• May 29, 2022

হস্ত শিল্পের অবক্ষয় : একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং

 হস্ত শিল্পের অবক্ষয় : একটি  ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং

সাত্যকি দাসগুপ্ত ও অন্বেষা মুখার্জির লেখা,তর্জমা করেছেন শ্রীমঞ্জরি গুহ।

পশ্চিমবঙ্গের বোলপুর-শান্তিনিকেতন অঞ্চল কলকাতা তথা ভারতবর্ষের অন্যান্য রাজ্য, এমনকি বিদেশের বহু ভ্রমণপিপাসুদের কাছে আকর্ষণের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে বিশেষত অক্টোবর-মার্চ মাস নাগাদ। প্রধাণত উচ্চবিত্ত শ্রেণীর পর্যটকেরাই সপ্তাহান্তের সোনাঝুরির হাটের অন্যতম ক্রেতা এবং হাটের শিল্পীদের রুজি-রোজগারের প্রধান অবলম্বন। করোনাকালীন সময়ে বারংবার একাধিক লকডাউন এবং সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কার ফলে এলাকায় পর্যটক সমাগম যথেষ্ট সীমিত যা অঞ্চলের শিল্পীদের জীবন এবং জীবিকা দুর্বিষহ করে তুলেছে।
আমরা এই প্রতিবেদনের জন্য জুলাই মাস নাগাদ (off season)অঞ্চলের ২৫ জন শিল্পীর কাছ থেকে বিশদে তথ্য সংগ্রহ করেছি। ঠিক এই সময়েরই আশেপাশে রাজ্য সরকার কোভিড সংক্রান্ত নিয়ম কানুনও শিথিল করতে শুরু করে। তথ্য সংগ্রহকালীন সময়ে দ্বিতীয় দফায় কোভিডের প্রভাব কিছুটা প্রশমিত হওয়ায়, লকডাউনের নিয়মাবলী এই সময় শিথিল ছিল এবং যাতে দুই সপ্তাহ সোনাঝুরির হাটও সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। আমরা মূলত শিল্পীদের উৎপাদিত পণ্য, তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত শ্রম এবং বিশেষত কারুশিল্পীর ওপর কোভিড অতিমারীর প্রভাব সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করেছি।
বিভিন্ন ধরনের কারু দ্রব্য যেমন একতারা(এই অঞ্চলের বাউল শিল্পীরাই এটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছে), কাঁথা ও বাটিকের বিভিন্ন জিনিস, টেরাকোটা ও ডোকরার নানান সামগ্রী (ডোকরার জিনিস শুরুতে একমাত্র এই অঞ্চলে তৈরি হত), বিভিন্ন গয়না ও ঘর সাজানোর সামগ্রী এবং কাশফুল ও বাঁশের তৈরি নানা জিনিস সম্পর্কিত বিশদ তথ্য সংগ্রহ করেছি।


উৎপাদন প্রক্রিয়া :
যে সমস্ত শিল্পীদের সাথে তথ্য সংগ্রহকালীন সময় আমরা কথা বলেছি তাদের মধ্যে বেশিরভাগই বোলপুর ও তার সংলগ্ন অঞ্চল থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করেন। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ্য, টেরাকোটার জিনিসের জন্য প্রয়োজনীয় মাটি কাছের নদী থেকে, কাঁথা শিল্পের কাপড় স্থানীয় বাজার থেকে পাওয়া সম্ভব। শিল্পী মল্লিকা রায় যিনি কাশফুলের ডাঁটা দিয়ে ঝুড়ি এবং অন্যান্য ধরনের পাত্র বোনেন, আমাদের জানান, যে তিনি প্রয়োজনীয় কাঁচামাল মূলত কাছাকাছি জঙ্গল থেকে জোগাড় করেন। ডোকরা শিল্পী জয়শংকর পাত্র তার প্রয়োজনীয় ডোকরা শিল্পের ধাতু কলকাতা থেকে আনেন।বাঁশ শিল্পী শ্রীধর মাহাতো ও বাদ্যযন্ত্র প্রস্তুতকারক শিল্পী সন্তোষ মাল বাঁশ ও কাঠ ঝাড়খণ্ড থেকে সংগ্রহ করেন। শিল্পী সন্তোষ মাল একতারা প্রস্তুত করার জন্য ব্যবহার করে থাকেন লাউ, বেলের খোল। এদের মধ্যে মাত্র দুজন শিল্পীর অধীনে মজুর শ্রমিক নিযুক্ত আছেন। এই জাতীয় কারুশিল্পে যন্ত্রের ব্যবহার খুব সীমিত। তবে বাদ্যযন্ত্র প্রস্তুতের ক্ষেত্রে যন্ত্রের প্রয়োজন পড়ে। প্রস্তুতকারকদের মধ্যে একজনের কাছে যন্ত্র থাকলেও অন্য শিল্পীর পক্ষে তা কেনা সম্ভব নয়। তিনি প্রয়োজন অনুসারে যন্ত্রটি ভাড়া করেন।
টেরাকোটা শিল্পী তিমির প্রামাণিক রাজ্য সরকারের কাছ থেকে পাওয়া চাকা ব্যবহার করে মৃৎসামগ্রী বানাতে পারলেও শিল্পীর জীবনও মূলত ‘মোজাইক প্লেট’, ঝাঁটার কাঠি, পেন বা কাপ ব্যবহারের ওপরই নির্ভরশীল।
পোশাক-পরিচ্ছদ তৈরীর জন্য সেলাই মেশিন ব্যবহৃত হয়। এক কাঁথা-শিল্পী সেলাইয়ের কাজ দর্জিকে দিয়ে করালেও আরেকজন জানান যে, তিনি বোনা ও সেলাই দুটি নিজেই করেন। বেশিরভাগ কারু সামগ্রী তৈরীর ক্ষেত্রে একটা অংশে মেশিনের সাহায্য নেওয়া হয় বা পুরোটাই হাতে বানানো হয়।
শিল্পী মাহাতো আমাদের এও বলেন যে, ‘যন্ত্রের সাহায্যে কাজে সেইরকম finishing (সূক্ষ্মতা) আনা সম্ভব নয় যা হাত দিয়ে আসে’।
চাহিদার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদনের পরিবর্তন;পর্যটকের আকষ্মিক চাহিদা পূরণে নিয়োজিত শিল্পীরা :
এই অঞ্চলের শিল্পীদের কারু দ্রব্য মূলত স্মারক সংগ্রহ হিসেবেই বিক্রি হয়। এর স্থানীয় চাহিদা নেই বললেই চলে। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে সামান্য স্থানীয় চাহিদা আসে। এছাড়া বহু বছরের চেনাশোনা সূত্র থেকে পাওয়া মারফৎ ফরমান অনুসারে, যেসব জিনিস তৈরি করা হয় তা মূলত কলকাতা, দিল্লী, মুম্বইয়ের মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের কাছে এমনকি বিভিন্ন শহরের বিক্রেতাদের কাছেও পাইকারি দরে সেইসব সামগ্রী বিক্রি হয়। এইসব দ্রব্যাদি শোরুমে শহুরে ব্যবসায়ীরা প্রায় ৪০-৭০ শতাংশ লাভে বিক্রি করেন।


টেরাকোটা শিল্পী দত্তর কোথায়,’ওরা এসি ঘরে বসে আমাদের তৈরি জিনিসই অনেক বেশি দামে বেচে। আমাদের তো শুধু পরিশ্রমই সার’! শিল্পীরা সরাসরি ক্রেতাদের কাছ থেকে জিনিস বিক্রির সময় কিছু লাভ রাখতে পারলেও পাইকারি দরে বিক্রি করলে, কিছুমাত্র মুনাফা তাদের পক্ষে বজায় রাখা সম্ভব হয় না। মূলত শিল্পীদের মধ্যে প্রতিযোগিতাই এর জন্য দায়ী।
এক ডোকরা শিল্পীর কথায়, প্রায় ৩০-৪০ জন শিল্পী নিজেদের জিনিস শোরুমে বিক্রি করতে চায়। আমি যদি বেশি দাম চাই, তবে আমার থেকে কেনা বন্ধই করে দেবে।
উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যন্ত্রের ব্যবহার সীমিত হওয়ায় দ্রব্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না। তবু শিল্পীরা ক্রেতাদের পরিবর্তিত চাহিদার সাথে পাল্লা দিয়ে ওঠার যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। যেমন শিল্পী মাহাতো জানান যে, বাঁশের তৈরি ল্যাম্প গত দু’বছরে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু বাঁশের বাক্সের চাহিদা কমেছে। বাদ্যযন্ত্র প্রস্তুতকারক শিল্পী মাল, বৃদ্ধদের লাঠির চাহিদা বাড়ায় তা বানাতে শুরু করেছেন। কাঁথা স্টিচের মাস্ক(mask) এইসময় সোনাঝুরি হাটে প্রচুর পরিমাণে বিক্রি হচ্ছে। শিল্পীরা ক্রেতাদের চাহিদা পরিবর্তনের সাথে সাথে নতুন সামগ্রী তৈরি করেছেন। তথ্য সংগ্রহকালীন সময়ে প্রায় সমস্ত শিল্পীই দাবি করেন যে, তাদের তৈরি সামগ্রীর নকশা ও পরিকল্পনা তাদের নিজস্ব। যদিও ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধ শিল্পী নিখিল মন্ডল জানান, বাজারের পরিবর্তিত চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে জিনিস বানানোর জন্য তিনি আজকাল ‘ইন্টারনেট’-এর সাহায্য নিয়ে থাকেন।
মহিলা শিল্পীর ভূমিকা :
সোনাঝুরি হাটের মহিলা শিল্পীরা মূলত হাতে বোনা পোশাক, কাপড় ও গয়না বিক্রি করেন। মহিলা কাঁথা-শিল্পীরা কাঁথা স্টিচের কাজ, মূলত বৃত্তি শিক্ষা, স্কুল থেকেই শিখেছেন। তবে মহিলা অলংকার শিল্পী জানান, তিনি গয়না তৈরির কাজ তার এক পরিচিতের সাথে কাজ করার সময় থেকে শিখতে শুরু করেন। আবার কাশফুল শিল্পী রায় জানান, তিনি তার শাশুড়ির কাছ থেকে এই শিল্প রপ্ত করেছেন। এই মহিলা শিল্পীরাই বাড়ির একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য নন, তাদের স্বামীরা মূলত টোটো চালক বা চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে নিযুক্ত। অর্জিত এই দক্ষতা থেকে রোজগারের আশাতেই মহিলারা তাদের তৈরি জিনিস হাটে বিক্রি করতে শুরু করেন।
রায় জানান, শুধুমাত্র বাড়ির কাছাকাছি কাজ পেলে বা স্বামী বাড়িতে না থাকলে তিনি ১০০ দিনের কাজ(nrega)-এ যোগ দেন। এই শ্রম বিভাজনই পরিবারে মেয়েদের গৌণকর্মীর(secondary workers) ভূমিকাটি স্পষ্ট করে তোলে। মেয়েদের উপার্জন পরিবারে গৌণ বলে চিহ্নিত হলেও তারা সন্তানদের পড়াশোনা, এমনকি পরিবারের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রেও অন্যতম ভূমিকা পালন করে। মহিলা শিল্পীরা জানান, রোজগারের একটা অংশ তারা নিজস্ব খরচ মেটানোর জন্য রেখে দিতে পারেন। তারা এও বলেন যে, রোজগার করা সত্ত্বেও সামান্য দরকারে স্বামীর কাছ থেকে টাকা নেওয়া তারা শ্রেয় বলে মনে করেন না। স্ত্রী ও মায়ের ভূমিকা পালনের জন্য তারা দিনের বেশিরভাগ সময়ই ঘরের কাজ ও সন্তানদের পরিচর্যায় ব্যয় করে দিতে বাধ্য হন। তাই শিল্পের পেছনে ব্যয় করার মত সময় তাদের হাতে আর থাকেনা। বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের কাছ থেকে তারা বিশেষ কোন সাহায্যই পাননা এবং মূলত অবসর সময়তেই তারা শিল্পের জন্য কাঁচামাল সংগ্রহ করেন। এমনকি ধার নেওয়া নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাজকর্ম(Paperwork) করার সময়ও তাদের হাতে নেই। সময়ের এই প্রবল অভাবই মহিলা শিল্পীদের জীবিকার অনিশ্চয়তার পেছনে অন্যতম কারণ।


তবে এই মহিলা শিল্পীদের কাজ দৃশ্যমান(visible) হলেও অদৃশ্য(invisible) মহিলা শিল্পীদের ভূমিকাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বহু পুরুষশিল্পীই জানান, বাড়ির মহিলা সদস্যেরা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেন। মাহাতোর স্ত্রী তাকে জিনিস পালিশ করতে এবং বুনতে সাহায্য করেন। শিল্পী জানান,’মেয়েরা প্রধানত সেই কাজগুলোই করে যাতে দক্ষতার বিশেষ প্রয়োজন নেই। যেহেতু তারা ভারী কাজে অক্ষম তাই সে কাজগুলো আমাকে করতে হয়’। এছাড়াও শিল্পী জানান, মেয়েরা মূলত বাদ্যযন্ত্রের রং ও পালিশ টেরাকোটার নকশা ও রং ইত্যাদি কাজে যুক্ত থাকেন। মূলত দেখা যাচ্ছে, মেয়েরা উৎপাদন প্রক্রিয়ার সেই অংশেই নিযুক্ত যাতে দক্ষতার বিশেষ প্রয়োজন নেই। যদিও বেশ কিছু শিল্পী জানান, জিনিস তৈরির ক্ষেত্রে এমন কোনোও শ্রম বিভাজন নেই। ৪৫ বছর বয়সী শিল্পী জয়শংকর পাত্রের মতে,’পরিবারের সব পুরুষ ও মহিলাই জিনিস তৈরি ক্ষেত্রে আমায় সাহায্য করে। জিনিস তৈরির ক্ষেত্রে তেমন কোনো ভাগাভাগি নেই।
এই আলোচনার মাধ্যমে এটি স্পষ্ট যে, তাদের দৃশ্যমান(visible) মহিলা শিল্পীরা তাদের স্বামীদের কাছ থেকে সাহায্য না পেলেও পুরুষ শিল্পীদের ক্ষেত্রে মহিলা সদস্যদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এই অদৃশ্য(invisible) মহিলা শ্রমিকদের অবৈতনিক শ্রম(unpaid labour) উৎপাদন ব্যয় কমানোর অন্যতম উপায়। শ্রমদান সত্ত্বেও এই মহিলারা কখনই শ্রমিক বলে পরিগণিত হন না বরং তাদের শুধুমাত্র গৃহিণী(homemaker) হিসেবেই দেখা হয়।


রাষ্ট্রের ভূমিকা ও অতিমারীর প্রভাব :
বেশিরভাগ শিল্পীর কাছেই সরকারী কার্ড আছে, যার মাধ্যমে তারা ভর্তুকি ঋণ বা সরকারি খরচে শহরের হস্তশিল্প মেলা যাওয়ার সুবিধা পেতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে কার্ড থাকা সত্ত্বেও শিল্পীরা কোনো বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন না। শিল্পী মাহাতোর কথায়, ‘কাগজ-কলমেই আমাদের শুধু সাহায্যের আশ্বাস দেওয়া হয়, বাস্তবে কিছুই পাওয়া যায় না’। অনেক শিল্পীই জানান যে, ভর্তুকি ঋণের সংস্থান হলেও তারা উৎপাদনের পরিমাণ বাড়াতে পারেন। কিন্তু ঋণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাংকের কাজকর্ম করা সত্ত্বেও কোনো শিল্পী এখনও ঋণ পাননি। এক শিল্পী জানান,’ব্যাংকের ম্যানেজার বলেছেন একাউন্টে টাকা না থাকায় আমি ধার পাবনা’। কিছু শিল্পী এও বলেন যে, অতিমারীর আগে তারা কলকাতা ও অন্যান্য শহরের জনপ্রিয় হস্তশিল্পের মেলাগুলি থেকে ডাক পেতেন। তবে যেতে হলে সরকারি খরচে থাকা খাওয়া ও যাতায়াতের ব্যবস্থা দরকার। সরকারি সাহায্যের অভাব এবং অত্যাধিক পর্যটক নির্ভরশীলতা, করোনাকালীন লকডাউনের সময়ে শিল্পীদের রোজগারের পথ আরও অ-সুরক্ষিত করে তোলে।
২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে করোনার কারণে পৌষ মেলা হয়নি। এমনকি ২০২১ সালে দোল উৎসবেও বহু বিধি নিষেধ ছিল। সোনাঝুরির হাটও এইসময় মাসের পর মাস বন্ধ ছিল। এমনকি করোনার পরেও শিল্পীরা বাইরের কোনো মেলা থেকে ডাক পাননি। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় এমনকি একতারার ক্রেতাদের আনাগোনাও বন্ধ হয়ে যায়। এই সমস্ত কারণে শিল্পীরা আজ প্রবল ক্ষতির সম্মুখীন। শিল্পী দত্ত জানান, লকডাউনের শুরুর দিকে তাকে পরিবার নিয়ে একরকম না খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছিল। তারপর সরকার ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা থেকে রেশন মেলায়, কিছুটা সুরাহা হয়। যেসব শিল্পীদের কাছে শ্রমিকরা কাজ করতেন, তাদের কাউকে পুরো মজুরি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বা তাদের ছাঁটাই করা হয়েছে। মহিলা কাঁথা-শিল্পী ভারতী কর জানান, প্রায় সমস্ত দোকানই এই সময় বন্ধ ছিল। বাড়ি থেকে মাত্র ১-২ পিস বিক্রি হতো। যে সমস্ত শিল্পীদের সাথে আমরা কথা বলেছি, তাদের বেশিরভাগের কাছেই রোজগারের কোনো বিকল্প পথ নেই। নিজস্ব গান বা অন্যকোনো কাজে পারদর্শিতার অভাব এই বিপন্নতার অন্যতম কারণ। টেরাকোটা শিল্পী প্রামাণিক এই পরিস্থিতিতে অবশ্য মূর্তি বানানো এবং রং করার মতো বিকল্প রোজগারের পথ খুঁজে পেয়েছেন। লকডাউনের পর অঞ্চলের ডোকরা শিল্পীরা সংস্থানের আশায় একপ্রকার বাধ্য হয়েই আয়ার কাজে যোগ দিয়েছেন।
শিল্পী মল্লিকা রায় ১০০ দিনের কাজে ৩০ দিন(nrega) কাজ করা সত্ত্বেও এখনও মজুরী পাননি। তিনি জানান, রেশন হিসেবে পাওয়া ১কেজি চাল ও ১কেজি আটায় তার পক্ষে সংসার চালানো একপ্রকার অসম্ভব হয়ে উঠেছে। বিশেষত লকডাউনের সময় সরকারের পক্ষ থেকে এই সম্পূর্ণ অসহযোগিতা শিল্পীদের বিপন্না করে তুলেছে।
পর্যটন শিল্প এই শিল্পীদের রোজগারের অন্যতম পথ হলেও উচ্চবিত্ত এবং উচ্চ-মধ্যবিত্ত ক্রেতা ও শ্রমিক শ্রেণীর বিক্রেতাদের মধ্যে অসম সম্পর্ককে অস্বীকার করা যায় না। এই ক্রেতারা প্রায় এক বছরের ওপর জিনিস না কিনলেও তাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয় না। কিন্তু এই অচলাবস্থায় শিল্পীদের সংস্থান অসম্ভব হয়ে ওঠে। এই শিল্প ও শিল্পীদের সংরক্ষণের জন্য শুধুমাত্র কলকাতার ‘বাবু’ সম্প্রদায়ের ‘নান্দনিকতা’ ও ‘রুচিজ্ঞান’-এর ওপর নির্ভর না করে, রাষ্ট্রকে তার নিজস্ব দায়িত্ব পালন করতে হবে।

কাজটির জন্য আমরা স্বপ্ননীল মুখার্জী ও শুভ নাথের কাছে বিশেষভাবে ঋণী, যাকে ছাড়া এটি সম্ভব হতো না। আমরা শিল্পীদেরও ধন্যবাদ জানাই তাদের ব্যস্ত কাজের দিনের মধ্যে সময় বের করে আমাদের সাথে সহযোগিতার জন্য।

সাত্যকি দাশগুপ্ত : Colorado University-তে গবেষণারত।
অন্বেষা মুখার্জী : Centre for Development Studies, (JNU), Kerala-তে গবেষণারত।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post