• May 25, 2022

হিজাব, আল্লাহু আকবর ও এস. ইরফান হাবিবের খোয়াইশ

 হিজাব, আল্লাহু আকবর ও এস. ইরফান হাবিবের খোয়াইশ

তাপস দাশ

এ লেখা সাহিব বর্ণিত ক্রোনোলজি নিয়ে। আমরা ক্রোনোলজি খেলব। সংবাদপত্র, ইংরেজি সংবাদপত্রে কোনও একটা ইস্যু নিয়ে পরপর কয়েকদিন, বা একইদিনে পরপর লেখা প্রকাশিত হলে, তাকে ইংরেজি row বলে চিহ্নিত করা হয়। সাম্প্রতিকতম উদাহরণ, হিজাব। আমরা কিছুদিন হিজাব রো দেখেছি। এখন আনিস রো। ইংরেজি row শব্দের তো নানাবিধ অর্থ। আমরা, এসব শব্দের অর্থ নিজেদের মত করে বুঝেও যাই। হিজাব রো মানে, হিজাব নিয়ে আরও খবর, আনিস রো মানে, আনিস নিয়ে আরও খবর। এই রো গুলি, খেয়াল করলে দেখা যাবে ঘটনাভিত্তিক। দিল্লি ব়্যালি রো, রেড ফোর্ট ফ্ল্যাগ রো, জামিয়া ইসলামিয়া রো, কর্নাটক হিজাব রো। আনিস, এখনও তত রো হয়ে উঠতে পারেননি, মরে যাবার পরেও।  
 
রো-গুলি সাধারণত, জেনেরিক কোনও বিষয় নিয়ে হয় না। রাজস্থান দলিত টর্চার রো হতে পারে, কিন্তু দলিত অপ্রেসন রো হয় না। দেগঙ্গা রায়ট রো হতে পারে, কিন্তু মুসলিম কিলিং রো হয় না। কর্নাটক হিজাব রো হতে পারে, কিন্তু কমিউনাল ফিলিংস অ্যামং লমেকার্স  রো হয় না।  
 
এরকম যে হয় না, তার কারণ এরকম হবার নিয়ম নেই। কেন নিয়ম নেই, তা সাধারণত অচর্চিতই থেকে যায় ও যাবে, কারণ তেমন কোনও রো বানাতে গেলে তো ভারতের সংবিধান, ভারতের রাষ্ট্রচরিত্র, বিস্ফোরণে চার্জশিট প্রাপ্ত সংসদ সদস্যের জেলের বাইরে থাকা কিন্তু কেরালার সাংবাদিকের জেলে পচার মত বিষয়গুলি সবই কোনও কোনও না রোয়ের মধ্যে চলে আসবে। অত জেনেরিক রো বানাতে গেলে ভারত ও ভারতীয়ত্বের ধারণা, চলমান ধারণা, বড় বেশি আঘাতপ্রাপ্ত হয়। তত আঘাত, সইবে না, কাহারও।  
 
কর্নাটকের হিজাবের ঘটনা চাপা পড়তে শুরু করেছে। নানাবিধ অন্য খবরের চাপে, হিজাব পিছিয়ে পড়েছে। হিজাব এবশ্য এমনিতেই পিছিয়ে থাকা, নারী, মানবতা, স্বাধীনতা ও সভ্যতার পক্ষে, এমনটাই স্বীকৃত সত্য। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সৌভ্রাতৃত্বের পরাকাষ্ঠা পশ্চিমের সবচেয়ে সংস্কৃতিবান দেশ ফ্রান্সও তো এমন কথা মেনেই নিয়েছে সে বেশ কয়েকবছর হল। ফলে, হিজাব পিছিয়ে পড়েছে।  
 
কিন্তু, আমাদের দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রভূত ক্ষমতাশালী (প্রয়াত বিচারপতি লোয়া সম্ভবত সে ক্ষমতার কথা জেনে মরেছিলেন) অমিত শাহ সাহিব আমাদের ক্রোনোলজি শিখিয়েছিলেন। আমরা ক্রেনোলজি দেখব। ক্রোনোলজিতে যাবার আগে, একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য – ইতিহাসবিদ এস.ইরফান হাবিব কর্নাটকের মেয়েটির ছবি ভাইরাল হবার পরে টুইটারে একটি খোয়াইশ ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, মেয়েটি যদি জয় হিন্দ বা ইনকিলাব জিন্দাবাদ ধ্বনি দিত, তাহলে তিনি খুশি হতেন।  
 
এবার ক্রোনোলজি। ইতিহাস বিবেচনায়, এস. ইরফান হাবিব স্যার জানবেন, ক্রোনোলজি দরকার হয়।   
 
অতি পূর্বকালে নয়, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসের ১৫ তারিখ সন্ধ্যায় জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশ বলপূর্বক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঢুকে পড়ে এবং ভাংচুর চালায়। সে ঘটনা এতই স্পষ্টভাবে ক্লোজড সার্কিট টিভিতে দেখা গিয়েছিল যে আমাদের গুজরাটি সাহিবরা তা অস্বীকার করে উঠতে পারেননি, তার সপক্ষে যুক্তি সাজিয়েছেন। জামিয়া মিলিয়ার ছাত্রছাত্রীরা সিএএ বিরোধী লাগাতার আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন। সেদিনের ঘটনার পরেও আন্দোলন থামেনি, পুলিশি হামলা ও প্রতিরোধ চলতে থেকেছিল। ১৭ ডিসেম্বর এখানে ইতিহাস রচিত হয়েছিল। জন্ম হয়েছিল দৃশ্যের। সহপাঠীকে লাঠির আঘাত থেকে বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজেদের শরীরকে ঢাল বানিয়েছিলেন আয়েষা আর ফরজানা। 

 


 
এর পরের দৃশ্যটা একটা দৃশ্যমাত্র। তার কোনও ব্যাখ্যা দরকার নেই। স্লোগান।  জামিয়া কি লড়কিয়োঁ নে রাস্তা দিখায়া হ্যায়।

তৃতীয় ঘটনাটা তত জনপ্রিয় নয়। সে ঘটনাক্রমে খুব বেশিসংখ্যক মানুষজন উপস্থিত ছিলেন না। জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়েষা আর ফরজানা কলকাতায় এসেছিলেন। একটি কর্মসূচিতে অংশ নিতে। তাঁরা বক্তব্য রেখেছিলেন। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে কলকাতার বেলেঘাটার সুকান্ত মঞ্চে জনতার সাহিত্য উৎসবে ভাষণ দিয়েছিলেন আয়েষা-ফরজানা। আয়েষা বলেছিলেন, কীভাবে দিনের পর দিন তাঁদের উপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে লিবারেল-প্রগতিশীল মহল থেকে। চাপ, ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক স্লোগান থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখার জন্য। চাপ, হিজাব পরিত্যাগ করার জন্য। ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তি, মুসলিমদের মধ্যে থেকে উঠে এলে ভারতের লিবারেল মহল আতঙ্ক বোধ করতে থাকে। আয়েষা যে প্রসঙ্গটা তুলেছিলেন, তা নিয়ে সম্ভবত কেউই আপত্তি করবেন না। তিনি বলেছিলেন, সিএএ তৈরি করাই হয়েছে মুসলিমদের টার্গেট করে। এটা একটা মুসলিমদের উৎখাত করতে। প্রগতিশীল মহল তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারেন, কিন্তু মুসলিম পরিচয়সহ কেউ এ মহলের পক্ষে সহনীয় হয়ে উঠতে পারেন না। আয়েষা জানিয়েছিলেন, তাঁকে প্রগতিমহল হিজাবহীন হয়ে উঠতে বলছিল।

ভারতের ইতিহাসে প্রগতিমহল ইসলামি পরিচয়চিহ্ন নিয়ে আতঙ্কে থাকেন।
আতঙ্ক, বা কম করে হলেও আশঙ্কা। ইসলামি পরিচয়সহকারে কেউ তাঁদের মঞ্চে উঠে পড়লে তাঁদের পরিচিত (অমুসলিম) সেকিউলার পরিচিতিটি খর্ব হতে থাকে। অমুসলিম, অহিন্দু নয় বা অ-শিখও নয়। এখানে এ কথা উল্লেখ একেবারে অপ্রাসঙ্গিক হবে না , প্রাক্তন কমিউনিস্ট নেতা হরকিষেণ সিং সুরজিৎ-এর যেসব ছবি দেখা যায়, তার প্রায় সবেতেই তিনি পাগড়ি পরিহিত। তাঁর ধর্মচিহ্ন তাঁকে সিপিআইএমের সাধারণ সম্পাদকের পদারোহণ ও এক দশকেরও বেশি তাতে থেকে যাওয়ার পক্ষে অসুবিধাবোধক হয় না। বিভিন্ন মিছিল ও আন্দোলনে ভারতীয় নারী-পুরুষরা বিভিন্ন রকম ধর্মচিহ্ন ধারণ করে থাকেন, সেগুলি তো আমাদের চোখেই লাগে না। লাগে না, তার কারণ, আমাদের প্রগতিমহল, পশ্চিমমুখী ও ইসলামোফোবিক।
 
প্রগতিমহলের প্রিয়তর পশ্চিম, মূলত খ্রিস্টিয় পশ্চিম, যারা আধুনিকতার একমাত্র বয়ান তৈরি করেছে, তাদের সাংস্কৃতিক যুদ্ধ বহমান। সে যুদ্ধে তাদের প্রিয়তম টার্গেট ইসলাম, ফলত মুসলমান। তাদের একরৈখিক আধুনিকতায় বহুত্বধারণাও মুসলিমদের পৃথগীকরণের। অপরীভবনের। ভারতের হিন্দুআধিপত্যের সংস্কৃতিধারণা ও পশ্চিমের একরৈখিক আধুনিকতাচেতনা ভারতীয় প্রগতিমননে মুসলিম পরিচয় ও তার অ্যাসারশনকে অপছন্দ করতে শিখিয়েছে, শিখিয়ে চলেছে। বিগত প্রায় আট বছরের হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রশক্তি সে হেজিমনিকে আরও জল-হাওয়া দিয়ে চলেছে। সে কারণেই যে গোষ্ঠীকে নির্মূল করার, দেশছাড়া করার চক্রান্ত চলছে, তাদের গোষ্ঠীগত, গোষ্ঠীপরিচয়গত চিহ্নগুলিকে, আওয়াজগুলিকে নির্মূল ও নিশ্চুপ করানোর, অন্য সব স্লোগান দিয়ে প্রতিস্থাপনের কথা বারংবার সামনে আসছে। আয়েষা রাণাদের হিজাব ছাড়তে বলেছিল প্রগতিমহল, সিএএ বিরোধী আন্দোলন জোরদার হবার পর। হিজাব নিষিদ্ধ করার পর হিজাবধারী মুসকানকে তার গোষ্ঠীপরিচয়বাচক আল্লাহু আকবরকে অন্য স্লোগান দিয়ে প্রতিস্থাপিত করার খোয়াইশ ব্যক্ত হচ্ছে।

কবীর সুমন একদা গানে গানে তাঁর খোয়াইশ ব্যক্ত করেছিলেন, অর্চনাদের পাশেই যেন আয়েষারাও থাকতে পারে। তিনি আয়েষাদের অর্চনার পরিচয় নেবার কথা বলেননি সম্ভবত, আয়েষাদের স্বপরিচয়ে থাকতে দেবার স্বপ্ন ব্যক্ত করেছিলেন।

এস.ইরফান হাবিব নিশ্চয়ই জানবেন, শ্রীমদভাগবতগীতায় একটা উক্তি আছে। ওটা তো উক্তি সংকলন। স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরোধর্ম ভয়াবহ। বর্তমান ভারতে ধর্মযুদ্ধ চলছে ও সে যুদ্ধকে খরতর করার প্রস্তুতি। এখন, পক্ষ বাছতে হবে। প্রগতিপক্ষকেও। নাহলে, কদিন পর, কোনও আরও প্রগতিশীল হয়ত খোয়াইশ প্রকাশ করে ফেলবেন, এস.ইরফান হাবিব যদি হলফনামা দিয়ে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় হতেন বা পিটার ব্রুক, তাহলে কী ভালই না হত।

তাপস দাশ : ব্যবস্থা-উদ্বৃত্ত সাংবাদিক, সম্পাদক।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.