• September 27, 2022

শ্রম–উৎপাদন–প্রকৃতি

 শ্রম–উৎপাদন–প্রকৃতি

বিজন পাল

প্রকৃতির বিবর্তনের মধ্য দিয়ে মস্তিষ্কের জন্ম হয়েছে। তাই এই মস্তিষ্কের অধিকারী মানুষ এবং মানুষের মস্তিষ্ক প্রকৃতিরই বিবর্তিত রূপ। এই মানুষকে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে হলে উৎপাদন করেই বেঁচে থাকতে হয়। অন্য প্রাণীরা বেঁচে থাকার জন্য প্রকৃতি থেকে নিজেদের খাদ্য যোগাড় করে, তাদের মতো করে বাসস্থানও বানিয়ে নেয় তাদের সহজাত দক্ষতা দিয়ে। যুগ যুগ ধরে একইরকম ভাবে তারা এই একই কাজ করে চলেছে। আগামী পরিকল্পনার কোন চিত্রকল্প তাদের মাথায় থাকে না। তারা আগে যা করত এখনও একশভাগ তাই করে যদি না বাইরে থেকে তাদের train করা হয়। কিন্তু মানুষ উৎপাদন করার আগে মাথায় একটা চিত্রকল্প তৈরি করে নেয় যা উৎপাদিত বস্তুর একটা ব্লু-প্রিন্ট হিসেবে কাজ করে। আবার হাতিয়ার উৎপাদন করে সেই হাতিয়ার ব্যবহার করে শ্রমের মাধ্যমে প্রকৃতিকে পরিবর্তন করার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ নিজের প্রকৃতিকেও পরিবর্তন করে। এটাই হলো শ্রমের বিবর্তন। সেই কারণেই যে মানুষ শ্রম করে তার সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কের মধ্য দিয়ে শ্রমের বিবর্তন ঘটে। মস্তিষ্কের বিবর্তন ঘটে প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে একটা সচেতন সম্পর্ক তৈরি হয়। উৎপাদনের প্রয়োজনীয় উপাদান হলো প্রকৃতি ও শ্রম। শ্রমকে সাধারণ ভাবে ভাগ করা যায় না। তবুও দুটি পর্যায় রাখলে দেখতে পাব – একটা হল পুরনো অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান, আরেকটি সেই জ্ঞানকে প্রয়োগ করার জন্য হাতিয়ার বা হাতের ব্যবহার। এখানে শারীরিক শ্রম ও মানসিক শ্রম দুটিই ব্যবহৃত হয়। এই জ্ঞান যা মানুষকে অন্য প্রাণী বা জীবজন্তু থেকে আলাদা করেছে। হাতিয়ারের সাহায্যে এই জ্ঞান প্রকৃতিতে প্রয়োগ করে মানুষ উৎপাদন করে। প্রথম পর্যায়ের জ্ঞান প্রাথমিক ত্রুটি-বিচ্যুতিকে সরিয়ে আবার এই জ্ঞানের মধ্যে দিয়েই পরবর্তী পর্যায়ে আরো নিপুণ হয়ে ওঠে। এভাবেই জ্ঞানের ক্রমবিকাশ ঘটে চলেছে। মানুষের এই পরিবর্তনে মানুষের মানবিক সত্তারও বিকাশ ঘটেছে। মানুষের সঙ্গে মানুষের যে সম্পর্ক ছিল সেটারও মানবিক বিকাশ ঘটেছে। এখানে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্কটা আরও নিবিড় হয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে নিবিড় হয়েছে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটাও।
সামাজিক ব্যবস্থা বদলে যাওয়ায় শ্রম দিয়ে যে উৎপাদন হয়, তা একসময় উদ্বৃত্ত উৎপাদনে পরিণত হয় যা পণ্য রূপে অন্য পণ্যের সঙ্গে বিনিময়যোগ্য। এভাবে একটি বিশেষ শ্রম আরেকটি বিশেষ শ্রমের সঙ্গে বিনিময় হয়। বিনিময় হবার সময় পরিমাপ হিসাবে প্রয়োজনীয় শ্রমসময়কে ধরে দুটি মূর্ত শ্রম বিমূর্ত শ্রমে পরিণত হয়। উদ্বৃত্ত উৎপাদন বিনিময় করতে গেলে এমন এক মালিককে প্রয়োজন যার কাছে অন্যের ব্যবহার মূল্য উদ্বৃত্ত হয়ে আছে এবং অন্যের ব্যবহার মূল্য তার কাছে প্রয়োজন আছে। এই অসুবিধা দূর করার জন্য সোনারূপী অর্থের উদ্ভব হল। সোনা এমন একটি ধাতু যার মধ্যে অনেক শ্রমসময় নিহিত থাকে। অর্থাৎ কম পরিমাণ সোনা উৎপাদন করতে গেলে অনেক শ্রমসময়ের প্রয়োজন হয় ও সোনাকে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে স্থানান্তরিত করা সহজ হয়। এই সোনা সকল পণ্যের প্রতিরূপ হিসাবে সামনে আসে। সোনা এমন একটি পণ্য যা সকল পন্যের সঙ্গে বিনিময় যোগ্য। সকল পণ্যের মালিককে যেতে হয় সোনার মালিকের কাছে। এই সময় এক ব্যবসায়ী শ্রেণীর উদ্ভব হলো যার জিম্মায় সোনারূপী অর্থ আছে। পণ্যের মালিককে পণ্য বেচতে যেতে হয় এই ব্যবসায়ীর কাছে। তাই সোনার মালিক পণ্য কেনে কম দামে, আর বিক্রি করে বেশি দামে। এভাবেই এই মূল্য উৎপাদন ব্যবস্থায় সোনার মালিক আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
মূল্য উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টিকারী প্রয়োজনীয় উৎপাদিত দ্রব্য পণ্যে রূপান্তরিত হলো। এর সঙ্গে সঙ্গে কিছু সংখ্যক মানুষের হাতে অর্থ থাকায় তারা উৎপাদনের উপকরণের অর্থাৎ উৎপাদনের হাতিয়ারগুলির মালিকানা হস্তগত করল। আর অন্যদিকে ব্যাপক সংখ্যার মানুষ এই উৎপাদনের হাতিয়ার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাদের শ্রমশক্তিকে পণ্য হিসেবে উৎপাদনের হাতিয়ারের মালিকের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হলো। শ্রমিককে তার শ্রমশক্তি হাতিয়ারের সাহায্যে প্রকৃতির নিয়মকে জেনে তাকে পরিবর্তন করে উৎপাদন করতে হয়। এই উৎপাদিত বস্তু যারা ব্যবহার করে অর্থাৎ উপভোক্তারা সেটা তার কাছে ব্যবহার মূল্য। এই দ্রব্য ব্যবহার করার মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হল, অর্থের বিনিময়ে কেনা কোনও বস্তু ব্যবহারের পর শেষ হয়ে গেলেও অর্থ কিন্তু শেষ হয়ে যায় না। উৎপাদনের হাতিয়ারের মালিকের হাতে উদ্বৃত্ত মূল্য জমা হচ্ছে অর্থরূপে। এই বিনিময়ের মধ্যেই তার কাছে অর্থ জমা হয়। শ্রমশক্তির মালিক প্রকৃতিতে কোন বস্তুর উপর শ্রমশক্তি প্রয়োগ করে বস্তুর গুণগত পরিবর্তন করে। এই শ্রম প্রক্রিয়ার মধ্যেই মানুষ প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ককে উন্নত করতে সমর্থ, প্রকৃতিকে সে জানতে পারল এবং প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হল। এখানেই তার আনন্দ। কিন্ত বিনিময়ের সম্পর্কটা উন্নত না হওয়ার কারণ হিসেবে যা সামনে আসে তা হল, শ্রমিক নিজেকে পরিবর্তন করে তার দক্ষতা বাড়িয়ে তুলছে অথচ এই উৎপাদন থেকে প্রাপ্ত উদ্বৃত্তটা সে পাচ্ছে না, সেটা চলে যাচ্ছে হাতিয়ারের মালিকের কাছে। এই উদ্বৃত্ত শ্রম তার সত্তাকে উন্নত করতে বাধা দেয়। এই শ্রম প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রকৃতিকে আরো বেশি করে জানাবোঝা ও প্রকৃতিকে উন্নত করার পরিবর্তে তার থেকে সে বিচ্ছিন্ন(alienated) হচ্ছে। তাই প্রকৃতি কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কীভাবে তাকে মানুষের বসবাসযোগ্য করে রাখা যাবে সেই ভাবনাটা তার মধ্যে সঞ্চারিত হচ্ছে না। তাই প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্কটাও উন্নততর পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে না। এখানেই সে প্রকৃতি থেকে ব্যাপকভাবে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। এখানে তাকে বাধ্যতামূলক শ্রমে মনোনিবেশ করতে হচ্ছে। হাতিয়ারের মালিক শ্রমিককে মজুরি হিসেবে তার শ্রমশক্তির মূল্য দেয় কিন্তু শ্রমের মূল্য দেয় না। দাস ব্যবস্থায় যেমন গোটা মানুষটাকেই কিনে নেওয়া হতো, যেমন খুশি কাজ করানো হতো, সেখান তার ইচ্ছার কোন মূল্য থাকত না। আর এখানে শুধুমাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য তার শ্রমশক্তিকে কেনা হয়। এখানে মালিককে শ্রমিকের শ্রমের মূল্য দিতে হলে শ্রমিক মালিকের জন্য যে উদ্বৃত্ত মূল্য তৈরি করে তাও ফেরত দিতে হবে। তাহলে হাতিয়ারের মালিকের কাছে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
এখানে জীবিত শ্রমকে মৃত শ্রমের সঙ্গে একই পংক্তিতে আনা হল অর্থাৎ মৃত শ্রম হল পুঁজি আর জীবিত শ্রম হল মানুষ উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যে শ্রম ব্যবহার করে।
এখানে সে কোন সৃষ্টিশীল শ্রম করতে পারে না, সে করে বাধ্যতামূলক শ্রম। এখন সে নিজের জন্য উৎপাদন করে না। সে করে মালিকের জন্য, উৎপাদিত পণ্যের ওপর শ্রমদাতার কোন মালিকানা নেই। ফলে তারই উৎপাদিত বস্তু থেকে সে বিচ্ছিন্ন হল। একইসঙ্গে তার বিচ্ছিন্নতা ঘটল প্রকৃতি থেকেও। এই শ্রম প্রক্রিয়ায় মালিকের কিন্তু কোনও অংশগ্রহণ থাকে না। সে শুধু উদ্বৃত্ত মূল্যের অর্থটাকেই বুঝে নেয়। তার কাজ শুধু কী পরিমাণ অর্থ অর্জন হল এবং কীভাবে অর্থকে আরও বাড়ানো যায় তা নিয়ে ব্যস্ত থাকা। তার উৎপাদনের প্রত্যেকটা মেশিনারিকেই নজরদারিতে রাখা হয় যে কোথায় কীভাবে উদ্বৃত্ত মূল্যকে বাড়ানো যায়। এখানে উৎপাদনের হাতিয়ারের মালিকের কোন প্রাকৃতিক সত্তা থাকে না। পাশাপাশি শ্রম প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকা মানুষেরও প্রাকৃতিক সত্তা বিনষ্ট হচ্ছে। অর্থাৎ মানুষের প্রাকৃতিক সত্তার বদলে অপ্রাকৃতিক সত্তারই বিকাশ ঘটছে।

এই উদ্বৃত্ত শ্রম পুঁজিরূপে ক্রমাগত প্রসারিত হতে থাকে। ক্রমে ক্রমে পুঁজির সঞ্চয়নের জন্য বাজারকে প্রসারিত হতে হচ্ছে। ফলে চাহিদাকে বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদনকেও বাড়াতে হচ্ছে। যেহেতু উৎপাদনে শ্রম ছাড়া আর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হল প্রকৃতি, তাই বাজারের জন্য আরো বেশি বেশি উৎপাদন করতে গিয়ে প্রকৃতির নিষ্পেষণ ও ধ্বংসাত্মক কাজকর্ম বেড়েই চলেছে। সমস্ত জীবজগত নিয়ে তৈরি যে অনুপম জীববৈচিত্র্য তার স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে প্রচুর প্রাণ প্রজাতি।
শিল্প-উৎপাদনের প্রথম পর্যায়ে মূলত ইউরোপ-আমেরিকার মধ্যেই শিল্পোৎপাদন সীমাবদ্ধ ছিল। এবং বাজারও ছিল ইউরোপ-আমেরিকায়। তাই সেখানে কল-কারখানা বেড়েছে, একইসঙ্গে নগরায়নও হয়েছে। ফলে সেখানকার বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইডের মাত্রা ও দূষণের পরিমাণ বাড়লেও তা ছড়িয়ে পড়তো সারা বিশ্বের আকাশে, বাতাসে, সমুদ্রে। তথ্য বলছে, সেই সময় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি শূণ্যের কাছাকাছি ছিল। ফলে বিশ্বজুড়ে তখনও প্রকৃতির ভারসাম্য সেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
বিশ্বায়নের যুগে এসে উৎপাদনের প্রক্রিয়া ও তার হাত ধরে প্রকৃতি পরিবেশ বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে এক গুণগত পরিবর্তন ঘটে গেল। এই যুগে শিল্প-উৎপাদন সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া হলো, বিশেষ করে এশিয়া-আফ্রিকার মতো অনুন্নত দেশগুলিতে। আর ইউরোপ-আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলিতে রয়েছে সেই উৎপাদিত পণ্যের বাজার। এশিয়া-আফ্রিকায় সস্তা শ্রম ও কাঁচামালের সম্ভার রয়েছে। এই সস্তা শ্রম ও ঢালাও প্রাকৃতিক সম্পদ যথেচ্ছ ব্যবহার করে অনেক কম দামে পণ্য উৎপন্ন করে তা বাজারজাত করা হতে থাকল ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোতে। ইউরোপ-আমেরিকা থেকে শিল্প উৎপাদন এশিয়া-আফ্রিকায় স্থানান্তরিত হলো ঠিকই, কিন্তু এইসব উন্নত দেশগুলোতে নগরায়ন তথা আর্বানাইজেশন বাড়তে থাকল এবং এই শহুরে মানুষের অগাধ সুখ ও আরামের জন্য পেট্রোল-ডিজেলের ব্যবহারও পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকল।
বিশ্বায়নের আগে ইউরোপ-আমেরিকায় শিল্প উৎপাদনের ফলে সেখানের বায়ুমন্ডলে দূষণ বাড়ত, এখন সারাবিশ্বের বায়ুমন্ডলে দূষণ বাড়ছে। দিন দিন গোটা পৃথিবীটা একটা কার্বন ডাইঅক্সাইডের চাদরে ঢাকা পড়ছে। ফলে এই গ্রীনহাউস এফেক্টের জন্য সূর্যের আলো পৃথিবীতে পড়ার পর তা আর বিকিরিত হয়ে ফিরে যেতে পারে না। ফলে সমুদ্রের জলের উষ্ণতা বেড়ে যাচ্ছে। আজ বিশ্বজুড়ে উষ্ণায়ন যে মাত্রায় পৌঁছেছে তাতে মেরু প্রদেশের বরফ ব্যাপকমাত্রায় গলে যাচ্ছে, সমুদ্র জলের উচ্চতাও বেড়ে যাচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবীর বহু শহর জলের তলায় তলিয়ে যাবে। আই পি সি সি ‘র ষষ্ঠ রিপোর্টে স্পষ্ট চেতাবনি দেওয়া হয়েছে – খুব বেশি হলে ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীর উপকূলবর্তী ৪০০টি শহরের সলিল সমাধি ঘটবে। এই তালিকায় রয়েছে কলকাতা, মুম্বাই, চেন্নাই, বিশাখাপত্তনমের মতো ভারতের বারোটি মেট্রো শহর।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির কারখানাগুলোকে যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক তৈরির কারখানায় রূপান্তরিত করা হল। এবং অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র তৈরির কারখানাগুলি অটোমোবাইল কারখানায় রূপান্তরিত হল। চাষীদের অধিক ফসলের লোভ দেখিয়ে বাধ্য করা হল বহুজাতিক কোম্পানির রাসায়নিক, শস্যবীজ ও কৃষি প্রযুক্তি কিনতে। দেশীয় যে বীজ বৈচিত্র্য ছিল, যা কৃষকরা নিজেরাই সংরক্ষণ করে রাখতেন পরবর্তী চাষের জন্য, তাকে ধ্বংস করে দেওয়া হলো শুধুমাত্র কর্পোরেটের মুনাফার স্বার্থে।
কীটনাশকের ও রাসায়নিক সার ব্যবহারে মাটিতে থাকা নানা খনিজদ্রব্যের সাথে বিক্রিয়ার ফলে নানা যৌগ উৎপন্ন হয়। এতে চাষের জমিতে থাকা অনুজীবিরা ধ্বংস হচ্ছে। এই উৎপাদিত শস্য মানুষ খেয়ে বিভিন্ন রোগের কবলে পড়ছে। পাঞ্জাবে সবুজ বিপ্লব ঘটাতে গিয়ে সেখানে ব্যাপক মাত্রায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার হয়েছে। ফলে পাঞ্জাবে ক্যান্সারের মাত্রা অনেক বেড়েছে।
অন্যদিকে এই রাসায়নিক সার ব্যবহারের পর দেখা যায় যে, গাছ তার একটা অল্প অংশ গ্রহণ করে আর অধিকাংশ পরিমাণ জলের সঙ্গে মিশে নদী নালা দিয়ে বয়ে যায়। নদী নালা দিয়ে এই রাসায়নিক সমুদ্রে মিশে সেখানকার জীববৈচিত্রকে ধ্বংস করছে। সমুদ্রের অ্যালগিদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে, যাকে বলা হয় অ্যালগাল ব্লুম। এই অ্যালগিদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে সমুদ্রের গভীরে সূর্যের আলো পৌঁছাতে পারে না। সমুদ্রের তলদেশে সূর্যের আলো না পৌছানোর কারণে কার্যত অক্সিজেনের অভাবে সেখানে থাকা উদ্ভিদ ও প্রাণীদের বেঁচে থাকা দুর্বিষহ হয়ে পড়ছে। ধ্বংস হচ্ছে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র।
আর একদিকে নগরায়নের জন্য ব্যাপক মাত্রায় বৃক্ষছেদন হয়েছে এবং সেখানকার জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়েছে। সেখানকার পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ, ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া সবই বিপন্ন হয়েছে। আজ পশুদের ভাইরাস মানুষের শরীরে ঢুকে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি করছে। ব্রিটিশরা অসমে চা বাগান বানানোর জন্য সাঁওতাল পরগনার থেকে আদিবাসীদের নিয়ে গিয়ে জঙ্গল কাটলো এবং সাঁওতাল পরগনার জঙ্গল কেটে সেখানের খনিজ পদার্থ লুট করল। চা বাগান বানানোর জন্য জঙ্গল কাটার ফলে সেখানের মানুষকে প্যারাসাইট আক্রমণে কালাজ্বরের কবলে পড়তে হয়েছিল, যেটা অসম ফ্লু নামে পরিচিত।
ক্রমাগত ব্যাপকহারে অরণ্য নিধন এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারের ফলে ২০২০ সালে এসে বাতাসে কার্বন এমিশনের পরিমাণ ২৫ বিলিয়ন মেট্রিক টনে পৌঁছে গেল এবং অন্যদিকে বায়ুদূষণের মাত্রা লাগামছাড়া হল। বায়ুদূষণের কবলে পড়ে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি সহ ফুসফুসের রোগ, কিডনি ও হার্টের সমস্যা, এমনকি ক্যান্সারের মতো মারণ ব্যাধি আজ ঘরে ঘরে। শুধু তাই নয়, কেবলমাত্র বায়ুদূষণের কারণে পৃথিবীতে গড়ে ৮০ লক্ষের মতো মানুষ মারা যান। এবং ২০১৯ সালে বায়ুদূষণের কারণে ভারতবর্ষে ১৭ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আরো আতঙ্কের বিষয় দূষিত ও বিষাক্ত বাতাস নবজাতক এমনকি গর্ভস্থ ভ্রুণকেও রেহাই দিচ্ছে না, তারাও আক্রান্ত হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে। এই অসুস্থ, বিষাক্ত ও দূষিত পরিবেশে মানুষ কোনভাবেই সুস্থ থাকতে পারে না।
পুঁজির মুনাফা শ্রম শোষণের পাশাপাশি প্রকৃতিকেও ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে যায়, যার হাত ধরে মানবসভ্যতাও আজ গণবিলুপ্তির দোরগোড়ায়। পুঁজির নতুন নতুন বিনিয়োগ ও মুনাফার অন্ধগতির জন্য আজ মানুষের শ্রমশক্তিকে ব্যবহার করা হচ্ছে মূলত অপ্রয়োজনীয় গাদাগাদা ভোগ্যপণ্যের জন্য। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তকে আরো সুখ ও আরামের বিজ্ঞাপনে টেনে আনা হয়েছে এই ভোগ্যপণ্যের বাজারে। এই অপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য কেনার জন্য টাকার প্রয়োজন। মানবিক সত্তাকে তোয়াক্কা না করে যেভাবেই হোক টাকা রোজগারটাই যেন প্রধান। অর্থের মোহ মানুষকে এমনভাবে গ্রাস করেছে যে কোন অমানবিক কাজ মানুষের মনে দাগ কাটে না। মানুষকে দেখা হয় অন্য চোখে। যার যত বেশি সামাজিক সম্পদ তার সামাজিক সম্মান তত বেশি। সংস্কৃতির কানাগলিতে সমাজের একটা বড় অংশটা কেবলই ঘুরপাক খাচ্ছে। চামড়ার মধ্যে আবদ্ধ রক্তমাংসের ছোট শরীরটাকেই সে মহান করে দেখছে। অথচ এই ছোট গণ্ডির বাইরে যে বিপুলা প্রকৃতি হাজির পাহাড়-পর্বত, নদী-সমুদ্র, আকাশ-বাতাসের এক নৈসর্গিক ডালা সাজিয়ে তাকেই আমরা জঞ্জালের পাহাড়ে পরিনত করছি। ভোগবাদী মানুষ আজ প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক স্বার্থপর ব্যক্তি মানুষে পরিণত হয়েছে। আর মানুষের অসীম সম্ভাবনাময় শ্রমশক্তিকে মুনাফার জন্য বাধ্যতামূলক শ্রমকে উৎপাদনের কাজে ব্যবহার না করে, তাকে সৃষ্টিশীল শ্রম দিয়ে প্রকৃতি মেরামতের কাজ করতে হবে। বিজ্ঞানসম্মত, সঠিক ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রকৃতি মেরামতের কাজে প্রচুর মানুষ এই কাজে অংশগ্রহণ করতে পারবে। এখানেই তৈরি হবে নতুন সংস্কৃতি।
সমাজটাকে অর্থের দাসত্বের থেকে মুক্ত করে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে মুনাফার জগৎ থেকে বাইরে এনে প্রকৃতি মেরামতের কাজে ব্যবহার করাই আজকের সময়ের বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকৃত দাবি।

বিজন পাল : প্রাবন্ধিক ও সমাজকর্মী ।

4 Comments

  • ভালো হয়েছে।
    লোভ প্রতিটি মানুষের মধ্যে
    মালিক, শ্রমিক সব

  • লেখা এগিয়েছে স্বচ্ছন্দে। ক‍্যানভাসে রয়েছে সময়ের বিস্তৃত প্রেক্ষাপট আর অর্থনৈতিক বিবর্তনের পথরেখা। সঙ্গে মানুষ-প্রকৃতি সম্পর্কের পরিবর্তনে অর্থনীতির নিয়ামক হয়ে ওঠার ধারাবিবরণী।
    সময় পর্বের শতকওয়ারী বিভাজন করে লেখাটি এগিয়ে গেলে এই ধরণের লেখার দাবী আরো জোরাল হ’তো বলে এই পাঠকের মনে হয়।

  • লেখাটা বেশ ভালো ও প্রণিধানযোগ্য। শ্রম – উৎপাদন – প্রকৃতি ও মানবিক সত্তা সম্পর্কে মার্কসবাদের প্রাথমিক পাঠকে এত সহজ সরল ও প্রাঞ্জলভাবে তুলে ধরার জন্য লেখক বন্ধুপ্রতিম বিজনকে অনেক ধন্যবাদ। আজকে পুঁজির আরো আরো সঞ্চয়ন ও মুনাফা বৃদ্ধির জন্য যেভাবে প্রাণ প্রকৃতি ও পরিবেশকে বিনষ্ট করা হচ্ছে, সেই সম্পর্কেও লেখক যথেষ্ট তথ্যনিস্ট , তাঁর এই আকুতি আমাদের মননেও ধাক্কা মারে। আজকের দিনে এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবনাচিন্তা, আলোচনা, মত বিনিময় ও কর্মপদ্ধতি ঠিক করাটাই প্রধান ও আশু কর্তব্য বলেই মনে হয়। লেখনী এভাবেই এগিয়ে চলুক, আমরা পাঠকরা আরো সমৃদ্ধ ও আলোকিত হই।

    • onk dhonnobad

Leave a Reply

Your email address will not be published.