• June 29, 2022

সংখ্যাগুরু বন্ধুকে বলছি, ভাবুন তো সত্যিই কি আপনি সংখ্যালঘু মানুষটির জন্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন?

 সংখ্যাগুরু বন্ধুকে বলছি, ভাবুন তো সত্যিই কি আপনি সংখ্যালঘু মানুষটির জন্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন?

সুমন সেনগুপ্ত

বিজেপি এবং আরএসএস যা চেয়েছিল, তাতে তাঁরা মোটামুটি সফল। এই নূপুর শর্মার একটি মন্তব্য তাঁদের পালে যেভাবে হাওয়া দিতে পেরেছে, তাতে এই কথাটাই বলা যায়। পাড়ার মোড় থেকে যেকোনো চায়ের দোকানে, একটাই আলোচনা, যেভাবে সংখ্যালঘু মানুষজন নূপুর শর্মার বক্তব্যের বিরোধিতা করতে গিয়ে এবং তাঁর গ্রেপ্তারির দাবিকে সামনে আনতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছেন, তাকে সমর্থন করা যায় না। অথচ এই ছবি বা ভিডিওর কতটা সত্যি, আর কতটা বানানো তা কিন্তু কেউ জানে না। এটাকেই বলে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া বা ফিয়ার সাইকোসিস। গত কয়েকদিনের ঘটনায় এই বাংলার হিন্দুরা অসুরক্ষিত বোধ করছেন। রাস্তাঘাটে কান পাতলে এটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।

কিন্তু এরপর যদি প্রশ্ন করা হয়, কেন করছেন, তাহলে সমস্যায় পড়বেন অনেকেই। দেশের আশি শতাংশ মানুষ হিন্দু, দেশের সমস্ত নেতা মন্ত্রী, শাসক দলের সমস্ত সাংসদ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতিও হিন্দু, প্রধান বিচারপতি, সামরিক প্রধান, রাজ্যপাল সবাই হিন্দু , তা সত্ত্বেও কেন এই নিরাপত্তাহীনতা, কেন এই প্রশ্ন, কই, ওঁরা যখন হিন্দুদের ঘরবাড়ি জ্বালাচ্ছে, আপনারা কিছু বলছেন না কেন ? তাহলে ভাবুন গত আট বছর ধরে যাঁরা ক্রমাগত আখলাকদের মব লিঞ্চিং দেখছেন বা জয়শ্রী রাম না বলার জন্য যাঁকে পিটিয়ে মারা হচ্ছে , যাঁর উপাসনাস্থল কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, তাঁর কি মনে হচ্ছে? কি পরবেন, কি খাবেন, যদি সংখ্যাগুরুরাই নির্ধারণ করে দেন, তাহলে একজন সংখ্যালঘু মানুষের কেমন লাগে? রোজ দিন যদি একজন সংখ্যালঘু মানুষকে ঘুমাতে যেতে হয় এটা ভেবে যে কাল আমার বাড়ির ওপর বুলডোজার চালানো হবে না তো? তাহলে তাঁর কেমন মনে হয়? তাঁরা কতটা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, এটা কি সংখ্যাগুরু মানুষেরা কোনোদিন ভেবে দেখেছেন? আসলে সংখ্যাগুরুর মধ্যে এই নিরাপত্তাহীনতা চারিয়ে দেওয়া যে কোনও ফ্যাসিজমের লক্ষ্মণ। পারস্পরিক অনাস্থার আবহ একবার তৈরী করা গেলে এ নিজেই নিজেকে পরিপুষ্ট করে। তখন আর সংখ্যালঘুর ওপর হওয়া অত্যাচার বা অবিচার চোখে পড়ে না।

বিতর্কটা ক্রমশ সরে সরে যাচ্ছে। প্রথমে শুরু হয়েছিল, বিজেপির মুখপত্র নূপুর শর্মার করা মুসলমানদের পয়গম্বর হজরত মহম্মদকে নিয়ে করা একটি মন্তব্য দিয়ে। তারপর তা নিয়ে মিডিয়াতে বেশ কিছু বিতর্কসভা, অনেকেই আশা করেছিলেন, ধীরে ধীরে এই বিতর্ক ধামা চাপা পড়বে, কিন্তু তা হয়নি। আমাদের দেশের মুসলমান মানুষজন মেনে নিলেও, আরব দেশের মুসলমান রাষ্ট্রপ্রধান এবং বিশিষ্ট ধনী মানুষজনদের তরফে এই বিষয়ে প্রবল আপত্তি ওঠে। তারপরেই সারা দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ। অন্যান্য রাজ্যে এই আন্দোলনকে স্তব্ধ করার জন্য নামিয়ে আনা হয় বুলডোজার। আমাদের রাজ্যে নানান জায়গায় এই নিয়ে বিক্ষোভ আন্দোলন হয়। তাতে কোথাও কোথাও কিছু হিংসাত্মক ঘটনা ঘটলেও, তার পুরোপুরি ফায়দা নেয় বিজেপি আরএসএস। মেরুকরণের যে রাজনীতি তাঁরা এতোদিন করে এসেছে, তা করতে আসরে নেমে পড়ে তাঁরা। নানান জায়গায়, ‘হিন্দুরা আক্রান্ত’ এই বলে কম বয়সী ছেলেদের নামিয়ে দেয় তাঁরা। তার সঙ্গে তাঁদের হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ তো আছেই। কোথাকার ছবি, কোথাকার ভিডিও কোথায় পাঠিয়ে সম্পুর্ণভাবে একজন সংখ্যাগুরু মানুষকে বিশ্বাস করিয়ে ছাড়ে, যে তিনি নিরাপত্তাহীন, তাঁর নিজের দেশেই।
নিরাপত্তাহীন, তাঁর নিজের দেশেই।

এমনিতে আমাদের দেশের বেশীরভাগ সংখ্যালঘু মানুষজন মেনে নিয়েছেন, যে তাঁরা এই দেশে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক, তাই তাঁরা এখন ভালো সংখ্যালঘু হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছেন। কিন্তু তা করলেও তো হচ্ছে না, কেউ কেউ আছেন, যাঁরা এখনও মনে করেন, না সব শেষ হয়ে যায়নি, তাঁদের এখনও এই দেশে সমানাধিকার আছে, তাই তাঁরা এখনও প্রতিবাদ করেন। সমস্যাটা হচ্ছে, প্রতিবাদের বিষয় নির্বাচন এবং প্রতিবাদের ধরন। যদিও একজন মানুষ কোন বিষয়ে প্রতিবাদ করবেন বা কি পদ্ধতিতে করবেন, তা বলে দেওয়ার মতো ধৃষ্টতা দেখানো উচিৎ নয়, কিন্তু তাও বলতে হয়, আমাদের এখনও শিখতে হবে, শাহীনবাগ থেকে, সেখানকার দাদীদের থেকে।

যেদিন প্রথম আমাদের দেশে বুলডোজার দিয়ে বেছে বেছে সংখ্যালঘু মানুষদের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হলো, সেদিনটাই ছিল সঠিক দিন, সেই সময়টাই ছিল আসল সময়, রাস্তায় নামার। বামপন্থীদের একটা অংশ যেদিন জাহাঙ্গীরপুরীতে বুলডোজারের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন, সেদিনই যদি দেশের সমস্ত বিরোধী দল রাস্তায় নেমে পড়তো, সামাজিক মাধ্যমের নিরাপদ দূরত্ব ভেঙে, তাহলে আজকে কিন্তু এই কথাগুলো শোনা যেত না। আজকে যখন নবীর অপমান হয়েছে বলে সংখ্যালঘু মানুষজন রাস্তায় নামছেন, তা হয়তো আট বছরের পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বা রাগের বহিঃপ্রকাশ, কিন্তু তা হয়ে যাচ্ছে ধর্মকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদ, কিন্তু যদি প্রতিবাদ হতো বুলডোজারের বিরুদ্ধে, এবং সেই প্রতিবাদে যদি ছোট বড় সব দল, সমস্ত ধর্মের মানুষজন যদি তাতে সামিল হতেন, তাহলে তাকে কি কখনো শুধুমাত্র সংখ্যালঘুদের প্রতিবাদ বলা যেত? সেই লড়াই থেকে যদি শ্লোগান উঠতো, ‘জয় ভীম, লাল সেলাম’, বা ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, সেই অবরোধে যদি জাতীয় সড়ক অবরুদ্ধও থাকতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা, যদি জাতীয় পতাকা, লাল পতাকা একসঙ্গে সেই অবরোধে তাহলে কি আজকের প্রশ্নগুলো উঠতো? যে মেরুকরণের রাজনীতি আজকে জিতে গেল, তাকে কি প্রতিহত করা যেত না? যে বিতর্ক হওয়ার কথা ছিল বেকারত্ব নিয়ে, টাকার দাম পড়ে যাওয়া নিয়ে, পেট্রল ডিজেল রান্নার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে, শিক্ষা নিয়ে, দুবেলা খেতে পাওয়া নিয়ে, তা না হয়ে বিতর্কটা কি নিয়ে চলছে? আমরা ওদের মাঠে ওদের তৈরী করা খেলায়, অংশ নিলে কি কোনোদিন জয়ী হতে পারবো? তা ভাবার কি সময় হয়নি? তাই ঘটনাচক্রে জন্মসূত্রে সংখ্যাগুরু মানুষ হয়ে আমার সংখ্যাগুরু বন্ধুদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন, সত্যিই কি একজন সংখ্যালঘু মানুষের জন্য আপনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন?

সুমন সেনগুপ্ত : বাস্তুকার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।

  •  
  •  
  •  
  •  

1 Comments

  • বর্তমান পরিস্থিতির সঠিক বিশ্লেষণ। সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় আবেগকে দমন করে বাস্তববাদী হতে হবে। দূর্ভাগ্য সংখ্যালঘুদের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভিতর শিক্ষার অভাব ও ধর্মীয় ভাবাবেগের আধিক্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post