• May 29, 2022

ভীমা-কোঁরেগাও মামলায় জামিনপ্রাপ্ত সমাজকর্মী সুধা ভরদ্বাজের সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারঃদ্বিতীয় পর্ব

 ভীমা-কোঁরেগাও মামলায় জামিনপ্রাপ্ত সমাজকর্মী সুধা ভরদ্বাজের সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারঃদ্বিতীয় পর্ব

[ সুধা ভরদ্বাজ নামটা অধিকার আন্দোলনের জগতপ বহু আলোচিত। বিশিষ্ট আইনজীবী, ট্রেড ইউনিয়ন অ্যাক্টিভিস্ট,সমাজকর্মী সুধা ভীমা-কোঁরেগাও মামলায় অভিযুক্ত হয়ে এতদিন কারান্তরালে ছিলেন।বর্তমানে তিনি শর্তাধীন জামিনে জেলের বাইরে।ছত্তিসগড় নিবাসী সুধাকে জামিনের শর্ত মেনে মুম্বাইতে তার জীবন নতুন করে শুরু করতে হচ্ছে। সম্প্রতি rediff.com এ তার এক সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে।সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নীতা কোলহাতকর।সেই কথোপকথনের নির্বাচিত অংশের অনুবাদ রইল পূর্বাঞ্চলের পাঠকদের জন্য। অনুবাদ করেছেন সুমন কল্যাণ মৌলিক ]

যখন জেলের ভেতর আপনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলেন তখন অবস্থাটা কেমন ছিল?

  • প্রথমে একটা কথা সবাইকে পরিষ্কার ভাবে বুঝতে হবে যে ভারতীয় জেলে সোসাল ডিস্টানসিং আদৌ সম্ভব নয়।জেলে আমরা সবাই মেঝেতে গাদাগাদি করে শুতাম।বাইকুল্লা জেলের যে ব্যারাকে আমি প্রথম ছিলাম সেখানে ছত্রিশ জনের জায়গা কিন্তু থাকতাম ছাপান্ন জন।আমার মেডিক্যাল বেল অ্যাপ্লিকেশনে জেল কর্তৃপক্ষ পরিষ্কার বলেছিল যদি ছত্রিশ জনের দুই-তৃতীয়াংশ থাকে তবেই সোসাল ডিস্টানসিং সম্ভব। বাস্তবে আমরা একসাথে শুতাম,একই শৌচালয় ব্যবহার করতাম,একই সঙ্গে খাবারের লাইনে দাঁড়াতাম।করোনার প্রথম ঢেউয়ে বাইকুল্লা বেঁচেছিল কিন্তু দ্বিতীয় ঢেউয়ে পরিস্থিতি সঙ্গীন হয়ে দাঁড়ায়।ছাপান্ন জন পজিটিভ হয় ও তাদের বৃহৎ মুম্বাই মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন কোভিড সেন্টারে পাঠানো হয়।সেখানে তারা ম্যাট্রেসে শুত।একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা তাদের নিরামিষ খাবার দিত।তাদের যখন প্রথম পাঠানো হয় তখন তারা খুব ভয় পেয়েছিল কারণ জানত না তাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু ফিরে এসে তারা কোভিড সেন্টারের ব্যবস্থাপনা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে।আমার ব্যারাকে তেরো জন মহিলা কোভিড পজিটিভ হয় তার মানে আমার ডায়ে,বাইয়ে,সামনে,পেছনে সবাই কোভিড রোগী। আমার হাল্কা জ্বর ও ডাইরিয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন ডাক্তাররা বলছেন আমার নিশ্চিত কোভিড হয়েছিল কারণ রাপিড অ্যান্টিজেন টেস্টে সবসময় ভাইরাস চিহ্নিত হয় না।সমস্যা হল আমরা যারা জেলের ভিতর কিন্তু পজিটিভ নই তাদেরও অসুস্থ বন্দীদের সাথে নিভৃতবাসে থাকতে হত।সেসময় কোন সাফাইকর্মী আসত না,দূর থেকে খাবার ঠেলে দেওয়া হত।সেই আড়াই মাস ছিল ভয়ংকর। কোভিড শরীরকে দুর্বল করে দেয়।কোভিডের আগে আমি ঝাড় দেওয়া,পরিষ্কার করার মত ডিউটি করতাম,নিজের কাপড় কাচতাম।কিন্তু অসুস্থ হবার পর তা আর পারি নি।

যদি আপনার কাছে উপায় থাকে তবে আপনি কি জেলের ডিউটি থেকে বাঁচতে পারবেন?

অবশ্যই।শ্রেণি ব্যবস্থা জেলের ভেতরেও সজীব। এখানে টাকা একটা বড়ো ব্যাপার।যদি আপনার পিপিসি( পার্সোনাল প্রিজন সেল) অ্যাকাউন্ট থাকে এবং তাতে বাইরে থেকে যদি কেউ তাতে টাকা পাঠায় তাহলে আপনি সাবান,স্যাম্পু,বিস্কুট, চিঁড়া ক্যান্টিন থেকে কিনতে পারেন।রোববার মুরগির মাংস সহ স্পেনের ডিস খেতে পারেন।যখন আপনি জেলে থাকেন,এই ধরণের জিনিসগুলো পাওয়াটাই একটা বিলাস।এর আরেকটা দিক হল যদি এই সব জিনিষ আপনি কোন গরীব বন্দীকে কিনে দেন তাহলে বদলে তারা আপনার ব্যারাক ডিউটি করে দেবে।

আপনি পুনের ইয়ারদা ও মুম্বাইয়ের বাইকুল্লা– দুই জেলেই বন্দী ছিলেন।এই সময় আপনি কিভাবে নিজেকে মানসিক ও শারীরিক ভাবে সুস্থ রাখতেন?

ইয়ারদাতে অধ্যাপিকা সোমা সেন আমার পাশের সেলে থাকতেন। তিনি ছিলেন আমার সবচেয়ে বড়ো সহায়।মনে হয় আমরা একে অপরকে ছেড়ে বাঁচতেই পারতাম না।যদিও আমাদের আলাদা আলাদা সেলে রাখা হয়েছিল,আমরা অন্তত একসাথে খেতে পারতাম। আমরা প্রত্যেকে একটা করে খবরের কাগজ রাখতাম ও পড়া হয়ে গেলে কাগজগুলো বিনিময় করতাম। এভাবে আমাদের ‘ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ‘ ও ‘ দি হিন্দু ‘ কাগজটা পড়া হয়ে যেত। ইয়ারদা ছিল ১৯২৬ সালে তৈরি একতলা জেল। ওখানকার ফাঁসি ওয়ার্ডের সেলগুলো খাঁচার মত, সেখান থেকে আমরা বাইরের দৃশ্য দেখতে পেতাম।দেখতাম বাইরে বাচ্চারা খেলছে, আমের মরশুমে মেয়েরা ঢিল ছুড়ে আম পাড়ার চেষ্টা করছে আচার বানাবে বলে। আমি সেলের মধ্যেই হাঁটতাম কারণ বাইরে যাওয়ার জন্য মাত্র তিরিশ মিনিট বরাদ্দ ছিল। আমি ও অধ্যাপিকা সেন সেই আধঘণ্টায় রোদের মধ্যে হাঁটতাম।সাউন্ড অব মিউজিক, বিটলস এবং পুরানো দিনের নারী আন্দোলনের গান আমরা একসঙ্গে গাইতাম।বাইকুল্লা জেলে থাকার সময় আমি রুটিন করে নিয়েছিলাম যাতে অন্তত আধঘন্টা ব্যায়াম করতে পারি। আমরা আদালতে যাওয়ার দিনগুলোর জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতাম।সেখানে আত্মীয় ও বন্ধুদের সাথে দেখা হওয়ার সুযোগ মিলত।যদিও সে দেখা করাও খুব কষ্ট সাধ্য ছিল। রক্ষীরা এতটাই নির্দয় ব্যবহার করত যে বহু সময় বন্ধু দের নিয়ে আসা খাবার খাওয়ার অনুমতি পর্যন্ত দেওয়া হত না।এমনকি আমাকে ও অধ্যাপিকা সেনকে সন্তানদের আলিঙ্গন করার অনুমতি পর্যন্ত দেওয়া হত না।বহু সময় ছত্তিসগড় থেকে ইউনিয়নের লোকজন আমার সঙ্গে দেখা করতে এলে গরীব বলে তাদের সুযোগ দেওয়া হত না।একবার জেল কর্তৃপক্ষের এই ব্যবহারের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ করি, তখন বিষয়টা বন্ধ হয়।বাইকুল্লাতে কোভিডের কারণে কারোর সঙ্গেই দেখা করতে দেওয়া হত না।কিছু দিন পরে আমাদের ফোনে কথা বলার অনুমতি দেওয়া হয়।এটা ছিল খুব স্বস্তির কারণ আমার মেয়ে বহু দূরে থাকে( সুধার কন্যা মাহিষ্যা ছত্তিসগড়ে পড়াশোনা করেন) এবং তিনমাসে একবার সে আসতে পারত।কখনো কখনো আমাদের ভিডিও কলের অনুমতি দেওয়া হত।বাইকুল্লাতে আমার সবচেয়ে বড়ো শক্তি ছিল বাকি মহিলা জেলবন্দীরা।

মহিলা বন্দীরা কিভাবে জেলে তাদের জীবনকে মানিয়ে নেয়? আপনি কি এব্যাপারে নিজের অভিজ্ঞতাটা বলবেন?

প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা মানুষের আছে।অনেকে জেলের মধ্যে প্রার্থনা করে,কেউ নামাজ পড়ে,কেউ আবার পূজোর মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখে।বহু মহিলা বন্দীকে আমি দেখেছি তারা কি দারুণ সৃষ্টিশীল।অবাক হয়ে দেখেছি তারা একে অপরের জন্য বার্থডে কার্ড তৈরি করছে,ক্যান্টিনে উপলব্ধ জিনিস দিয়ে কেক তৈরি করছে।প্রত্যেকেই নিজেদের মধ্যে ছোট ছোট গ্রুপ তৈরি করে থাকে,একে অপরের খাবার ভাগাভাগি করে।ব্যারাকে নিজেদের মধ্যে মারামারিও হয় কারণ ছোট এক জায়গার মধ্যে সব কিছু ভাগাভাগি করতে হয়।শৌচালয়, ক্যান্টিনে খাবার,ফোন,চিকিৎসা — সব কিছুর জন্য বিশাল লাইন ফলে মারামারি অপরিহার্য।একই সঙ্গে বন্ধুত্বের গল্পও প্রচুর। জেলে কোন গোপনীয়তার ব্যাপার নেই তাই গোপনীয়তা লঙ্ঘনের প্রশ্নও নেই। আপনার সঙ্গে অন্য জনের মাঝে কোন দেওয়াল নেই তাই কোন আনুষ্ঠানিকতার বিষয় নেই। যেহেতু সবাই সবার সঙ্গে প্রতিটি ঘন্টা, মিনিট, সেকেন্ড একসঙ্গে থাকে তাই পাশের মানুষটি কাঁদলে তাকে কি উপেক্ষা করা সম্ভব? যে মানুষ টি ঠিক আপনার পাশে আছে তাকে বাদ দিয়ে কি সামান্য মাংসের টুকরোও কি একা খাওয়া যায়! এই পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ অজানা মানুষের সঙ্গেও বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে যা সাধারণ পরিস্থিতিতে সম্ভব নয়।জেলে এক তরুণী ছিল যে আমাকে আম্মি বলে ডাকত।একটু জড়বুদ্ধি মেয়েটা বান্দ্রায় ( উত্তর পশ্চিম মুম্বাই) তার স্বামীর সাথে থাকত।একবার কিছু মানুষ তাদের পাথর ছোঁড়ে।আঘাতে স্বামী মারা যায়,মেয়েটিকে পুলিশ আবার খুনের দায়ে অভিযুক্ত করে।মেয়েটা সারাক্ষণ চিৎকার করত,কাঁদত,অপরকে উত্তেজিত করত,শেষে নিজেই মার খেত।আমি তাকে রক্ষা করার চেষ্টা করতাম।সে আমার বন্ধু হয়ে গিয়েছিল। বহু বন্দী জেলে তাদের মামলার অবস্থা, দিন – কিছুই জানতে পারে না।ভাষা না জানাও একটা সমস্যা। করোনা কালে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়।আমি আমার আইনজীবীকে অনুরোধ করি বিষয়গুলো তাদের আইনজীবী দের সাথে অনলাইনে কথা বলে আমাকে জানাতে।এটা করার জন্য জেল কর্তৃপক্ষ আমাকে একবার হুমকি পর্যন্ত দেয় অথচ আমি ভেবেছিলাম আমি ভালো কাজ করছি। পরে আমার আইনজীবীর সাথে সরাসরি কথা বলার জন্য এই মেয়েদের আমি উৎসাহিত করি।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post