• May 29, 2022

চেপে রাখা মোপলা বিদ্রোহের শতবর্ষ

 চেপে রাখা মোপলা বিদ্রোহের শতবর্ষ

দীপক সাহা

দুঃখের বিষয়, স্বাধীন ভারতের স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রমে যেকোন শ্রেণির পাঠ্যবইগুলোতে স্বাধীনতা সংগ্রামী মুসলিম নেতৃত্বের নাম দূরবীক্ষণ দিয়ে খুঁজতে হয়! পাঠ্য বই-এ শুধু মীর জাফরের নাম পাওয়া যায়। কিন্তু বিস্ময়করভাবে পাঠ্যবইয়ের পাতায় জগত শেট, বাবু কৃষ্ণদেব, উমিচাঁদ, রায়দুর্লভ,কান্তমুদি, নন্দকুমার, গোবিন্দ সিং নাম খুঁজে পাওয়া যায় না। ১৭৫৭ থেকে ১৮৫৭ এবং ১৮৫৭ থেকে ১৯৪৭ এর স্বাধীনতা পর্যন্ত যেসব মুসলিম বিপ্লবী নেতা নেত্রীদের জেল দীপান্তর ও ফাঁসি হয়েছে তাদের নাম স্কুল কলেজের পাঠ্য ইতিহাস বই-এ কৌশলে গোপন রাখা হয়েছে। ১৭৫৭ থেকে ১৮৫৭ এবং ১৮৫৭ থেকে ১৯৪৭ এর স্বাধীনতা পর্যন্ত যেসব মুসলিম বিপ্লবী নেতা নেত্রীদের অবদানের প্রকৃত ইতিহাস আড়াল করে রাখা হয়েছে। ১৭৫৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল অর্থাৎ ১৯০ বছরের সুদীর্ঘ মুসলিম আন্দোলনের জেলখাটা ও রক্ত দেওয়া কেমন করে বেমালুম নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হল সেটা ভয়াবহ বিস্ময়কর ব্যাপার।

আমি অবশ্য ইতিহাসের ছাত্র নয়। দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকের বিষয়গুলোর মধ্যেই ইতিহাস সম্পর্কে আমার যেটুকু পরিচয়। স্কুল জীবনে প্রিয় ইতিহাসের শিক্ষকের কিছু কথা আজও কানে বাজে। তিনি বলতেন ‘ইতিহাস’ শব্দটি এসেছে ‘ইতিহ’ সংস্কৃত শব্দ থেকে। … ‘Histor’ শব্দ বা কথার অর্থ জ্ঞান এবং ‘Histori’ শব্দ বা কথার অর্থ হল সত্যকে অনুসন্ধান করা। সুতরাং ইতিহাস’ শব্দ বা কথাটির অর্থ হল অতীত ঘটনা বা কাহিনির সত্যকে অনুসন্ধান করা। এক সচেতন মানুষ হিসাবে আলোচ্য বিষয়ে আমি নির্মোহ দৃষ্টিতে সেটুকুই অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেছি মাত্র। এই অনুসন্ধানের পথচলায় গুণীজনদের ঋণ আমি নতমস্তকে স্বীকার করি। বাকিটুকু পাঠকের বিচার্য।

ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থার ত্রুটি, সুদখোর মহাজনদের নির্লজ্জ শোষণ, ঔপনিবেশিক শোষণ এবং কৃষক ও উপজাতিদের উপর দমন নীতি ইত্যাদির কারণে ও এর প্রতিবাদে বিভিন্ন সময়ে কৃষক, শ্রমিক, তাঁতি, কারিগর, আদিবাসী, জেলে, ব্যবসায়ী, শিল্পী, ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ বিচ্ছিন্ন ভাবে হলেও সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে সামিল হয়েছিল বারে বারে। এইসব বিদ্রোহগুলোর মধ্যে কেরালার মালাবার এলাকার মুসলিম সম্প্রদায়ের মোপলা বিদ্রোহ অন্যতম। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলিম সম্প্রদায়েরও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন রয়েছে। সেই অবান্তর প্রশ্নমালা কতটা ভ্রান্ত ও সাম্প্রদায়িক দূষণে দুষ্ট আমার বর্তমান নিবন্ধটি তার সাক্ষী।

ভারতে মুসলিম শাসনের অনেক আগে থেকেই কেরালায় আরবভূমি থেকে মুসলিম সম্প্রদায়ের আনাগোনা। পরবর্তীতে ভারতের মাটির সঙ্গে তাদের সহাবস্থান এবং ভারতাত্মার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে এদেশেই তাদের পরম্পরার বিকাশ। সুদূর অতীতে আরব দেশ থেকে দক্ষিণ ভারতের মালাবার অঞ্চলে মোপলারা বসতি স্থাপন করে। মোপলারা মূলত সমুদ্র উপকূলবর্তী মালাবার অঞ্চলের কৃষিজীবী। তাদের জীবিকা ছিল প্রধানত কৃষিকাজ। স্থানীয় জমিদারদের কাছে বর্গাভিত্তিক চাষাবাদ করতো মোপলারা।

১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে ভাস্কো-ডা-গামার ভারতে আসার পর এখানে পোর্তুগিজরা মশলার বাজার দখল, লুঠপাট ও জবরদস্তি ধর্মান্তকরণ চালাতে থাকে যা মালাবারের মোপলা বা মুসলিম কৃষকদের শ্বেতাঙ্গবিদ্বেষী করে তোলে। এখানে ব্রিটিশ শাসকরা উঁচু জাতের হিন্দু ‘নাম্বুদ্রি’ ও ‘নায়ার’ জেনমি (জমিদার) দের অবস্থার উন্নতি ঘটাতে উদ্যোগ নেয় । ফলে অসংখ্য মুসলিম ‘ইজারাদার’ বা ‘কনমদার’ ও কৃষক বা ‘বেরুসপট্টমদার’ যারা ‘মোপালা’ নামে পরিচিত, তাদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে ওঠে। জমিদাররা নানা অজুহাতে কৃষকদের শোষণ করতো। জমিদারের খাজনা, মহাজনের ঋনের অত্যাচার সব মিলিয়ে মোপলাদের মনে ধীরে ধীরে অসন্তোষ দানা বাঁধছিল। এক সময় অত্যাচারের মাত্রা তীব্রতর হলে এই অসন্তোষের আগুন ছড়িয়ে পড়ে দীর্ঘস্থায়ী মোপলা বিদ্রোহের সৃষ্টি করেছিল একাধিক সময়ে (১৮৭৩-১৯২১)। কেরল রাজ্যের অধিবাসী দরিদ্র মোপলাদের ওপর শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার ও আক্রমণ এই বিদ্রোহের জন্ম দেয়। মোপলা বিদ্রোহ (“মালাবার আন্দোলন”, মালায়লাম ভাষায় মাপ্পিলা লাহালা নামে ও পরিচিত) ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনের এবং তৎকালীন উচ্চবিত্ত হিন্দুদের বিরূদ্ধে মুসলমান মোপলা সম্প্রদায়ের কৃষক সংগ্রাম, যা দক্ষিণ ভারতের মালাবার অঞ্চলের মোপলা মুসলমান এবং মোপলা বিদ্রোহীদের মধ্যে পুরো ১৯ শতক ধরে এবং ২০ শতকের শুরুর দিক পর্যন্ত চলতে থাকে। অনেক ঐতিহাসিকদের মতে মোপলা বিদ্রোহ মূলত ঔপনিবেশিক সরকারের বিরুদ্ধে কৃষক বিদ্রোহ। কেরলের মালাবার অঞ্চলের কৃষিজীবী মোপলাদের উত্থান ও বিদ্রোহ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে এক জ্বলন্ত সংযোজন।

১৮৫৭ সালে ভয়ঙ্করভাবে সিপাহী বিদ্রোহ দমনের মাধ্যমে ইংরেজরা পূর্ণরূপে ভারতের শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। চূড়ান্ত ক্ষমতা গ্রহণের পর ইংরেজ সরকার ভারতজুড়ে যে দমন নীতি চালায় তাতে নতুন করে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কোথাও বিদ্রোহের সামান্য সূত্র পেলেই কঠোরভাবে তা দমন করা হতো। তবে ইংরেজ সরকারের সকল দমন-পীড়ন উপেক্ষা করে ৫ টি সশ্রস্ত্র বিদ্রোহ পরিচালনা করে মালাবারের মোপলা মুসলমানরা। তাদের এ বিদ্রোহগুলো যথাক্রমে হয়েছিল ১৮৭৩, ১৮৮৫, ১৮৯৪, ১৮৯৬, ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে। মালাবারের ওয়ালুভানাদ ও এরনাদ তালুক জুড়ে দশ লক্ষ মোপালা চাষী সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে। ইতিহাসে এই সংগ্রাম প্রথম মোপলা বিদ্রোহ নামে পরিচিত। ব্রিটিশ সেনাদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে মোপলারা প্রাথমিক ভাবে পরাজিত হয়ে জঙ্গলে আশ্রয় নিলেও বিভিন্ন সময় চোরাগোপ্তা আক্রমণ ও গেরিলা যুদ্ধে আঘাত হানতে থাকে। ১৮৮৫ সাল নাগাদ দ্বিতীয় মোপলা বিদ্রোহ হয় যা দমন করতে ব্রিটিশ সরকার তিন হাজার সৈন্য ও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র নিয়োগ করে। এই দ্বিতীয় বিদ্রোহ দেড় বছর স্থায়ী হয়। তাদের নির্মম ভাবে দমন করা হয় ‘পিটুনি কর’ বসিয়ে ও দ্বীপান্তর পাঠিয়ে। বিদ্রোহীদের পরাজয় ঘটে। ১৮৯৪ সালে তৃতীয় মোপলা বিদ্রোহ এবং ১৮৯৬ তে চতুর্থ মোপলা বিদ্রোহ ঘটে। সবকটি বিদ্রোহই কঠোর ও নির্মম হাতে দমন করা হয়। চতুর্থ মোপলা বিদ্রোহে ভীত শাসকগোষ্ঠী জমিদারদের বর্ধিত খাজনা ও মহাজনদের সুদ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, যদিও সামন্তশ্রেণী তাদের বহু উপায়ে শাসন শোষন অব্যাহত রেখেছিল।

এই মোপলা বিদ্রোহ এর বিপ্লবীরা ছিল প্রত্যেকেই মুসলমান। আর যেহেতু সেখানকার রাজা-মহারাজা-জমিদার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সহযোগিতা ও সমর্থন করে আসছিল সেজন্য বিপ্লবী মোপলা বাহিনীরা বুর্জোয়াশ্রেণী হিন্দুদের শত্রু বলে মনে করতো। সমাজের নিম্নশ্রেণীর উপেক্ষিত ও শোষিত অমুসলমানরা প্রতিবারই মোপলা বিপ্লবীদের দলে যোগদান করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল কিন্তু সমাজের ধনী মধ্যবিত্তদের কুকৌশলে সেইসব অমুসলমানদের বোঝানো হয়েছিল যে এই মোপলা বিদ্রোহ আসলে হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক লড়াই। ফলে বহু অমুসলমান এই বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করার আন্তরিক ইচ্ছা থাকলেও নেতৃস্থানীয় ধনী মধ্যবিত্ত ইংরেজদের পদলেহীদের অপপ্রচারে তারা অংশগ্রহণ করতে পারেনি। শাসক ইংরেজরাও divide and rule এই পন্থা অবলম্বন করে সফল হয়। তাই অনেক ক্ষেত্রে ধর্মের অপব্যবহারের ফলে নীল বিদ্রোহের মত মিলিত হিন্দু-মুসলমান একত্রিত হতে পারেনি।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য মোপলা বাহিনীরা মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন ও মাওলানা মুহাম্মাদ আলীর খেলাফত আন্দোলনে রক্ত দিয়ে সহযোগিতা করেছিল। এই মোপলাদের প্রধান শত্রু ছিল পুলিশ, সামরিক বাহিনী, জমিদার ও মহাজন শ্রেণীর লোকেরা। ঐতিহাসিক V.C Smith মোপলা অভ্যুত্থানের সাম্প্রদায়িক চরিত্রের ঐতিহাসিক সত্যকে তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, মোপলারা সেই পুলিশ ও সামরিক বাহিনীকে, সেই জমিদার ও মহাজনকে আক্রমন করেছিলেন যাঁরা দীর্ঘদীন তাঁদের পদানত রেখে পিষ্ট রেখেছিল। এই প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক সুরজিৎ দাশগুপ্ত লিখেছেন, “তারা (মোপলারা) দেখেছিল যে ইংরেজদের বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রাম হিন্দু ধর্মাবলম্বী প্রতিবেশীরা তাদের সমর্থন করেনি, সাহায্য দেয়নি, এমনকি নিরপেক্ষও থাকেনি, বরং সর্বপ্রকার ইংরেজদেরই সাহায্য করেছে এবং যেসব পুলিশ ও সৈন্যবাহিনী তাদের দমনে এগিয়ে তারা হিন্দু ধর্মাবলম্বী। স্বাভাবিক কারণেই অশিক্ষিত দরিদ্র নিপীড়িত মোপলারা এক করে ফেলেছিল ইংরেজ ও হিন্দুকে।” (ভারতবর্ষ ও ইসলাম)

অত্যাচারী ইংরেজ সরকার এক প্রকার নাকাবন্দী করে রাখে মোপলাদের মালাবার এলাকা। মোপলাদের সভা-সমিতি ও সম্মেলন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। সে সময় এই সব অঞ্চলে চিঠিপত্র, টেলিগ্রাম ইত্যাদির আদানপ্রদান বন্ধ রাখা হয়। বাইরে থেকে আসা প্রত্যেকটি চিঠি পরীক্ষা করে তবে বিলি করা হতো। সামান্যতম সন্দেহ হলে সেগুলো বিনষ্ট করে ফেলা হতো। তবে সরকারি খবরাখবর আদান প্রদান অব্যাহত ছিল। কিন্তু এত দমন পীড়ন সত্ত্বেও বিপ্লবকে দমানো যায়নি, বরং ছাইচাপা বিদ্রোহের আগুন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্রোহ চলাকালীন বিদ্রোহীরা ঔপনিবেশিক রাজ্যের বিভিন্ন প্রতীক এবং প্রতিষ্ঠানের উপর যেমন টেলিগ্রাফ লাইন, ট্রেন স্টেশন, আদালত এবং ডাকঘরগুলিতে আক্রমণ করে। বিদ্রোহীরা এককাট্টা হয়ে শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখে। ফল হিসেবে ১৯২১ সালে মোপলারা মালাবারকে স্বাধীন বলে ঘোষণা করে এবং মালাবারের পবিত্র মাটিতে স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়ে দেয়। মালাবার বিদ্রোহের নেতা হাজী কুঞ্জাহামেদের নেতৃত্বে ছ’মাস স্থায়িত্বকাল স্বাধীন মুসলিম সরকার গঠিত হয়েছিল। এর পরই শুরু হয় ইংরেজ সৈন্যদের সাথে মোপলাদের ভয়াবহ সশস্ত্র লড়াই । ইংরেজ সৈন্যরা নৃশংসতার চূড়ান্ত সীমা লঙ্ঘন করে। একদিকে শাসক ইংরেজ ও তাদের ধামাধরা স্তাবকের দল, অন্য দিকে শাসিত শোষিত মৃত্যু পথযাত্রী বিপ্লবী দল। তাসত্বেও সাহসী ও লড়াকু মোপলারা ইংরেজ সৈন্যদের হাত হতে ওয়াতানাদ ও এরনাদ নামক দুটি স্থান ছিনিয়ে নিলে যুদ্ধ আরো জোরদার হয়। ইংরেজদের প্রতিহিংসার আগুন তীব্র আকার ধারণ করে।

মোপলা বাহিনী ইংরেজের সাহায্যকারী কিছু ভারতীয় নেতাদের এ সময় হত্যা করে। সেই সুযোগে চতুর ইংরেজরা মুসলমান কর্তৃক হিন্দু আক্রান্ত এ কথাটি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে প্রচার করে সাফল্য লাভ করে। ইংরেজের এ সমস্ত চক্রান্ত সরকারিভাবে গোপন রাখার চেষ্টা করা হলেও ভারতীয় নেতৃমহল তা জেনে যায়। প্রথমদিকে দেশের বুদ্ধিজীবী মহলের বৃহৎ অংশ মোপলাদের ওপর ভয়াবহ অত্যাচার প্রসঙ্গে নীরব থাকেন। পরবর্তীতে মাওলানা মহান আলী ও মাওলানা শওকত আলী মোপলা হত্যা এবং মিথ্যা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের খেলা বন্ধ করতে মালাবারে প্রবেশ করতে উদ্যত হলে ইংরেজ তাদের মালাবারে ঢুকতে বাধা দেয়। শাসকের বক্তব্য, কাউকে এখন মালাবারে ঢুকতে না দেওয়ার আইন চালু রয়েছে। এদিকে মানবাধিকারকে ধূলিসাৎ করে ব্রিটিশ সরকার মালাবারে সৈন্য, যুদ্ধট্যাঙ্ক, কামান, বোমা, গানবোট এবং রণতরী নিয়ে আসে। তার আগে ইংরেজী কায়দায় মুসলিম-অমুসলিমদের বিভেদের অপপ্রচারে অবিশ্বাস ও সাম্প্রদায়িক দূষণের বাতাবরণ তৈরি হয়েই ছিল। সুতরাং হিন্দুরা বিপ্লবী মুসলমানদের তাদের শত্রু মনে করে সাম্প্রদায়িক লড়াইয়ে নেমে পড়ে। একদিকে ইংরেজ শক্তি তো আছেই, অন্য দিকে বাড়িতে পল্লীতে হিন্দু-মুসলমান ভাই-ভাই-এ লড়াই এক বীভৎস রূপ নিল। যুদ্ধ চলল এক মাস। তারপর সুযোগ বুঝে কোন এক সকালে ইরেজরা আকাশ হতে বোমা বর্ষণ, রণতরী হতে শেল বর্ষণ, ট্যাঙ্ক ও কামান হতে গোলা বর্ষণ করে মোপলাদের ঘরবাড়ি, দোকান পাট ধ্বংস্তূপে পরিণত করে। বিদ্রোহী মোপলারা পরাস্ত হয়।

বিদ্রোহটি প্রায় ২,০০০ বর্গমাইল -র উপরে প্রসারিত হয়েছিল–মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির দক্ষিণ মালবার অঞ্চলের প্রায় ৪০%, আনুমানিক ১০,০০০ মানুষ প্রাণ হারায়, যদিও সরকারী পরিসংখ্যান অনুসারে ২৩৩৭ বিদ্রোহী নিহত হয়েছে, ১৬৫২ আহত হয়েছে এবং ৪৫,৪০৪ জন বন্দী রয়েছে। মানবাধিকারের সমস্ত নিয়মকে মাটিতে মিশিয়ে শিশু ও মহিলাদের উপর চলে অকথ্য অত্যাচার। বেসরকারি মতানুসারে প্রায় ৫০,০০০ জন বন্দী ছিল যাদের মধ্যে ২০,০০০ জনকে নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল। মূলত আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের দন্ডিত কলোনীতে, প্রায় ১০,০০০ নিখোঁজ ছিল।

এ অত্যাচারের ইতিহাসে আর একটি মর্মন্তুদ ঘটনা পাঠকদের সামনে তুলে ধরছি। বিপ্লবীদের মধ্যে বেঁচে ছিল এবং যাঁরা শিক্ষিত ও নেতৃস্থানীয় ছিল তাদের মধ্যে বাছাই করা আশিজনকে ট্রেনে একটি ছোট কামরায় দরজা জানালা বন্ধ করে কালিকটে নিয়ে যাওয়া হয়। চলার পথে তৃষ্ণায় কাতর হয়ে বন্দী বিপ্লবীদের গলা শুকিয়ে যায় এবং এক ফোঁটা জলের জন্য তারা হাহাকার করতে থাকে। নিষ্ঠুর ইংরেজ সৈন্যদের কানে হাহাকারের শব্দ পৌঁছায় না। তারা নির্লিপ্ত থাকে। ট্রেনের দমবন্ধ অন্ধকার কামরায় একে অপর জনের জিভ চুষে পিপাসা মেটাবার আপ্রাণ চেষ্টা করে। যখন ট্রেন কালিকট পৌঁছাল তখন দেখা গেল অধিকাংশই শহীদ হয়েছে। এই কুখ্যাত মর্মান্তিক ঘটনা “ওয়াগন ট্র্যাজেডি” নামে পরিচিতি। এতবড় একটা মর্মান্তিক কাণ্ড ঘটবার পরও সেই সময়ের ভারতীয় নেতৃবৃন্দ চুপ ছিলেন। খিলাফত কমিটির নেতা মাওলানা মুহাম্মদ আলী এই অমানবিক নিষ্ঠুর ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে কোন সর্বভারতীয় নেতার সমর্থন পাননি। স্বভাবতই তিনি খুব মর্মাহত হন এবং কংগ্রেসের উপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন।

ইতিহাসের পাতায় মুছে ফেলা মোপলা বিদ্রোহের প্রধান নেতারা হলেন আলী মুসুলিয়র, ভেরিয়াকুন্নাথ কুঞ্জমাহমদ হাজী, সিথি কোয়া থাঙাল, এমপি নারায়ণ মেনন, চেমব্র্যাসেরী থাঙাল, কে মইদেনকুট্টি হাজী, কপ্পড কৃষ্ণন নায়ার, কনন্নারা থানগল, পান্ডিয়াত নারায়ণন নামবীসান, এবং মোজিকুন্নাথ ব্রহ্মাথন নাম্বুদিরিপাদ।

ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা শুরু থেকেই ‘মালাবার বিদ্রোহ’ এবং বিদ্রোহীদের নেতা হাজী কুঞ্জাহামেদের প্রতি ছিল বিদ্বেষভাবাপন্ন। উপনিবেশ শাসনের বিরুদ্ধে মোপলা মুসলমানদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে তারা ‘সাম্প্রদায়িক আন্দোলন’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। নতুন করে ঘটনাটি আলোচনায় এসেছে মালাবার বিদ্রোহের শতবর্ষ উপলক্ষে একটি চলচ্চিত্র পরিচালনাকে কেন্দ্র করে। বিদ্রোহীদের নেতা কাজী কুঞ্জাহামেদের এক বায়োপিক তৈরীর বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদীরা। তারা কাজী কুঞ্জাহামেদকে লুটেরা এবং বিদ্রোহকে ‘সাম্প্রদায়িক’ আখ্যা দিয়ে এ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে বাধা দিয়ে আসছে। নির্মাতা অবশ্য সকল তিরস্কার এবং ভর্ৎসনা উপেক্ষা করে সত্য প্রকাশে নিজেকে বদ্ধপরিকর বলে ঘোষণা দিয়েছেন। হিন্দুত্ববাদীদের দাবি, মোপলারা সুপরিকল্পিতভাবে হিন্দুদের গণহত্যা করে। তাদের অভিযোগ, কুঞ্জাহামেদ মালাবারের স্থানীয় হিন্দুদেরকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করে। হিন্দুদের নির্যাতন করে। কিন্তু প্রকৃত ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা।

ইতিহাসের অধ্যাপক আব্দুর রেজ্জাক, কে এন পানিক্কর থেকে শুরু করে বহু ইতিহাসবিদ মালাবার বিদ্রোহ নিয়ে গবেষণা করেছেন। কোনও বইতেই ওই ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বলা হয়নি। অধ্যাপক আব্দুর রেজ্জাকের মতে, “আসলে ব্রিটিশ আর জমিদার শ্রেণী তার বাহিনীর কাছে নাস্তানাবুদ হয়েছিল, সেজন্যই তারা বিদ্রোহ হিসাবে না দেখিয়ে ১৯২১ এর ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বলার চেষ্টা করেছে। আর এই প্রচেষ্টা এখন নয়, ওই সময় থেকেই চলে আসছে।”

একশত বছর পেরিয়ে গেলেও ব্রিটিশ বিরোধী মোপলা বিদ্রোহ এখনো চেপে রাখা ইতিহাস। একশ বছর পরেও মোপালা কৃষকদের রক্ত সংগ্রামের প্রকৃত তথ্য ও কাহিনি ইতিহাসের শেষ পাতাতেও ঠাঁই পায় না। এ ভাবেই ভারতে ব্রিটিশবিরোধী মুসলিমদের সংগ্রামের ইতিহাস চাপা পড়ে মিথ্যাচারের কালো কাপড়ে।

দীপক সাহা : শিক্ষক ও কলামিস্ট।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post