• September 27, 2022

রঙের জন্ম, রঙের মৃত্যু

 রঙের জন্ম, রঙের মৃত্যু

সুমন সাধু

এ জীবন ছন্দময়। সে ছন্দের ভিতর কত রঙের প্রলেপ। বৃষ্টির তুমুল বিকেলে হঠাৎ মনখারাপ। উদাত্ত কণ্ঠে সুবিনয় রায় পরজ রাগে গাইছেন, “গভীর রজনী নামিল হৃদয়ে, আর কোলাহল নাই/ রহি রহি শুধু সুদূর সিন্ধুর ধ্বনি শুনিবারে পাই”। হঠাৎ গানের ছন্দে রং ঢেলে দিল বারান্দার প্রায় শুকিয়ে যাওয়া টগর। সে শুকিয়ে যাওয়ার কোনো হীনমন্যতা নেই।

হিসেব কষে ভাবলাম আমার ব্যক্তি জীবনে এসে পড়েছে নতুন রং। যাদের কোনো ভিত্তি বা ভবিষ্যৎ নেই। জীবনের মতোই। তবুও তারা চলমান। বহমান। মাথার মধ্যে বনবন করে। এমনই এক বৃষ্টির দুপুরে ঘরবন্দি হন ওংকার-ওয়াই। সুদূর হংকং থেকে নিয়ে আসেন নিত্যনতুন রং। খানিক জীবনানন্দীয় তালে। ‘ইন দ্য মুড ফর লাভ’-এর নিয়ন আলোর কথা মনে পড়ে। সেই ফ্রেমেও এসেছিল হঠাৎ অবাধ্য বৃষ্টি।

রং যেন শিল্পীর চেতনাপ্রসূত বিমূর্ত বিভার ফসল। এখানে চলে সচেতন আর অসচেতনতার ভ্রাম্যমাণ খেলা। রং আমাকে ভাষাজ্ঞান দেয়। পারিজাত, খুবানি, আসমানি, শতমূলী, ধূসরাভ হলুদ, ফিরোজা, শার্ত্রোজ, পীতাভ, সূর্যকমল, নীললোহিত, মিডনাইট ব্লু, ভায়োলেট — এক ধাক্কায় শতসূর্য ফেটে যায়। এ মহাজীবনের সকল ব্যক্তি বা বস্তুর ভিন্ন রং রয়েছে। অন্ধকারের যে রং, তাকে অন্ধরং বলি? ভোরের সূর্যকে বলতে ইচ্ছা হয় ভৈরবী রঙের৷ কিংবা উত্তর কলকাতার ঘাটকে নিয়ন রঙের। মায়ের রং চিরসবুজ। বন্ধুরা সন্ধের ধূসর।

এইভাবে রঙের বারোমাস্যা জুড়ে যায় জীবনে। মরণের শ্মশান হয়ে ওঠে ফ্যাটফ্যাটে শাদা। গ্রামবাংলার কৃষকদের হাতে বোনা ধান হয়ে ওঠে সোনালি। সেখানে জুড়ে যায় জাগরণের গান। সলিল চৌধুরীরা গেয়ে ওঠেন বিদ্রোহের সেই অমোঘ সুর ‘হেই সামালো’। হত দরিদ্রের বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না। একসময় বাঁধ ভাঙে। তখন প্রতিবাদে মুখরিত হয় দেশ৷ প্রধানমন্ত্রী – মুখ্যমন্ত্রীদের ক্ষমতার দালাল মনে হয়। প্রতিনিধি হয়েও তাঁরা কেমন মাটির উপরে কালো ঢিবির মতো। মানুষের কান্নার রং কী গো স্যার?

এ বোকার পৃথিবীতে ভালো মানুষরা কেমন এতিম করে দিয়ে পালাচ্ছে। এ মহাজীবন মূল্যহীন। অথচ বাজারে মূল্যবৃদ্ধি। মানুষ কয়েক টাকায় বিক্রি হচ্ছে আরেক মানুষের কাছে৷ উলঙ্গ হয়ে জন্মানো ভাইসকল উলঙ্গ হয়েই শ্মশানে যাবে৷ তারা কি মায়ের চোখের ভাষা বোঝে? জীবন নামক এ অদ্ভুত বৃত্তের মাঝে আমাদের দেখা হয়ে যায় মায়েদের সঙ্গে। মায়ের দুপুরে ভাগ বসিয়ে পোয়াতি বেড়ালটাকে খাবার দিই৷ সে আমার দিকে চেয়ে থাকে অপলক। সে দুপুরে বৃষ্টি আসে না। সে দুপুরের টিভিতে শুধু রিপিট টেলিকাস্ট। সে দুপুর বড়ো বিলম্বিত। দূরের রেডিওতে নিখিল ব্যানার্জি। মৃদু ভেসে আসে। সে দুপুরে ঘুমিয়ে পড়ে সবাই। তখন কে কাহার! সে দুপুরেজোড়া শালিখ। যাদের গায়ের রং খয়েরি।

বিলম্বিত দুপুরের ভীমপলশ্রীতে ভেসে যাচ্ছে সূর্যপোড়া পাড়া। পাড়াতুতো কাকিমারা ছাদ থেকে শাড়ি তুলছে। এয়োবতী কাকিমাদের ভায়োলেট রঙের শাড়ির ভাঁজের আওয়াজে ঘুম ভাঙছে তাদের সন্তানের। হঠাৎ দুপুরের রেডিওতে ফিরোজা বেগম। গানের সুরে রং ঢালছেন তো ঢালছেনই।

যাদবপুরে পড়াকালীন দেখেছি ছাত্রদের হোক কলরব আন্দোলন। ছাত্রদের হাত ধরেছেন শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীরা। অকালে বৃষ্টি নেমেছিল খুব। সেদিন আমরা সবাই কাকভেজা হয়ে আকাশে আকাশে স্লোগান তুলেছিলাম। বৃষ্টি আর স্লোগানে ধুয়ে মিশে যাচ্ছিল বন্ধুরা, প্ল্যাকার্ডে লেখা গান-ছড়ার রং ধুয়ে অদ্ভুত কালার প্যালেটের আকার নিচ্ছিল। সেই বৃষ্টির জলে ধোয়া প্রতিবাদ জিতে গিয়েছিল একদিন। লাল আবিরে ভেসে গিয়েছিল যাদবপুরের ক্যাম্পাস। রং তাই ঘর আর বাইরের চিরকালীন দ্বন্দ্ব থেকে নিজেদের বের করতে শিখিয়েছিল। স্পর্ধা সেদিন হয়ে উঠেছিল অ-পরাজিত।

রং-রঙ্গ জীবনে এসেছে এভাবে। স্বভাবে জুড়ে বসেছে ক্রমশ। পাশ থেকে কেউ শিক্ষকের মতো আমায় শিখিয়ে দিয়েছেন, নিজেকে একা ভেবো না কখনও। চোখে রঙের নেশা লেগেছে। আমার গ্রাম – মফস্‌সল – শহরের ভিড়ে রং হয়ে উঠেছে চলমান। তার জীবনে থিতু এসেছে। সে কারোর একটা প্রেমে পড়েছে। প্রেমের রং কি গোলাপি?

সুমন সাধু :কবি, গদ্যকার, সাংবাদিক

Image source: Saint Goblin

Leave a Reply

Your email address will not be published.