• May 29, 2022

দেশে শ্রমশক্তির আকার

 দেশে শ্রমশক্তির আকার

হাসান আজারকার :- ৪৫ বিলিয়ন ডলার ফরেক্স রিজার্ভ এবং সেখান থেকে শ্রীলংকারে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার লোন দেয়ার আলাপটা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে অশ্লীল আলাপ।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা ৩ কোটি। প্রতিষ্ঠানটি আভাস দিয়েছে, কয়েক বছরে তা দ্বিগুণ হয়ে ৬ কোটিতে দাঁড়াবে, যা মোট জনসংখ্যার ৩৯ দশমিক ৪০ শতাংশ হবে।

২০১৬-১৭ সালের জরিপ অনুযায়ী দেশে শ্রমশক্তির আকার ৬ কোটি ৩৫ লাখ মানুষ

• কাজের মধ্যে ছিলেন ৬ কোটি ৮ লাখ

• করোনার আগে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ (সরকারি জরিপের এই ২৭ লাখ সংখ্যাটি অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ, আসল সংখ্যা এরচেয়েও কয়েকগুণ বেশি)

• গতবছর এপ্রিল-জুলাই সময়েই বেকারত্ব ১০ গুণ বেড়েছে: বিবিএস

• তরুণদের মধ্যে ২৫% বেকার: আইএলও

• গতবছর ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে’র মধ্যে সাধারণ ছুটির সময় বাংলাদেশের ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছে: বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি

• করোনায় ২ কোটি ৪৫ লাখ লোক নতুন করে গরীব হয়েছে, দারিদ্র‍্যসীমার নীচে নেমে গেছে: পিপিআরসি-বিআইজিডি জরিপ

সর্বশেষ ২০১৭ সালে প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ বলতেসে, বাংলাদেশে যত লোক চাকরি বা কাজ করেন, তাঁদের মধ্যে ৬০.৯ শতাংশের কর্মসংস্থান হইসে আত্মনিয়োজিত বা ব্যক্তিগত অংশীদারত্ব অথবা ব্যবসা-বাণিজ্য উদ্যোগের ভিত্তিতে। গৃহস্থালি পর্যায়ে কাজ করেন ২০. ৮ শতাংশ এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন ১৩.৬ শতাংশ। সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত কিংবা স্থানীয় সরকার পর্যায়ে কাজ করে মাত্র ৩.৬ শতাংশ। আর এনজিওতে আছেন ০.৬ শতাংশ।

অর্থাৎ, বাংলাদেশের মোট কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৬০.৯ শতাংশের কর্মের উৎস হইলো আত্মকর্মসংস্থান৷ এই আত্মকর্মসংস্থানের বলতে কনসাল্টেন্সি, অনলাইন মার্কেটিং, ফ্রীল্যান্সির, খামার, ব্যবসা ইত্যাদি বুঝায়। ইন্ডাস্ট্রি বেসড কোনো লেবার ফোর্স এইদেশে সেভাবে তৈরি হয় নাই। যতটুকু আছে গার্মেন্টস, লেদার ও জুট ইন্ডাস্ট্রিতে সেটা নগণ্য।

এই কারণেই ২০১৭ সালের সরকারি হিসাবমতে দেশে বেকারসংখ্যা এত কম, মাত্র ২৭ লাখ। বেকারত্ব নির্ণয়ের সংজ্ঞাটি বেশ ত্রুটিপূর্ণ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী, কাজপ্রত্যাশী হওয়া সত্ত্বেও সপ্তাহে এক দিন এক ঘণ্টা মজুরির বিনিময়ে কাজের সুযোগ না পেলে ওই ব্যক্তিকে বেকার হিসাবে ধরা হবে। সাধারণত জরিপ করার সময়ের আগের সপ্তাহের যেকোনো সময়ে এক ঘণ্টা কাজ করলেই তাকে বেকার বলা যাবে না। আইএলও’র এই সংজ্ঞাটি উন্নত বিশ্বের জন্য যতটা প্রযোজ্য ঠিক ততটাই সমস্যাজনক তৃতীয় বিশ্বের যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য। অর্থনৈতিক স্ট্যাবিলিটি, সোশ্যাল সিকিউরিটি ও গ্রস ইনকামের ক্ষেত্রে একজন উন্নত বিশ্বের নাগরিক যে সুযোগ-সুবিধা রাষ্ট্রের কাছ থেকে পেয়ে থাকে, তৃতীয় বিশ্বের একজন নাগরিক ঠিক ততটাই সেসব সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়৷ তৃতীয় বিশ্বের নাগরিকের শ্রম শোষণ করেই উন্নত রাষ্ট্র তার নাগরিককে দেখভাল করে৷ জীবনধারণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নূন্যতম আয় না করেও বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রে জন্ম নেয়া মানুষটিকে কর্মে নিয়োজিত হিসেবে ধরে নেয়া হয় এবং এর মধ্যে ৮৫ শতাংশই আনঅফিসিয়াল খাতে নিয়োজিত৷ আনঅফিসিয়াল খাত বলতে যেখানে নির্দিষ্ট বেতন ও ভাতা নির্ধারণের কোনো সুযোগই নাই। যেখানে উন্নত বিশ্বে ঘন্টা ভিত্তিতে অফিসিয়ালি মজুরি নির্ধারিত হয়।

অবশ্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বাংলাদেশের জন্য একটি মানদণ্ড মাঝেমধ্যে অনুসরণ করে। সেটা হলো, যাঁরা সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা কাজের সুযোগ পান না, তাঁদের ছদ্ম বেকার বলা হয়। গিগ ইকোনমির কন্ট্রিবিউটর অর্থাৎ টিউশন, রাইড শেয়ারিং, ডেলিভারি করে যারা জীবিকা নির্বাহ করে তাদেরকেই মূলত ছদ্মবেকার হিসেবে ধরা হয়। বিবিএসের হিসাবমতে দেশে এমন মানুষ প্রায় ৬৬ লাখ। এই ৬৬ লাখ মানুষও এখন করোনাকালীন সময়ে বিপাকে।

বর্তমান ব্যবস্থায় দেশে কর্মসংস্থান বাড়ানোর একমাত্র উপায় হলো নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে অর্থ বরাদ্দ করা। অর্থ আমলাদের প্রস্তাবিত নতুন বাজেট বাংলাদেশের জিডিপির মাত্র ১৭.৪৬% হবে যা এই অঞ্চলের দেশ ভারতের ২৬.৯%, পাকিস্তানের ২২% এবং নেপালে ৩১% এর তুলনায় সবচেয়ে কম। ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও আমেরিকার বাজেটের ব্যয় জিডিপির প্রায় ৬০%। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা ছাড়ার আগে ৪.৮ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজেট রেখে গিয়েছিলো যার প্রায় ৬০% বরাদ্দ করা হয়েছিলো সামাজিক সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে ব্যয়ের উদ্দেশ্যে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের গবেষণা হতে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উচ্চতর বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাজেট বাস্তবায়ন ক্ষমতা ব্যয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরে সরকার প্রথম ১০ মাসে বার্ষিক বরাদ্দকৃত বাজেটের মাত্র ৪২ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে যা গত বছরের তুলনায় কম।

ফরেক্স রিজার্ভের ৪৫ বিলিয়ন ডলার কিংবা জিডিপির গ্রোথ দেখায়ে হয়তো আওয়ামীলীগ সরকার স্ট্যাটিস্টিক্যালি বেনিফটেড হইতে পারবে কিন্তু এখানেও ঝামেলা আছে। ভুলভাল ইকোনমিক গ্রোথ দেখানোর ফলে জিএসপি সুবিধা পাওয়ার রাস্তাও অদূর ভবিষ্যতে বন্ধ হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে। যার ডিরেক্ট প্রভাব পড়বে রেডিমেড গার্মেন্টস খাতে। জিডিপির যে গ্রোথ এখানে দেখানো হয় সেটা শ্রেফ সরকারি হোক্স। বিনা কারণে উচ্চহারের ট্যাক্স ও ভ্যাট আরোপ, সেইসাথে সরকারদলীয়দের সিন্ডিকেটবাজির মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য ও সেবার দাম বাড়ানো সরকারের এই জিডিপি গ্রোথের মূল হাতিয়ার৷ ফলে পণ্য বা সার্ভিস যে হারে উৎপাদন ও ডিস্ট্রিবিউশন জরুরি সেটা না হওয়া স্বত্তেও পাবলিকের এক্সপেন্ডিচার অনেক বেশি দেখানো যাচ্ছে এই উচ্চহারের ট্যাক্স – ভ্যাট আরোপ, সেই সাথে বিভিন্ন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পণ্যের দাম বাড়িয়ে। একটা পণ্য বা সেবা যত বেশি পরিমাণ বাজারে থাকে সেই পণ্য বা সেবার দাম কমে যায়৷ বাংলাদেশে পরিকল্পিত শিল্পায়নের মাধ্যমে প্রচুর পণ্য ও সেবা উৎপাদন সম্ভব। এটা করলে প্রথমত প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে। দ্বিতীয়ত, পণ্য বা সেবার দাম কমে আসবে৷ পাবলিকের পণ্যের পিছনে এক্সপেন্ডিচারও বৃদ্ধি পাবে। সেসব না করে সরকার যেটা করছে সেটা হলো মার্কেটে প্রচুর নোট ফেলে রাখসে৷ ৩ টাকার গোল্ডলীফ ১০ টাকায় কিনে খেতে হচ্ছে। এই বাড়তি ৭ টাকা হলো ট্যাক্স। অর্থাৎ প্রায় ৭০% বেশি নোট মার্কেটে থাকা লাগতেসে জাস্ট সরকারকে ট্যাক্স দেয়ার জন্য, যেই ট্যাক্সের টাকায় কানাডায় বেগমপাড়া তৈরি করা হচ্ছে সরকারদলীয় চোরদের জন্য৷ যেহেতু কারেন্সিও একটা পণ্য এবং বাজারে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কারেন্সি ছেড়ে রাখা হয়েছে এবং এর ফলে বাংলাদেশের টাকার মাণ দুর্বল হচ্ছে যা আল্টিমেটলি অন্যান্য আমদানি পণ্য ও সেবার দাম বাড়িয়ে তুলছে।

সরকারের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান বনাম জনগণের অর্থনৈতিক বাস্তবতার দ্বন্দ এতটাই প্রকট আকারে হাজির হচ্ছে যে এর থেকে উত্তরণ দ্রুত জরুরি। আদারওয়াইজ এভাবে চলতে থাকলে খুব শীঘ্রই অর্থনৈতিক কাঠামো আরো ধ্বসে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে যার প্রভাব ইতিমধ্যই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী ভালভাবে টের পাচ্ছে৷

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post