• May 25, 2022

শাসকের হুংকার

 শাসকের হুংকার

অভিসন্ধি সরকার

বগটুই, বীরভূমের রামপুরহাটের প্রত্যন্ত একটি গ্রাম যার আকাশে-বাতাসে শুধুই পোড়া মাংসের গন্ধ আর আর্তনাদ। গত ২১/০৩/২০২২ এ খুন হয় রামপুরহাট ১ পঞ্চায়েতের উপপ্রধান ভাদু শেখ। তারপর শুরু হয় বগটুই নারকীয় হত্যাকাণ্ড। ভাদু শেখ ছিলেন বর্তমান শাসক দল অর্থাৎ তৃণমূলের কর্মী, ভাদু শেখ খুন হয়েছেন তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে এবং এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড যে তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বেরই ফল, তা স্পষ্টভাবেই মনে করছেন রাজনৈতিক মহল।
শিশু,কিশোর,মহিলা সহ মোট ৯ জনকে বাড়ির মধ্যে কুড়ুল দিয়ে কুপিয়ে পেট্রোল ঢেলে বাড়ি সহ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং বেশ কিছু জন গুরুতর জখম অবস্থায় চিকিৎসাধীন। যা রাজ্যে-রাজনীতিতে আলোড়ন ফেলেছে। বর্তমান শাসকদলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ফলে মারা যায় নিরীহ তরতাজা কিছু প্রাণ।
“তারপর যুদ্ধ এলো,
রক্তের এক আগ্নেয় পাহাড়ের মতো।
শিশু আর বাড়িরা খুন হলো,
সেই মেয়েটির মৃত্যু হলো না।”
পাবলো নেরুদার লেখা (তর্জমা: নবারুণ ভট্টাচার্যের) ‘অসুখী একজন’ কবিতার সেই স্তবক যেন বারবার কানে বিঁধছে বগটুই গ্রামের পূর্বপাড়ার ইদগাহ লাগোয়া যে বাড়িগুলোয় অগ্নিসংযোগ দিয়ে তান্ডব শুরু হয়, সেই বাড়ির একটির অন্তঃসত্ত্বা সাজিনা খাতুনের কথা শুনে। চোখের জল মুছতে মুছতে অন্তঃসত্ত্বা যুবতী চেষ্টা করছিলেন পোড়া ঘর থেকে অবশিষ্ট চাল বের করে আনতে। উনি বলে উঠলেন “দেখুন সর্বনাশের চিহ্ন। আমার ঠাকুমা খুন হয়েছেন, বাবা নিখোঁজ, মা অগ্নিদগ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। আমি শ্বশুরবাড়িতে ছিলাম বলে হয়তো বেঁচে গিয়েছি।” ওই অন্তঃসত্ত্বা যুবতী আদতে সোনা শেখের আত্মীয়। সেই সোনা শেখ, যার বাড়ি থেকে মঙ্গলবার সকালে উদ্ধার হয়েছে একের পর এক দেহ। ওই তরুণী দাবি করেন, “সোমবার রাত্রে ভাদু শেখ খুন হওয়ার ঘটনায় আমাদের বাড়ির কেউ যুক্ত নয়। তা সত্ত্বেও বেছে বেছে আমাদের আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে হামলা ও এতজনকে খুন করা হয়েছে।” সাজিনার মা কোনোরকমে সেখান থেকে অগ্নিদগ্ধ দেহ নিয়ে সাজিনার বাড়ি পৌঁছায় তারপর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অন্য এক মৃত পরিবারের সদস্য মিহিলাল শেখ জানান, “যখন আগুন লাগানো, বোমাবাজি চলছে, প্রাণের ভয়ে কাছে ঘেঁষতে পারিনি। স্ত্রী-মেয়েকে বাঁচাতে পারলাম না।” আর এক গ্রামবাসী শেখ সাদের আলম বলেন, “মৃত্যুর পরে উপপ্রধানের সঙ্গীরা মারমুখী হয়ে ওঠে। ওরা আগুন লাগিয়ে দেবো, মারবো-ধরবো বলছিলো। কিছুক্ষণ পরেই দেখি পূর্বপাড়ায় চারটি বাড়িতে আগুন জ্বলছে।” গ্রামবাসীরা বলছেন এই ঘটনা চলার সময় পুলিশের চারটি ভ্যান গ্রামের বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল।পুলিশের কাছে বারবার সাহায্য চাওয়া হলেও পুলিশ কোনরকম সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়নি বরং পুলিশি গ্রামবাসীদের প্রটেকশন না দিয়ে দুষ্কৃতীদের প্রোটেক্ট করছিল গ্রামের বাইরে দাঁড়িয়ে এমনটাই দাবি করেছেন গ্রামবাসীরা।
ঘটনা ঘটার কয়েক ঘণ্টা পর পুলিশের দেখা মেলে ঘটনাস্থলে। পুলিশ যে তৃণমূলীদের উর্দিধারী সংগঠনে পরিণত হয়েছে তা আরো একবার ‘বগটুই গণহত্যাকাণ্ডে’ প্রমাণিত হলো। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ‘আনিশ হত্যাকাণ্ডে’ যেভাবে পুলিশ নির্মমভাবে একটি প্রতিবাদী যুবক কে হত্যা করে তাতে স্পষ্টতই পুলিশের নিরাপত্তার ভূমিকা নিয়ে ঘোর ধোঁয়াশা তৈরি করে। রাজ্যের পুলিশমন্ত্রী তথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যেই তার স্বভাবমতোই তা বিরোধীদের ষড়যন্ত্র বলে দায় এড়িয়ে যান। অন্যদিকে বীরভূমের তৃণমূলের জেলা সভাপতি অনুব্রত মণ্ডল টেলিভিশন ব্লাস্ট করে শর্ট সার্কিট হয়ে আগুন লেগেছে বলে নতুন তত্ত্ব খাড়া করেন। এদিকে সময় গড়িয়ে যায়, পুলিশ তদন্ত শুরু করা তো দূরে থাক, FIR পর্যন্ত নিতে চায়নি। রাজ্য জুড়ে বিরোধীরা গর্জে উঠতে শুরু করে, অবস্থা খারাপ বুঝে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশমন্ত্রী SIT গঠনের নির্দেশ দেন। এবার তড়িঘড়ি রামপুরহাট ১ নং ব্লকের তৃণমূল সভাপতি আনারুল হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রামবাসীরা দাবি করেছেন আনারুলের মদতেই এই ঘটনা ঘটেছে। তৃণমূল শাসক দল হয়েছিলো অতীতের নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুরের মতো বেশ কিছু গণহত্যার উপর ভর করে। যদিও সেই গণহত্যা গুলিতে কতটা অতীতের শাসকদলের ভূমিকা ছিলো তা প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছেন তৃণমূলের সুপ্রিমো মমতা ব্যানার্জি এবং তারই একসময়ের একনিষ্ঠ সৈনিক শুভেন্দু অধিকারীর তরজা। সুতরাং মমতা ব্যানার্জি খুবই ভালো করে জানেন রাজনৈতিক গণহত্যার ফসল কিভাবে রাজনৈতিক দলগুলি ঘরে তুলতে পারেন। তাই তিনি তড়িঘড়ি রামপুরহাট গিয়ে আনারুল হোসেন কে গ্রেপ্তার করতে বলেন এবং পরিবার পিছু লক্ষাধিক টাকার ক্ষতিপূরণ ও পরিবার পিছু একটি করে চাকরি ধার্য করেন। যা নিন্দনীয় এবং কুরুচিকর রাজনীতি। কারণ এটি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অঘটন না। এটি শাসকদলেরই নারকীয় হত্যাকান্ড। সুতরাং, সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় উনি কিভাবে ক্ষতিপূরণ দিতে পারেন, এবং মুখ্যমন্ত্রী বা পুলিশমন্ত্রীর কি কোন চাকরি দেবার কোটা থাকে যা তিনি ঘোষণা করেছেন। খুব স্বাভাবিক ভাবেই, বিরোধী শিবির মনে করছে এই তদন্তকে প্রভাবিত করছেন মাননীয়া। তিনি অতীতে এই একই ভাবে আনিসের দাদা কে চাকরীর প্রলোভন দেখিয়ে তদন্ত থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। যা সত্যি নিন্দনীয় ও অপরাধ বলেই মনে করছেন সমাজের বিদ্বজনেরা। ইতিমধ্যে, মহামান্য আদালত SIT এর উপর ভরসা না রেখে CBI এর হাতে তদন্ত ভার তুলে দিয়েছেন। রাজ্য পুলিশ তথা SIT এর উপর যে একেবারেই ভরসা রাখা যায় না, তা হাইকোর্টের নির্দেশ থেকেই স্পষ্ট বলে মনে করছেন সমাজের একাংশ।
অতীতের সারদা-নারদা এবং আনিশ কান্ডে SIT এর ভুমিকা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্নচিহ্ন থাকায় আদালতের এই সিদ্ধান্তকে সাদরে গ্রহণ করেছে বগটুই সহ সমাজের সকল শান্তিপ্রিয় নাগরিকেরা। যদিও CBI কে নিয়েও অনেক সমালোচনা আছে যেগুলো যুক্তিপূর্ণ।
এবার একটাই প্রশ্ন সকলের মনে… শাস্তি পাবে তো নির্দোষ,অসহায় মৃত, দগ্ধ লাশ গুলো? শাস্তি কি হবে তরতাজা শিশুদের প্রাণ কেড়ে নেবার?

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post