• May 29, 2022

জয়িতাদের “রাষ্ট্রদ্রোহীতা”- আজকের দিনে অপরাধ না জরুরি?

 জয়িতাদের “রাষ্ট্রদ্রোহীতা”- আজকের দিনে অপরাধ না জরুরি?

তথাগত

২০২১ সালের ১২ই অক্টোবর, টিপু সুলতানকে গ্রেপ্তার করা হয় তার বাড়ি থেকে। দুদিন বেআইনি ভাবে আটক রেখে ২০১৬ সালের বেলপাহাড়ি থানার একটি UAPA কেসে তার নাম যুক্ত করে পুলিশ। সে আরএসএফ (তৎকালীন ইউএসডিএফ)-এর প্রাক্তন সদস্য এবং শ্রমিক-কৃষক একতা মঞ্চের কর্মী।

২০২১ সালের ১২ই ডিসেম্বর, জয়নগর বকুলতলা থানা এলাকার জীবন মণ্ডলের হাট থেকে পুলিশ বেআইনি ভাবে ‘শ্রমিক কৃষক একতা মঞ্চ’-র ৪ কর্মীদের গ্রেপ্তার করে, যাদের মধ্যে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তীর্থরাজ ত্রিবেদী প্রাক্তন আরএসএফ কর্মী।

২০২২ সালে ২৩শে মার্চ, মুর্শিদাবাদের নওদা থানার পুলিশ শ্রমিক-কৃষক একতা মঞ্চের দুই কর্মী প্রতীক ভৌমিক (ইউএসডিএফের প্রাক্তন সদস্য) ও হাসিবুর শেখকে গ্রেপ্তার করেছে এবং অস্ত্র আইনে মিথ্যে কেসে যুক্ত করেছে।

২০২২ সালে ২৯শে মার্চ, জাগুলিয়া থেকে জয়িতা দাসকে (আরএসএফ ও মাতঙ্গিনী মহিলা সমিতির প্রাক্তন সদস্য) কোলকাতা পুলিশের বিশেষ টাস্ক ফোর্স গ্রেফতার করে। নন্দিগ্রামে সেজ-বিরোধী আন্দোলনে এবং সামগ্রিকভাবে সিপিএমের চূড়ান্ত ফ্যাসিবাদি কার্যকলাপের বিরুদ্ধে ব্যপক জনগণ কে সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে জয়িতা। ২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর, নোনাডাঙায় বস্তি উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলনে এবং কামদুনিতে গণধর্ষণের বিরুদ্ধে যে গণআন্দোলন গড়ে ওঠে তাতেও সক্রিয় সংগঠকের ভূমিকা পালন করেছে জয়িতা।

গ্রেপ্তারির তালিকাটা কেবলমাত্র বাড়ছে। অন্য দিকে, পশ্চিমবাংলার নাগরিক সমাজ এদের মুক্তির দাবিতে গণআন্দোলন গড়ে তুলছে। রাজনৈতিক কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হলে, বন্দিমুক্তি আন্দোলনও সংগঠিত হবে – এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে – বিশেষ কয়েকটি সংগঠনের কর্মীদেরই এরম নিশানা করে কেন আক্রমণ নামিয়ে আনছে বাংলার তৃণমূল সরকার? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের এত পুলিশ কর্মী, এত ভাড়াটে গুন্ডা বাহিনী, তার গুণগান গায় এত মিডিয়া – তবুও কেন কারারুদ্ধ করে রাখতে হচ্ছে প্রতীক-জয়িতাদের?

কারণ তাদের কণ্ঠস্বর দমন করার, তাদের প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দেওয়ার আর কোন উপায় নেই। একমাত্র জেলে বন্দি করে রাখলেই আর নয়তো ভুয়ো এনকাউন্টারে হত্যা করলেই, বাংলার এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের তারা মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা সম্ভব। যখনি তারা জনগণের মধ্যে গিয়ে তাদের সঙ্গে একাত্ম হয়েছে, সেই অঞ্চলের জনগণ নিজেদের অধিকার নিয়ে সরব হয়েছে, নিজেদের ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছে এই খুনি সরকারের উপর। পারুলদাঙায় শিশু ধর্ষণের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন টিপু সুলতান। বকুলতলায় গণস্বাস্থ্য আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন তীর্থরাজরা। কৃষকদের ন্যায্য দাবি নিয়ে গণআন্দোলন গড়ে তুলছিলেন প্রতীকরা। অর্থাৎ এরা আজ রাষ্ট্রীয় দমনের শিকার – এদের রাজনীতির জন্য। তাদের রাজনীতি কেবল সাধারণ মানুষের অধিকারের কথাই বলেনা, সাধারণ জনতার রাজের কথাও, জনগণের সরকার-আদালতের কথাও বলে বলেই কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের নিশানায় তারা।

পশ্চিমবঙ্গের “ফ্যাসিবাদ-বিরোধী শক্তি” তৃণমূল সরকার কেন্দ্রের ফ্যাসিস্ট বি জে পি–র সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ছাত্র, সমাজকর্মী ও বিপ্লবী রাজনৈতিক কর্মীদের নামে তাদের গ্রেফতারির কর্মসূচি নিয়েছে। যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্ট্যান স্বামী শহীদ হলে, কেন্দ্রকে চিঠি লিখে গাল দেয় তাদের UAPA প্রয়োগ করা নিয়ে, সেই মমতাই ঠিক একই ভুত দেখে রামনাম জপ করার মতো UAPA কেসে ফাঁসাচ্ছে রাজনৈতিক কর্মীদের। বিপ্লবী রাজনৈতিক কর্মীদের উপর যে আক্রমণ নামিয়ে আনছে এই রাজ্য সরকার, তা আদতে “অপারেশন সমাধানের” অন্তরভুক্ত। অর্থাৎ, ২০২২ সালের মধ্যে ভারতে মাওবাদী আন্দোলনকে নিঃশেষ করার পরিকল্পনার নামে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার আন্দোলন, উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলন, জল জঙ্গল জমির অধিকারের আন্দোলন গুঁড়িয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র।

স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ভারতের ব্যপক জনগণের জীবন জীবিকার উৎস লুট, এবং জনগণের ব্যপক প্রতিরোধে তা রক্ষার দ্বন্দ্ব যত তীব্র হবে, ততই এই শাসক ও শোষিতের মধ্যেকার যুদ্ধ গৃহযুদ্ধের রূপ নেবে, ইতিমধ্যেই ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্ছল জুড়ে তা নিয়েছেও। এই দুর্নীতি-গ্রস্থ পচা গলা সমাজকে আপাদমস্তক উপড়ে ফেলতে, মাওবাদী বিপ্লবী ধারার রাজনৈতিক কর্মীরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে। তাই তারা রাষ্ট্রদ্রোহী। দেশে জনগণের রাজ কায়েম করতে চায়, প্রতীক-জয়িতাদের মতো এমন “রাষ্ট্রদ্রোহী”দের সাথ দেওয়া ছাড়া আর গণতন্ত্র-প্রিয় মানুষের কি উপায় আছে?

তথাগত : রাজনৈতিক কর্মী।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post