• May 25, 2022

মুল্যবান পরামর্শ

 মুল্যবান পরামর্শ

তরুণকুমার দে

তিনি ট্রান্সফার নিয়ে সেই অফিসে এসেছিলেন কোনো এক শনিবার। রবিবার ছুটির দিন। সোমবার দুপুরেই তাঁর নতুন নামকরণ হয়েছিল: বড়দা। কিছুদিন আগে ওই অফিসেই ছিলেন এক প্রবীণ ভদ্রলোক। তাঁর নাম ছিল রমাপদ পাল। তিনি কোনো একটি সেন্টেন্স বলতে গিয়ে মাঝে বার দুই ‘আ -আ’ করতেন। এই নতুন ভদ্রলোককে প্রতিটি সেন্টেন্সে কম করে বার চারেক ‘ অঁ-অঁ ‘ -করে গোঙাতে লক্ষ্য করেছিলেন অল্পবয়সী শিক্ষকরা । তাঁরা এই আগন্তুকের নাম দিয়েছিলেন : পালদার বড়দা। কিন্তু অত বড় নাম সব সময় বলবার অসুবিধে বলে নামটা একটু ছোট করে নিয়েছিলেন তাঁরা :
( কেবল ) বড়দা। ‘বড়দা’ আপত্তি করেননি। বোধহয় ভেবেছিলেন যে, তাঁর মর্যাদা বাড়ল।

সপ্তাহ কাটবার আগেই সবাই টের পেয়েেছিল যে, বড়দা রাম-ফাঁকিবাজ। সকালে আসেন
দেরি করে; তারপর আবোলতাবোল বকেন; দুপুরে বাড়িতে খেতে যান। আবার আসেন অনেক দেরি করে । ছুটির বাঁশী বাজবার আগেই তিনি প্রস্থান করেন । সারা দিনে কোনো কাজই করেন না। মাঝে মাঝে সবাইকে মনে করিয়ে দেন: ‘ আমি রাজপুুত।’
অল্পবয়সী শিক্ষকরা আড়ালে অবশ্য তাঁকে ‘গোভূত’ বলতে শুরু করেছিলেন।

তারপরেই এসেছিল চমকে দেবার মতো খবর: ‘বড়দা’র দুই বিয়ে এবং দুই জীবনসঙ্গিনীই জীবিত। একজন এখানে থাকেন, অন্যজন থাকেন ‘বড়দা’র দেশের বাড়িতে – বিহারে । তবে ‘বড়দা’ দুই জীবনসঙ্গিনীর কাউকেই
অবহেলা বা ত্যাগ করেননি। প্রায়ই দেশে দু-চারদিন কাটিয়ে আসেন। মাইনে পেলেই 40% দেশের জীবনসঙ্গিনীর হাতে দিয়ে আসেন। দেশে তাঁর কিছু জমিও আছে। তাতে ফসল হয়। আর এখানে budget-এযেটুকু ঘাটতি হয়, মাঝেমধ্যে কারখানার তামা-পিতল সরিয়ে সেটা পূরণ করে নেন।

সব খবর সংগ্রহ করে অল্পবয়সী শিক্ষকরা কোমর বেঁধেছিলেন। ‘বড়দা’কে ভালো রকম দাওয়াই দিতে হবে।

সেদিন সকালে ‘বড়দা’ আটটার পরে এসেছিলেন। কারখানা শুরু হয় সাড়ে সাতটায়। অর্থাৎ তিনি আধ ঘণ্টারও বেশি লেট। অল্পবয়সীরা সবাই একে একে তাঁকে বলেছিলেন-‘গুড নূন।’ বড়দা কোনো উত্তর দেননি। শুধু চোখ লাল করে ওঁদের দিকে
তাকিয়েছিলেন।

একটু পরে ওই শিক্ষকদের একজন ‘বড়দা’কে জিজ্ঞেস করেছিলেন-‘চা খাবেন ?’
অন্যদিন তিনি হেসে উত্তর দেন-‘হ্যাঁ।’ সেদিন গম্ভীরভাবে জানিয়েছিলেন-‘না।’

আরও ঘন্টা খানেক পরে এক শিক্ষক সুমন ‘বড়দা’র কাছে গিয়ে অন্তরঙ্গ হয়েই বলেছিলেন -‘আমার বউটা রোজই ঝগড়া করে। ওর জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছি। ভাবছি আর একটা বিয়ে করে ফেলবো। কিভাবে করা যায় আমাকে একটু বুদ্ধি দিন।’
বড়দা চোখ পাকিয়ে বলেছিলেন-‘নিজের কাজ কর গে যাও।’
ধাঁতানি শুনে সুমন খুশি হয়ে নিজের সিটে চলে এসেছিলেন।

সুমন চলে এসেছিলেন। কয়েক মিনিট পরে আর এক শিক্ষক কমল ‘বড়দা’র পাশে গিয়ে বসেছিলেন। প্রায় ফিসফিস করে বলেছিলেন-‘আমার বউটা বাঁচবে না। ডাক্তার বলেই দিয়েছেন। কিন্তু মরতে অনেক দেরি। ভুগবে আর আমাকেও ভোগাবে। এখন আমার সবে ছত্রিশ হলো। আমি আর একটা বিয়ে করতে পারি তো ?’
বড়দা ধমকের সুরেই বলেছিলেন-‘যাও যাও, বিরক্ত করো না।’
ধমক খেয়ে মুচকি হেসে কমল সরে এসেছিলেন।

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অসিত ( তিনিও শিক্ষক ) এসে ‘বড়দা’র চেয়ারে হাত রেখে একটি দুরূহ সমস্যার সমাধানের hints চেয়েছিলেন- ‘আমার বাড়িতে দু-দুটো ঘর। দুটো ঘরে দুটো বউ রাখতে পারি কিনা ?’
এক লাফ দিয়ে শিক্ষক দিলীপ সামনে এসেছিলেন-‘মাইনে এখন অনেক বেড়েছে। আগেকার লোকেরা এর অনেক কম রোজগার করে তিন-চারটে বিয়ে করতো। আর আমরা দুটো বিয়ে করতে পারবো না ? কি বলেন বড়দা ?’

‘বড়দা’ দুর্বাসার মতো বিস্ফোরিত হয়েছিলেন- ‘পাজি নচ্ছার বজ্জাতের দল। কাজের সময় আজেবাজে কথা বলছো। দাঁড়াও, তোমাদের ঢিট করছি।’
বলে তিনি দুমদাম করে পা ফেলে দক্ষিণপন্থী ইউনিয়নের অফিসে রওনা হয়েছিলেন। আসলে তিনি ছিলেন দক্ষিণপন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাসী। ওই দলের মিটিং-মিছিলে মাঝেমাঝে যোগও দিতেন। ওই অফিসে তখন গোটা চারেক ছেলে বসেছিল। তাদের কারোর বয়সই ত্রিশ হয়নি।
‘বড়দা’ তাদের কাছেই অভিযোগ জানিয়েছিলেন-‘ওরা সবাই আমার পিছনে লেগেছে !’
ওই ছেলেরা ‘বড়দা’র মুখ দেখে কিছুটা আন্দাজ করেছিল। তারা সমস্বরে প্রশ্ন করেছিল-‘আপনাকে কী বলে খ্যাপাচ্ছে ?’
‘বড়দা’ শোনামাত্রই বুঝতে পেরেছিলেন, ওই ছেলেগুলোর উদ্দেশ্য কি ! তিনি তৎক্ষণাৎ ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন।
ওই ছেলেরা ‘কি হলো, বলুন’ বলতে বলতে পিছু পিছু এসেছিল।
কিন্তু ‘বড়দা’ কোনো উত্তর না দিয়ে হনহন করে বামপন্থী ইউনিয়নের অফিসে ঢুকে পড়েছিলেন।

এক বয়স্ক ভদ্রলোক বসে কতকগুলো ফাইল দেখছিলেন। পায়ের শব্দ পেয়ে তিনি মুখ তুলে তাকাতেই ‘বড়দা’ উত্তেজিত স্বরে বলেছিলেন-
‘এই ছোঁড়াগুলো আমাকে কোনো কাজ করতে দিচ্ছে না। সবসময় disturb করছে।’
ভদ্রলোক চশমাটা খুলে নির্লিপ্ত কন্ঠে পরামর্শ দিয়েছিলেন – ‘আপনার medical leave পাওনা নেই ? ছুটি নিয়ে নিন না।’

হতাশ হয়ে ‘বড়দা’ ধীরপায়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। নিজের চেয়ারে বসে চোখ বন্ধ করেছিলেন।
সুমন কী ভেবে জিজ্ঞেস করেছিলেন – ‘শরীর খারাপ লাগছে ?’
‘বড়দা’ চোখ খুলে খেঁকিয়ে উঠেছিলেন-‘Get out.’
কমল সহানুভূতি দেখিয়ে বলেছিলেন- ‘চা খাবেন ? আনাবো ?’
‘বড়দা’ সাড়াও দেননি।
অল্পবয়সী ওই শিক্ষকরা তখন চাপা হাসির সঙ্গে নিজেদের মধ্যে নীচু গলায় আলাপ শুরু করেছিলেন।

ওই ডিপার্টমেন্টের হেড ছিলেন অধীরবাবু। তিনি অত্যন্ত গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। তাঁর কাছে গিয়ে ‘বড়দা’ অকপটে সব খুলে বলে পরামর্শ চেয়েছিলেন – কী করলে ওই চ্যাংড়াদের থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়।
অধীরবাবু একটু ভেবে বলেছিলেন – ‘জানেন তো কখনও কখনও আক্রমণই হচ্ছে আত্মরক্ষার শ্রেষ্ঠ পথ।’
বড়দা জানতে চেয়েছিলেন – ‘কী করতে বলছেন ?’
অধীরবাবু বড়দার চোখে চোখ রেখে মুল্যবান পরামর্শটি ব্যক্ত করেছিলেন – ‘আপনি যত তাড়াতাড়ি পারেন তিন নম্বর বিয়েটা সেরে ফেলুন

তরুণকুমার দে

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post