• September 27, 2022

যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদের ভিত্তি

 যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদের ভিত্তি

শতদ্র

গণতন্ত্র হলো রাষ্ট্রীয় সকল ব্যবস্থায় সাধারন মানুষের সর্বাধিকার । রাষ্ট্রপ্রধান হলো দেশের সাধারণ জনগণের দ্বারা নির্বাচিত জনসাধারণের প্রতিনিধি যে জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কার্যকলাপ সম্পাদন ও জনকল্যাণে কাজ করতে বাধ্য । কিন্তু সমস্যার উদ্ভব হয় তখনই যখন রাষ্ট্রপ্রধান, রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষমতার একক অধিকারী হয়ে ওঠে এবং রাষ্ট্রীয় কাজে তখন তারই ইচ্ছে হয়ে ওঠে জনগণের ইচ্ছে এবং এর জন্য দায়ী রাষ্ট্র, রাজনীতি ও গণতন্ত্রের সম্বন্ধে জনগণের অজ্ঞতা । মানুষকে খুব সহজেই উগ্র জাতীয়তাবাদের তারা ভুলিয়ে রেখে ক্ষমতাধারী রাজনীতিবিদ ও পুঁজিবাদীরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বিভিন্ন জনবিরোধী সাম্রাজ্যবাদী কার্যকলাপে লিপ্ত হয় যাতে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারন মানুষই ।
24 শে ফেব্রুয়ারি, 2022, রাশিয়া, ইউক্রেনের সেপারেটিস্ট অঞ্চলের মাধ্যমে সৈন্যসমাবেশ, ইউক্রেনের উপর যুদ্ধ ঘোষণা এবং আক্রমণ করে “শান্তি রক্ষার” নামে । পুতিন মনে করে‌ ইউক্রেন রুশ জাতীয়তাবাদের অংশ অথচ শুধুমাত্র ইউক্রেনের সেপারেটিস্ট অঞ্চলগুলির মানুষেরা রূশ জাতীয়তাবাদের পক্ষে । এদিকে ইউক্রেইন তেল ও গ্যাস সংরক্ষণের যথাক্রমে তেইশতম ও ৫১ তম। অন্যদিকে পুতিনের উপর রয়েছে রুশ পুঁজিবাদীদের (রুশ অলিগর্গস্) চাপ । রাশিয়ার গণমাধ্যমে জনগণের সামনে ইউক্রেনকে একটি আগ্রাসী দেশ হিসেবে দেখানো হয় এবং কোনো রুশ নাগরিক যদি কোনো পুতিনবিরোধী কার্যকলাপ এমনকি কোনো মন্তব্য করলেও তাকে পুতিন কঠোরভাবে দমন করে এবং এক্ষেত্রে বাদ যায় বাদ যায়না পুঁজিপতিরাও ।পুঁজিপতিদের চাপ, ইউক্রেনের তেল ও গ্যাস রিজার্ভ, জনগণকে গণমাধ্যমের দ্বারা জাতীয়তাবাদের দ্বারা প্রভাবিত করা এবং পুতিনবিরোধী কোন কার্যকলাপের বিরুদ্ধে পুতিনের কঠোর প্রতিক্রিয়া এবং ইউক্রেনের উপর আগ্রাসন প্রভৃতি একটি একনায়কের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের চিত্র তুলে ধরে ।


কিন্তু এই পুরো ঘটনায় শুধু রাশিয়াই কি সমস্ত নষ্টের গোড়া নাকি এখানে কাজ করছে আরো কোনো শক্তি ? 1949 সালে গঠিত হয় NATO যার সদস্য হলো আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলো । NATO হলো একটি পশ্চিমী প্রতিরক্ষা জোট এবং এর বিপরীতে ছিল পূর্ব ইউরোপের সোভিয়েত ইউনিয়ন । সোভিয়েত ইউনিয়নের দেশগুলোকে নিয়েছে যে প্রতিরক্ষা জোট তৈরি হয়েছিল তার নাম ছিল ওয়ারস প্যাক্ট । 1991 সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে সোভিয়েত ইউনিয়নের থেকে স্বাধীন হওয়ার দেশগুলো একে একে NATO তে যোগদান করতে থাকে, শুধুমাত্র বাকি ছিল ইউক্রেন, বেলারুশ, জর্জিয়া ও রাশিয়া এবং আমরা যদি রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক অবস্থা যাচাই করি তাহলে রাশিয়ার উত্তরে রয়েছে তিনটি দেশ লিথুনিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়া যারা NATO এর সদস্য, পূর্বে রয়েছে জাপান ও সাউথ কোরিয়া যারা NATO এর যৌথ রাজনৈতিক মিত্র ও সদস্য এবং রাশিয়ার দক্ষিণে তুরস্ক NATO এর সদস্য । এবার যদি ইউক্রেন NATO তে যোগ দেয় তাহলে NATO, রাশিয়াকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলবে । এবার নেটো কি রাশিয়াতে আক্রমণ করবে যে রাশিয়া NATO এর বিস্তার রুখতে এত উদ্ধত ? এই ব্যাপারটি বুঝতে হলে আমাদের জানতে হবে এক ধরনের সম্পদের ব্যাপারে যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় “প্রতিরোধের সম্পদ” । বিভিন্ন দেশ পারমাণবিক বোমা কেন রাখে ? এগুলো নিশ্চয়ই আইফোন বা কেএফসি নয় যে দেখানোর জন্য বসিয়ে রেখেছে, এই পারমাণবিক অস্ত্র গুলো সেই দেশগুলির “প্রতিরোধের সম্পদ” যার জন্য দেশগুলি কোনরকম ভয় বা হুমকি ছাড়া থাকতে পারে আর ইউক্রেনের কাছে একসময় 5000 পারমাণবিক অস্ত্র ছিল কিন্তু ইউক্রেন সেই পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করে আর এখন ইউক্রেন এর উপর রাশিয়া আক্রমণ করে বসেছে । এই প্রতিরোধের সম্পদ খুব জরুরী । রাশিয়া চায় NATO এর দেশ গুলির সঙ্গে রাশিয়ার প্রতিরোধের সম্পদ হিসেবে একটি ইউক্রেনের দূরত্ব বজায় থাকুক এবং রাশিয়ার এই চাওয়া ভুল নয় এবং আমেরিকা যে এই চাওয়াকে ভুল বলে দাবি করছে সেই আমেরিকা নিজেও এই কাজটি করে থাকে। আমেরিকার একটি বিদেশি রয়েছে যাকে বলা হয় “মনরো ডকট্রিন”। এই নীতি অনুযায়ী পশ্চিম গোলার্ধে অর্থাৎ আমেরিকা মহাদেশে, মহাদেশের বাইরের কোনো শক্তি কোনো ধরনের সামরিক বাহিনী মোতায়েন বা কোনো ধরনের সামরিক জোট তৈরি করতে পারবে না, যদি করে তাহলে তারা এটা যুদ্ধের সংকেত হিসেবে দেখবে, যার জন্য 1962 সালে কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস ঘটে। এই নীতি অনুযায়ী আমেরিকাও ইউরোপের কোন ব্যাপারে নাক গলাবে না, যে নীতি আমেরিকান লংঘন করেছে বারবার । যেমন 1962 সালে কিউবার মিসাইল সংকট এর সময় আমেরিকার রাশিয়াকে তাক করে তুরস্কে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ে পোল্যান্ড, লাটভিয়া এস্তোনিয়াতে মার্কিন সৈন্য সমাবেশ । রাশিয়ার যদি পুনরায় সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন করারই হত, তাহলে সে 1998 থেকে 2008, যে সময়কালে ইউক্রেন এবং জর্জিয়া নেটো যোগদানে উৎসাহী ছিল না, সেসময় রাশিয়া কোন কারণ দেখিয়ে এসব দেশে আক্রমণ করতে পারতো কিন্তু সেই সময় রাশিয়া তা করেনি । রাশিয়া বিভিন্নভাবে ন্যাটোর সদস্য দের বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে ইউক্রেনকে একটি নিরপেক্ষ দেশ হিসেবে থাকতে দেওয়া হোক, কিন্তু নেটো তা প্রত্যাখ্যান করেছে কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কিছু ন্যাটোর সদস্য ইউক্রেনীয় জনগণকে ক্রমাগত একটি আদর্শ পুঁজিপতি ইউটোপিয়া এর মিথ্যে স্বপ্ন দেখিয়ে‌ ইউক্রেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং নেটোতে যোগদান করানোর জন্য প্রভাবিত করেছে, যাতে আমেরিকার সিদ্ধ হবে তিনটি স্বার্থ । প্রথমত, ইউক্রেন নেটো তে যোগদান করতে গেলে রাশিয়া বাধা দেবে কারণ এতে তাদের প্রতিরোধের সম্পদে কুপ্রভাব পড়বে ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইউক্রেনের জনগণকে সহানুভূতি দেখিয়ে রাশিয়াকে দুর্বল করার জন্য রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করার একটি সূত্র পাওয়া যাবে । দ্বিতীয়ত, ইউক্রেন দখলে রাশিয়ার প্রচুর অর্থ ব্যায় হবে যাতে রাশিয়ার অর্থনীতি আরো দুর্বল হবে। তৃতীয়ত, বিশ্ব রাজনীতিতে রাশিয়ার নাম বদনাম হবে যাতে বেশিরভাগ উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো নেটোর দিকে ঝুঁকবে, ফলে আরও কিছু দেশের উপর আমেরিকাসহ পুঁজিবাদী দেশগুলোর প্রভাব বাড়বে এবং রাশিয়া কিছুটা হলেও যেহেতু আমেরিকার পরাশক্তিকে প্রশমিত করে সুতরাং রাশিয়া যত দুর্বল হবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিতে ততবেশি একক পরাশক্তির অধিকারী হতে পারবে। তাই নেটো দেশগুলি প্রথমে ইউক্রেনের জনগণকে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদের গল্প শুনিয়ে রুশ বিরোধী করে তুলেছে এবং একটি আদর্শ পুঁজিবাদের মিথ্যে স্বপ্ন দেখিয়ে NATO এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদান করতে প্রভাবিত করেছে যাতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে একটি যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এবং সেখানে ইউরোপ ও আমেরিকা সামরিক ও বিভিন্ন সহযোগিতা দিয়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি ধরে রাখার চেষ্টা করেছে এবং নিজেরা যুদ্ধে যাবে না যাতে নিজেদের দেশের অর্থনীতি নষ্ট না হয় । একটি যুদ্ধ পরিস্থিতি ধরে রাখা নিয়ে মার্কিন অস্ত্র ও তেল উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক প্রাইভেট কোম্পানিগুলি কোটি কোটি অর্থ লাভ করবে এবং পুঁজিবাদের এই নোংরা খেলায় ইউক্রেন পুরো জ্বলে যাবে । রাশিয়া যেটা করেছে ঠিক করেনি কারণ অনেক মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে, অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু সবাই যদি নিজেদের স্বার্থ না দেখে কিছুটা মানবতার দিক থেকে যদি দেখতো, আমেরিকা যদি NATO এক্সপানশন বন্ধ করত তাহলে হয়তো কিছুই হতো না । পুরো ঘটনার থেকে একটা প্রশ্ন উঠে আসে যে এটা কি আদৌ রুশ আগ্রাসন নাকি মার্কিন আগ্রাসন ? আর এই সংঘাতে না আমেরিকার কিছু এসে গেছে না NATO এর, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শুধু রাশিয়া ও ইউক্রেইনের সাধারণ জনগনই ।

শতদ্রু,ছাত্র ,বিশ্বভারতী

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post