• May 29, 2022

‘প্রিয় শুধু ‘হাসিবার ‘ দিন নয় অদ্য’

 ‘প্রিয় শুধু ‘হাসিবার ‘ দিন নয় অদ্য’

তমোজিৎ রায়
বাংলা ভাষা মোটামুটি ১৩০০ বছরের পুরনো। ‘ উচা উচা পাবত তই বসই শবরী বালি’ থেকে যার পথ চলা শুরু। তারপর, ‘ ‘ কোন মুখে তুমি আমার মৈচ্ছ খাইবা’ র পথ পেরিয়ে ‘ আলালের ঘরের দুলাল‘ এ ভাষা বিদ্যাসাগর মশাইয়ের হাতে সাবালক হয়। হুতুম ভাষায় আনেন মজাদার সব নকশা। তারপর তো জোড়াসাঁকোর জমিদারের আবাদ । ক্রমে ভাষার ‘ দ্বিধা থরথর চূড়ে’ নির্মিত হয় কত ‘ অমরাবতী’ , ‘ হৃদয়ের পুরোনো খাপে কখন ও জং ধরে কখন ও আবার ভেসে যায় ‘ অলকানন্দা জলে’। এ ভাষাতেই ‘ স্বপন দোলার’ নাচন জাগে , শৈশব এর আকাশে উড়ে যায় ‘ হলদে পাখির পালক’ – ব্যাঙগমা –“ ব্যাংগমি বলে – নীল কন্ঠ পাখির পালকের গল্প। আমাদের সব ‘পথের পাঁচালি’ যেন ‘ হাসুলির বাঁক হয়ে পৌঁছে যায় ‘তিস্তা পাড়ের বৃত্তান্তে’। ‘মধু সাধু খাঁ’র সাম্পান ভাসে‘ রূপসী বাংলা’ র গাঙ্গুরের জলে। এ ভাষাই ‘ বাষ্পের বেগে স্টিমারের মতো চলে, ভিসুভিয়াস হয়ে ফেটে পড়ে হাংরি কলকাতার বুকে। কত ‘যমুনাবতী বাসর রচে বারুদ বুকে নিয়ে’। ,’ বিদ্রোহী রন ক্লান্ত ভাষা ‘ জনতার মুখরিত সখ্যে ‘ মিছিলে প্রতিবাদে রক্তাক্ত হয় , ‘ প্রেমিকার ঠোঁট, আর নিশানের লাল ‘ একাকার হয়ে যায় ‘ স্লোগানে স্লোগানে’।
বাঙলা ভাষার এ বহমান স্রোতে, আজ( এই খোলামেলা বিশ্বায়িত ভুবনে)- সিরিয়ালে, বিজ্ঞাপনে, খবরের কাগজে, পর্দা ও রাষ্ট্র নায়কদের বয়ানে’ র খোলা নর্দমা দিয়ে হিলহিল করে মিশছে বিকৃতির বিষ। বাক্য গঠন, শব্দের ব্যবহার , হিন্দি ইংরেজী র লাগাম হীন মিশেল– দূষণ , তীব্র দূষণ খেয়ে ফেলছে ভাষা, প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে একটু একটু করে। আর ভাষা দূষণ মানেই, চিন্তন ও মননের ক্ষয়, গোটা সমাজের পশ্চাদপসরণ।
ভাষা দূষণ কে রুখতে, বাংলা ভাষার মর্যাদা কে অক্ষুন্ন রাখতে ভাষাও সাহিত্যের বিকাশ- প্রসারের প্রতিবন্ধকতা গুলোকে চিহ্নিত করে সেগুলি সরিয়ে ফেলার যথাযথ ব্যবস্থা নেবার জন্য ই গঠিত হয়েছিল ‘বাংলা একাডেমি’ – বাংলা ভাষার সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ১৯৮৬ সালে। প্রথম সভাপতি ছিলেন অন্নদাশংকর রায় ও সম্পাদক সনৎকুমার চট্টপাধ্যায়। ৯৬ তে একাডেমি স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান রূপে স্বীকৃতি পায়। বাংলা বানান বিধি, অভিধান, শব্দ কোষ পুস্তকাদি প্রকাশ করে এবং অনেক অনেক সেমিনার , সভা ইত্যাদি দিয়ে ভাষা দূষণ কতটা রোধ করা গেছে বা ভাষা কেন্দ্র কলকাতা থেকে প্রান্তে কতটা পৌঁছানো গেছে সে অন্য প্রশ্ন, কিন্তু একাডেমি মে মাসের ছয় তারিখ, একাধারে বিশিষ্ট নাটক কার, নির্দেশক , অভিনেতা এবং শিক্ষামন্ত্রীর সভাপতিত্বে এবং একগুচ্ছ শিল্পী সাহিত্যিকের সহমত্যে যে কান্ড ঘটালেন – সেই কর্ম ভাষার ইতিহাসে এক কলঙ্কিত অধ্যায় হিসাবেই শুধু চিহ্নিত হবে না এর সুদূর প্রসারী ফল নিয়ে আতঙ্কের যথেষ্ট কারন আছে।
আপনারা যারা শ্রীমতি বন্দ্যোপাধ্যায় এর লেখা পড়েছেন তাঁরা দেখেছেন প্রতি ছত্রে ছত্রে ভাষার বিকৃতি, ব্যাকরণ গত অজস্র ভুল এবং সর্বোপরি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ‘ অর্থহীন ও অসংলগ্ন’। যে কোন পাঠক এর কাছেই এই ‘ দিসতে দিসতে’ লেখা ‘ গদ্য, পদ্য, প্রবন্ধ ‘ কোনো পদবাচ্য ই নয় বরঞ্চ ‘ উন্মাদের প্রলাপ , শাসকের আত্ম-রতির অনিয়ন্ত্রিত বিকারের ই নামান্তর মাত্র। বাঙালি জাতির ক্ষেত্রে এইসব লেখালেখি অফুরান রগড়ের রসদ। কিন্তু ব্যাপারটা রগরের থাকে না যখন ভাষার বিকৃতি তে সরকারি সিল মোহর পড়ে। সরকারি কমিটি যা কিনা প্রথিত যশা সাহিত্যিক দের নিয়ে গঠিত এবং জনগণের করের টাকায় পোষিত , তাঁরা যখন শাসকের এইসব বালখিল্যপনাকে সরকারি ভাবে সাহিত্য বলে স্বীকৃতি দেন এবং ‘ নিরলস সাহিত্য চর্চা টর্চা এইসব বাক্য বন্ধে ভূষিত করেন তখন করদাতাদের নড়ে চড়ে বসতে হয় বৈকি। পাড়ার যে কোনো দুলাখি ক্লাব যারা শাসকের অনুগ্রহে চলে তারা যা খুশী তাই করতে পারে ,আমাদের বলবার কিছুই থাকে না। কিন্তু এ খানে তো সরকার আমাদের, তার সমস্ত সিদ্ধান্তের জন্য করদাতার কাছে দায়বদ্ধ। আমরা হেসে উড়িয়ে দিতে পারি না, জবাব চাইতেই হবে, যে কি কারনে উদ্ভট সব বাক্যবন্ধ সাহিত্য বলে গণ্য হলো। এরপর যখন সব ক্লাসের পাঠ্যসূচি তেই এসব বাধ্যতা মূলক ভাবে ঢুকে যাবে , আমাদের ছেলেমেয়েদের ‘ হাব্বা বুম্বা’ ইত্যাদি নিয়েই ভাবসম্প্রসারণ করতে হবে এবং প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে হবে – তখন হইচই করলে লাভ হবে কি? সমাজের অধিকাংশ মানুষের এখন জীবন যাত্রার মানের এমন অবস্থা যে প্রতিদিনের ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য প্রায় দাসের জীবন যাপন Up হয়। এক মুঠো অন্নের জন্য ও সরকারের দান নির্ভরতা ছাড়া করার কিছু নেই। তাঁদের ঘরের ছেলেমেয়েরা তিন চার বছর থেকেই শিক্ষা অঙ্গনে র বাইরে। তাঁদের কাছে প্রতিমাসে নানা প্রকল্প এর টাকা ঘরে ঢোকাতেই হয়ত সার্থকতা শিক্ষার। এমতাবস্থায় কে কি লিখলেন , পুরস্কার না তিরষ্কার পেলেন তাতে তাঁদের কিচ্ছু যায় আসেনা। সিলেবাস খায় না মাথায় দেয় এ প্রশ্ন ও তাঁদের দৈনন্দিন এর পরিসীমার অনেক অনেক বাইরের বস্তু। আর একাংশ মানুষ, যাদের মধ্যে আমরা শিক্ষিত(???) ফ্ল্যাটবাসী দশটা পাঁচটার বাঙালি পড়ি আর কি, তাঁদের কাছে সব সব কিছু আমোদের , রগরের।– টাইম পাস। আমাদের না আছে অতীত না ভবিষ্যৎ। আছে শুধু ঘেঁটে যাওয়া বর্তমান। তাই সঙ্কট গুলোকে চিহ্নিত করতে পারছি না আমরা। চাই ছি ও না। আমাদের কি কোনো দায় নেই আগামী প্রজন্মের কাছে? কমিটির নাম গুলো দেখুন- ব্রাত্য – সুবোধ – অর্পিতাদের বাদ ই দিন ওরা তো আগেই বুদ্ধি বন্ধক রেখেছে কিন্তু সঞ্জীব চট্টপাধ্যায় যার- লোটা কম্বল বাঙালি কে তুচ্ছ জীবন কে মর্যাদা দিতে শিখিয়েছে। শীর্ষেন্দু- যাকে ঘিরে রয়েছে বাঙালির শৈশব, বড়বেলা। আবুল বাশার – যার ‘ অগ্নি বলাকা’ য় লিপিবন্ধ রয়েছে ‘ বসন্তের বজ্র নির্ঘোষ এর সৎ দলিল, ‘ফুলবউ,’ ‘সিমার’ এ পাই বাঙালি মুসলিম জীবনের দ্বন্দ্বময় দৃশ্যকাব্য। মানুষের ‘ শিরদাঁড়া’ র কথা মনে করিয়ে দেওয়া কবি শ্রীজাত??? এরা কি করে পারলেন? যে ভাষা তাঁদের অন্ন যুগিয়েছে, এতদিন দিয়েছে লেখক এর মর্য্যাদা , শিল্পীর সম্মান; সেই ভাষার সাথে এতবড় বিশ্বাস ঘাতকতা করতে পারলেন তাঁরা? পারলেন বাঙালির ভালোবাসাকে এতটা অমর্যাদা করতে !!! আর কি পাওয়ার আছে আপনাদের ! নির্লজ্জ্ব চাটুকারিতা র বিনিময়ে প্রাপ্ত পরিতোষিক এ আপনার গলা দিয়ে অন্ন নামবে তো? আপনার সন্তান দের দিকে মুখ তুলে তাকাতে পারবেন তো। লিখতে লিখতে খবর পেলাম লোক সংস্কৃতি গবেষক রত্না রশিদ এই অসভ্যতা র জবাব দিয়েছেন শাসকের পুরস্কার ছুঁড়ে ফেলে।
পড়ে রইলাম আমরা , যারা এখনো বাংলা কে আঁকড়ে ধরে বেঁচে , এখনো বাংলা যাদের ‘ তৃষ্ণার জল, তৃপ্ত শেষ চুমুক’ তাঁরা কি করব , খুব তাড়াতাড়ি ভেবে নিতে হবে। এখন যদি শুধু হাসি আর ফেসবুকে মিম বানিয়ে দায় সাড়ি তাহলে আমাদের ছেলেমেয়েরা ‘ বুম্বা অম্বা’ ছন্দ মিলেই বেঁচে থাকবে। আর ওদের হাতে পেন্সিল টুকুও থাকবে না। কোনোদিন কি ওরা ন্যাংটো রাজার দিকে আঙ্গুল তুলতে পারবে?
হঠাৎ মনে পড়ল ইশকুলে বেশ বুক ফুলিয়ে ই আবৃত্তি করতাম অস্থির সময়ের যন্ত্রনা ক্লিষ্ট এক কিশোর এর দৃপ্ত উচ্চারণ- ‘ বিশ্ব কে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার’-
সেই কিশোরের বিশ্বাস কোনো দিন ই আমাদের অন্তর কে ছয় নি, ছুঁলে আজ …।

ফিচার ছবিঃ শিল্পী শুভেন্দু সরকার

তমোজিৎ রায় : নাট্যকর্মী

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.