• May 25, 2022

বিশ্বে প্রথম শ্রমিক আন্দোলনের দিশারী কিন্তু কাশ্মীর

 বিশ্বে প্রথম শ্রমিক আন্দোলনের দিশারী কিন্তু কাশ্মীর

শুভমন

উপত্যকায় একটা কথা চালু আছে যে পশমিনা শিল্প ঠিক ততটাই প্রাচীন, যতটা প্রাচীন ওই পাহাড়! আর তার সুখ্যাতিও সেই কবে থেকেই জগৎজোড়া।

১৫০৩ খ্রিস্টাব্দে লিওনার্দো দা ভিঞ্চি আঁকতে শুরু করেছিলেন মোনা লিসা। সে ছবিতে মোনা লিসার গায়ে জড়ানো আছে পশমিনা। ক্লদ মনে চিত্রিত মাদাম লুই জোয়াকিম জুব্যের তৈলচিত্রটিতেও দেখা মেলে পশমিনা জামোভারের। এমনকি কথিত আছে যে ৫৯৫ খ্রিষ্টাব্দে হজরৎ মহম্মদের বিবাহে তাঁর স্ত্রী হজরৎ খাদিজা পিত্রালয় থেকে যৌতুক হিসেবে যে সকল উপহার সামগ্রী এনেছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল কাশ্মীরি পশমিনা শাল। সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্ট তাঁর সম্রাজ্ঞী জোসেফাইনকে (দাম্পত্য ১৭৯৬ – ১৮১০ খ্রিস্টাব্দ) উপহার দিয়েছিলেন পশমিনা। আশ্চর্যের কথা হল কালজয়ী তৈলচিত্র মোনালিসা আবার বেশ কিছু দিনের জন্য ঘর আলো করে ছিল নেপোলিয়ান-জোসেফাইনের শয়নকক্ষের দেওয়াল জুড়ে! সময়টা আনুমানিক ১৮০০ থেকে ১৮০৪। ওই পেইন্টিং দেখেই কি তবে মহারাণীর সাধ জেগে ছিল পশমিনা পরখ করার?
যাই হোক এ তো গেল আড়ম্বরের আলোচনা। কিন্তু এ সবের আড়ালে রয়ে গেছে যে বৃহত্তর বঞ্চনার উত্তরাধিকার, নেওয়া যাক তারই কিছু খবরাখবর।

শিকাগো শহরের হেমার্কেট স্কোয়ারের ঐতিহাসিক শ্রমিক আন্দোলনটি হয়েছিল ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ৪ঠা মে। শ্রমের দৈনিক সময় কমিয়ে ৮ ঘন্টা করার দাবিতে ছিল শ্রমজীবী মানুষের সে দিনের সংগ্রাম। যার প্রেক্ষিতে ১৮৮৯ সালে ইন্টারন্যাশানাল ফেডারেশন অফ সোশালিস্ট গ্রুপ্স এণ্ড ট্রেড ইউনিয়ন্স পয়লা মে দিনটিকে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের মর্যাদা দেয়। সেই থেকে প্রায় সমগ্র বিশ্বেই দিনটি শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামের স্মারক দিবস রূপে স্বীকৃত। অনতিবিলম্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ও কানাডায় সেপ্টেম্বরের প্রথম সোমবারটি লেবার ডে হিসেবে চিহ্নিত হয়।

কাশ্মীরের শ্রমিক আন্দোলনটি সংঘটিত হয়েছিল হেমার্কেট আন্দোলনের ২১ বছর আগে। সৌজন্যে পশমিনা শিল্পের সঙ্গে পেশাগত ভাবে জড়িত শ্রমজীবী ভাই-বোনেরা।

প্রথম ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধ পরবর্তী অমৃতসর চুক্তির ভিত্তিতে ১৮৪৬-এ ইংরেজদের থেকে কাশ্মীরকে কিনে নেন জম্মুর তদানীন্তন ডোগরা রাজা গুলাব সিং। পঁচাত্তর লক্ষ টাকা আর অপর্যাপ্ত পশমিনার উপঢৌকনের বিনিময়ে বিক্রি হয়ে যায় তামাম কাশ্মীর মুলুক। প্রতিষ্ঠিত হয় শতবর্ষব্যাপী ডোগরা সাম্রাজ্য।

ভূস্বর্গের সিংহাসন দখল করে প্রথমেই যে কাজটি করেন গুলাব সিং, তা হল রাজস্ব ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। মাত্রাতিরিক্ত করের বোঝা চাপানো হয় জনসাধারণের উপর। গলা অবধি করে ডুবে যান সমাজের প্রতিটি পেশার মানুষজন। কৃষক, শ্রমিক তো বটেই, এমনকি বাদ যান না স্বাধীন ব্যবসায়ীরাও। পশমিনা শিল্পের সঙ্গে সংযুক্ত সমস্ত শিল্পী-সহকারী-শ্রমিক সম্প্রদায়ের উপর ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কর আরোপ করা হয়। ন্যূনতম গ্রাসাচ্ছাদনও দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে তাঁদের কাছে। স্বভাবতই অসন্তোষ দানা বাঁধতে থাকে আপামর শ্রমজীবী শ্রেণির মানুষের মধ্যে। সে সময়ে সম্পূর্ণ রাজস্ব আদায়ের নিয়ন্ত্রণ ছিল রাজ কাক ডার-এর মালিকানায় দাগশালি নামে এক সংস্থার হাতে।

ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে তখন কাঁচামাল কিনতে হত সরাসরি সরকার বাহাদুরের কাছ থেকেই। সেই আকাশছোঁয়া ক্রয়মূল্যের প্রতিবাদে ১৮৪৮-এর শরতে শ্রীনগরের দোকানিরা সম্মিলিত ভাবে বন্ধ করে দেন সওদার ঝাঁপ। তাঁদের সঙ্গে ধর্মঘটে সামিল হন কলকারখানার মজদুররাও। এবং বলাই বাহুল্য যেকোনো রকম শ্রমিক অসন্তোষকে কড়া হাতে সমূলে দমন করার রীতি গ্রহণ করে রাষ্ট্র। বিচ্ছিন্নভাবে এমন বিভিন্ন ঘটনা ঘটতে থাকে উপত্যকা জুড়ে। সঙ্গতে তাল মিলিয়ে চলতে থাকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। একজন প্রতিবাদী মানুষকে য়োলার সরোবরে জমে যাওয়া পাতলা বরফ চাদরের উপর দিয়ে হেঁটে যেতে বাধ্য করেন গুলাব সিং। ফলত কিছু দূর যেতে না যেতেই চাদর ভেঙে গিয়ে সলিল সমাধি ঘটে তাঁর। নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে একের পর এক প্রায় চার হাজার পশমিনা শ্রমিক পালিয়ে যান পাঞ্জাবে। রাজার তরফ থেকে আইন প্রণয়ন করা হয় যাতে করে কোনো অনিচ্ছুক শ্রমিক আর এলাকা ত্যাগ অথবা পেশা পরিবর্তন করতে না পারেন। এর পরেও যদি কোনো শ্রমিক রাজপেয়াদার চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন, তবে দাগশালির নির্দেশে তুলে আনা হত তাঁর স্ত্রী-সন্তান-বাবা-মাকে। তাঁদের উপর চলত পাশবিক নির্যাতন। কারাবন্দী করা হত ওঁদের।

তত দিনে ভূস্বর্গের তখ্ৎ-এ বসেছেন গুলাব সিংয়ের সুপুত্র রণবীর সিং। রাজত্বকাল ১৮৫৬ থেকে ১৮৮৫। দিনটা ছিল ১৮৬৫-র ২৯শে এপ্রিল। শ্রীনগর নগরীর জলদগর এলাকায় তখন একটা ময়দান ছিল। সকাল থেকেই সেখানে একে একে জড়ো হয়েছেন পশমিনা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত সহস্র কারিগর। গগনচুম্বী খাজনা, পিপীলিকাবৎ পারিশ্রমিক, বলপূর্বক উদ্বৃত্ত শ্রম, অকারণে মালিক পক্ষের অমানুষিক অত্যাচার ইত্যাদি প্রভৃতির বিরূদ্ধে একজোট হয়ে তাঁদের এই প্রতিবাদী জমায়েত। নারী পুরুষ নির্বিশেষে সোচ্চার হয়েছেন তাঁরা। বেগতিক দেখে দাগশালির মালিক রাজ কাক ডার সেনা বাহিনীর শরণাপন্ন হন। অতঃপর কর্নেল বিজে সিং-এর নেতৃত্বে নিরস্ত্র নিরন্ন মানুষগুলোর উপর চড়াও হয় রাষ্ট্রীয় সেনা। অদূরে সংকীর্ণ হাজি পাথের সেতুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয় আন্দোলনকারীদের। লাগাতার চলতে থাকে বেয়নেট ও বর্শার খোঁচা। ছত্রভঙ্গ জনতার চাপে পদপিষ্ট হন শতাধিক। সেতু থেকে নদীতে পড়ে যান অসংখ্য মানুষ। পরের দিন ঝ্যায়লামের জল থেকে পাওয়া যায় ২৮টি নিথর দেহ। সে সকল দেহ নিয়ে সেদিন আবার মিছিল করেন শ্রমিকরা। আবারও তাঁদের প্রতিহত করে রাজার সেনা। গ্রেপ্তার করা হয় শ্রমিক নেতাদের। জেলবন্দী করে চলতে থাকে অকথ্য অত্যাচার। হাজতেই হত্যা করা হয় রসুল শেখ, আলি পাল, আবদুল কাদাস, সোনা শাহ প্রমুখ শ্রমিক নেতাদের।

পশমিনা। পশমিনা। জাত পশমিনার বর্তমান বাজার দর কয়েক লক্ষ টাকা। এক শ্রেণি সে পশমিনায় ছড়িয়ে দেন আভিজাত্যের অহমিকা। কিন্তু কটা টাকাই বা পৌঁছোয় শিল্পীর সঞ্চয়ে? কত টুকুই পেয়ে এসেছেন তাঁরা যুগ যুগান্ত ধরে? কালো পশমিনার উপর কারিগরের নিপুণ ফোঁড়ে ফুটতে থাকে চেন স্টিচের লাল ফুল। তুমি যাকে বুকে জড়িয়ে নিচ্ছ হেঁসে, তার নিজের বুকে রয়ে গেছে শতাব্দীর অন্ধকার আর লাল। থেকে গেছে সে নিতান্তই নীরবে। প্রতিমার নেপথ্যে যেমন পাথর কোঁদা। মহরৎ-এর আড়ালে যেমন স্বেদসিঞ্চিত মহড়া।

গ্রন্থ সূত্র:
1) Jammu and Kashmir – Somnath Dhar.
2) Hindu rulers, Muslim subjects – Mridu Rai.
3) Freedom struggle and the methods of mass mobilisation in Kashmir (1931 – 1947) – Muhammad Ibrahim Wani.
4) Freedom movement in Kashmir – Ghulam Hassan Khan.
5) Marginality and Historiography: The case of Kashmir’s history – Amit Kumar and Fayaz A Dar, Economic and political weekly, 2015, volume 50, issue 39.
6) Kashmiris fight for freedom – Muhammad Yusuf Saraf.
7) Encyclopedia Britannica

শুভমন : লেখক। কাশ্মীর অন্বেষক।

  •  
  •  
  •  
  •  

3 Comments

  • পড়লাম। ভালো যেমন লাগল তেমনই জানতে পারলাম ইতিহাসের টুকরো। বড়ো করে লেখো। তোমার কাশ্মীর চর্চা আরো এগিয়ে যাক। আরো। আরো।

  • যে ছবিটি রয়েছে তার লোকেরা বড় বড় পাগড়ী পরা । সব কি হিন্দু ? প্রবন্ধে শ্রমিক নেতা যা নাম পাওয়া গেল, সব মুসলমান । শালের কাজে কি কাশ্মীরে আগে হিন্দু কারিগর হোতো ?

    • Good point.
      কাশ্মীরে কেন, সমগ্র উপমহাদেশেই সেলাইয়ের বিদ্যায় পথ প্রদর্শক ছিলেন মুসলমানেরা। হিন্দুরা সেলাই জানতেন না। হিন্দু পুরুষ ব্যবহার করতেন ধুতি উত্তরীয় আলোয়ান। নারীরা শাড়ি। ব্লাউজ নয়, ছিল কাঁচুলির চল। মুসলিমরা পরতেন সেলাই করা কুর্তা পাজামা জোব্বা সালোয়ার কামিজ। পরে রোজগারের দায়ে অনেক হিন্দু সেলাইয়ের পেশায় আসেন। পশমিনার ক্ষেত্রেও তাই। এখন ফোটোগ্রাফির চল ১৮১৬-এর পরে। তত দিনে উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই যুক্ত হয়েছেন পশমিনা পেশায়। তবে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post