• May 29, 2022

নাদিরা বানু বেগম-ভাগ্যহতা শাহজাদী

 নাদিরা বানু বেগম-ভাগ্যহতা শাহজাদী

সহেলি চক্রবর্তী

নাদিরা বানু বেগম ছিলেন বাদশাহ শাহজাহানের জ্যেষ্ঠ পুত্র দারা শিকোহর প্রধানা বেগম।দারার নাদিরা বেগম ছাড়াও আরো দুই বেগম ছিলো যাঁরা ইতিহাসের পাতায় সেরকম উচ্চারিত নন। তাঁরা হলেন উদয়পুরী বেগম ও রাণাদিল।ঔরঙ্গজেবের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য যখন দারা সপরিবারে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন সেই সময়, ১৬৫৯সালে নাদিরা বানু বেগম মারা যান।দারার নৃশংস মৃত্যু তাঁকে দেখে যেতে হয়নি।
নাদিরা বানু বেগমের জন্ম হয়েছিল ১৪ই মার্চ ১৬১৮সালে রাজস্থানে।পিতা ও মাতার দিক থেকে নাদিরা ছিলেন মুঘল বংশজাত।নাদিরা বেগমের পিতা ছিলেন পারভেজ মীর্জা। যিনি ছিলেন জাহাঙ্গীরের বেগম সাহেব জামালের পুত্র। অপরদিকে তাঁর মা ইফতার জাহান বেগম ছিলেন আকবরের দ্বিতীয় পুত্র মুরাদের কন্যা।সেই দিক থেকে আকবর ছিলেন নাদিরা বেগমের প্রমাতামহ।নাদিরা বেগমের পিতা পারভেজ মীর্জা ছিলেন পিতা জাহাঙ্গীরের প্রতি কর্তব্যপরায়ণ।অন্যদিকে জাহাঙ্গীরের অপর দুই বিখ্যাত পুত্র শাহজাদা খসরু ও শাহজাদা খুররম পিতা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করছিলেন। পারভেজ মীর্জা অতিরিক্ত মদ্যপান ও আফিমের নেশা করার জন্য মাত্র ৩৮বছর বয়সে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেয়ে মারা যান।অপর মত হলো সৎ ভাই খুররম বিষ প্রয়োগ করে পারভেজ মীর্জা কে হত্যা করেন সিংহাসন কন্টকমুক্ত করার জন্য।


নাদিরা বেগমের জন্ম রাজস্থানে হলেও তাঁর বেড়ে ওঠা আগ্রায়।১৬২২সালে মাত্র ৪বছর বয়সে তিনি পিতাকে হারান।নাদিরা ছিলেন বুদ্ধিমতী ও সুন্দরী। পাদশাহ বেগম মুমতাজ মহল নাদিরার বুদ্ধিমত্তা ও সৌন্দর্যের জন্য ১৬৩১সালে নিজ পুত্র দারা শিকোহর সঙ্গে বিবাহ ঠিক করেন।কিন্তু সেই বছরই তাঁর ১৪তম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মুমতাজ মহল মারা যান।মুঘল সাম্রাজ্য গভীর শোকে ডুবে যায়। শাহজাহান শোকাতুর হয়ে পড়েন। ফলে দারার সঙ্গে নাদিরার বিবাহ ব্যবস্থাও বন্ধ হয়ে যায়। পরে জাহানারা বেগমের সহযোগিতায় শাহজাহান স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন।জাহানারা বেগম এরপর প্রথম যে কাজটি করেন তাহল দারার সঙ্গে নাদিরার বিবাহ। ১১ই ফেব্রুয়ারী ১৬৩৩সালে নিকাহের আয়োজন করা হয়।প্রচুর আড়ম্বরের মধ্য দিয়ে মধ্যরাতে নিকাহ সম্পূর্ণ হয়।জাহানারা বেগম নিজে সে যুগে ১.৬কোটি টাকা খরচ করেছিলেন নিকাহের জন্য। এছাড়া অন্যান্য মুঘল শাহজাদী, বেগম ও অভিজাত মহিলারা খরচ করেছিলেন ০.৪কোটি টাকা সেই যুগে, যা আজকে ১২০কোটি টাকার সমান। মুঘল ইতিহাসে সবচেয়ে আড়ম্বরতম বিবাহ হলো দারা শিকোহ ও নাদিরা বানু বেগমের বিবাহ।
নাদিরা ও দারা একে অপরের প্রতি আজীবন অনুগত ছিলেন। দারার জীবনে নাদিরা বেগমের যথেষ্ট অবদান ছিল। তিনি সাহসের সাথে দারার কঠিন সময়ে তাঁর পাশে ছিলেন সর্বদা। নাদিরা ফরমান ও নিশান দেওয়ার অধিকার পেয়েছিলেন। এই সুবিধা একমাত্র তাঁদের জন্য ছিল যাঁরা সাম্রাজ্যের হারেমের সর্বোচ্চ পদে আসীন ছিলেন। নাদিরা ছাড়া একমাত্র জাহানারা বেগমের এই অধিকার ছিল। বিয়ের দুবছরের মধ্যে ১৬৩৫সালে দারা ও নাদিরা বেগমের জ্যেষ্ঠ পুত্র সুলেমান শিকোহর জন্ম হয়। এছাড়া সিপিহর শিকোহ এ জেহেনজেব বানু বেগম বা জানি বেগম মুঘল ইতিহাসে দারা ও নাদিরার সন্তান রূপে নিজ পরিচিতি লাভ করেছিলেন।


ঔরঙ্গজেবের হাতে পরাজিত দারা যখন দিশেহারা, ঠিক তখনই দারার জীবনে ঘনিয়ে এলো আরেকটি বিপর্যয়।দারার সাথে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পরিশ্রান্ত নাদিরা বেগম পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হলেন। ১৬৫৯সালের ৬ই জুন নাদিরা বেগম মারা গেলেন। তিনি আজীবন দারা শিকোহর প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন এবং তাঁর প্রতি পদক্ষেপে দারার সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে চলেছিলেন।নাদিরা বেগমের মৃত্যুতে দারা শোকাগ্রস্থ হয়ে পড়েন এবং ভাগ্যের প্রতি উদাসীনতা তাঁকে ঘিরে ধরে। নাদিরার মৃত্যু হয়েছিল বর্তমান পাকিস্তানের বোলান পাসে।নাদিরা বেগমের শেষ ইচ্ছানুসারে দারা কিছু সৈন্য সহ বেগমের মৃতদেহ লাহোরে প্রেরণ করেন।দারার আধ্যাত্মিক গুরু মিয়া মীরের সমাধির পাশে মুঘল বংশীয় এই শাহজাদীকে সমাধিস্থ করা হয়।বর্তমান লাহোরে তাঁর সমাধিটি অবস্থিত।
নাদিরা বেগম নিজেও হজরত মিয়া মীরের শিষ্যা ছিলেন। জীবিতকালে তিনি তাঁর আধ্যাত্মিক গুরুর দরগাহে প্রায়ই আসতেন দারা শিকোহর সাথে। নাদিরা বেগমের ইচ্ছে অনুসারেই মীয়া মীরের দরগাহের সন্নিকটে দারা নাদিরার সমাধিস্থলটি নির্মাণ করেছিলেন। অনেকের মতে সমাধিটি দারার আমলে নির্মাণ শুরু হলেও শেষ হয়েছিল ঔরঙ্গজেবের আমলে।সুবিশাল প্রান্তের মাঝে সমাধিস্থল নির্মিত হয়েছিল। সমাধিটি একটি প্ল্যাটফর্মের ওপর রাখা। মনে করা হয় মুঘল আমলে এই সুবিশাল প্রান্তটি ছিল একটা জলাশয়। মুঘল আমলে সমাধিগুলি মূলত চাহারবাগ নামক সুবিশাল বাগানের মধ্যে নির্মিত হতো। কিন্তু সেদিক থেকে নাদিরা বানু বেগমের সমাধিটি পুরো আলাদা।এটি নির্মাণ হয়েছিল জলাশয়ের মাঝে। বর্তমানে সমাধিস্থলের আশপাশে ক্রিকেট খেলা হয়।অত্যন্ত অনাদরে,অবহেলায় পড়ে আছে দারাশিকোহর প্রিয়তম বেগম নাদিরা বানু বলছেন সমাধি।


জন্ম মুঘল রাজবংশে,মাত্র ৪বছর বয়সে পিতাকে হারানো, অত্যন্ত জাঁকযমকতার সাথে মুঘল উত্তরাধিকারী দারা শিকোহর সাথে বিবাহ, ভাগ্যের পরিহাসে শেষ জীবনে ঔরঙ্গজেবের ভয়ে দারার সঙ্গে পালিয়ে বেড়ানো এবং একদম শেষে পেটের অসুখে মৃত্যু। নাদিরা বানু বেগম এক ভাগ্যহতা শাহজাদী যিনি আজীবন দারার প্রতি সৎ থেকেছেন, আর মৃত্যুও এসেছে দারার সঙ্গে পালিয়ে বেড়াতে বেড়াতে। শাহজাদী থেকে ধুলোয় ভরা পথে পথে হাঁটতে হাঁটতে শেষ হয়ে গিয়েছিল তাঁর জীবন, শুধুমাত্র দারার কঠিন সময়ে তাঁর পাশে থাকার জন্য। দারার নৃশংস মৃত্যু তাঁকে দেখে যেতে হয়নি এটা ঠিক। তবু মনের ভিতর বহু অশান্তি নিয়ে বোলান পাসে দারার সামনে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ব্যাক্তিত্বময়ী,পতি অনুগতা,সুন্দরী, সুলতান পারভেজ মীর্জার কন্যা নাদিরা বানু বেগম মাত্র ৪১বছর বয়সে।

সহেলি চক্রবর্তী : ঐতিহাসিক নিবন্ধ লেখিকা, সম্পাদিকা প্রত্নচিহ্ন ই ম্যাগাজিন।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post