• June 29, 2022

লাল পিঁপড়েদের আস্তাবল

 লাল পিঁপড়েদের আস্তাবল


শুভ নাথ এর উপন্যাস লাল পিঁপড়েদের আস্তাবলম পর্ব


“কিন্তু আছে
অনেক অনেক রক্তপাত
বিষ্ঠা আবর্জনা
এখনো আমাদের চারিপাশে…”
-মায়াকভস্কি

পৃথিবীতে সকল লড়াইয়ের মাঝখানে একটা সূক্ষ্ম অসমতা থাকে। সে অসমতা খালি চোখে দেখা না গেলেও উঁচু নীচুর মাঝে একটা সিঁড়ি থেকে যায়। তা মানুষের মাঝে হোক, পাখির মাঝে হোক, পশুর মাঝে হোক কিংবা পশু ও মানুষের মাঝে। কোনদিনও প্রকৃতির কোলে থাকা বোকা মানুষেরা নিজেদেরকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব মনে করেনি ও করে না। পৃথিবীর মাংস-মজ্জা গিলে যারা বেঁচে থাকে তারা নিজেদেরকে এতকাল শ্রেষ্ঠ জীব বলে মনে করে এসেছে ও করে চলেছে। মাঝে মাঝে এই সব শ্রেষ্ঠ জীবেরা লালাপিঁপড়েদের খাদ্য হয়ে যায়। আসলে পৃথিবীতে লালাপিঁপড়েরা আছে বলেই সকলেই বেঁচে আছে। কোনো এক বিজ্ঞানী বলেছেন ‘পৃথিবীতে সকল পিঁপড়ে মারা গেলে তার কিছু সময় পরেই পৃথিবীর সকল মানুষ মারা যাবে’। আসলে মানুষের টিকে থাকার জন্য পিঁপড়েদের থাকাটা জরুরি। আর মানুষকে মানুষের মত টিকিয়ে রাখতে লালপিঁপড়েদের।
মাঘ মাসের সকাল। জঙ্গলের শুকোনো পাতা আর ছোট ছোট কাঠ জ্বালিয়ে আগুনের চারিদিকে মানুষজন জড়ো হয়েছে। গায়ে ছেঁড়াফাটা শীতবস্ত্র। বিভিন্ন ‘মানবদরদী’ ধনী ব্যাক্তি কিংবা এনজিও এসে দিয়ে যায় এ সব শীতবস্ত্র। ছবি তোলে। ফেসবুকে ছাড়ে, হোয়াটসঅ্যাপে বন্ধুদের পাঠিয়ে জনদরদি ভাব ফুটিয়ে তোলে। কখনো নতুন, কখনো পুরনো। এই গ্রামে বছর চার আগে পৌঁছানটা ছিল দুঃসাধ্যের বিষয়। রাস্তা ছিল না, নদীতে ব্রিজ ছিল না। গ্রামের একটি যৌথ নৌকো ছিল সকলের যাওয়া আসার জন্য। নদীর এপাড়ে পশ্চিমবাংলা ওপাড়ে ঝাড়খণ্ড। পশ্চিমবঙ্গে লালপার্টি আসার পরে নদীতে ব্রিজ হল। রাস্তা পাকা হল। যারা পারলো সাইকেল কিনল। যারা পারলো না তাঁদের পায়ের জোর ধরে রাখতে হল সারাজীবন ধরে। এই নিমমহলি গ্রামটি ছিল ব্রিটিশ ভারতে অখণ্ড বাংলার অংশ। এই গ্রামটি মূলত আদিবাসী জনজাতির ‘কোঁড়া’ সম্প্রদায়ের গ্রাম। তারপর রাজ্যগুলির ভাগ হয়। বর্তমানে ঝাড়খন্ড রাজ্যের অন্তর্গত। সেই ভাগ হওয়ার সময় কিছু দিকু এসে নিমমহলিতে বসবাস করতে শুরু করে। আদিবাসী পাড়ায় দিকুরা মূলত দুটি স্বার্থে আসে। বড় অংশের দিকুরা আসে আদিবাসীদের শ্রম ও সম্পত্তি লুঠ করতে। আর কিছু সংখ্যক দিকু আসে আদিবাসীদের জীবন-জীবিকার সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত এই ভারত ভূখণ্ডের প্রাচীনতম সংস্কৃতিকে লুঠ ও বিকৃত করতে। আরও কিছু মানুষ আসে, তবে আদিবাসীরা তাঁদের দিকু মনে করে না। বরং আপন করে নেয় একে অপরকে। কারণ তাঁদের সকলেরই দশা জীর্ণ।
নিমমহলিতে এই মুহূর্তে কুড়ি থেকে চল্লিশ বছর বয়সি কোন পুরুষ বেঁচে নেই। কারণ দিকুদের রোজগারের বড় ব্যবস্যা হল মদের ব্যাবসা। চোলাই। চোলাই সস্তা, অল্প খেলেও নেশা হয় বেশি। চোলাই তৈরির সময় অত্যাধিক পরিমানে ইউরিয়া ব্যবহার করা হয়। ফলে যারা রোজ চোলাই খাই তাঁদের শরীরে কিছুদিনের মধ্যে জল জমে যায়। শরীর ঢাকের মত ফুলে যায়। তারপর হঠাৎ একদিন রক্তবমি শুরু হয়। তারপর হাসপাতালে দু-চার দিনের চিকিৎসার পরে মরণ অনিবার্য। নিমমহলির শেষ চোলাই খেয়ে মারা যায় ধীরেন কোঁড়া। তারপরে পুলিশ ও প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। কিন্তু ততদিনে নিমমহলি জোয়ান শূন্য হয়েছে। পুরুষ বলতে বাচ্চা ও বুড়োরা। গ্রামের ঘরে ঘরে বিধবা। এই বিধবারা কিছুদিন হল নিজেদের উদ্যোগে চোলাইয়ের ঠেকগুলোকে বন্ধ করেছে। এখন তাঁদের উপার্জনের রাস্তা বলতে ইট ভাঁটার কাজ। কিছু অংশ চলে যায় পোলট্রি ফার্মে, পাথরের ক্রেশারে, খড়ি খাদানে। বর্ষায় এরা তাঁদের অঞ্চলের কাজে নিযুক্ত থাকে আর গ্রীষ্মকালে নামালের তিন মাস। তবে কিছু পুরুষ এই মৃত্যু থেকে বেঁচে গেছে। কারণ তাঁরা রোজগারের তাগিদে অনেক আগে গ্রাম ছেড়েছিল। শহরে ভারী কাজে তাঁদের নিযুক্ত করা হত মূলত নানান ধরনের কন্সট্রাকশন ও কারখানার কাজে। সেখানে জীবনের ঝুঁকি থাকলেও চোলাই খেয়ে মরার মত অবস্থা ছিল না। গ্রাম পুরুষ শূন্য হওয়ার পরে তাঁদের অনেকেই এখন গ্রামে ফিরেছে। তবে তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ফেরার সময় সম্পূর্ণ টাকা পায়নি। তাঁদের অঙ্কের মোটা টাকাটা ঢুকেছে ঠিকাদারের পকেটে। এই ঠিকাদারদের কাজ হল কমিশনের ভিত্তিতে গ্রাম থেকে বেকার ছেলেদের তুলে নিয়ে গিয়ে শহরে সস্তার মজুরের জোগান দেওয়া।
তিন মাস আগে ঝিনুক কোঁড়া বিধবা হয়েছে। তবে তাঁর মরদ রবিন কোঁড়া চোলাই খেয়ে মারা যায়নি। নামালের কাজে গেছিলো বীরভূমের সাঁইথিয়ার কাছে গদাধরপুর নামের একটি গ্রামে। সেখানে মাঠে কাজ করার সময় বজ্রপাতের কারণে মারা যায়। রবিনের সাথে নিমমহলির আরও কিছু মানুষ সেখানেই নামাল খাটতে গেছিলো। প্রথমে জমির মালিক রবিনের মৃত্যুর কোন দায়ভার নিতে চাইনি। কিন্তু তপন কোঁড়া সকলকে একজোট করে মালিককে চেপে ধরলে মালিক একটি ‘চাইনা ভ্যান’ ভাড়া করে দিয়েছিল। সেই ‘চাইনা ভ্যান’এ করে রবিনের মৃতদেহ গ্রামে ফিরিয়ে এনেছিল তপনরাই। আসার সময় মৃতদেহ সৎকারের জন্য তপনের হাতে দুহাজার টাকা দিয়েছিল জমির মালিক।
ঝিনুক আর রবিনের বিয়ে হয়েছিলো আট মাস আগে। গেলো আষাঢ়ে। রবিন শহর থেকে গ্রামের ফেরার পরে পরেই। রবিনের বাবা মারা গেছিলো চোলাই খেয়েই। ফাইলেরিয়ার কারণে তাঁর মায়ের একটা পা গোদা। হাঁটতে চলতে অসুবিধা হয় না। তবে একটানা বেশিদূর হাঁটতে পারে না। মাঠে বা ইটভাঁটায় কাজ করতে গেলে অসুবিধা হয়। ফলে রবিনের বিয়ে দেওয়াটা জরুরি হয়ে উঠেছিল। আদিবাসী সমাজে অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যায়। তবে রবিন বাইরে থাকার ফলে বিয়ে একটু বেশি বয়সেই হয়। বিয়ের কথা উঠতেই রবিন তাঁর মা কে ঝিনুকের কথা জানায়। ঝিনুকের সাথে রবিনের অনেক দিনের প্রেম। তাঁরা একসাথে ‘বাঁদনা’; ‘বাহা’; ‘দাসাই’ সমস্ত পরব কাটাত। ঝিনুকের বাড়ি ম্যাসানজোর ড্যামের পাশে, তিলপাহাড়ি গ্রামে। ড্যামের পাড়ে যখন ‘দাসাই’ পরবের মেলা বসতো দুজনে একসাথে যেত। সেই মেলায় সকল জিনিসের সাথে সাথে হাঁড়িয়া, মহুয়া আর শুয়োরের মাংসের পসরা বসতো। হাঁড়িয়া আর মাংস খেয়ে ঝিনুকের হাত ধরে পাহাড়ের উপরে যেত রবিন। সেই সব উৎসবে চাঁদের স্নিগ্ধতায় চারিধার হয়ে উঠত প্রেমের স্বর্গভূমি। সেখান থেকে প্রথম ড্যামের জলে আকাশের চাঁদকে ভাসতে দেখেছিল ঝিনুক। সেই দৃশ্য দেখে রবিনকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিল বহুক্ষণ। কাছে মানুষকে কাছে পাওয়ার আনন্দের বহিঃপ্রকাশ হল চোখের জল। তারপর রবিনের সাথে সারারাত মেলাতে, জঙ্গলে পাহাড়ে কাটিয়ে ভোরে বাড়ি ফিরে যেত ঝিনুক। তারপর রবিনও ফিরে আসতো নিমমহলিতে।
বিয়ের দিনে রবিন ঝিনুকের জন্য আদিবাসী বিবাহ রীতি ভেঙেছিল। আদিবাসী বিয়ের রীতি অনুসারে রবিন যখন গাছে উঠে পরে সে দেখে ঝিনুকের কি কান্না। রবিন কে নামাতে সে কোন ভাবেই বলবে না যে আমি খেটে মরদকে খাওয়াবো। শেষে ঝিনুকের কান্না দেখে রবিন নিজেই গাছে থেকে নেমে পরে। সেই দৃশ্য দেখে গাঁয়ের মোড়লরা রাগ করেছিলো বটে। এক হাঁড়ি হাঁড়িয়ার বদলে সে রাগকে ঠাণ্ডা করতে হয়েছিল রবিনকে।
সংসারে অভাব থাকলেও রবিন কখনো ঝিনুকে লোকের জমিতে কাজ করতে যেতে দেয়নি। রবিনদের কিছুটা নিজস্ব জমি ছিল সেখানে ঝিনুক চাষের কাজ করতো। আর বাকি সময় ঘরের কাজ, গরু-বাছুর, হাঁস-মুরগি দেখত। ঝিনুকের এক কথায় রবিন শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে আসে। ভালোবাসার টানে সকলকেই একদিন ফিরতে হয় ভালোবাসার মানুষের কাছে এ পৃথিবীর এক কঠিন বাস্তব। রবিন নামাল খাটতে যাওয়ার সময় ঝিনুকও জেদ ধরেছিল সঙ্গে যাবার। রবিন নিয়ে যায়নি তার কারণ রবিন জানে নামাল খাটতে যাওয়া নিজেদের জাতের মেয়েদের উপর দিকুরা কি জুলুমটা না করে। সেই ভয়ে হয়তো নিয়ে যায়নি ঝিনুককে। নইলে হয়তো নিয়ে যেত। ঝিনুককে তো সে চোখে হারায়।
এখন ব্রিজ হলেও, রাস্তা হলেও নিমমহলিতে সেই একটি মাত্র মুদিখানার দোকান। সেটাও আবার দিকুদের। আর বড় বাজার বলতে দেবনগর। নিমমহলি থেকে সে আট কিলোমিটারের রাস্তা। বর্তমানে দুর্জয় স্বর্ণকার মুদিখানার দোকান চালালেও তার বাপ-ঠাকুরদারা এই গ্রামে এসেছিলো আদিবাসীদের মেহনত আর সম্পত্তি লুঠ করতে। সেই লুঠের সম্পত্তি দিয়েই বর্তমানে তাদের পতিপত্তি গড়ে উঠেছে এই গ্রামে। এখনো সেই মুদিখনার দোকানে সুদের অঙ্কতে আদিবাসীদের ধারবাকি দেয় দুর্জয়। সেই ধারবাকি আর কখনো মেটে না। দুর্জয়ের ভাই সঞ্জয় চোলাইয়ের ব্যবসাদার। গ্রামের মহিলারা এখন চোলাইয়ের কারবার বন্ধ করে দিয়েছে বলে সাইকেলে করে গ্রামে গ্রামে জামা-কাপড় বিক্রি করে। আর উপরি কামাইয়ের জন্য খবর পাচার করে। এই খবর পাচার তার পুরনো ব্যাবসা। এই সব অঞ্চলগুলিতে পুলিশ সচরাচর ভয়ে ঢোকে না। পুলিশের ভাষায় এই সব গ্রামগুলি হল ‘লালপিঁপড়েদের আস্তাবল’। আগে সঞ্জয় তার চোলাই এজেন্টদের কাছে থেকে খবর সংগ্রহ করে ব্যবসাটা চালাত। এখন নিজেই গ্রামে গ্রামে কাপড় বিক্রি করে, তবে খবর সেরকম থাকে না। ২০১২ সালের পরে থেকে এই ব্যবসায় মন্দা নেমেছে। আগে লালপিঁপড়েরা থাকতো বলে চোলাইয়ের ব্যাবসা ঠিকমত চলত না। মানুষগুলোও বেঁচে ছিল। খবর পাচারের ব্যাবসাটা তখন জাঁকিয়ে চালাত সঞ্জয়। লালাপিঁপড়েদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় চোলাইয়ের ব্যাবসাটা রমরমিয়ে চালাতে শুরু করে। এখন চোলাইয়ের ব্যবাসা উঠে যাবার পর থেকেই খবর পাচারের ব্যবাসায় আবার নেমেছে। এই ব্যাবসায় লাভের অঙ্কটা বেশি। তবে সঞ্জয়ের মনের মধ্যে সবসময় লালপিঁপড়ের কামরের ভয়টা থেকে যায়।
আদিবাসী মহিলাদের উপরে দিকুদের যৌন শোষণের কথা মহেশ্বতা দেবী থেকে সোমেন্দ্রশেখর হাঁসদা সহ নানান সাহিত্যিকদের লেখাতে যেমন আমরা পাই, বাস্তবে তা আরও ভয়ঙ্কর। কোন ভাবেই এই ভয়ঙ্কর রুপকে সর্বত ভাবে প্রকাশ করা সম্ভব বলে মনে হয় না। রবিন মারা যাওয়ার পরেও ঝিনুক নিমমহলি ছেড়ে তিলপাহাড়িতে বাবা-মা’র কাছে ফিরে যায়নি। শাশুড়িকে সঙ্গে নিয়ে থাকে। নিমমহলির মানুষদের সাথে এখন অন্যের জমিতে খাটতে যায়। দুর্জয়ের দোকানে ধার-বাকিতে চলে সংসার। পুরুষশূন্য এই আদিবাসী পরিবারের উপরে দুর্জয় সহানুভূতি দেখায়। আসলে এই সহানুভূতির পিছনে রয়েছে ঝিনুকের প্রতি দুর্জয়ের যৌন উগ্রতা। ঝিনুক দোকানে গেলে কিছু কিছু জিনিসের টাকা নেয় না সঞ্জয়। টাকা ছাড়া ঝিনুক নিতে না চাইলে একপ্রকার জোর করে ধরিয়ে দেয়। তবে ঝিনুক গেরস্ত ঘরে থেকে মজুরি পেলেই দুর্জয়ের টাকা মিটিয়ে দেয়। মাঝে মাঝে ফাঁকা দোকানে ঝিনুক কিছু কিনতে এলে দুর্জয় ঝিনুকের শরীরের দিকে তাকিয়ে থাকে। মাঝে মাঝে ঝিনুকের হাত ধরার চেষ্টা করে। ঝিনুক রেগে যায়, বলে- ‘দেখবি গাঁয়ের লোক ডাকবো?’ দুর্জয় শয়তানের হাসি হেসে বলে – ‘লোক ডেকে কি করবি? জঙ্গলে যাবি ত চ কেনে’। ঝিনুক রেগে দোকান থেকে বেরিয়ে যায়। দুর্জয় জানে গ্রামের কেউ সহজে তাঁর বিরুদ্ধে কিছু বলবে না। কারণ মুদির দকানের হাল খাতায় ধার-বাকির অঙ্কে সে সকলকে বেঁধে রেখেছে।
অন্যদিকে সঞ্জয়। সাইকেল নিয়ে ফেরি করতে যাওয়া সময় ঝিনুককে একা দেখতে পেলে দাঁড়িয়ে পরে, বলে – ‘এই এউয়া… প্যান্টি লাগবে? বেসিয়ার লাগবে? কত সাইজ দেবো বল’। ঝিনুক উত্তর দেয় না। পাশ কাটিয়ে চলে যায়। দুর্জয় ঝিনুককে ছোঁয়ার সাহস করলেও সঞ্জয় করে না। সঞ্জয়ের মদের কারণে গ্রাম পুরুষশূন্য। সকলের রাগ আছে তাঁর উপরে। আগেরবার ক্ষমা চাওয়ায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছিলো। এই বার কিছু করলে তাকে যে গ্রাম ছাড়া করা কিংবা মেরে ফেলা হবে তা সে মোক্ষম জানে।
এখন আদিবাসী গ্রামগুলির চরিত্র বদলেছে। ব্যাঙের ছাতার মত হনুমান মন্দির হচ্ছে। সরস্বতী পূজো, দোল হচ্ছে তার সাথে ডিজে বাজিয়ে নাচ। ঘরে ঘরে হচ্ছে তুলুসি মন্দির, দরজায় দরজায় রাম-সীতার ছবি লাগানো হচ্ছে। অভিনব কৌশলে তাঁদের সারি ধর্ম ভুলিয়ে হিন্দু করা হচ্ছে। আদিবাসীদের যেমন ইংরেজরা খ্রিস্টান করতে লেগেছিল লুঠ করার তাগিদে এখন সেই এক কৌশলেই হিন্দু করার চক্রান্ত। জল-জঙ্গল-জমির লুঠ যেখানে শাসকের মূল লক্ষ্য।
গ্রাম ঢোকার মুখেই ঝিনুকের শ্বশুরবাড়ি। সেই বাড়ির পাশে এই বছর তৈরি হয়েছে একটি হনুমান মন্দির। সেই হনুমান মন্দিরের গায়ে বড় বাঁশের ডগায় ঝুলছে মহাবীর ঝাণ্ডা। নরেন্দ্র মোদী দ্বিতীয়বারের জন্য দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার দিন ছিল এই মন্দিরের ছাদ ঢালাই। সেই মন্দিরের চূড়ার পাশে মহাবীর ঝাণ্ডার পিছনে চাঁদ ভাসছে। পাল্লাবিহীন জানলা দিয়ে চাঁদের আলোয় মহাবীর ঝাণ্ডার কালো ছায়া এসে পড়েছে কম্বলে ঢাকা ঝিনুকের শরীরের উপর। ঘরের দরজাও নেই। বারান্দায় এই শীতেও খড়ের উপরে চাঁটাই বিছিয়ে একটা ছেঁড়া কম্বল নিয়ে ঘুমিয়ে আছে তাঁর শাশুড়ি। ঝিনুকের ঘুম আসছে না। গায়ের কম্বলটিকে জড়িয়ে গুটসুটি হয়ে শুয়ে এক দৃষ্টিতে জানলার বাইরের চাঁদটিকে দেখছে ঝিনুক। মনে পড়ছে রবিনের সাথে গিয়ে ম্যাসানজোর ড্যামের জলে প্রথম চাঁদকে ভাসতে দেখা, মনে পড়ছে তিলপাহাড়ির কথা। তাঁর গ্রাম, পরিবার-আত্মীয়স্বজনদের কথা। তাঁর ইচ্ছে করে তিলপাহাড়ি ফিরে যেতে। আবার বৃদ্ধ-অসুস্থ শাশুড়ির কথা ভেবে সে ইচ্ছেতে লাগাম কষেছে বারবার। আদিবাসী প্রথায় শিকারের ভাগ সমান ভাবেই বিধবাদেরও দেওয়া হয়, দিকুরা বিধবাদের যেভাবে তাছিল্য করে রাখে আদিবাসী প্রথায় তা হয় না। বিধবারাও সমাজে স্বসম্মানে অধিকারের সাথে বেঁচে থাকে। শুয়ে শুয়ে এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ ঝিনুকের মনে হল নিঃশব্দে কেউ তাঁর ঘরে ঢুকল। ততক্ষণে সে হ্যারিকেন নিভিয়ে দিয়েছে। কেরোসিনের দাম দুই বিশ দশ। বেশি খরচ করা যায় না। তবু যেটুকু চাঁদের আলো এসে পড়েছে তাতে দেখে চাঁদর মুড়ি দিয়ে কেউ তাঁর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ঝিনুক দৃষ্টি সরিয়ে বারান্দার দিকে তাকায়। বারান্দায় ধবধবে চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তাঁর শাশুড়ি ঘুমিয়ে রয়েছে। ঝিনুক চিৎকার করে উঠবে এমন সময় তাঁর মুখ চেপে ধরে একটা শক্ত হাত। ঘরের ভেতরের মৃদু চাঁদের আলোয় ঝিনুক দেখে দুর্জয়। ঝিনুকের চোখের তেজ দেখে দুর্জয় কথা বাড়ায় না। বলে – ‘সামনে বাঁদনা ভাবলুম কি করে উৎসব করবি। দিনের আলোতে তো আর সব দেওয়া যায় না। এই হাজার টাকাট রাখ। কিছু কিনবি’। দুর্জয় ঝিনুকের মুখ থেকে হাত সরিয়ে নেয়। ঝিনুকের বালিশের পাশে টাকাটা রাখে। ঝিনুক চিৎকার করে না। নির্বাক হয়ে যায়। দুর্জয় আবার বলে- ‘মরদ ছাড়া আছিস, তুর বয়সও কম। মায়া হল তাই দিতে টাকাট এলুম’। ঝিনুক ভাবে সে চিৎকার করবে কি না। তারপর মুখ ঘুরিয়ে বারান্দায় চালে গোঁজা কাস্তেটার দিকে তাকায়। ততক্ষণে দুর্জয় দৌড়ে পালিয়ে যায়। চাঁদ তখন মাঝ আকাশে। ঘরের ভেতরটা ধীরে ধীরে আরও অন্ধকার হয়ে উঠছে। সেই অন্ধকারে ঝিনুক গুঁটি মেরে বসে থাকে। হাঁস ঘরের হাঁসগুলো সমবেত ভাবে ডাকতে শুরু করে। হয়তো বিড়াল বা শেয়াল এসেছে উঠোনে।
পরের দিন ভোরে উঠে কাজে যাবার সময় ঝিনুক ভাবতে থাকে গেলো রাতের কথা সে কাকে জানাবে। তাঁর শ্বাশুড়িকে না তপনকে। এই দুজন ছাড়া নিমমহলিতে তাঁর আপন কেউ নেয়। এইসব ভাবতে ভাবতে নিরুপায়ের মত হাঁটতে থাকে সবার সাথেই। কিছু বলতে পারে না কাউকেই।
ঝিনুক ও তপন কাছাকাছি মাঠে কাজ করলেও তাঁদের জমির মালিক আলাদা। কাজের ফাঁকে দেখা করার অবকাশ নেয়। ধান কাটার সময় মালিকরা শীতের রোদে এসে বসে থাকে মাঠে। সর্বচ্চ কাজটা হাসিল করতে তারা মরিয়া থাকে।
দুপুরে খাবার সময় গাছের ছায়ায় আশে পাশের মাঠের সকলে একসাথে খেতে বসে। গল্প গুজব করে ওই ফাঁকে। খাবারের আদানপ্রদানও হয়।
খাওয়া দাওয়া সেরে কান্দরের জলে ঝিনুক টিফিন কৌটো ধুয়ে নেয়। একটু দূরে বসে তপন খৈনি ডলছিল। ঝিনুক যাবার সময় তপনকে জানিয়ে যায় তাঁর সাথে গোপনে কথা আছে।
কাজ তখন প্রায় শেষ। তপন তখন তাড়া করা ধান তুলছে গরুর গাড়িতে। মাঠে ঝড়ে পড়া শিষগুলো কুড়চ্ছে ঝিনুক। কাজের শেষে অনেকেই এই শিষ কুড়োয় এই শিষ মেরে যে দশ বিশ কেজি ধান হয় তা দিয়ে তাঁরা কিছু কেনাকাটা করে। ঝিনুক তাঁর শাশুড়িকে জানিয়েছে তাঁর পায়ে ব্যাথা সে তপনের সাইকেলে যাবে। ঝিনুকের শাশুড়ি গ্রামের লোকজনের সাথে তাই আগেই হাঁটা লাগিয়েছে। ঝিনুক তপনের সাথে যায়। তপন গিয়ে সাইকেল থামায় একটি চায়ের দোকানে। সেখানে তাঁরা চা খায়। তারপর আজকের কুড়নো ধানের শিষগুলো দিয়ে ঝিনুক চারটে চপ কেনে। যদিও এই চারটে চপের বদলে কাল আবার কিছুটা শিষ দিতে হবে ঝিনুককে। তারপর সেই চপের ঠোঙা নিয়ে গিয়ে তাঁরা বসে নতুন ব্রিজের পাশে। ব্রিজ থেকে একটু নেমে গেলে পুরনো পারাপার করার রাস্তা। বড় বড় পাথর ফেলে তৈরি করা হয়েছিলো। এখন শীতকাল তাই জল কম বলে সেগুলোর উপরে বসা যায়।
সেদিন অনেক রাত করে বাড়ি ফিরেছিল ঝিনুক। তাঁর শাশুড়ি ততক্ষণে শুয়ে পড়েছে। তপনের সাথে ঝিনুকের মেলামেশাতে তাঁর আপত্তি নেয়। দিকুদের সমাজের চেয়ে বিধবাদের অনেক বেশি অধিকার আছে আদিবাসী সমাজে। আদিবাসী সমাজে অবাধ মেলামেশায় কোন বাধা নেই। তপন এখনো বিয়ে করেনি। যদি ঝিনুককে তাঁর মনে ধরে। তাঁরা যদি বিয়ে করে তাহলে সে খুশিই হবে।
ঝিনুক বাড়ি এসে কিছু না খেয়ে শুয়ে পরে। তপনকে আজ সে সব কিছু বলেছে। দীর্ঘদিন ধরে দুজনের মধ্যে যে ভালবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠছিল নীরবে আজ তাঁর মাঝের অনেকটা বাধা কমে গেছে। তবে দুর্জয় ও সঞ্জয়ের সম্পর্কে সব কথা শোনার পরে তপন কেমন যেন শান্ত হয়ে যায়। তপনের এই শান্ত হয়ে যাওয়াটা যে অত্যাধিক রাগের লক্ষন ঝিনুক বিলক্ষণ জানে। সব শোনার পরে তপন বলে সে গোপন দলকে সব জানাবে। গোপন দল সম্পর্কে ঝিনুক জানে। তিলপাহাড়িতে থাকাকালীন তাঁর হপন কাকা গোপন দলে যোগ দিয়েছিলো। কাকার কাছে থেকে গোপন দলের লড়াইয়ের কথা শুনত। কীভাবে গোপন দল মানুষের অধিকারের কথা বলে সেসব শুনত। সেসব শুনে তাঁরও ইচ্ছে করতো গোপন দলে যোগ দেবার। সেই সুযোগ আর হয়ে ওঠেনি। ঝিনুক জানে তপন গোপন দল করে। রবিনও মাঝে মাঝে গোপন দলের ডাকে যেত। ঝিনুক বারবার রবিনকে গোপন দলের ডাকে নিয়ে যাওয়ার কথা বলতো। কিন্তু রবিন নিয়ে যাবো নিয়ে যাবো বললেও নিয়ে যায়নি। রবিন শহরে যাওয়ার পরে তো সেসবের আর কোন কিছু ছিল না।
সেই রাতের পরে থেকে আর তপন গ্রামে ফেরিনি। কাজেও যায়না। ঝিনুক জানে তপন কোথায় যেতে পারে। সে শুধু অপেক্ষায় থাকে তপনের ফেরার। তাঁর বিশ্বাস তপন ফিরলে ‘লালপিঁপড়েদের আস্তাবল’এ দুর্জয় ও সঞ্জয়দের বিচার হবে।
এই বছর শীত গেছে খুব তাড়াতাড়ি। গাছে গাছে অল্পস্বল্প পলাশ ফুটেছে। উঠনে-ঘরে এখনো বাঁদনার চাকচিক্য। এখনো তপন ফেরেনি। এই সময়টায় কারোর চাষের কাজ খুব বেশি থাকে না। এই অঞ্চলে চাষ বলতে বর্ষার ধান। তবে নদীর পাড়ের জমিগুলোতে অনেকে গম-সরিষা চাষ করে। তপন থাকলে গম-সরিষা লাগাত এই কথা ভাবতে ভাবতে শরের ঝাঁটা বাঁধছিল ঝিনুক। আঙুলে তাঁর একটা কাপড় বাঁধা। হয়তো শরেই কেটেছে। সূর্যের তেজ তখন অনেকটা ঠাণ্ডা। নিমমহলির রাস্তায় তখন ধুলো উড়িয়ে বাড়ি ফিরছে গরুর দল। ঝাঁটা বাঁধার কাজ রেখে তখন বাইরে থেকে কিছু কাঠ ঘরে আনতে গেছে ঝিনুক। অন্ধকার গাঢ় হবার আগে রান্না চাপিয়ে ফেলতে হবে। কাঠ আনতে গিয়ে সন্ধ্যার মুখ চেনা অন্ধকারে ঝিনুক দেখে তাঁর সামনে তপন দাঁড়িয়ে। ঝিনুক কিছু জিজ্ঞেস করতে যায় তপন থামিয়ে দেয়। আজ রাতে চাঁদ মাথার উপরে যখন আসবে ঝিনুক যেন পলাশ বনে পৌঁছে যায়। রাতে লালপিঁপড়েরা আস্তাবলে ফিরছে। এইতুকু কথা বলে তপন দুরের কাঁটাঝোপে মিলিয়ে যায়। ঝিনুক অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তাঁর মাথা থেকে পা অবধি কেঁপে ওঠে। কাছের মানুষকে হঠাৎ দেখলে মানুষ আনন্দিত হয়। সেই আনন্দের রেশ জেগে ওঠার আগেই যদি মানুষটি আবার হারিয়ে যায় তার চেয়ে বিরহের আর কিছু হয়তো পৃথিবীতে নেয়।
তবে ঝিনুক জানে খুব তাড়াতাড়ি সে বিচার পাবে। তবু আজ তাঁর মনে আনন্দের থেকে যে দুঃখের ভাগ বেশি। সেই ক্ষীণ অন্ধকারে বিদ্যুতের মত তপনের আসা ও মিলিয়ে যাওয়া ঝিনুক মেনে নিতে পারছে না। অন্তত কেমন আছে এইটুকু জিজ্ঞেস করতে পারলেও সে শান্তি পেত। ঝিনুকের এই অভিমান যে ভালবাসার রসকে আরও গাঢ় করে তুলছে। তাড়াতাড়ি রান্না সেরে ঝিনুক এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। তখন চাঁদ সবে মাত্র পশ্চিম থেকে দক্ষিণের দিকে কিছুটা হেঁটেছে। এক চাপা উত্তেজনা ঝিনুকের মনে। বারবার সে ভেবে যায় এইবার হয়তো তাঁর চিরদিনের জন্য গোপন দলে যাওয়ার পালা। আবার ভাবে সে চলে গেলে তাঁর শাশুড়ির কি হবে। তবু সে নিজের মনকে শক্ত করে ভাবে শাশুড়ির কিছু একটা হয়ে যাবে কিন্তু যদি সে গোপন দলে যায় অন্তত তপনের সাথে সে থাকতে পারবে, কথা বলতে পারবে।
এখন শরতের মেঘের মত রবিনের স্মৃতি মাঝে মাঝে ঝিনুকের মনে ভাসে। চাঁদ মাথার উপরে আসতে আর দেরি নেই। ঝিনুক আলো নেয়নি। মৃদু জোছনায় পথ দেখা যাচ্ছে। নদী পেরোনোর সময় ঝিনুক জল দিয়ে মুখটা ধুয়ে নেয়। তাঁর মন এখন নদীর বালির মত চিকচিক করছে। শালবনে গিয়ে ঝিনুক দেখে কেউ নেয়। একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে নেয় চাঁদের অবস্থান ঠিক তাঁর মাথার উপরে। একটু ভয় করছে তাঁর। মানুষশূন্য শালবন। মাঝে মাঝে শিয়ালের ডাক। রাতচরা পাখিরা মাঝে মাঝে উড়ে যাচ্ছে মাথার কাছাকাছি। ঝিনুক একটু অপেক্ষা করে। তপন যখন আসতে বলেছে নিশ্চয় আসবে। রাত অনেকটা গড়িয়ে যায়। মনের অভিমান এতক্ষণে রাগে পরিণত হয়েছে। অবশেষে তপন আসে। কিন্তু সে একা। আসা মাত্র তপন ঝিনুককে নতুন ব্রিজের দিকে যেতে বলে। শালবনের মাঝে দিয়ে তাঁরা হাঁটছে। সামনে ঝিনুক তাঁর কিছুটা পিছনেই তপন। তপনের হাতে একটা টর্চ লাইট, কিন্তু জ্বালছে না। নদীর পারে এসে ভাও কুঁড়ে তপন জল খায়। তারপর একটা জায়গায় বসে একটু ঠাণ্ডা হয়ে ঝিনুককে জানায় গোপন দলের কমরেডরা আসতে পারেনি। ঝাড়খণ্ড বর্ডারে পুলিশের টহলদারি বেড়েছে আজ তাই তাঁরা বাংলা ঢুকতে পারেনি। এই কথা শোনার পরে ঝিনুক একটু স্তম্ভিত হয়ে পরে। নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকে তপনের মুখের দিকে।
অন্যদিকে ঝিনুক আবার একটু খুশি হয়। কারণ এই প্রথম একদম নির্জনে সে তপনকে পেয়েছে। সেই ব্রিজের নীচে তাঁদের নানান কথা চলতে থাকে। ভোরের ঠাণ্ডা বাতাস তখন দুজনকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর আদিম মিলনের দিকে তখন তাঁরা এগিয়ে চলেছে জোনাকিদের সাক্ষী রেখে।
ভোরে জঙ্গল থেকে ফেরার সময় তপন ঝিনুককে একটা ঝিনুকের খোলা উপহার দেয়, ঝিনুকও তপনকে একটা তিরের ফলা উপহার দেবে বলে। আসলে আদিবাসী সমাজে পুরনোরীতি অনুসারে যখন ঘরের মধ্যে তাঁদের সন্তান প্রসব হয় তখন ছেলে জন্মালে নাভি কাটা হয় তীরের ফলা দিয়ে আর মেয়ে হলে ঝিনুকের খোল দিয়ে। তপন চাই তাঁর ও ঝিনুকের কন্যা সন্তান জন্মাক। ঝিনুক তাঁর উল্টোটা। আসলে সারা পৃথিবীতে এই সংজ্ঞাটা সকল মানুষের কাছে অনেকটা একরকম। আদিবাসী প্রথায় বিধবা মহিলাকে বিয়ে করার সময় সিঁদুর দান হয় না। পুরুষ সেই বিধবা মহিলার খোঁপায় ফুল গুঁজে দেয়। আজ তপন ঝিনুককে আদর করার পরে ঝিনুকের খোঁপায় পলাশ ফুল গুঁজে দিয়েছে। গ্রামের মোড়লকে বলে তাঁরা সামাজিক বিয়ে সারবে কিছুদিন পরে। ভোরের নীল আলোয় সেই রক্ত পলাশ যেন আবার সমস্ত তেজ ফিরিয়ে দিয়েছে ঝিনুকের মনে। তপন গ্রামে ঢুকবে না। কমরেডের খবর আনতে যাবে। তবে ঝিনুককে গ্রামের মাথা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে জঙ্গল থেকে গ্রামের দিকে হাঁটা লাগায় একসাথে।
তাঁদের একসাথে জঙ্গল থেকে বেরোতে দেখে ফেলে সঞ্জয়। ঝিনুককে না পাওয়ার ক্ষোভ ও ভাই দুর্জয়ের উপর সম্পত্তিগত হিংসা থেকে সে করে বসে তাঁর জীবনের শেষ ভুলটি। থানার বড় বাবুকে গিয়ে সে সবটা জানাই। বড়বাবু সঞ্জয়কে বাকি নীলনক্সাটা বুঝিয়ে দেয়।
সারা নিমমহলিতে ছড়িয়ে পরে দুর্জয় এর সাথে ঝিনুক রাতে জঙ্গলে গেছে। একজন দিকুর সাথে একজন বিধবা সাঁওতাল মহিলার রাতে জঙ্গলে যাওয়ার কথা কতটা আগুন জ্বালাতে পারে সঞ্জয় বিলক্ষণ জানতো। সমস্ত পরিকল্পনা করে যে মোড়লের সাথে দেখা করে এসেছে ও ধারবাকির অঙ্ক বুঝিয়ে কিছু টাকা মোড়লের হাতেও দিয়ে এসেছে। আসলে সঞ্জয়ের হাতে দিয়েছে থানার নতুন বড়বাবু। বড়বাবু বিলক্ষণ জানেন গ্রামে একটা বড় ঝামেলা বাঁধাতে পারলে জনতানা আইনে তার বিচার হবে। আর সেই সময় যদি সঞ্জয় ঠিকমত খবর দিতে পারে তাহলে যে তাঁর প্রমোশন আর কে দেখে। গ্রামের মোড়লের কথা অনুসারে ঠিক হয় বিকেল ৪টে তে বিচার বসবে পলাশবনের মাঠে। আসলে এই সময় ঠিকটাও হয় বড়বাবুর নির্দেশ মত সঞ্জয়ের কথা অনুসারে। কারণ বেশি রাত হলে গ্রাম থেকে থানায় খবর পাঠানো সহজ হবে না। আর রাতে লালপিঁপড়ের আস্তাবলে পুলিশও সহজে ঢুকবে না। তাই ভাইয়ের সম্পত্তি দখল ও ঝিনুকের জীবন তছনছ করার কাজ সে একবারেই সেরে ফেলতে চাই। সঙ্গে বড়বাবুর মন খুশি করে একটা বাজি মারতে চাই সে।
ঝিনুক জঙ্গল থেকে ফিরে এসে আর ঘুমায় নি। তাঁর শাশুড়ি পাতা জ্বেলে উনুনে ভাত’এর জল বসিয়েছে। ঝিনুক উঠোন ঝাট দিচ্ছিল। এমন সময় গাঁয়ের মোড়ল বসন্ত হেমব্রম আরও কিছু লোক নিয়ে এসে উঠোনে হাজির। ঝিনুকের দিয়ে একটা রাগের চাহনি দিয়ে ঝিনুকের শাশুড়িকে সঞ্জয়ের মুখ থেকে শোনা সব কথা বলতে শুরু করলো মোড়ল। ঝিনুক স্তব্ধ। কথা শেষ করে সকলে বেড়িয়ে যায়। জানিয়ে গেলো আজ বিকেলে পলাশবনে পঞ্চায়েত বসবে। উনুনের পাতা পুড়ে গেছে সেখান থেকে ছায় উড়ছে। চাল তখনও দেওয়া হয়নি। হাঁড়ির জলটা আর ফুটছে না শুধু উপরে একটা ধুসর ধুঁয়া উড়ছে। এসব কথা শোনার পরে ঝিনুক ঘরের ভেতরে চলে যায়। ভাত আর হয় না। তাঁর শাশুড়ি বাড়ির বাইরে বেড়িয়ে যায়। যুগটা মোবাইলের হলেও ঝিনুকের কাছে মোবাইল নেই। তাঁর খুব ইচ্ছে করছে তিলপাহাড়িতে ফোন করে মা-বাবাকে সব জানাতে। উপায় নেই। এখন তপন যদি বিকেলের আগে ফেরে তবেই সবাই মানবে ঝিনুক কার সাথে জঙ্গলে গেছিলো। কিন্তু তপন না ফিরলে কেউ ঝিনুকের কথায় বিশ্বাস করবে না। ঝিনুক ভাবতে ভাবতে অস্থির হয়ে উঠছে। ঝিনুকের মন শক্ত সহজে কান্না আসে না। ঝিনুক দেখে তাঁর শাশুড়ি গোদা পা নিয়ে থপথপ করে ঘরে ঢুকল। ঝিনুক আর কান্না চেপে রাখতে পারলো না। মরদকে হারিয়েছে, কিছুমাস আগে ছেলেকে হারিয়েছে, এই বউমা ছাড়া তাঁর আপন বলতে আর কেউ নেয়। ঝিনুকের উপর যতই রাগ হোক। ঝিনুকের কান্না দেখে তাকে বুকের কাছে টেনে নিলো বৃদ্ধা। কিছুক্ষণ পরে কান্না থামিয়ে শাশুড়িকে সব কথা বুঝিয়ে বললো। ঝিনুকের কথা গ্রামের সকলে অবিশ্বাস করলেও তাঁর শাশুড়ি করবে না। সব শোনার পরে শাশুড়ি বউ মিলে ঠিক করলো গ্রামের তপনের একমাত্র কাছের বন্ধু লখিন্দরকে দিয়ে তপনের কাছে খবর পাঠাবে।
ঝিনুকের কথায় লখিন্দর বেড়িয়ে পড়েছে তপনের কাছে খবর পৌঁছাতে। বিকেলের অপেক্ষায় বসে আছে ঝিনুক ও তাঁর শাশুড়ি। দুজনের অভুক্ত পেট তখন চিৎকার করে বলছে – এই পৃথিবীতে তাঁদের অধিকারের কথা।
বিচার বসেছে পলাশবনে। দুর্জয় আসেনি। সকালেই খবর পাওয়া মাত্র গা ঢাকা দিয়েছে। মোড়ল বসন্ত হেমব্রমের কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে সঞ্জয়। ঝিনুককে একটু একটু দূরে বসিয়ে রাখা হয়েছে। আদিবাসী সমাজে এই ধরণের খাপ বসা শুরু হয়েছে আধুনিক কালে। একটু অতিতে গেলে এই সব খাপ বসানোর ইতিহাস খুব একটা নেয়। নানান দিক থেকে ঝিনুকের বিরুদ্ধে উঠে আসছে নানান কুমন্তব্য। ঝিনুক চুপ করে বসে আছে, ভাবছে কখন তপন আসবে। ঝিনুকের শাশুড়ি তপন ও ঝিনুকের জঙ্গল যাওয়ার কথা সকলের সামনে বললো। তাতে সঞ্জয় ফোঁস করে উঠলো। সঞ্জয়ের সাথে সাথে তপনের পরিবেরেরও দু-এক একজন নানান কথা শুনিয়ে দিলো ঝিনুকের শাশুড়িকে। গ্রামের এতো আত্মীয়তা, যৌথতা যে কতটা নষ্ট হয়েছে তা হয়তো আজকে সব থেকে ভালো বোঝা যাচ্ছে। সন্ধ্যা নামবে প্রায়। ঝিনুক চিৎকার করে করে বলছে সে তপনের সাথেই জঙ্গলে গেছিলো। কেউ শোনে না সে কথা।
বিচার শেষ হয়। তপন ফিরে আসেনি। ঠিক হয় গ্রামের সাতজন পুরুষ মিলে ঝিনুককে জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে শরীর ভোগ করবে। কি নৃশংস বিধান। ঝিনুক কিছুতেই বোঝাতে পারে না তাঁর কথা। তবে ঝিনুকের কথাতে গ্রামবাসীদের একটা বড় অংশ বিশ্বাস করেছে। কিন্তু তাঁদেরও মোড়লের বিচারের উপরে কিছু বলার নেয়। গ্রামবাসীরা একে একে ঘরে ফিরছে। ঝিনুকের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে মোড়ল বসন্ত ও দুর্জয়ের পাশে থাকা কিছু ছেলে।
সেই মুহূর্তে লখিন্দর এসে সেখানে পৌঁছায়। লখিন্দর বিচারের কথা কিছু জানে না। কোনদিকে কিছু না দেখে সে সোজা ঝিনুকের কাছে গিয়ে জানায় তপনকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। ঝিনুক নির্বাক হয়ে পরে। তারপর ঝিনুকের বিচারের শাস্তির কথা শুনে সে প্রানপণে আটকার চেষ্টা করে। কিন্তু না শেষ রক্ষা হল না ঝিনুকের। তাঁর গলায় চিৎকার করারা মত আর শক্তি বেঁচে নেই। চাঁদের আলো এসে পড়েছে পৃথিবীর বুকে। সেই আলোতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে দ্রোপদীর মত জঙ্গলের দিকে হেঁটে চলেছে ঝিনুক।

শুভনাথ: লেখক ও রাজনৈতিক কর্মী

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post