• May 29, 2022

খড়গপুর আইআইটির ক্যালেন্ডার(২০২২)- প্রমাণের নামে ভারতের সিন্ধু ও বৈদিক সভ্যতা সম্পর্কে এক ধর্মীয় মৌলবাদী চিন্তার মিথ্যা প্রচার

 খড়গপুর আইআইটির ক্যালেন্ডার(২০২২)- প্রমাণের নামে ভারতের সিন্ধু ও বৈদিক সভ্যতা সম্পর্কে এক ধর্মীয় মৌলবাদী চিন্তার মিথ্যা প্রচার

রাধাপদ দাস
গত ১৮ই ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান খড়গপুর আইআইটির একটি বাৎসরিক ক্যালেন্ডার প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন ‘the calendar was aimed at bringing out the truth’.শিক্ষামন্ত্রীর মতে, এত দিন এক মিথ্যার ইতিহাস আমরা জানতাম, আগামী দিনে সেই সত্য তাঁরা প্রকাশ করবেন। এই ক্যালেন্ডার প্রকাশ করার পিছনে যাঁর প্রধান ভূমিকা তিনি হলেন অধ্যাপক জয় সেন। তিনি Centre of Excellence for Indian Knowledge System-এর চেয়ারম্যান। তিনি এই ক্যালেন্ডারের শুরুতেই উল্লেখ করেছেন ‘Rebutting the Aryan invitation myth. Recovery of the foundation of Indian knowledge system’ । অধ্যাপক জয় সেন হঠাৎ করেই এই কাজ করেছেন ভাবলে ভুল হবে। কারণ তিনি ২০১৯ সালে ইউটিউবে এক ভিডিও আপলোড করেছিলেন সেখানে তিনি দেখিয়েছেন যে আর্যদের ভারতে আগমনের ঘটনা কখনো ঘটেনি। এরপর ২০২১ সালে এক অনুষ্ঠানে আরএসএস এর প্রধান মোহন ভাগবত দাবী করেন ভারতীয়দের জিন ২০,০০০ বছরের পুরানো। আর তার পরেই আমরা দেখতে পেলাম জিন তত্ত্ব নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণার ফল ও ঐতিহাসিকদের নানা পরীক্ষা নিরীক্ষাকে অস্বীকার করে তাঁরা দাবী করলেন, সিন্ধু সভ্যতা ও ভারতীয় বৈদিক সভ্যতার মানুষ একই এবং ভারতে বৈদিক যুগের মানুষদের কোন অভিবাসন ঘটেনি। এ হল বিজ্ঞান চর্চার এক উন্নত প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে এক অবৈজ্ঞানিক তথ্যের পরিবেশন।
যদিও আইআইটির এই কাজ কর্মের বিরুদ্ধে নানা প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছে, যেমন এই খড়গপুর আইআইটির এক প্রাক্তনী আশীস রঞ্জন অনলাইন পিটিশান শুরু করেছেন। প্রখ্যাত লেখক টনি জোসেফ তাঁর ‘Early Indians’ গ্রন্থের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। তিনি সেখানে ভারতে সেই আর্য অভিবাসন নিয়ে সাম্প্রতিক জিন তত্ত্বের গবেষণার নানা ফলাফল দিয়ে দেখিয়েছেন এশিয়ার স্তেপ অঞ্চল থেকে ভারতে ১৫০০ খ্রিঃ পূঃ অব্দের সময় আর্যদের অভিবাসন হয়েছিল। তিনি এই প্রসঙ্গে বলেছেন ‘Distressing Transformation of Centre of Excellence”১
আর এক জন বিজ্ঞানী অনিকেত সুলে যিনি হোমি ভাবা সেন্টার ফর সায়েন্সের অধ্যাপক তিনি বলেছেন, ‘If scientific community remain silent there is a risk that the general public will believe such content.”২
আর একজন ঐতিহাসিক রোমিলা থাপারের নাম আমরা জানি,তাঁর একটি বক্তব্য এই প্রসঙ্গে বেশ উল্লেখযোগ্য, “proving Aryans to be indigenous to India is crucial for Hindutva forces to defend their ideology, even though historical findings do not tend to support that notion”.৩
এখন আমরা দেখে নেবো আইআইটি কতৃপক্ষ তাঁদের ক্যালেন্ডারে উপরোক্ত বিষয়ে কি কি যুক্তি তুলে ধরেছেন। যেমন- প্রথমত, ঋকবৈদিক সময়ে যোগী পুরুষরা স্বস্তিকা চিহ্নের ব্যবহার করতেন, আবার সিন্ধু সভ্যতার এক সিলেও স্বস্তিকা চিহ্নের অস্তিত্ব আছে। দ্বিতীয়ত, বৈদিক সভ্যতার সময়কালে বিভিন্ন যোগী পুরুষের উল্লেখ আছে, আবার সিন্ধু সভ্যতার একটি সিলে এক যোগী পুরুষের উপস্থিতি আছে।তৃতীয়ত, ঋকবেদে ষড় ঋতুর উল্লেখ আছে এবং সিন্ধু সভ্যতার এক সিলে একদিকে এক সিং গন্ডার ও ষাঁড়ের ছবির মাঝে বৃত্তাকার এক চিত্র ছয়টি খণ্ডে বিভক্ত যা ঋকবেদে উল্লেখিত ষড় ঋতুর সমান। চতুর্থত, সিন্ধু সভ্যতায় ব্রোঞ্জের তৈরী এক নারী মূর্তি পাওয়া গেছে ঐতিহাসিকরা যাকে এক নর্তকীর মূর্তি বলে উল্লেখ করেছেন, আইআইটির ক্যালেন্ডার নির্মাতাদের বক্তব্য সেই নারী মূর্তি হলেন মাতৃদেবী, সেই ভাবনা থেকেই ঋকবেদে উল্লেখিত মাতৃদেবী অদিতি। তিনি হলেন the mother of god। এছাড়াও ইলা, সরস্বতী এবং ভারতী। এই দেবী ভারতীর ভাবনা থেকে পরবর্তীকালে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতমাতার চিত্র অঙ্কন করেছেন।
উপরে উল্লেখিত যুক্তিগুলোকে সিন্ধু সভ্যতাকে বৈদিক সভ্যতা বলে উল্লেখ করার পিছনে যে কোন যুক্তি হতে পারে ভাবাই যায় না। দীর্ঘ প্রায় ১০০ বছর ধরে গবেষণা চলছে আইআইটি কর্তৃপক্ষর এই দাবীগুলোকে নিয়ে।তা কোন ঐতিহাসিক একবারও উল্লেখ পর্যন্ত করেননি।কারণ দুটি সভ্যতার ধারাবাহিকতা বোঝাতে হলে যে সমস্ত উপাদানের উপর ঐতিহাসিকদের নির্ভর করতে হয় উপরের দাবিতে তার কোনটাই নেই, সেই কারণে তাঁরা জেনেও উল্লেখ পর্যন্ত করেননি। একটি উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা বোঝা যাবে, যেমন সিন্ধু সভ্যতার একটি সিলে যেমন স্বস্তিকা চিহ্নের উল্লেখ আছে সেই সঙ্গে প্রাচীন ব্যবিলনীয়, চীন ও মায়া সভ্যতায়ও এই স্বস্তিকা চিহ্ন পাওয়া গেছে। তার মানে কি সিন্ধু সভ্যতার সাথে ঐ সমস্ত সভ্যতার সরাসরি যোগ থাকার প্রমাণ হয়ে গেল বোঝায়?
ইন্টারমিডিয়েট এভিডেন্স হিসাবে বৈদিক সভ্যতার লোকেরা যে ভারতীয়, বাইরে থেকে আসা কোন অভিবাসন জনগোষ্ঠি নয় তার প্রমাণ হিসাবে তাঁরা বিবেকানন্দ ও অরবিন্দের দুটি বক্তব্যকে তুলে ধরেছেন। ভাবতে অবাক লাগছে ঐতিহাসিক এক প্রমাণের বিষয়কে ঐতিহাসিকদের কোন বক্তব্যকে বাদ দিয়ে, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ফলাফলকে এড়িয়ে গিয়ে আধ্যাত্মিক ধর্মীয় মহাপুরুষদের বক্তব্যকে তুলে ধরা হচ্ছে দেশের এক উচ্চ বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান থেকে। এই প্রসঙ্গে রোমিলা থাপারের এক উক্তি বেশ প্রাসঙ্গিক। (ভারতবর্ষ: ঐতিহাসিক সূচনা ও আর্য ধারণা – রোমিলা থাপার, জোনাথান মার্ক কেনোয়ার, মাধব এম দেশপান্ডে ও শিরীন রত্নাগর।) বইএর শুরুতে রোমিলা থাপার উল্লেখ করেছেন,“আর্য সম্বন্ধে ভারতীয় চিন্তা চেতনার আলোচনায় ঐতিহাসিকগণের মতামতের অপেক্ষা অধিকাংশ সময় অরবিন্দ, বিবেকানন্দ, দয়ানন্দ ও তিলকের মন্তব্য পেশ করা হত, যাঁরা প্রথমত দার্শনিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। অনেক ক্ষেত্রেই এঁরা প্রাচীন হিন্দু চেতনার যে ঐতিহ্য তাকেই উপস্থিত করতেন একথা ভুলে গিয়ে যে, তাঁরা মুলত ঔপনিবেশিক কথোপকথনের মধ্যে দাঁড়িয়েই এই বিতর্ক তুলে ধরছেন”৪। দেশে ধর্মীয় এক মৌলবাদী উন্মাদনা তৈরী করতে হলে যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ধর্মীয় মহাপুরুষদের বক্তব্যকে সামনে আনতে হবে, আইআইটির ক্যালেন্ডারও সেই উদ্দেশ্যেই তৈরী হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এখন আমরা দেখে নেবো ঐতিহাসিকরা ঠিক কি কি কারণে সিন্ধু সভ্যতাকে বৈদিক সভ্যতার থেকে আলাদা ভাবে দেখেছেন এবং ঋকবৈদিক সময়ের মানুষদেরকে বহিরাগত বা আর্য অভিবাসন বলেছেন তার সপক্ষে যুক্তি গুলি হল নিম্নরূপ।
বিখ্যাত ঐতিহাসিক রিচার্ড সলোমন, যিনি মূলত ভারতের প্রাচীন লিপি নিয়ে গবেষনা করছেন, তিনি তাঁর ‘এপিগ্রাফি ইন ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন:“But practically nothing is known of what might have happened in the longperiod between (very roughly) 1750 and 260 B.C. Certain bits of evidence have beenproposed as missing links between the proto-historic and historical writings”৫।কারণ ১৭৫০ খ্রিঃ পূর্বাব্দ থেকে ২৬০ খ্রিঃ পূর্বাব্দ পর্যন্ত সময়কালে অর্থাৎ প্রায় ১৭০০ বছরের ভারতে, কোন লিপির সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি। যদি ভারতীয়রা ঐ ১৭০০ বছরের সময়কালে লিখতে জানত তাহলে সিন্ধু লিপি, কিউনিফর্ম লিপি বা হায়ারোগ্রিফিক লিপির মতই এই সময়ের ভারতীয় লিপির ও কিছু না কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক চিহ্ন পাওয়া যেত। ভারতের সবথেকে প্রাচীন লিপি যা সিন্ধু সভ্যতার মানুষ ব্যবহার করত(৩৫০০ খ্রিঃ পূর্বাব্দ থেকে ১৭৫০খ্রিঃপূর্বাব্দপর্যন্ত) সেই সিন্ধু লিপি এখনো পাঠ করা সম্ভব হয়নি।ভারতের সব থেকে প্রাচীন লিপি যা পাওয়া গেছে এবং পাঠ করা সম্ভব হয়েছে তা হল ব্রাহ্মী লিপি। ২৫০ খ্রিঃ পূঃ নাগাদ মৌর্য সম্রাট অশোকের সময় এই লিপির প্রচলন ছিল। আর ভারতের সংস্কৃত ভাষার প্রাচীনত্ব নিয়ে যে এত প্রচার করা হয়, আর্যরা যে সংস্কৃত ভাষায় কথা বলতেন, সেই সংস্কৃত ভাষার লিপির প্রচলন হয়েছে তারও প্রায় ৪৫০ বছর পরে, প্রায় খ্রিষ্ঠীয় দ্বিতীয় শতকে, আর এই সংস্কৃত ভাষার প্রসার ঘটে তারও প্রায় ২০০-৩০০ বছর পরে, প্রায় খ্রিষ্ঠীয় চতুর্থ বা পঞ্চম শতকে। “Sanskrit was adopted as an epigraphic medium in the 2nd century A.D and its use became widespread in the fourth and fifth century”৬ অতএব এই ১৭৫০ খ্রিঃ পূঃ থেকে খ্রিষ্ঠীয় ৫ম শতক, প্রায় ২২৫০ বছর পর আর্যরা কথা বলত যে ভাষায়, সেই সংস্কৃত ভাষার লিখিত রূপ বা লিপির প্রচলন হল। অর্থাৎ যাদের আমরা আর্য ভাষাভাষী মানুষ বলব তাদের সম্পর্কে এটা জানা আছে যে তাদের কার্যকলাপের ২২৫০ বছরের কোন লিখিত ইতিহাস নেই। যারা সিন্ধু সভ্যতার সময়কালে লিখতে পারত তারা আবার ২২৫০ বছর লিখতে ভুলে গেল বা লিখলেও তার কোন প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমান পাওয়া যাবে না, তা কখনো যুক্তিগ্রাহ্য বা বিজ্ঞান সন্মত হতেই পারেনা।
আর্যদের যাযাবর বৃত্তির কারণে ভারতে আগমনের পিছনে ঐতিহাসিকদের যুক্তি হল, ভারতের প্রাচীন নগরকেন্দ্রিক সিন্ধু সভ্যতার নির্মাতারা যদি আর্য হত তাহলে ৩৫০০-১৫০০ পর্যন্ত যে মানুষরা নগর সভ্যতা নির্মাণ করে বসতি স্থাপন করতে পারল তারপর হঠাৎ করে তাদের নগর সভ্যতার বিলোপ ঘটে গিয়ে গ্রামীন সভ্যতার বিকাশ কেন হল? পৃথিবীর অগ্রগতির ইতিহাস যদি দেখা যায় তাহলে আমরা দেখতে পাবো, বিবর্তনের মাধ্যমে মানব সভ্যতার অগ্রগতি ক্রমশ আরো উন্নত হয়েছে। মানব সমাজের যে সম্প্রদায় পোড়া ইটের ব্যবহার, উন্নত পয়ঃপ্রণালী, রাস্তাঘাট সহ উন্নত নাগরিক জীবন যাপন করত, তারা হঠাৎ করে সেই সব ভুলে গিয়ে গ্রামীন পশুচারণ বৃত্তি গ্রহণ করেছে—এটা কখনো সম্ভব হতে পারে না।
দ্বিতীয়ত, পোড়া ইটের ব্যবহার, সিন্ধু সভ্যতার মানুষ ইট পুড়িয়ে ঘর বাড়ি বানাতে জানত এবং পৃথিবীর সমসাময়িক আর কোনও সভ্যতার মানুষ সেই সময় পোড়া ইটের ব্যবহার জানত না। বিখ্যাত ঐতিহাসিক রামশরণ শর্মা তাঁর বিখ্যাত ‘ইন্ডিয়া:এনসিয়েন্ট পাস্ট’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন,“when Harappa used burnt bricks, at the same time Egypt used dried bricks and Mesopotemia baked bricks.’’৭ কিন্তু বৈদিক সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে তা ছিল এক অজানা বিষয়। শুধু তাই নয়, বৈদিক সভ্যতার মানুষদের ভারতে আসার সময়কাল হিসাবে যে ১৫০০ খ্রিঃ পূঃ নাগাদ ধরা হয় তারও প্রায় ১২০০ বছর পর ভারতে আবার ইটের ব্যবহারের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ঐতিহাসিকরা দেখিয়েছেন,হরপ্পা-উত্তর ভারতে ইটের ব্যবহারের প্রথম চিহ্ন পাওয়া যায় আনুমানিক ৩০০ খ্রিঃ পূঃ নাগাদ গাঙ্গেয় উপত্যকা অঞ্চলে। যদিও এর প্রচলন শুরু হয় খ্রিঃ পূঃ ২০০ অব্দ নাগাদ।৮ সিন্ধু সভ্যতার অধিবাসীদের সাথে যদি সামান্যতম কোন যোগাযোগ থাকত তাহলে এরা সেই ১৫০০ খ্রিঃ পূঃ থেকেই শুধু ইটের ব্যবহার জানত তাই নয় ভারতে তাজমহল বানানোর জন্য শাহাজাহানকে ১৬৪০ খ্রিঃ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হত না, তার থেকেও আরো ভালো কিছু ইমারত তার কয়েক হাজার বছর আগেই আমরা দেখতে পেতাম, বর্তমানে যা ঐতিহাসিক স্থান হিসাবে পৃথিবীর মানচিত্রে জায়গা করে নিত। সেখানে তাজমহলের মতো কোন মুসলিম ছোঁয়াও থাকত না। ফলে যোগীর দলবলকে তাজমহলের মতো নিদর্শনকে ভেঙে ফেলার হুমকিও দিতে হত না।
বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক অশোক মুখোপাধ্যায় (সাধারণ সম্পাদক, সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সায়েন্স অ্যান্ড সোসাইটি, কলকাতা) তাঁর ‘প্রাচীন ভারতের ইতিহাস: বিশ্বাস বনাম যুক্তিতথ্য’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন,“সিন্ধু সভ্যতার অবসান বা ধ্বংসকালে (আনুমানিক ২০০০-১৫০০ অব্দ) যারা দলে দলে এসে এই একই অঞ্চলে ও তার আশপাশের অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিল, নৃতত্ত্ববিদদের মতে তারা ছিল আলপিনয়েড (alpinoid), দিনারিক (dinaric), আর্মেনয়েড (armenoid), ও নর্ডিক(nordic) নৃজাতি গোষ্ঠির বংশধর। ঐতিহাসিক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ভারতবর্ষের সাপেক্ষে আমরা তাদের সাধারণভাবে বৈদিক জনজাতি সমূহ (vedic tribe) হিসাবেই একমাত্র চিহ্নিত করতে পারি(যদিও এদের মধ্যে কারা বৈদিক সাহিত্য রচনায় অংশগ্রহণ করেছিল তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়)। কারণ, তারা তখনও একটা কোনো বিশুদ্ধ জনজাতির লোক ছিল না। তাদের মধ্যে ছিল বহুরকম জনজাতি (tribe), প্রত্যেকটা জনজাতি আবার অনেক গণ (clan) গোত্র (phratry) প্রবর বা বংশ (kin) ইত্যাদিতে বিভক্ত ছিল।”৯
তৃতীয়ত, সিন্ধু সভ্যতার মানুষ ঘোড়ার ব্যবহার জানত না, সমগ্র সিন্ধু সভ্যতা এলাকায় প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কার্যের ফলে কোথাও ঘোড়ার হাড়ের বা জীবাশ্মের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। অথচ আর্যদের সঙ্গীই ছিল ঘোড়া। ঐতিহাসিকরা তা নানা ভাবে প্রমাণ করে দেখিয়েওছেন। পৃথিবীতে ঘোড়ার আবির্ভাব ও বিস্তার নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেছেন তাঁরা দেখিয়েছেন যে প্রায় ছয় লক্ষ বছর আগে দক্ষিণ উরালের পার্বত্য এলাকা ও ব্ল্যাক সি এলাকায় প্রথম ঘোড়ার জীবাশ্মের সন্ধান পাওয়া যায়। তার পর তিন লক্ষ বছর আগে দক্ষিণ সাইবেরিয়া অঞ্চল,৬০০০ খ্রিঃপূঃ উরাল অঞ্চল, ইউরেশিয়া অঞ্চলে ঘোড়ার চিহ্ন পাওয়া যায় ২০০০খ্রিঃপূঃ নাগাদ।১০ রিচার্ড মিডো, যিনি ঘোড়ার বিবর্তন নিয়ে গবেষণা করেছেন তিনি দেখিয়েছেন যে ২০০০ খ্রিঃপূঃ নাগাদ ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম ঘোড়ার চিহ্ন পাওয়া যায়। তিনি আরো দেখিয়েছেন যে বালুচিস্থানের বোলান গিরিপাসের কাচি সমতল এলাকায় প্রথম প্রকৃতপক্ষে ঘোড়ার চিহ্ন পাওয়া যায় ১৭০০ খ্রিঃপূঃ নাগাদ। পরবর্তী কালের প্রত্নতাত্বিক বহু উদাহরণে ভারতে বহু ঘোড়ার চিহ্ন পাওয়া যাচ্ছে।১১ হরিয়ানার ভগবানপুরাতে চিত্রিত ধূসর মৃৎপাত্রের সাথে ঘোড়ার হাড়ের সন্ধান পাওয়া গেছে, যার সময় কাল ১৬০০ থেকে ১০০০ খ্রিঃ পূঃ মধ্যে।১২ ঋকবৈদিক মানুষদের কাছে ঘোড়া কত পরিচিত এক পশু ছিল তা বোঝানোর জন্য ঐতিহাসিক রামশরণ শর্মা দেখিয়েছেন যে “ঋকবেদে asva(ঘোড়া) ২১৫ বার, go(গরু) ১৭৬ বার, vrasbha (ষাঁড়) ১৭০ বার উল্লেখ আছে, কিন্তু রাইনোসর বা বাঘের কোন উল্লেখ নেই।১৩ এখানে একটা বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে যে সিন্ধু সভ্যতার যে সমস্ত প্রত্নবস্তু পাওয়া গেছে সেখানে কিন্তু বাঘ বা রাইনোসরের সাক্ষ্য পাওয়া গেছে। যদি সিন্ধু সভ্যতা ও ঋক বৈদিক সভ্যতার মানুষ একই হত তাহলে কেন তাদের সাহিত্যে বাঘ বা রাইনোসরের একবারের জন্যও উল্লেখ থাকল না? ঐতিহাসিকরা এই বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার সাহায্যে এটা জানা সম্ভব হচ্ছে যে সিন্ধু সভ্যতার সময়কালে ভারতে ঘোড়ার কোন চিহ্ন পাওয়া যায়নি; সুতরাং সেই সময় ভারতে ঘোড়ার উপস্থিতি থাকাও সম্ভব নয়। আর আর্যদের ভারতে অনুপ্রবেশের সাথে সাথেই ভারতে ঘোড়ার উপস্থিতির নানা প্রত্নতাত্ত্বিক চিহ্ন পাওয়া যাচ্ছে। রোমিলা থাপার“History of early India from origin to AD 1300” গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে “Horse and chariot were introduced from central Asia in the 2nd millennium BC”।১৪ অতএব এই ঘোড়ার উপস্থিতির চিহ্ন থেকে ঐতিহাসিকরা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন যে সিন্ধু অধিবাসীদের সাথে বৈদিক যুগের কোন সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং নৃজাতিগত যোগাযোগ ছিল না। মধ্য এশিয়া থেকে তারা ঘোড়া ও রথ সহযোগে উত্তর পশ্চিম দিক দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে। আর যে রথ আর্য ভাষাভাষী মানুষের সঙ্গী ছিল সেই রথের ব্যবহার প্রথম দেখা যায় ২০০০খ্রিঃ পূঃ নাগাদ এশিয়া মাইনর অঞ্চলে, এরপর ইজিয়ান অঞ্চলে ১৫০০ খ্রিঃ পূঃ নাগাদ, ক্রীটে দেখা যায় ১৪৫০ খ্রিঃ পূঃ নাগাদ, আর ইজিপ্টে ১৫৫০ খ্রিঃপূঃ নাগাদ প্রথম আমেন হোটেপের সময়।১৫
আমরা আগেই দেখেছি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের একটি সদস্য হল সংস্কৃত। ঐতিহাসিকদের ব্যাখ্যা অনুসারে মধ্য এশিয়া থেকে অভিবাসনের মাধ্যমে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠীর মানুষেরা দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একটি গোষ্ঠী ইউরোপে পৌঁছায় এবং অপর গোষ্ঠী ইরানে, সেখান থেকে আবার একটি গোষ্ঠী বিভাজিত হয়ে উত্তর-পশ্চিম ভারত আক্রমণ করে। এই ভাষা পরিবারের মানুষদের মধ্যে যে ভাষাগত বেশ সাদৃশ্য এখনো টিকে আছে ঐতিহাসিকরা তা ভাষাতাত্ত্বিক দিক দিয়ে প্রমাণও করেছেন। বিখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী পি সসেটি যিনি ১৫৮১ থেকে ১৫৮৮ পর্যন্ত গোয়ায় বসবাস করেন তিনি দেখিয়েছেন যে সংস্কৃত ও ইতালীয় ভাষার মধ্যে বহু শব্দগত সাদৃশ্য বর্তমান। বিশেষ করে ছয় থেকে নয় অবধি সংখ্যাবাচক শব্দ, দেবতা, সর্প সহ আরো বেশ কয়েকটি শব্দে এই রকম মিল পাওয়া যায়।১৬ আর এক ফরাসী ভাষা বিজ্ঞানী পি. ক্যোরডু ১৯৪৭ সালে ফ্রেঞ্চ একাডেমিকে সংস্কৃত, গ্রীক ও ল্যাটিন ভাষার মধ্যবর্তী সাদৃশ্য জানান এবং বলেন যে এই সাদৃশ্য মানুষের আদিম ভাষার অভিজ্ঞান স্বরূপ। তিনি উভয় ভাষার মধ্যে তুলনা করে দেখিয়েছেন, যেমন- সংস্কৃত দানম ‘উপহার’, দেবাস ‘দেবতা’, জানু ‘হাঁটু’, মধ্যস ‘মধ্য’, এগুলোর ল্যাটিন হল দোনম(Donum),দেউস(deus), জেনু (Genu),ইত্যাদি।১৭ আর একজন ঐতিহাসিক স্টুয়ার্ট পিগট তিনি ‘প্রিহিস্টোরিক ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে “Today we can recognize the Indo-European group oflanguagesas a relativelyjunior member ofthe Old World linguisticfamily, evolving at a time when such languages asSumerian and those in the Hemitic and Semitic groups wereof respectable antiquity”১৮।তিনি আরো দেখিয়েছেন ox বা ষাঁড়কে লাঙল বা চাষের কাজে লাগানো হতো, ইজিপ্ট, সুমের ও মেসোপটেমিয়া সভ্যতায়ও একই কালচার ছিল, আর এরা উভয়েই একই ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের সদস্য ছিল। এখানে কোথাও yak বা চমরিগাই-এর উল্লেখ নেই।১৯ আর্যদের ব্যবহারের রথ ইন্দো-ইউরোপীয় শব্দ (wheel), Latin- rota, German- rad, Lithuanian– ratas, ইত্যাদি। এই রকম বহু শব্দ ব্যাখ্যা করে তাঁরা দেখিয়েছেন যে এই ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের মধ্যে এক আত্মিক সম্পর্ক ছিল।২০ আর সংস্কৃত হল এই ভাষা পরিবারের মধ্যে একেবারে নবীন সদস্য।২১ আবার খ্রিঃ পূঃ চতূর্দশ শতকে মিট্টানি-ইট্টাইট চুক্তিতে যে ইন্দো-ইরানীয় শব্দ পাওয়া যায় তা ঋকবেদের ভাষার থেকেও প্রাচীন।২২ আবার ঋকবেদের বহু জিনিস যে প্রাচীন নানা গ্রন্থে পাওয়া গেছে ঐতিহাসিকরা তা ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন, যেমন রামশরণ শর্মা; তিনি ‘ইন্ডিয়ান এনসিএন্ট পাস্ট’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন “The Rig Veda has many things incommon with the Avesta, which is the oldest text in the Iranian language. Thetwo texts use the same terms for several gods and even for social classes”২৩ ।
তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের লিপি প্রথম পাওয়া গেছে ২২০০ খ্রিঃ পূঃ ইরাক থেকে। তারপর এইরকম উদাহরণ পাওয়া যায় ১৯০০-১৭০০ খ্রিঃপূঃ হিট্টাইট লিপি আনাতোলিয়া (তুরস্ক) থেকে। এরপর মাইসোনিয়ন লিপি পাওয়া যায় ১৪০০ খ্রিঃ পূঃ গ্রিস থেকে। আর্য নামের প্রথম সন্ধান পাওয়া যায় ১৬০০ খ্রিঃ পূঃ নাগাদ ইরাকের কাসাইট লিপি, ১৪০০ খ্রিঃপূঃ নাগাদ সিরিয়ার মিট্টানি লিপি থেকে।২৪ কিন্তু ভারতের সংস্কৃত ভাষার লিপির কোন উদাহরণ ঐ সময় তো দূরের কথা, তারও প্রায় ১৫০০ বছর পরে পাওয়া গেছে। এই রকম বহু প্রমাণ সাপেক্ষে অন্যান্য ঐতিহাসিকের মতো রামশরণ শর্মাও দেখিয়েছেন যে, “The Aryans migrated to India in several waves. The earliest wave isrepresented by the Rig Vedic people, who came to the subcontinent in about1500 BC”.২৫
ভারতে এই বৈদিক সভ্যতার মানুষদের বাণিজ্যিক কাজকর্মের কোন প্রত্নতাত্ত্বিক উদাহরণ এখনো পাওয়া যায়নি। অথচ সিন্ধু অধিবাসীরা যে নানা বাণিজ্যিক কাজকর্মে লিপ্ত ছিল তার বহু প্রমাণ ঐতিহাসিকরা পেয়েছেন। ২৪০০- ২১৫০ খ্রিঃপূঃ নাগাদ কিছু হরপ্পীয় সীল মোহর সুমের ও নিম্ন মেসোপটেমিয়ায় পাওয়া গেছে, সুমেরীয় গ্রন্থে মেলুহার সাথে বাণিজ্যের উল্লেখ আছে,আর ঐতিহাসিকরা এই মেলুহা পশ্চিম ভারতে অবস্থিত বলে উল্লেখ করেছেন।২৬ আর এই বানিজ্যের সাথে যুক্ত ছিল বৈদূর্যমণি, জেডপাথর, আম্যাজনীয় মণি ইত্যাদি যা সিন্ধু সভ্যতার মানুষ ব্যবহার করত।২৭ আর একজন বিখ্যাত ঐতিহাসিক যিনি দীর্ঘদিন ধরে হরপ্পার নানা খোঁড়াখুঁড়ি থেকে শুরু করে বিভিন্ন গবেষণার প্রকল্পে যুক্ত ছিলেন সেই জোনাথন কেনোয়ার তাঁর‘The Ancient City of Harappa’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন যে,“Texts from Mesopotomian cities state that “onion”, cotton, hardwood, pearls, carnelian, peacock and monkey were imported from the land of Meluhha, which can be identified as the Indus velley”.২৮ কিন্তু আর্যরা যে এই সমস্ত মূল্যবান জিনিস ব্যবহার করতো তার কোন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এখনো পাওয়া যায়নি, এছাড়া বানিজ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ওজন ও পরিমাপ পদ্ধতি, যা সিন্ধু সভ্যতার মানুষ যে ব্যবহার করতো তার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনও পাওয়া গেছে; কিন্তু বৈদিক যুগের মানুষের এই রকম জিনিসের ব্যবহারের কোন নিদর্শন বা উল্লেখ কোথাও পাওয়া যায়নি।
অতি সম্প্রতি বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে জিন তত্ত্ব নিয়ে গবেষণারও অনেক উন্নতি হয়েছে। টনি জোসেফ এর ‘Ancient Indians’ এবং David Reich এর ‘Who We are and how we get here’ গ্রন্থে তাঁরা এই বিষয়ে এই জিন তত্ত্বের গবেষণার ফলাফল নিয়ে বর্ণনা দিয়েছেন। সেখানে তাঁরা দেখিয়েছেন যে, মেয়েদের মাইটো কন্ড্রিয়া DNAআর ছেলেদের Y-DNA থাকে, এই দুটি জিন নারী ও পুরুষদের একেবারে স্বতন্ত্র।২৯ ভারতে এই মাইট্রোকন্ড্রিয়া DNA তে গত সাড়ে ১২ হাজার বছর থেকে আজ পর্যন্ত মহিলাদের মধ্যে খুব বেশি বাইরের জিনের অনুপ্রবেশ ঘটেনি। কিন্তু Y-DNA তে গবেষণার ফলাফল থেকে জানা যায় যে আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে ভারতের পুরুষদের মধ্যে বাইরের জিনের অনেক মিশ্রণ দেখা গেছে।৩০ Y-DNAতে যে জিন ভারতের পূরুষদের মধ্যে প্রায় চার হাজার বছর আগে প্রবেশ করেছিল বিজ্ঞানীরা তার নাম খুঁজে বের করেছেন, তার নাম দিয়েছেন R1a। বর্তমানে ভারতে ১৭.৫% লোকের মধ্যে এই জিন আছে। সম্প্রতি সারা পৃথিবী থেকে নমুনা সংগ্রহ করে বিজ্ঞানীরা একটা প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন যাতে দেখানো হয়েছে এই R1a জিনের প্রথম সূত্রপাত হয়েছে ইরানের নিকটবর্তী একটা স্থানে।৩১ এই পরস্পর বিরোধী দুই তথ্যের থেকে ঐতিহাসিকদের অনুমান ঐ চার হাজার বছর আগে ভারতে উত্তর-পশ্চিম দিক দিয়ে যে অভিবাসন হয়েছিল সেখানে মহিলাদের থেকে পুরুষদের সংখ্যা অনেক বেশী ছিল। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেখানে এক দল অপর দলকে পরাজিত করে দেশ দখল করেছে সেখানে এই ঘটনাই ঘটেছে।৩২
‘Early Indian’ গ্রন্থে টনি জোসেফ দেখিয়েছেন, ভারতে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম অংশের লোকেরা দুধ ও দুধ জাতীয় খাবার খেতে পছন্দ করে, কিন্তু তারা মাংস এত পছন্দ করে না। আবার পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতের মানুষ দুধের পরিবর্তে মাংস বেশি পছন্দ করে। এই দুধ হজম করার জন্য যে জিনটা প্রয়োজন তার নাম 13910T । যেটা ৭৫০০ বছর আগে ইউরোপে প্রথম শুরু হয়েছে। এই জিনটা উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতে মানুষের মধ্যে ৪০% পূর্ব ও দক্ষিন ভারতের মানুষের মধ্যে ১% এরও কম।
টনি জোসেফ তাই উল্লেখ করেছেন যে, তথাকথিত এই আর্য অভিবাসন ভারতের উত্তর-পশ্চিম দিক দিয়ে হয়েছিল জিনের গবেষণার মাধ্যমে তার প্রমাণ আজ পাওয়া যাচ্ছে।৩২
ইন্দো-ইরানীয় ও ঋকবেদের যুগের মানুষেরা যে সোমরস ব্যবহার করত নিজের শরীরকে উত্তেজিত করার জন্য, এটা এক ধরণের উত্তেজক পানীয়। এই সোম রস তৈরী হয় যে গাছ থেকে সেই গাছের নাম হল এফেড্রা। সেই এফেড্রা গাছ পাওয়া যায় পূর্ব ইরান ও দক্ষিণ আফগানিস্থানে। এই এফেড্রা গাছের পল্লবগুলি তুর্কমেনিস্থানের পান পাত্রে পাওয়া গেছে। যেগুলির সময়কাল ২০০০ অব্দের আগে। তাই এই ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠির মানুষেরা ইরান হয়ে ভারতের উত্তর-পশ্চিম দিক দিয়ে যে ভারতে প্রবেশ করেছিল সোমরসের ঘটনা এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসাবে গণ্য করা যেতে পারে।৩৩
ভারতের আরএসএস এর প্রবক্তারা যে নিজেদেরকে প্রকৃত আর্য বলে উল্লেখ করছেন এবং সেই আর্যদের প্রকৃত বাসস্থান ভারত বলে দাবি করেন। আমরা যদি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ইতিহাস পর্যালচনা করি তাহলে দেখতে পাবো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষেরা বিভিন্ন সময়ে এই দাবি উত্থাপন করে নিজের দেশে এক উগ্র জাতিয়তাবাদী উন্মাদনা তৈরি করেছেন। ভারতেও আজ এক মিথ্যা দাবীকে ভিত্তি করেই সেই উন্মাদনা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। এখন আমরা দেখে নেবো সেই রকম কিছু দৃষ্টান্ত। Madison grants ‘the passing of the great race’ 1916 a best seller in the U.S. দেখিয়েছেন আমেরিকার বিশুদ্ধ আর্য রক্তের মিশ্রনের ফলেই আমেরিকার জাতির মধ্যে নিম্ন জাতির প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই জন্য আমেরিকার white supremacist দল নিজেদের কে প্রকৃত আর্য বলে দাবী করে। এই দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলারও চেষ্টা করেন।
বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে বিজ্ঞানী গুস্তাভ কোসিনো আর্কিওলোজির মাধ্যমে দেখালেন যে আর্যদের প্রকৃত বাসস্থান জার্মানি। এই কোসিনোর তত্ত্বকে ভর করেই জার্মানিতে আর্য জাতিকে কেন্দ্র করেই হিটলারের উত্থান।
রাশিয়ার কিছু আধুনিক জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠি যারা নিউ পেগান আন্দোলনে ছিলেন তাঁরা দাবী করলেন স্লাভ জনগোষ্ঠির মানুষদের সাথে আর্যদের সরাসরি সংযোগ আছে।
পরিশেষে একটা কথা এই প্রসঙ্গে খুব গুরুত্বপূর্ণ। গত ১২ই জানুয়ারী বিবেকানন্দের জন্মদিন উপলক্ষ্যে কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক “নিউ ইন্ডিয়া সমাচার” নামে যে পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশ করেছে বর্তমান সরকারের কাজকর্মের প্রচারের জন্য সেখানে ‘নতুন ভারতের অমৃত যাত্রা’ নামক নিবন্ধে বলা হয়েছে, ‘ভক্তি আন্দোলনই ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা করেছিল, ভক্তি যুগে স্বামী বিবেকানন্দ, চৈতন্য মহাপ্রভু এবং রমন মহর্ষি আধ্যাত্মিক জাগরণ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। এটাই ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের প্রেক্ষাপট হিসাবে কাজ করেছিল”, যা দেখে দেশের ইতিহাসবিদ থেকে শুরু করে বহু সাধারণ মানুষ এর প্রতিবাদ করেছেন।ইতিহাসবিদ তনিকা সরকারের মতে, ‘ভক্তি আন্দোলনের সাথে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের কোন যোগ নেই। ভক্তি আন্দোলন হয়েছিল মূলত ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র, মন্দির-মসজিদের নিয়ন্ত্রণ ও জাতপাতের ভেদাভেদের বিরুদ্ধে’। আর বিবেকানন্দের জন্ম ১৮৬৩ সালে এবং রমণ মহর্ষির জন্ম ১৮৭৯ সালে সিপাহী বিদ্রোহের অনেক পরেই।৩৪ আজ এই কেন্দ্রীয় সরকার মাত্র ১৭০ বছর আগের মহাবিদ্রোহের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই যদি এক মিথ্যা প্রচারের এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে, তাহলে ৩৫০০-৪০০০ বছরের আগের সিন্ধু সভ্যতা এবং বৈদিক যুগের অভিবাসন নিয়ে কেন মিথ্যা তথ্য প্রচার করবেনা? হিটলারের প্রচার মন্ত্রী গোয়েলবসের নীতি অনুসারে, “মিথ্যা বল, বারে বারে বল, জোর গলায় বল, মিথ্যা সত্যে পরিণত হবে”—আজকে আমাদের দেশের শাসক শ্রেণীও সেই নীতি অনুসরণ করেই মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করার রাস্তাতেই নেমেছেন।

রাধাপদ দাস : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post