• May 25, 2022

ব্লকচেন(Blockchain) প্রযুক্তির শুরুয়াত

 ব্লকচেন(Blockchain) প্রযুক্তির শুরুয়াত

অরুপ ঘোষ

ক্রিপ্টোকারেন্সিকে ঘিরে পৃথিবীব্যাপী বিতর্ক আজ সামনে এসেছে। ভারতবর্ষে ক্রিপ্টোকারেন্সি কে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে এই নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে। তাই ভারতবর্ষে ক্রিপ্টোকারেন্সি যেমনি ইল্লিগাল নয় তেমনি আবার সেটার উপর কোন নিয়ন্ত্রন না থাকার দরুন, বিভিন্ন রকম প্রশ্ন সামনে এসেছে । বিটকয়েন হচ্ছে এক রূপ ক্রিপ্টোকারেন্সি। ২০১৩সালে আমেরিকা বিটকয়েন কে তাদের দেশে ব্যবহারের জন্য গাইড লাইন দিয়েছে – এই মর্মে যে তা প্রকৃত কারেন্সি অর্থাৎ ডলারের সাথে তার মূল্য নির্ধারণ করার জন্য। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ব্যাংকিং অথরিটি বিটকয়েন কে এসেট হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সাথে সাথে এও তারা ঘোষণা করেছে ক্রিপ্ট অ্যাসেট অ্যাক্টিভিটি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এবং তারা জনগণকে এই বলে সাবধান করে যে এতে বিজনেসের রিস্ক আছে। ২০২০তে এই ক্রিপ্ত এসেটকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে তার জন্য তারা আইন এনেছে।
তাই ক্রিপ্টোকারেন্সি কে ঘিরে একটা আলোচনা আজ খুব জরুরী হয়ে পড়েছে। মূলত রাস্ট্রের নিয়ন্ত্রণের সাথে ক্রিপ্টোকারেন্সির বিরোধের সম্পর্ক কে নিয়ে।

২০০৮ সালে বিশ্ব অর্থ ব্যবস্থার মধ্যে যখন ধ্বস দেখা দিল তখন ধ্বসের কারণ অনুসন্ধানরত অর্থনীতিবিদদের বলতে শোনা গেল যে, ধ্বসের কারণ ও মাত্রার পরিমাপ অনুধাবন করা সম্ভবপর হচ্ছে না। এই চ্যালেঞ্জ থেকেই নতুন হিসাবশাস্ত্রের অনুসন্ধান, তার থেকেই জন্ম ব্লকচেন প্রযুক্তির। ২০০৮ সালে Satashi Nakamoto নামে জাপানি এক প্রযুক্তিবিদের হাত ধরে এই প্রযুক্তির আগমন। কিন্তু জন্মলগ্নেই এই বিটকয়েন ব্লকচেন (Bitcoin Blockchain) এক হ্যাকিং-এর স্বীকার হয়। হ্যাকিং অংকুরে বিনষ্ট করা গেলেও বিটকয়েন ব্লকচেন-এর বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা সামনে চলে আসে। ২০১৪ সালে ১৬ বছর বয়স্ক টরেন্ট প্রবাসী বুটারিন (Buterin) ইথুরিয়াম ব্লকচেন (Ethereum Blockchain) আবিষ্কার করেন, যার আকার অনেক বৃহৎ। নামকরণটি ইথার (Ether) থেকে নেওয়া হয়েছে।

ব্লকচেন কি ধরনের প্রযুক্তি

এই চেন-এর লক্ষ্য স্পর্শতর সম্পদ (Tangible Assets) এবং অস্পর্শতর সম্পদ (In-tangible Assets) অর্থাৎ সমস্ত ধরনের সম্পদকে মূল্যে রূপান্তর করে একটি ক্রিপ্টোমুদ্রার (Cryptocurrency) দ্বারা সঙ্গে সঙ্গেই মূল্যকে মজুত করা এবং বিশ্ব মূল্যচেনের মধ্যেকার (world value chain) প্রবাহে এই মুদ্রাকে সচল রাখা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্বারা, যাতে মুদ্রার প্রবাহের অলস সময় প্রায় শূন্য হয় এবং দ্রব্য মজুতির (Store Inventory) পরিমাণও ন্যূনতম করা যায়। আর এই অর্থ প্রবাহের উপরে কোনো দেশ, কোনো ব্যাঙ্ক, কোনো আন্তর্জাতিক সংগঠন, কোনো ব্যক্তি – কারও নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। শুধুমাত্র যাদের মধ্যে লেনদেন (Exchange) হবে তারাই অংশগ্রহণ করতে পারবে অন্য কেউ নয়। অর্থাৎ রাম ও শ্যামের মধ্যে যে অর্থপ্রবাহ হবে, সেই ডিজিটাল অর্থের উপর, কোনো ব্যক্তি, আমাদের দেশের ট্রেজারী, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ, Bank for International Settlement বিশ্বব্যাঙ্ক, IMF নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না, সবার অগোচরে ঘটবে এর হিসাব এবং প্রবাহ। এর ভিতর দিয়ে অর্থের মূল্যের ক্ষয় রোধ করা এবং মূল্যের সংরক্ষন গ্যারান্টিপ্রাপ্ত করা যাবে। কেন ডলার এই গ্যারান্টি দিতে পারল না?

মূল্য কি?

মার্কসের মতে মূল্য হচ্ছে একটি বস্তুগত ব্যাপার। বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদদের মধ্যে রিকার্ডো ছাড়া সকলেই মনে করেন তা ভাবগত। রিকার্ডো মূল্যকে পণ্যের মধ্যে সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় শ্রম সময় দ্বারা দেখেছিলেন। কিন্তু দ্বান্দ্বিক ভাবে দেখতে না পারার দরুন- মূল্য, মুনাফা, পুঁজি সকলকেই শুধুমাত্র মূল্যের সংজ্ঞা দিয়ে ব্যাখ্যা করেছিলেন। মার্কস কিন্তু বিনিময়ে কিভাবে সমাজের এলো, সেই সমাজে মূল্যের উৎপত্তি কিভাবে হলো, সেখান থেকে কিভাবে মুদ্রা এলো সবকিছুই ব্যাখ্যা করলেন পণ্যের দ্বিবিধ বিনিময় মূল্য ও ব্যবহার মূল্য রূপী দ্বিমেরু চরিত্র দ্বারা। যেখান থেকে পণ্য ও অর্থের প্রবাহ ও তার ভিতর থেকে উদ্বৃত্ত মূল্যের আবিষ্কার ও পুঁজির জন্ম- মার্কস তা ব্যাখ্যা করেন। মার্কস দেখান, মূল্য ও দামের মধ্যে তফাৎ থাকলেও মূল্যকে কেন্দ্র করে দাম চক্রাবর্তে ঘোরে। অর্থাৎ মূল্য হচ্ছে বস্তুগত জায়গা যাকে কেন্দ্র করে মানুষের পণ্যের প্রতি চাহিদা এবং তাকে ঘিরে যোগানের প্রবাহ মূল্যের উপরে বা নীচে দামকে ওঠানামা করায়। অর্থাৎ চাহিদার থেকে যোগান বেশি হলে মূল্যের তলায় দামের পতন হয় আর চাহিদা বাড়লে মূল্যের উপর দাম ওঠে। এই কারণেই যোগানকে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে সম্পদকে ঘিরে মানুষের এক ইল্যুশানের(Illusion) কথাও বলেছিলেন মার্কস। পেপার মানি অর্থাৎ কাগুজে অর্থকে (ব্যাঙ্ক নোট, শেয়ার সার্টিফিকেট, বন্ড ইত্যাদি) ঘিরে এই ইল্যুশান কাজ করে। অর্থ যেহেতু আরও বেশি অর্থকে টেনে আনে তাই মানুষ ‘সোনা’ (পদার্থ-অর্থ) তাকে বেচে কাগুজে অর্থে সম্পদকে রূপান্তর করায়। এর ফলে পুঁজিবাদ ক্রেডিট ব্যবস্থার দ্বারা দ্রুত বেগবান হয়ে তাকে গন্ডীর শেষ সীমানায় এনে দাঁড় করায়, ফলে কাগুজে অর্থকে ঘিরে মুনাফার হারকে বাড়িয়ে চলার যে ইল্যুশন, যা ভাবগতভাবে বেশিদূর এগোনো সম্ভব নয় বস্তুগত জায়গাকে অস্বীকার করে, তা ধাক্কা খায় বস্তুগত জায়গায়। মুনাফার হার পড়ে যায় এবং মানুষের মধ্যে তখন পেপার অর্থ বেচে আবার সোনায় ফিরে আসার প্রবল তাগিদ দেখা যায়। ফলে কাগুজে অর্থের মূল্য বৃদ্ধি সোনার মূল্য হ্রাস, পরক্ষনেই সোনার মূল্য বৃদ্ধি কাগুজে অর্থের মূল্য হ্রাস- এই ভাবেই কাগুজে অর্থ নিজের মূল্য সংশোধন করে যাকে মার্কস বলেছেন ক্রেডিট ব্যবস্থা, ‘মেটাল বেরিয়ার’-কে অতিক্রম করে এগোলেও ধাক্কা খেয়ে আবার আটকে যায়।

১৯৪৪-এর পর বিশ্বগ্রাহ্য অর্থ কি ছিল?

প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পৃথিবী পুঁজিবাদী পণ্ডিতদের মধ্যে এই সচেতনতা এনে দেয় যে ফিনান্স পুঁজির কোনরূপ জাতীয় কাঠামো হয় না, হলেই বিশ্বযুদ্ধ হবে। ফলে ব্রেটন উডসের মাধ্যমে গঠন হয় বিশ্ব ফিনান্স পুঁজির কাঠামোর সংগঠনগুলি যথা World Bank, IMF, GATT, UNO ইত্যাদি। আর অর্থ হিসাবে আমেরিকা ডলারকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেও পারে না কেইনস অর্থাৎ ব্রিটিশ প্রতিনিধির চাপে। ফলে Fixed Exchange রেট ১ আউন্স সোনা সমান ৩৫ ডলার স্থাপন হলো। সোনা ও ডলার উভয়েই বিশ্বগ্রাহ্য অর্থ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত থাকে, যাতে কাগুজে ডলার নিজেকে যেমন খুশি বাড়িয়ে চলতে না পারে ইল্যুশনের দ্বারা। যে কেইনস এইভাবে ডলারকে বেঁধে রেখেছিলেন সেই কেইনসই আবার মার্কসের মূল্যের তত্ত্বকে অন্যভাবে অগ্রাহ্য করেছেন – মূল্যের মধ্যে শ্রমকে স্বীকার করলেও তিনি বলেছেন শ্রম খুব প্রাসঙ্গিক নয়, প্রাসঙ্গিক হচ্ছে মুনাফার হারকে ঘিরে বিনিয়োগকারীর ভাবগত বা মানসিক (psychological) বিষয়। আজ বিশ্ব অর্থের মধ্যে যে ধ্বস নেমেছে তার কারন মার্কসের সেই ব্যাখ্যা যে, কাগুজে অর্থ ও মেটাল অর্থের সম্পর্কের মধ্যে যে কার্যকারণ সম্পর্ক রয়েছে তাকে অস্বীকার করে বেরোনো সম্ভব নয়, বলে। এটাই হচ্ছে প্রকৃত মূল্য আর ভাবগত মূল্যের মধ্যেকার তফাৎ। পুঁজিবাদ ভাবগত মূল্যকে যতই বেলুনের মতন ফুলিয়ে তুলুক একটি সময়ে তাকে চুপসে যেতে হবেই।

ধ্বস হলো কেনো?

আশির দশকের শেষ লগ্নে সোভিয়েত ব্যবস্থার পতনের পর www.com প্রযুক্তিকে সামনে এনে বড় বড় শিল্পকে বিশ্বব্যাপী সস্তা শ্রমের জায়গায় আউটসোর্স করে এবং পণ্যকে যেখানে বেশি দামে বেচা যায় সেখানে সরবরাহ করে এক পুঁজির নতুন কাঠামোর জন্ম দেওয়া হল। আর এখানেই বিশ্বগ্রাহ্য অর্থ হিসেবে ডলারকে রাখা হলো সোনার থেকে বিচ্ছিন্ন করে। অর্থাৎ সোনা আর বিশ্ব-অর্থ রইল না। না থাকার ফলে ডলার মানুষের মধ্যে পুঁজিবাদী ইল্যুশন বাড়িয়ে তুলল আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে চলল মার্কিন ট্রেজারী ও ফেডারেল রিজার্ভের গোপনে গোঁজামিল দেওয়ার ব্যবস্থা যাতে ডলারকে শক্তিশালী দেখায়। এই সুযোগে মার্কিন দেশের সমস্ত সংকট রপ্তানি হলো সারা বিশ্বে। ষাট দশকে ৭ টাকা ৫০ পয়সা সমান ছিল ১ ডলার, যা আজকে হয়েছে ৭৫ টাকার সমান। যার ফলে প্রকৃত মূল্যের হিসাব আর সম্ভব হচ্ছে না। বিশ্ব ডলার অর্থের সাম্রাজ্যটি যখন ২০০৮ সালে ধ্বসে পড়ল তখন থেকেই কেউই আর ডলারের উপর ভরসা রাখতে পারছে না। এখানেই জন্ম নিচ্ছে ব্লকচেন প্রযুক্তি। সোনার বদলে প্রোগ্রামেবল অর্থ (Programmable money) যেখানে economatrix প্রয়োগ করে অর্থাৎ অর্থনীতির নিয়মকে একটি Matrix-এর ফর্মুলায় আবদ্ধ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এই নিয়মটির থেকে নির্গত ফলাফলকে প্রযুক্তির দ্বারা সময়ের সাথে সাথে সংরক্ষণও করা হচ্ছে ব্লক গঠন করে।

কেন এই কঠিন নিয়ম?

Double Entry Book Keeping-এর golden rule দ্বারা এতদিন শিল্পপুঁজি ও জাতীয়তাবাদের যে বিকাশ হয়েছিল সেই নিয়মই আজ ধ্বংসের মুখে। পণ্যের মধ্যেকার দ্বিমেরু- ব্যবহারমূল্য ও বিনিময়মূল্য, তার বিকাশ ঘটেছিল অর্থ পণ্য সঞ্চালনের মধ্যে যেমনি, তেমনি আবার মূল্যের সংরক্ষণের হিসাব তা খুব ভালোভাবে করা যেত Double Entry Book Keeping-এর golden rule দ্বারা। আসলে পণ্যের দ্রব্য রূপটি যেদিকে প্রবাহিত হয় বা তার উল্টো দিকে প্রবাহিত হয় অর্থের মাধ্যমে মূল্যরূপটি। যেমন কারখানার মালিক পণ্য উৎপাদন করে খরচের সাথে তার মুনাফার অংশ যোগ করে পণ্য দোকানদারকে বিক্রি করে দেয়। দোকানদার আবার সাধারণ ক্রেতাকে, যে ক্রেতা পণ্যের দ্রব্য রূপটি ব্যবহার করবে। তাই ক্রেতার ব্যবহারের মধ্যেদিয়ে দ্রব্যগত রূপ নিঃশেষ হয়ে গেলেও কারখানার মালিক থেকে দোকানদার অবধি সবাই অর্থের মাধ্যমে তার মূল্যকে সংরক্ষিত করে নেয়। যেহেতু ভারতীয় অর্থ ভারতীয় রাষ্ট্রের মুদ্রাস্ফীতি বা মুদ্রাসংকোচন নীতির নিয়ন্ত্রণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, ফলে প্রত্যেকেরই সম্পদের অর্থমূল্যের বিচারে মূল্যের একইসাথে স্ফীতি বা সংকোচন ঘটে। কিন্তু ধরা যাক ক্রেতা-বিক্রেতার লেনদেন প্রক্রিয়াটি তিনটি দেশ জুড়ে হচ্ছে – ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, তখন মার্কিন দেশের সাথে কার কীরকম সম্পর্ক তার দ্বারা তার অর্থের শক্তিশালী হওয়া বা দুর্বল হওয়া নির্ধারিত হবে। ফলে তিনটি দেশের অর্থের হিসাবটির মধ্যে কোনোরূপ স্থিরতা তো থাকছেই না, উল্টে বিশ্বের বিভিন্ন ঘটনায়, ইরাক যুদ্ধ বা সন্ত্রাসবাদী ঘটনা সবক্ষেত্রেই প্রতিনিয়ত এই হিসাবগুলি অস্থির হয়ে উঠেছে। এবার ধরা যাক ভারতে তৈরি করে বাংলাদেশ বেচলে Double Entry Book Keeping-এর আজকের হিসাব উল্টে যাচ্ছে পরের দিন। দ্বিতীয়ত, এর ফলে কোনো দেশের সম্পদের হিসাবের পরিমান হঠাৎ বেড়ে যাচ্ছে আবার পরদিনই পড়ে যাচ্ছে। এই কারণেই ক্রিপ্টোকারেন্সিকে নিয়ন্ত্রণহীন করা হয়েছে।
এই ব্যাপারে গবেষক বেটিনা (Betiina) এবং টমকল (Tom Call) কী বলেছেন দেখা যাক – ‘এই সরবরাহ চেনগুলি(Supply Chain) স্বয়ংক্রিয়(autonomous) , ছড়ানো (Distributed) এবং প্রতি মুহূর্তে নবীকরণ করা হচ্ছে জ্ঞান দ্বারা (cognitive),তার কারণ নতুন অভিজ্ঞতাগুলিকে একটি বান্ডিলে নিয়ে আসা হচ্ছে এমনই ভাবে যাতে নতুন সুযোগগুলিকে কাজে লাগিয়ে দায়িত্ব ও দক্ষতাকে চূড়ান্তকরণ করা যায়। এইরূপ cognitive সরবরাহ চেন-এর জন্য দরকার “A Network State Function”, যেটা সর্বদা একটি সর্বজনগ্রাহ্য (universal) সত্যকে তুলে ধরছে, বেটিনা এবং টমকল যাকে বলছেন ‘machine trust’ (Blockchain Revolution P-VIII) এই কারণেই পৃথিবীব্যাপী বিভিন্ন রাষ্ট্রের অধীনে থাকা মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বদলে ‘Network State’- এর অধীনে থাকা মুদ্রাব্যবস্থার ওপর বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ছে। কেন বাড়ছে বলতে গিয়ে বেটিনা ও টমকল বলছেন, ‘আমাদের হার্টবিটের মতন করে প্রতি দশ মিনিট অন্তর বিটকয়েন নেটওয়ার্ক সারা বিশ্বব্যাপী তার নেটওয়ার্কে যা ট্রানজ্যাকশন হয়েছে তাকে পরীক্ষা করে একটি ব্লকে মজুত করে যা তার দশ মিনিট আগে যে ব্লক তৈরী হয়েছিল তার সাথে ধারাবাহিকতা মেনে। এবং সাথে সাথে এই তৈরী হওয়া নতুন ব্লকটির গায়ে সময়ের একটি ছাপ মেরে দেওয়া হয়। ফলে এই ব্লকের মধ্যে যে বিনিময় মূল্য (Exchange value) সুরক্ষিত হয়ে রইল তাকে কারো দ্বারা পাল্টানো সম্ভব নয়। যদি কেহ একটি বিটকয়েন চুরিও করতে চায়, তাকে আবার নতুনভাবে re-write করতে হবে কয়েনের ইতিহাসটিকে অর্থাৎ কোন ব্লকচেনের কোথা থেকে তার জন্ম হলো যা কার্যত অসম্ভব। সেই জন্যই ব্লকচেন হচ্ছে একটি Distributed ledger যা মানুষকে প্রতিটি ট্রানজ্যাকসন সম্পর্কে সচেতন করে। আগে এইভাবে প্রতি মুহূর্তে ledger দেখা সম্ভব ছিল না কোনো একজন ব্যাক্তির দ্বারা, এখানে যা সম্ভবপর। যেকোনো ব্যক্তি তার চাবি দ্বারা তার ব্যাক্তিগত কম্পিউটার ledger খুলে তার সাথে প্রত্যেকের কবে, কত, কি ট্রানজ্যাকসন হয়েছে তার ইতিহাস খুব সহজেই দেখে নিতে পারে’।

এই ledger কিভাবে হিসাব করে?

এই নতুন প্ল্যাটফর্ম কৃত্রিম মেধার সাহায্যে এমনই এক ডিজিটাল রেকর্ড রাখার ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে যেখানে প্রকৃত সময়ে (real time) বিলিয়ন স্মার্ট বস্তু (smart thing) বাস্তব পৃথিবীতে (Physical world) সজাগভাবে সাড়া (sensing and responding) দিতে পারে, তথ্য আদান প্রদান (Communication) করতে পারে এমনকি নিজের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ডিজিটাল পয়সা দিয়ে কিনে নিতে পারে (কারণ মূল্য পরিমাপে এটা একটা উপাদান) এবং সুচারু ভাবে হিসাবও করতে পারে। এই কারণেই এই “Internet of everything” এর প্রয়োজন “The ledger of everything l” এবং “Digital reckonery” -এর।প্রত্যেকটি মানুষের জন্য একটি ledger তৈরী করা হয়। যেখানে মানুষের সম্পত্তিগত, আকারগত, জীনগত সমস্ত তথ্য থাকবে। অর্থাৎ বাড়ি, গাড়ি, গয়না, তাকে দেখতে কেমন অর্থাৎ কতটা লম্বা, গায়ের রং, তার জীবনের কাঠামো, গান জানে কিনা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, জন্ম তারিখ ইত্যাদি এবং ধরা যাক একটি মানুষ গান জানে আর একটি মানুষ গান শুনতে ভালোবাসে। যে গান জানে সেটি হচ্ছে তার asset আর যে শুনতে চায় সেটি হচ্ছে তার liability, এবার যে গান জানে তার ledger-এ গানটি read হবে আর যে শুনতে চায় তার ledger-এ write হবে। এই লেনদেনের মধ্যে ক্রিপ্টোকারেন্সি হিসাব করে দেবে কত বিটকয়েন গানটির মূল্য, সেই বিটকয়েনটি যার ledger-এ গানটি read হয়েছে তার ওয়ালেটে চলে যাবে। এই লেনদেন দুজনার মধ্যে ব্যক্তিগত হিসাবেই থেকে যাবে কেউ জানতে পারবে না।

রাষ্ট্র বনাম মুদ্রার বিরোধ

মার্কস পুঁজিবাদকে সামন্ততন্ত্র থেকে সমাজবাদের পর্বের মধ্যেকার এক অন্তর্বর্তীকালীন পর্ব হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু পুঁজিবাদী পণ্ডিতেরা বরাবর মার্ক্সবাদকে ব্যর্থ প্রমাণ করার ভ্রান্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। তার কারণ পুঁজিবাদ জাতীয়তাবাদের পর্বেই শেষ হবার কথা, পুঁজিবাদের দ্বারা আন্তর্জাতিকবাদ সম্ভব নয়। তাই দেখা যাচ্ছে মুদ্রাকে আন্তর্জাতিকভাবে সংশোধন করতে গেলে রাষ্ট্র থাকছে না, আবার রাষ্ট্র বাঁচাতে গেলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা রাখা যাচ্ছে না, আবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা ছাড়া আজ বিশ্ববাণিজ্য সম্ভব নয়।
ভারতবর্ষে একদিকে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ঢেউ তোলা হচ্ছে, অন্যদিকে ব্লকচেন প্রযুক্তি সমস্ত কলেজে পড়াবার ফরমান জারি করছে AICTE (All India Council for Technical Education)। সরকার সবথেকে বেশি ট্যাক্স আদায় করে কেনাবেচার লেনদেন থেকে। কর্পোরেটরা যদি সবই ব্লকচেন চালায়, তাহলে ট্যাক্স আদায় হবে কি করে? সরকার দারিদ্র দূরীকরণের কাজ করবে কি করে? তাই রাষ্ট্রকে আজ হতে হবে রাষ্ট্র নয়, কর্পোরেট সংগঠন। রাষ্ট্র আজ তাই ধর্মের মোড়কে নীরব মোদী, আদানী, আম্বানীদের কাছে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।

হর্ষ দাস : পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.