• May 25, 2022

বিপর্যয় নিয়ন্ত্রণ আইন(Disaster Management Act)

 বিপর্যয় নিয়ন্ত্রণ আইন(Disaster Management Act)

মিলন মালাকার

২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে গোটা দেশজুড়েই কেন্দ্রীয় সরকার বা রাজ্য সরকারগুলি বেশ কড়াকড়ি এক আইন জারি করে রেখেছে। ১৮৯৭ সালে বৃটিশ শাসকেরা একটা আইন তৈরি করেছিল। সেই আইনে(মহামারী আইন, ১৮৯৭) ভারত সরকার বা তার দ্বারা অধিকার প্রাপ্ত যে কোন সংস্থা বা ক্ষমতাধারী ব্যক্তির জারি করা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে অবাধ্য ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৮৬০-এর ১৮৮ নং ধারা অনুযায়ী এক মাস কারাদণ্ড বা ২০০ টাকা আর্থিক জরিমানা বা উভয় শাস্তিই(যদি নিরীহ আইন অমান্য হয়) কিংবা ছয় মাস কারাদণ্ড বা ১০০০ টাকা জরিমানা বা উভয় রকম শাস্তিই হতে পারে(যদি এই আইন অমান্যের জন্য কেউ আহত হন বা পথ অবরোধও হয়)। অবশ্য সেক্ষেত্রে ভারত সরকারকে মনে করতে হবে যে দেশের এক বা একাধিক অংশে দারুণ সংক্রামক এক রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ কিন্তু কোন ভাবেই বিচারক বা দণ্ডদাতা হবে না। পুলিশ আইন ১৮৬১ ও ফৌজদারি দণ্ড প্রক্রিয়া(ক্রিমিনাল প্রসিডিউর কোড) অনুযায়ী পুলিশের কাজ সন্দেহভাজন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা, আদালতে হাজির করানো ও যথাযথ তদন্ত করা। নাক-মুখ আঢাকা অবস্থায় রাস্তায় বেরোনোর কারণে পুলিশ আর্থিক জরিমানা ও কান ধরে উঠবস পর্যন্ত করিয়েছে। দূরপাল্লার বাসে, ট্রেনে, বিমানে ওঠার জন্য বা হোটেলে থাকার জন্য প্রতিষেধক নেওয়ার ঘোষণাপত্র খবরদারিতে থাকা কর্তা ব্যক্তিকে দেখাতে হয়েছে। অবশ্য কেন্দ্রীয় সরকার শীর্ষ আদালতে হলফনামায় জানিয়েছে, করোনা মোকাবিলার জন্য এই জাতীয় কোন বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি তাদের তরফে।
বিপর্যয় নিয়ন্ত্রণ আইন তৈরি হয়েছে ২০০৫ সালে। তাই এই আইনের নাম ডিসাস্টার ম্যানেজমেন্ট এ্যাক্ট, ২০০৫। এই আইনের সঙ্গে আগে বলা মহামারী আইন, ১৮৯৭-এর সঙ্গে অনেক মিল আছে। নতুন আইনেও কেন্দ্রীয় সরকার বা রাজ্য সরকারগুলি বা তাদের দ্বারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রশাসনিক সংস্থা বা ব্যক্তি কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার অধিকারী, যদি তারা মনে করে স্ব-এলাকার এক বা একাধিক অঞ্চলে বিপর্যয় শুরু হয়েছে। ১৯৪৭ সালে আলবেয়ার(বা আলবার্ট) কামু ফরাসি ভাষায় যে উপন্যাস লিখেছিলেন ‘লা পেস্ত’(বঙ্গানুবাদ হলে তার নামকরণ হয়েছে ‘মারী’) সেখানে রোগী দরদী ডাঃ বার্ণার্ড রিও আলজিরিয়ার ছোট শহর ওরানের ম্যজিস্ট্রেটকে বারবার অনুরোধ করছেন দুর্ভোগ হলেও কঠোর অনুশাসন বা নিষেধাজ্ঞা জারি করার জন্য কারণ রোগের নাম যাই হোক, বহু মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন অল্প সময়ের মধ্যেই এবং মারাও যাচ্ছেন। আলজিরিয়া তখন ছিল ফ্রান্সের উপনিবেশ।
বিপর্যয় বা ডিসাস্টার শব্দটা প্রাচীন গ্রীক সাহিত্যে পাওয়া গিয়েছে। ফরাসি ভাষায়, পুরনো ইতালি ভাষাতেও এই শব্দের এর বহুল ব্যবহার ছিল। বিপর্যয় প্রাকৃতিক(যথা ভূমিকম্প, বন্যা, তুষারপাত, বাজপড়া, আগ্নেয়গিরির লাভাস্রোত, দাবানল, ভূমিধ্বস, শৈত্য বা উষ্ণ তাপ প্রবাহ, ঝড়, হঠাৎ তুমুল বৃষ্টি, সমুদ্রের তলদেশে কম্পনের কারণে জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি), জীবাণুঘটিত(বসন্ত, কলে্রা, ফ্লু জ্বর, প্লেগ, কোভিড ইত্যাদি) বা মানুষের সৃষ্ট(যুদ্ধ, দাঙ্গা, আগুন লাগিয়ে দেওয়া, ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের বিপুল ব্যবহার, প্রামাণবিক কেন্দ্রে নিস্ফোরণ ইত্যাদি) কারণে হতে পারে। মহামারির সংজ্ঞা এমন দেওয়া হয়েছে যে যার বিস্তার হঠাৎ এবং স্বল্প সময় বা স্বল্প এলাকা ব্যাপী হয়। আর অতিমারির সংজ্ঞায় যে বিপর্যয় বিশ্বের বহু দেশ, মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ স্থায়ী হয়। এই ধরণের বিপর্যয় সাধারণতঃ জীবাণুবাহিত রোগের ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। তবে দুই বিশ্বযুদ্ধের বিপর্যয়ও গোটা পৃথিবীকেই ক্ষতিগ্রস্ত এবং আতঙ্কিত করে তুলেছিল। এক সময় ধনবাদী* দেশগুলোর রাষ্ট্র প্রধানেরা সাম্যবাদের তাড়নে আতঙ্কিত হয়েছিল(১৮৪৮ সালে গৃহীত কম্যুনিস্ট ইস্তেহার)। এখন মানুষের তৈরি নয়া বিপর্যয় হলো নাগরিক বাছাই এবং অবাঞ্ছিতদের ভিটা থেকে উচ্ছেদ করা।
যাইহোক, আমাদের দেশের বিপর্যয় আইনে বিপর্যয় নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটা বিভাগ(ন্যাশনাল ডিসাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি) খোলার কথা বলা হয়েছে, যে বিপর্যয় বলে ঘোষণা করবে, বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য জাতীয় নীতি(পলিসি) স্থির করবে কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকারগুলো ও বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে পাওয়া মতের ভিত্তিতে। বলা হয়েছে আপৎকালীন পরিস্থিতিতে আক্রান্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সাময়িক কালের জন্য আশ্রয়, খাবার, পানীয় জল, চিকিৎসা পরিষেবার ব্যবস্থা করা হবে। অনাথ ও স্বামীহারাদের পুনর্বাসনের বিশেষ ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজনে ব্যাঙ্ক ঋণ, সরকারি খাজনা বা কর মকুব করা হবে বা অংশতঃ ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থা করবে। বিপর্যয় নিয়ন্ত্রণ অথরিটি বা সমতুল রাজ্য বা জেলা প্রশাসন বা তাদের দ্বারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত পদস্থ কর্মচারীরা প্রয়োজনে যে কোন বাড়ি, যান সাময়িক কালের জন্য অধিগ্রহণ করতে পারবে, যে কোন সরকারি কর্মচারীকে বিশেষ কাজে লাগাতে পারবে। কোন ব্যক্তি সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে বা নিষেধাজ্ঞা পালনে বাধা সৃষ্টি করলে শাস্তি পাবেন এক বছরের কারাদণ্ড, বা আর্থিক জরিমানা বা উভয়ই। যদি সেই অপরাধীর কাজে কেউ আহত হয় বা মারা যায় বা সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে শাস্তির মাত্রা দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ দু’বছরর কারাদণ্ড হতে পারে। সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকরাও দু’বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে যদি তাদের দিক থেকে দুর্নীতি, ফাঁকিবাজি, অবহেলার অভিযোগ প্রমাণিত হয়। সরকারি কর্মচারীরা নির্দেশ মতো কাজ করতে অস্বীকার করলেও শাস্তি পাবে।
এই রচনায় কামুর ‘মারী’ উপন্যাসের উল্লেখ করা হয়েছে আগে । এই উপন্যাসের শেষাংশে বলা আছে, “মৃত্যুবাহী রোগের বীজ কোনোদিন মরে না, কোনোদিন একেবারে অন্তর্হিতও হয় না;.. যুগ যুগ ধরে এ বীজ সুপ্ত অবস্থায় আসবাব আর বিছানাপত্রের মধ্যে লুকিয়ে থাকে, মানুষের ঘরে, নীচের চোরকুঠুরিতে, তোরঙ্গের মধ্যে রুমালে, আর বইয়ের আলমারির তাকে অপেক্ষা করে, – .. হয়তো আবার এমন দিন আসবে যখন দুর্ভাগ্য মানুষকে শিক্ষা দেবার জন্য এই মারী আবার ঘুম থেকে জেগে উঠবে।”

মিলন মালাকার : মানবাধিকার কর্মী।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post