিনে কাহিনী বা প্রেক্ষাপটের অনেক কিছুই ভুলে গিয়েছি বলা চলে। কিন্তু ভালোলাগার পরশটুকু এখনো ঠিক তেমনই রয়ে গেছে ভেতরে! ‘ন হন্যতে’ উপন্যাসটি পড়ে জেনেছিলাম রবি ঠাকুরের বাসায় মৈত্রেয়ী দেবীর যাতায়াত ছিলো। মৈত্রেয়ী যেমন রবি ঠাকুরকে ভীষণ পছন্দ করতেন তেমনি রবিরও অপার স্নেহের ছায়ায় ছিলেন তিনি। মির্চা রবিকে ভীষণ ঈর্ষা করতেন এ কারণে। মৈত্রেয়ীর বইটিতে এসবের কী অনুপুঙ্খ বর্ণনাই না ছিলো! আর দেশি বই বলতে ইমদাদুল হক মিলনের দুএকটা প্রেমের উপন্যাস পড়েছিলাম হয়তো। ও হ্যাঁ, রোমানা আফাজের ‘দস্যু বনহুর’ও কিন্তু কিছুদিনের জন্য আমার মনটাকে চুরি করে নিয়েছিলো। তবে কাজী আনোয়ার হোসেনের ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের কথা আলাদা করে না বললেই নয়। একটা পড়া শেষ হলেই পরেরটা প্রকাশের অপেক্ষায় থাকতাম। ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের বইগুলো অবশ্য আমরা বন্ধুদের কাছে থেকে ধার নিয়েও পড়েছি বা তাদেরকে ধারও দিয়েছি। টগবগে তরুণ সেই বয়সে এ সিরিজের বইগুলো পড়তে পড়তে নিজেকে মাসুদ রানার জায়গাতেই কল্পনা করতাম, মনে মনে তার নায়িকা সোহানারও প্রেমে পড়েছি। ‘মাসুদ রানা’র কারণেই কীনা আশি-নব্বইয়ের দশকে স্টেশনের বুকশপগুলোর ব্যবসা ছিলো রমরমা। এখনো কোনো কোনো স্টেশনে হয়তো বুকস্টল আছে, যদিও তাতে আর বুক বা বই বিক্রি হতে দেখা যায় না। এখন সেখানে শুধু পেপার-পত্রিকাই বিক্রি হয়। যাহোক, ‘মাসুদ রানা’ও কিন্তু সব বয়সী পাঠকের মন জয় করতে পারেনি, শুধুই তরুণরাই পড়ত। অতঃপর তিনি আসলেন। আর আমার অভ্যাসেরও পরিবর্তন হলো। আমার আগ্রহের জায়গা থেকে একে একে ভারতীয় উপন্যাসিকেরা হারিয়ে যেতে যেতেই সেখানে প্রবলভাবে জায়গা করে নিলেন হুমায়ূন আহমেদ। ‘মাসুদ রানা’র প্রতি আসক্তিও কমে এলো। তাঁর সাদামাটা ভাষার এক অসাধারণ সম্মোহনী শক্তি ছিলো। একেবারেই সাধারণ বিষয়ও তাঁর নিরাভরণ বর্ণনায় অসাধারণ হয়ে উঠতো। সহজ সরল শব্দের মায়াবী বুননের কারণে তার উপন্যাস পাঠকের চিত্তকে সহজেই এক অপার্থিব ভালোলাগার আবেশে আচ্ছন্ন করে রাখতো। আর তাই তার উপন্যাস একবার পড়া শুরু করলে শেষ না করে উঠার উপায় ছিলো না। যতোবারই তাঁর উপন্যাস পড়েছি ততোবারই একটা অদ্ভুত প্রশান্তির পরশ নিয়ে ফিরে এসেছি। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসে গভীর জীবন দর্শন নেই এমনটি আঁতেলদের কেউ কেউ বললেও চুপিসারেই তাঁর উপন্যাস পড়ে মজা লুটতে দেখা গেছে এদের অনেককেই। আর আজ এই অনলাইনের যুগে যখন তরুণ-তরুণীরা বই পড়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তখন তাদের জন্য হুমায়ূন আহমেদের মতো চটুল লেখাই অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। তাদের কি আর সময় আছে তথাকথিত গভীর দর্শনের মোটা মোটা উপন্যাস পড়ার, আছে কি তাদের ধৈর্য তেমন স্বাস্থ্যবান বই একটু একটু (চুরুৎ চুরুৎ) করে পড়ে শেষ করার। না নেই।
এই মহান লেখকের মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি তাঁকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post