• May 25, 2022

ব্যাঙ্ক ধর্মঘট : নেপথ্যের কাহিনী

 ব্যাঙ্ক ধর্মঘট : নেপথ্যের কাহিনী

পিনাকী রঞ্জন দাস

সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে পেশ হতে চলা প্রস্তাবিত ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণ তথা ব্যাঙ্কিং আইন (সংশোধন) বিলের বিরোধিতায় আগামী ১৬ এবং ১৭ই ডিসেম্বর ব্যাঙ্ক আধিকারিক এবং কর্মী সংগঠনগুলির যৌথ মঞ্চ ইউনাইটেড ফোরাম অফ ব্যাঙ্ক ইউনিয়নস এর নেতৃত্বে সারা দেশ ব্যাপী ব্যাঙ্ক ধর্মঘটের আহ্বান করা হয়েছে। কর্পোরেট চালিত মিডিয়া এই ধর্মঘটকে যথারীতি ‘কর্মনাশা ধর্মঘট’ আখ্যা দিয়ে শিরোনাম সংবাদ করবে-“ব্যাঙ্ক ধর্মঘটে নাকাল সাধারণ মানুষ” অথবা “ টানা দুদিন ব্যাঙ্ক বন্ধ, গ্রাহকের ভোগান্তি”। আর তা দেখে জনমানসের একাংশে এই ধারণা প্রসূত হবে যে, এই ধর্মঘটের কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই, ব্যাঙ্ক কর্মচারীরা তাদের নিজেদের স্বার্থে এই ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। এ ধারণা সর্বৈব ভাবে ভ্রান্ত এবং ভিত্তিহীন। এ লড়াই শুধু ব্যাঙ্ক বাঁচানোর লড়াই নয়, এ লড়াই দেশ বাঁচানোর লড়াই।এ লড়াইয়ে জিততে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন মানুষকে বোঝানো যে ব্যাঙ্ক বেসরকারি হলে কি বিপদ সাধারণ মানুষের ওপর নেমে আসতে চলেছে।
এই মর্মে ব্যাঙ্ক অফিসারদের সর্বভারতীয় সংগঠন, অল ইন্ডিয়া ব্যাঙ্ক অফিসার্স কনফেডারেশন (আইবক) অনেক দিন ধরেই ‘ব্যাঙ্ক বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ আন্দোলনের মাধ্যমে বেসরকারিকরণের অন্ধকার দিকগুলোকে তুলে ধরছে। সোশ্যাল মিডিয়া হোক বা প্রচলিত গণমাধম, রাজভবন হোক বা রাজপথ, এই আন্দোলনের ঢেউ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। সর্বভারতীয় কৃষক সভা, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কর্মচারী ও আধিকারিক সংগঠন সহ বহু সংগঠনই এই ধর্মঘটে তাদের সক্রিয় সমর্থন জানিয়েছেন।

এই ধর্মঘটের নেপথ্য কাহিনী জানতে হলে আমাদের অর্থনীতিবিদ হওয়ার দরকার নেই, দরকার ইতিহাসের পাতাগুলো একবার উল্টে দেখা।

১৯৪৭ সালে দেশ পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত হলেও আমাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বলে কিছু ছিল না। ভারতবর্ষ কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতি চালিত হতো কৃষিজাত পণ্যের ওপরে ভিত্তি করে। সেসময়ে ব্যাঙ্কগুলি ছিল ব্যক্তিগত মালিকানাধীন, এবং অধিকাংশ ব্যাঙ্কের মালিকপক্ষ ছিলেন মূলত বড়ো বড়ো শিল্পপতি তথা অভিজাত পরিবারবর্গ। ফলে সাধারণ দরিদ্র কৃষকদের কাছে কুসীদজীবি মহাজনের কাছে জমিজমা বন্ধক রেখে চড়া সুদের হারে ঋণ নেয়া ছাড়া কোনো গতি ছিল না। ভারতবর্ষের অর্থনীতির অবস্থা ছিল শোচনীয়।স্বাধীনতা উত্তর ভারতবর্ষে ব্যাঙ্কে লালবাতি জ্বলা একটি দৈনন্দিন ঘটনায় পর্যবসিত হয়। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৮ সালের মধ্যে মোট ৭৩৬ টি বেসরকারি ব্যাঙ্কের ঝাঁপ বন্ধ হয়ে যায়।

এমতাবস্থায় ১৯৪৯ সালে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার জাতীয়করণ করা হলো এবং ব্যাঙ্কিং রেগুলেশন আইন, ১৯৪৯ অনুযায়ী রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের দায়ভার অর্পণ করা হলো। এতদিন এই দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল ইম্পেরিয়াল ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার ওপর। ১লা জুলাই ১৯৫৫ সালে এই ইম্পেরিয়াল ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার জাতীয়করণ হয়ে আত্মপ্রকাশ ঘটে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া হিসেবে। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (সাবসিডিয়ারি ব্যাংকস) আইন ১৯৫৯ অনুযায়ী, ১৯৬০ সালে আরো ৮ টি প্রাদেশিক ব্যাঙ্ককে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার সহযোগী ব্যাঙ্ক হিসেবে রাষ্ট্রায়ত্তকরণ করা হয়। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ বিকানের, স্টেট ব্যাঙ্ক অফ জয়পুর, স্টেট ব্যাঙ্ক অফ হায়দরাবাদ, স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্দোর, স্টেট ব্যাঙ্ক অফ মহীশুর , স্টেট ব্যাঙ্ক অফ পাতিয়ালা, স্টেট ব্যাঙ্ক অফ সৌরাষ্ট্র এবং স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ট্রাভাংকোর। এ সব পদক্ষেপের নেপথ্যে তৎকালীন সরকারের মূল উদ্দেশ্য ছিল অর্থনীতির ব্যাপক বিস্তার তথা গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত করা কিন্তু এই কাজের জন্য দরকার ছিল আরো ব্যাঙ্ককে সরকারের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসা যাতে তারা গ্রামীণ তথা ক্ষুদ্র অর্থনীতির বিকাশে যোগদান করতে পারে।
১৯৬৯ সালের ১৯শে জুলাই, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন সরকার সংসদে ব্যাঙ্কিং কোম্পানিজ (ট্রান্সফার এন্ড একুইজিশন অফ প্রপার্টিজ) অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে ১৪ টি ব্যাঙ্কের রাষ্ট্রায়ত্তকরণের প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যদিও ভারতীয় জনসঙ্ঘ তথা তৎকালীন সংসদ এবং পরবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রী শ্রী অটল বিহারি বাজপেয়ী এই অর্ডিন্যান্সের তীব্র বিরোধিতা করেন। যদিও ২৫শে জুলাই ১৯৬৯ সালে তা বিল আকারে সংসদে প্রস্তাবিত হয় এবং অটলজী এবং মিনু মাসানীজীর বিরোধিতা সত্ত্বেও নিম্নোক্ত ১৪টি ব্যাঙ্ক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে:

১)এলাহাবাদ ব্যাঙ্ক
২)ব্যাঙ্ক অফ বরোদা
৩)ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া
৪)ব্যাঙ্ক অফ মহারাষ্ট্র
৫)সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া
৬)কানাড়া ব্যাঙ্ক
৭)দেনা ব্যাঙ্ক
৮)ইন্ডিয়ান ব্যাঙ্ক
৯)ইন্ডিয়ান ওভারসিস ব্যাঙ্ক
১০)পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক
১১)সিন্ডিকেট ব্যাঙ্ক
১২)ইউকো ব্যাঙ্ক
১৩)ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া
এবং
১৪)ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া

রাষ্ট্রায়ত্তকরণের দ্বিতীয় ধাপ হিসেবে ১৯৮০ সালে নিম্নোক্ত আরো ৬টি বেসরকারি ব্যাঙ্ককে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়:
১) পাঞ্জাব এন্ড সিন্ধ ব্যাঙ্ক
২) ওরিয়েন্টাল ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া
৩) কর্পোরেশন ব্যাঙ্ক
৪) অন্ধ্র ব্যাঙ্ক
৫) নিউ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া
এবং
৬) বিজয়া ব্যাঙ্ক

এই সাহসী পদক্ষেপের পরিণাম হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্পে এলো এক নতুন প্লাবন। যেসব প্রান্তিক মানুষ ব্যাঙ্কের চৌকাঠ পেরোনোর সাহস করে উঠতে পারতেন না, তারাও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি থেকে ঋণ নিয়ে বা উদ্বৃত্ত অর্থ সঞ্চয়ের মাধ্যমে নিজেদের জীবিকা সুনিশ্চিত করতে শুরু করলেন।সরকারের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় সরকারি ব্যাঙ্কগুলি স্বল্প সুদে কৃষি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ব্যাপক হারে ঋণ প্রদান করতে শুরু করে যার ফলে দেশে এক অর্থনৈতিক বিপ্লবের সূচনা হয়। সবুজ বিপ্লব হোক বা শ্বেত বিপ্লব, নেপথ্যের কান্ডারি ছিল সেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলিই।এই পর্যায়ে সরকারের হাতে ব্যাঙ্কিং শিল্পের প্রায় ৯১ শতাংশ রাশ এসে দাঁড়ায়। দেশের প্রত্যন্ত প্রান্তে গড়ে ওঠে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের শাখা।

১৯৯১ সালের সূচনাকালে তৎকালীন সরকার মিশ্র অর্থনীতি থেকে মুক্ত অর্থনীতির দিকে যাত্রা শুরু করেন এবং সীমিত পরিসরে ব্যাঙ্কিং শিল্পে ব্যক্তিগত ও বিদেশী পুঁজির পুনরায় প্রবেশ ঘটে। গ্লোবাল ট্রাস্ট ব্যাঙ্ক, ইউটিআই ব্যাঙ্ক(অ্যাক্সিস ব্যাঙ্ক), এইচডিএফসি ব্যাঙ্ক এবং ইন্ডাসইন্ড ব্যাঙ্ক ভারতবর্ষে ব্যবসা করার ছাড়পত্র পায়। এই উদারনীতির ফলে একটা লাভ অবশ্য হল, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার তাগিদে নিজেদের প্রযুক্তি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের দিকে নজর দিতে শুরু করলো। কিন্ত ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ব্যাঙ্কগুলির নজর ছিল “হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোনোখানে”। ব্যক্তিগত মালিকানাধীন প্রথম ব্যাঙ্ক গ্লোবাল ট্রাস্ট ব্যাঙ্ক, যাত্রা শুরু করে ১৯৯৪ সালে, ১০ বছরের মাথায় বিভিন্ন কেলেঙ্কারি এবং অসদুপায় অবলম্বন করে লক্ষ লক্ষ আমানতকারীকে পথে বসিয়ে নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করে এবং ওরিয়েন্টাল ব্যাঙ্ক অফ কমার্স কে বাধ্য করা হয় এই ডুবে যাওয়া জাহাজটিকে তীরে নিয়ে যাওয়ার জন্য। এ যেন প্রকারান্তরে “ ক্ষতির জাতীয়করণ এবং লাভের বেসরকারিকরণ”!

২০১৪ সালে বর্তমান সরকার ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্টতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার পরেই অশনিসংকেত পাওয়া গিয়েছিলো যে এবার তারা নিজেদের বহুপ্রতীক্ষিত এজেন্ডা কে বাস্তবে রূপদান করার পথে এগিয়ে যাবে। এবং প্রত্যাশিত ভাবেই সমস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে পরিকল্পনামাফিক দুর্বল করে একে একে নিজেদের তাঁবেদার মুষ্ঠিমেয় শিল্পপতিদের হাতে তুলে দেয়ার চক্রান্তকে রূপায়ণে বদ্ধপরিকর। ২০১৬ সালের নোটবন্দী থেকে শুরু করে Paytm সহ বিভিন্ন ফিনটেক কোম্পানির উত্থান, একে একে বিভিন্ন লাভজনক সংস্থাকে ক্ষতির মুখে ফেলে সেগুলিকে পুঁজিপতিদের কায়েমী স্বার্থে ব্যবহারের ঢালাও অনুমতি প্রদান, বিএসএনএল এর মতো সংস্থাকে ৪জি স্পেক্ট্রামএর নিলামে অংশ না নিতে দিয়ে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেয়া, এসব যে বিশেষ কাউকে কিছু পাইয়ে দেয়ার জন্যে, তা নিশ্চই বলে দিতে হবে না।

এই পরিকল্পনার অঙ্গ হিসেবে শুরু হয় ব্যাঙ্কগুলির সংযুক্তিকরণ। ২০২০ সালে সংযুক্তিকরণের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের সংখ্যা নামিয়ে আনা হয় ১২টিতে কিন্তু বিভিন্ন ব্যাঙ্কের প্রযুক্তিগত পার্থক্যের জন্য এই সংযুক্তিকরণের ফলে গ্রাহক এবং কর্মী উভয়েই এখনও সমস্যায় রয়েছেন। ‘ব্যাঙ্ক বেচো, দেশ বেচো, যোজনার দ্বিতীয় ধাপ হিসেবে সরকার সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে আনতে চলেছেন ব্যাঙ্কিং রেগুলেশন আইন(সংশোধনী) বিল ২০২১, যার মাধ্যমে দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত বাক্যংকের বিলগ্নিকরণের পথ প্রশস্ত করা হবে।

১৯৯০ সালে উপদ্রুত কুয়েত থেকে ৪৮৮ টি বিমানে ১,৭০,০০০ ভারতবাসীকে নিরাপদে ফিরিয়ে এনেছিল যে সংস্থা, সেই এয়ার ইন্ডিয়া আজ ব্যাক্তিগত পুঁজির হাতে। প্রশ্ন হল আগামীকাল যদি একই পরিস্থিতি উদ্ভূত হয়, পারবেন তো বেসরকারি সংস্থাকে দিয়ে উদ্ধার কাজ করাতে?

অনেকে বলে থাকেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি নাকি অদক্ষ, তাই বেসরকারি করে দেওয়াটাই একমাত্র সমাধান! বেসরকারি হলে নাকি পরিষেবা ভালো হবে! যারা একথা সত্যি বিশ্বাস করেন তারা নিচের তালিকায় একবার চোখ বুলিয়ে নেবেন। ১৯৬৯ থেকে ২০২০ সালের মাঝে যতগুলো বেসরকারি ব্যাঙ্ক মোরেটোরিয়ামে গিয়েছে বা ব্যাঙ্কে লাল বাতি জ্বলেছে সেই ব্যাংকগুলি হলো:

আজকাল একটা কথা খুব শোনা যাচ্ছে, ‘আত্মনির্ভর ভারত’! আসলে বলা উচিত ‘ব্যাঙ্ক নির্ভর ভারত’। সরকারের যে কোনো প্রকল্প রূপায়ণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তা সে জনধন প্রকল্পই হোক বা জীবনজ্যোতি বীমা যোজনা, ব্যাঙ্ক ছাড়া কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের একটি প্রকল্পও বাস্তবে রূপায়ণ সম্ভব নয়। আসুন এক ঝলক দেখে নেয়া যাক এ অবধি কোন ব্যাঙ্কগুলি কত জনধন একাউন্ট খুলেছে!

ব্যাঙ্কের অনুৎপাদক সম্পদ এবং কর্পোরেট লুট:

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির মোট অনুৎপাদক সম্পদের সিংহভাগই হলো ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি কর্পোরেট সংস্থার অবদান। এই ঋণ দেওয়ার পেছনে সাধারণ ব্যাঙ্ক আধিকারিক বা কর্মচারীরা না জড়িত, না অধিকৃত; বরং শাসকদলের অনুগত কিছু কর্পোরেট সংস্থাকে সরকারের প্রচ্ছন্ন বা প্রত্যক্ষ অঙ্গুলিহেলনে ঋণ দিতে বাধ্য করা হয়। এখন ব্যাঙ্ক বিলগ্নিকরণ হলে গুটিকয় কর্পোরেট ঋণখেলাপি সংস্থাই ব্যাঙ্কগুলির মালিক হয়ে উঠবে এবং জনসাধারণের গচ্ছিত অর্থের নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা থাকবে না। সরকার সে কথা বিলক্ষন জানেন এবং জানেন বলেই FRDI বিল নিয়ে আকাশকুসুম গল্প ফেঁদে চলেছেন। পাঁচ লক্ষ টাকা অবধি ইন্সুরেন্স এবং Sovereign গ্যারান্টীর মধ্যে পার্থক্য মানুষকে সুকৌশলে ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে।

সরকারি মদতে যেভাবে কর্পোরেট লুটেরারা আমজনতার আমানত লুন্ঠন করছে তা দেখলে শিউরে উঠতে হয়! বিগত সাত বছরে ১৩ টি ঋণখেলাপি কর্পোরেট গোষ্ঠীর মোট ৪,৪৬,৮০০ কোটি টাকার ঋণ ২,৮৪,৯৮০ কোটি টাকা লোকসানে মাত্র ১,৬১,৮২০ কোটি টাকায় সেটল করা হয়েছে আর ৬৮,৬০৭ কোটি টাকা ব্যাঙ্কগুলির হিসেবের খাতা থেকে write off বা স্রেফ মুছে ফেলা হয়েছে।

এই মহান দেশের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমরা দেশের সম্পদ কতিপয় স্বার্থপর পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দেওয়ার চক্রান্ত কে রুখতে বদ্ধপরিকর। তাই আগামী ১৬ই এবং ১৭ই ডিসেম্বরের ব্যাঙ্ক ধর্মঘটে ব্যাঙ্ক কর্মীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানো আমাদের নাগরিক কর্তব্যের মধ্যে পরে। কৃষক আন্দোলনের তীব্র অভিঘাতে যেমন সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল, তেমনি ভাবে সরকারকে এই জনবিরোধী তথা দেশ বিরোধী সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারে বাধ্য করতে হবে।না হলে কিন্তু বণিকের মানদণ্ড রাজদণ্ডে পরিণত হতে সময় লাগবে না। তাই দিকে দিকে আওয়াজ উঠুক ‘ ব্যাঙ্ক বাঁচাও, দেশ বাঁচাও!’

পিনাকী রঞ্জন দাস : ব্যাঙ্ক কর্মী।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.