• June 29, 2022

নাবিক আলির রিক্সা

 নাবিক আলির রিক্সা

শুভনাথ

এশিয়া মহাদেশের প্রায় বেশিরভাগ শহর কিংবা শহরতলির মানুষের যাতায়াতের লাইফলাইন বলতে রিক্সার নাম প্রথমেই উঠে আসে। এই রিক্সা বড় রাস্তা থেকে অলিগলি পৌঁছে গিয়ে সচল রাখে আস্ত একটা ট্রাফিক সিস্টেমকে।
ভোরের আলো ফোটার আগেই উঠে পড়ে তমাল মিয়াঁ। টর্চের আলো জ্বেলে সুইচ অন করে ইলেকট্রিক আলো জ্বেলে নেয়। বিছানা গুটিয়ে একপাশে রাখে। বাইরে টুলগুলো বের করে দেয়। মুখ হাত ধুয়ে বাইরের টেবিলে গ্লাসগুলো সাজিয়ে নেয়। গ্যাসওভেন ও সিলিন্ডার ঠিক জায়গায় বসায়। রাতে ধুয়ে রাখা সশপ্যানে চা বসায়। অন্য দিকে কাঠের উনুনে চপ-ঘুগনির আলু ও কলাই সেদ্ধ করতে বসিয়ে দেয়। এই হল তার রোজের রুটিন। সূর্য ওঠার আগে থেকে রাত পর্যন্ত যে জায়গাটি তাঁর দোকান রাতের কিছুক্ষণের জন্য সেই দোকানটি হয়ে ওঠে তাঁর ঘর। বিশ্রামের জায়গা। তমালের ঘর আছে তবে সেখানে সে যায় না। স্টেশনে দোকান হওয়ার কারণে ফার্স্ট ট্রেন থেকে লাস্ট ট্রেন পর্যন্ত তাঁর ডিউটি। তমালের দুই ছেলে শহরে কাজ করে। বউ ছেড়ে চলে গেছে অনেক বছর আগে। আর বিয়ে করেনি তমাল। তাই অসুস্থতা ছাড়া তমালের ছুটি নেই। এই মফঃস্বলের স্টেশনে তমালের কাছের মানুষ বলতে একজনই। নাবিক।
তমালের চা হতে না হতেই পাখির মত শিষ দিতে দিতে রিক্সা নিয়ে হাজির হয় নাবিক আলি। তারপর বুড়ো শিরীষ গাছের নীচে রিক্সা লাগিয়ে দেয়। ঘাড় থেকে গামছাটা নামিয়ে, ঝুলিয়ে দেয় রিক্সার হাতলে। তারপর গিয়ে বসে তমালের দোকানের টেবিলে।
কি নাবিক আজ এত দেরি করলে? জিজ্ঞেস করে তমাল
কই দেরি। ট্রেন আসার আগেই তো চলে এসেছি। নাবিক উত্তর দেয়।
আসলে এই এক কথা রোজই নাবিককে তমাল জিজ্ঞেস করে। তাঁদের দুজনের সকাল শুরু হয় এই খুনসুটির মধ্যে দিয়েই। চা শেষ করে নাবিক বিড়ি ধরায়। তমালের দিকে একটা এগিয়ে দেয়। ততক্ষণে আরও অনেকে রিক্সা নিয়ে হাজির হয়ে যায়। বিড়ি শেষ হতে না হতেই বাঁশি বাজিয়ে ট্রেন এসে পড়ে। নাবিকের তাড়াহুড়ো নেই। ফার্স্ট ট্রেনে তাঁর সাওয়ারি বাঁধা। কলকাতা থেকে এক বাবু আসেন রোজ ভোরে। তাকে স্টেশন থেকে কাজের জায়গায় পৌঁছে দেওয়া ও আবার বিকেলে কাজের জায়গা থেকে নিয়ে ট্রেন ধরিয়ে দেওয়া নাবিকের কাজ। তাঁর জন্য নাবিকের মাস মাইনে আছে। সেইটুকুর মাঝে বাকি সব সাওয়ারিদের ওঠায় নাবিক।
নাবিকের বয়স ষাটের কাছাকাছি। নাবিকের জীবনও এই বুড়ো শিরিষ গাছটার মতো। এই গাছে যেমন পাখি আসে, বাসা বাঁধে, ডিম পাড়ে তারপর একদিন বাচ্চারা বড় হলে উড়ে যায় সপরিবারে। তেমনই নাবিকের জীবনে অনেক মানুষ আসে। তারপর একদিন চলে যায়। সংসার করবো ভেবে নাবিক বিয়েও করেছিলো। তারপর বাচ্চা প্রসবের সময় বউ মারা যায়। খুব ভালোবাসতো নাবিক তাকে। সেই সময় এক শিল্পীকে দিয়ে তাঁর বউয়ের অবয়ব আঁকিয়ে ছিল রিক্সার পিছনে। সেই রিক্সা আজও চালিয়ে যাচ্ছে। তবে ছবিখানা মুছে গেছে সময়ের সাথে সাথে। রিক্সাটার ছেঁড়া সিট থেকে উঁকি মারে স্পঞ্জ। নাবিকের স্বাস্থ্যের মতই সেটাও নড়ঝড়ে অবস্থা।
রোজকার সওয়ারি এসে রিক্সায় ওঠে। প্রথম দুটো প্যাডেল মারতেই নাবিকের দমে একটু টান ধরে। রোজ সকালে এটা হয়। তারপর সারাদিন আর কোন শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা থাকে না। সাওয়ারি একটা সিগারেট বের করে। এপকেট ওপকেটে হাতড়ায়। আগুন নেই তার কাছে। খুঁজে পায় না।
নাবিক আগুনটা দে তো। সওয়ারি বলে ওঠে।
নাবিক তাড়াতাড়ি আগুনটা এগিয়ে দেয়। সওয়ারি সিগারেট জ্বালিয়ে সুখটান দিতে থাকে।
আচ্ছা নাবিক বলতো তোর এরকম নাম কে রেখেছিলো?
আর কি বলবো বাবু। ঠাকুরদা রেখেছিলেন।
তা এমন নাম রাখলো কেন জানিস?
অতটা জানি না। তবে ছোটবেলায় বাপের কাছে শুনে যতদূর মনে আছে। ঠাকুরদা ছিলেন জেলে। দূর সমুদ্রে গিয়ে তাঁর মত মাছ ধরায় পটু সেই অঞ্চলে কেউ ছিল না। দূর সমুদ্রে ঠাকুরদা যখন বড় জাহাজগুলোকে দেখতেন। বড় চালানোর শখ হত তাঁর। তবে সে শখ কখনো পূরণ হয়নি। বাপও কখনো জেলে নৌকা ছেড়ে বেরোতে পারেনি। তাই ঠাকুরদা আমার জন্মের পরে ভেবেছিলো আমি জাহাজ চালাবো। তাই এই নাম।
হা হা হা… তোর ঠাকুরদা বেশ মজার মানুষ ছিল তো দেখছি। তা তুই কখনো জাহাজ চালিয়েছিস?
কি যে বলেন। তবে জাহাজ চালাই নি। এই যে আপনি বসে আছেন এই উড়োজাহাজটা চালাচ্ছি আজ বিয়াল্লিশ বছর ধরে।
গন্তব্যে এসে পড়ে। সওয়ারি রিক্সা থেকে নেমে নাবিককে বলে
শোন আজ দশটার সময় করে আসিস। একটা জায়গা যাওয়ার আছে।
বাবু ওই সময়ে তো আমি দুটো বাচ্চাকে স্কুলে ছাড়তে যাই।
আজ যাবি না। একদিন না গেলে কিছু বলবে না।
বাবু মাস মাইনে করা আছে। যেতে হবে। আপনি অন্য রিক্সা নিয়ে নিতে পারবেন না!
কত জায়গায় মাস মাইনে খাস তুই। আমি তোকে মোটা অঙ্কের টাকা এমনি এমনি দি মাসের শেষে। শোন তাড়াতাড়ি চালাবি। বাচ্চা দুটোকে পৌঁছে সোজা এখানে চলে আসবি। আমি না হয় পনেরো মিনিট পরে বেরবো।
বেশ বাবু।
নাবিক রিক্সা নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে পরে। কিছুটা আসতেই এক প্রেমিক যুগল নাবিকের রিক্সায় ওঠে। তাঁরা স্টেশনে যাবে। তাঁদের সাথে গল্প জুড়ে দেয় নাবিক। আসলে নতুন কাউকে পেলেই নিজের জীবনের গল্প শোনায় নাবিক। আর প্রেমিক যুগল পেলে তো শেষে একটা গান গেয়ে শোনাবেই নাবিক। তা সেই যুগলের শোনার ইচ্ছে থাকুক কিংবা নাই থাকুক। এবারেও ব্যাতিক্রম গেল না। সেই চেনা মহম্মদ রফির গান – ‘কব কাঁহা সব খো গেয়ি… জিতনি ভি থি পারছায়িয়া’।
স্টেশনে সেই যুগলকে নামিয়ে দিয়ে রিক্সা লাগিয়ে দেয় নাবিক। তারপর স্টেশনের বড় ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে সময়ের হিসাব কষে নেয়। গিয়ে তমালের দোকানে হাত মুখ ধুয়ে নাস্তা করতে বসে। আর মনে মনে ভাবে আজ কি করে সে সময়ের হিসেব মেলাবে। নাবিককে চিন্তিত দেখে তমাল জিজ্ঞেস করে –
কি নাবিক ভাই! গভীর কিছু হয়েছে নাকি।
না না।
শরীর খারাপ করছে।
না না। শরীর ঠিক আছে।
নাবিক নাস্তা সেরে ওঠে, গিয়ে রিক্সার ওপরে গিয়ে বসে। একটা বিড়ি জ্বালায়। কিছুটা জিরিয়ে নেয়। ঘড়ি ন’টা ছুঁতেই একটা ট্রেন ঢোকে। এক সওয়ারি এসে জিজ্ঞেস করে যাবে কি না। নাবিক জায়গার খোঁজ নেয়। একটু দূর বলে প্রথমে সে যাবে না বলে জানিয়ে দেয়। সেই সময় সওয়ারি আর কোন রিক্সা না পেয়ে নাবিককে বেশি টাকা দেবে বলে। নাবিক কিছু একটা ভেবে রাজি হয়। সওয়ারিকে চাপিয়ে বেরনোর সময় তমালকে বলে যায়
শোন তমাল মিয়াঁ ফিরতে একটু দেরি হবে। আজ আমার মাছের পেটি রেখো। কাঁটা বেছে খাওয়ার মত আর চোখ নেই বুঝলে।
বেশ বেশ। এসো তোমারে কাতলা মাছের পেটি দিয়ে গুগলির ঝোল খাওয়াবো। চোখের জ্যোতিও বাড়বে আর তোমার পেটি খাওয়াও হবে।
হাসতে হাসতে নাবিক সওয়ারিকে চাপিয়ে বেড়িয়ে যায়। রাস্তায় জ্যাম থাকায় অন্য রাস্তা নিতে হয়। নাবিক বুঝতে পারে তাঁর দেরি হয়ে যাচ্ছে। বারবার সওয়ারিকে নাবিক সময় জিজ্ঞেস করতে থাকে। সওয়ারি তাতে কিছুটা বিরক্তও হয়। কোনক্রমে সওয়ারিকে নামিয়ে দিয়ে নাবিক প্রাণপনে রিক্সা চালিয়ে বাচ্চাদের স্কুল পৌঁছে দিতে বেরিয়ে পড়ে। যখন বাচ্চাদের বাড়ির কাছে গিয়ে পৌঁছায় ঘড়ি তখন ন’টা বেজে চল্লিশ মিনিটে পৌঁছে গেছে। নাবিকের শরীর ভিজে গেছে ঘামে। গামছা দিয়ে বারবার নিজের মুখটা মুছে নিচ্ছে। স্কুলের বাচ্চাদের চাপিয়ে নাবিকের রিক্সা ছুটছে স্কুলের দিকে। নাবিকের শরীরের মত তাঁর রিক্সার দশা। দুটোই যেন এই মুহূর্তে একটু বিশ্রাম চাইছে। তবে বাবুর কথা ভেবে নাবিক চুপ। নাবিক অন্যদিন বাচ্চাদের সাথে কত গল্প করতে করতে তাঁদের স্কুলে পৌঁছে দেয়। আজ সে একেবারে চুপ।
নাবিক দাদু আজ কথা বলছ না কেন? গল্প বলবে না আজ?
না না দাদুভাই। বলছি তো কথা। একটু চেপে ধরে বস। আজ তোমাদের জাহাজের সওয়ারি করাবো। চুপ করে বসো।
বাচ্চাদুটো মজা পায়। শক্ত করে চেপে ধরে। নাবিক প্রাণপণে রিক্সা চালাতে থাকে। বাচ্চা দুটো সেই গতির অনুভব করতে পেরে হাসতে থাকে জোরে জোরে। মাঝে মাঝে তীক্ষ্ণ চিৎকার করতে থাকে। অবশেষে বাচ্চা দুটিকে স্কুলের গেটে নামিয়ে দিয়েই নাবিক বাবুর কাজের জায়গার দিকে রওনা দেয়। নাবিক মনে মনে ভাবতে থাকে। আজ থেকে হয়তো মাস মাইনে গেল। কাল থেকে হয়তো বাবু অন্য রিক্সা দেখে নেবে। ঘাম মুছতে মুছতে নাবিকের কাঁধের গামছা তখন প্রায় ভিজে গেছে। অবশেষে নাবিক পৌঁছায়। দেখি বাবু দাঁড়িয়ে আছে।
কি বাবু দেরি হয়ে গেলো খুব? হাঁসফাঁস করতে করতে নাবিক জিজ্ঞেস করে।
বাবু একটু খেঁকিয়ে উঠে বলে –
তোঁর মুণ্ডু। বারবার বললাম দেরি করিস না। সেই শেষে পনেরো মিনিট দেরি করিয়েই ছাড়লি। এইবার একটু জোরে চালাত দেখি।
নাবিক আর কোন কথা বলে না। নড়ঝড়ে ক্লান্ত শরীরের সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়ে প্যাডেল করতে থাকে। বাবু একটা সিগারেট জ্বালায়। বারবার ঘড়ির দিকে তাকাতে থাকে। কিছুদূর যেতে না যেতেই নাবিকের দমে টান ধরে। নাবিক কয়েকবার কেশে ভাবে এ কিছু না। আবারও জোরে জোরে প্যাডেল করতে থাকে। না, আর পারে না সে। চোখ নীল হয়ে আসে। নাবিক তাঁর বিয়াল্লিশ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে এই দমের খেলাতে জিততে চায়। এইবার সে আর পেরে ওঠে না। পা অবশ হয়ে আসে। রিক্সার গতি কমতে থাকে। বাবু খেঁকিয়ে ওঠে। নাবিক আর কিচ্ছু শুনতে পায় না। রিক্সার হাতল তখন আর তাঁর বশে নেই। মাঝ সমুদ্রে নাবিকহীন জাহাজের মত তখন রিক্সা ভাসছে রাস্তার উপর। নাবিক আছড়ে পড়ে রাস্তায়। দূরে ছিটকে পড়ে সওয়ারি। আর রিক্সাটি তখন রাস্তার ওপর ভেসে যাচ্ছে দিশাহীন, নাবিকহীন এক জাহাজের মত। যে জাহাজের অতলে ডুবে যাওয়া আজ নিশ্চিত।
রাস্তার ওপর জ্যাম! পিছন থেকে অজস্র হর্ন বাজতে থাকে একসাথে। সকলেরই বড় তাড়া। আজ শুধু তাড়া নেই নাবিকের। সে এখন মহাবিশ্বের অনন্ত নীলের চালক।

শুভনাথ : রাজনৈতিক কর্মী ও লেখক।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post