• June 29, 2022

১৯৪৩ সালে আইএফএ-এর অনুমোদন
লাভ করে ইস্পাত নগরীর এই ক্লাব

 ১৯৪৩ সালে আইএফএ-এর অনুমোদনলাভ করে ইস্পাত নগরীর এই ক্লাব

দূর্বাদল চট্টোপাধ্যায়

সত্তরের দশকে আইএফএ শীল্ড প্রতিযোগিতার পুল ম্যাচের একটি খেলায় পরিপূর্ণ ক্রীডাঙ্গনের দর্শকাসন। টানটান উত্তেজনামূলক খেলায় একদিকে ক্রীড়াঙ্গন থেকে ভেসে আসছে দর্শকদের চীৎকার। অপরদিকে টিকিট সংগ্রহে ব্যর্থ হয়ে খেলার চূড়ান্ত ফলাফল জানতে কয়েক শত ফুটবলপ্রেমী উদ্বিগ্নতার সঙ্গে অপেক্ষারত ক্রীড়াঙ্গনের বাইরে । তারা সকলেই ক্রীড়াঙ্গনের লাউড স্পীকারের মাধ্যমে আকাশবাণী কলকাতা কর্তৃক সরাসরি সম্প্রচারিত বাংলা ধারাভাষ্য শুনছেন। এহেন ঘটনা কলকাতা শহরের কোন ক্রীড়াঙ্গনে নয়। ১৯৭৩ সালে আইএফএ শীল্ডের এই খেলাটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল শিল্পাঞ্চলের অতি পরিচিত বিউসি’র বার্নপুর স্টেডিয়ামে। সেদিনের খেলায় দুই অংশগ্রহণকারী দল ছিল বার্নপুর ইউনাইটেড ক্লাব (বিউসি) বনাম কলকাতার এরিয়ান্স। খেলায় বেতার ধারাভাষ্য দিয়েছিলেন বিখ্যাত বাংলা ধারাভাষ্যকার অজয় বসু। উল্লেখ্য, সে বছরই আইএফএ শীল্ডের কয়েকটি পুল ম্যাচের জন্য মনোনীত হয় বিউসি’র নিজস্ব বার্নপুর স্টেডিয়াম। পুল ম্যাচে কালীঘাট, ওয়ারি, ইউপি-১১ ও এরিয়ান্সের মতন শক্তিশালী দলকে পরাজিত করে পুল চ্যাম্পিয়ান হয়েছিল বিউসি।

পশ্চিম বর্ধমান জেলার বার্নপুর ইউনাইটেড ক্লাব এক উল্লেখযোগ্য ক্রীড়াকেন্দ্র। ইস্পাতনগরী বার্নপুরের এই ক্লাব বিউসি নামেই বেশি পরিচিত। ইস্কো ও স্টীল কর্পোরেশন অফ্ বেঙ্গলের পৃষ্ঠপোষকতায় বিউসি স্থাপন হয় ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। ইস্কোর আন্তঃ বিভাগীয় ফুটবল টুর্নামেন্ট ও রাউটলেজ শীল্ড টুর্নামেন্ট আয়োজনের মাধ্যমে বিউসি’র ক্রীড়া কর্মসূচী শুরু । প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রাউটলেজ একজন ব্যক্তির নাম। তিনি একসময় ‘স্টীল কর্পোরেশন অফ বেঙ্গল’-এর সঙ্গে যুক্ত ‘মেসার্স ইন্টারন্যাশানাল কোম্পানি’র চীফ রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ারের পদে নিযুক্ত ছিলেন। রৌপ্য দ্বারা নির্মিত শীল্ডটি তাঁরই দান করা ছিল।

১৯৪৩ সালে রাউটলেজ শীল্ডের পরিবর্তিত নাম হয় ‘ইস্কো চ্যালেঞ্জ ট্রফি’। সে বছরেই বিউসি আইএফ ও বিএইচএ (বেঙ্গল হকি অ্যাসোসিয়েশন) –এর অনুমোদন লাভ করে। এরূপ সরাসরি অনুমোদন প্রাপ্তির নিদর্শন বিউসি ব্যতীত আর অন্য কোন ক্লাবের নেই। ফলস্বরূপ বিউসি ১৯৪৩ সালে আইএফএ শীল্ড টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ অর্জন করে এবং ভারতের ফুটবল মানচিত্রে ফুটে ওঠে বিউসি’র নাম ।

১৯৫৮ সালে ইস্কোর কর্ণধার বীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় মোহনবাগান ক্লাবের সভাপতির পদে মনোনীত হন। ১৯৬১ সাল অবধি তিনি ওই পদে আসীন ছিলেন। ওই সময়কালে বিউসি দলের ফুটবলের প্রভূত উন্নতি সাধন ঘটে। স্থানীয় সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে বার্নপুর স্টেডিয়ামে বিউসি বনাম মোহনবাগানের একটি খেলার কথা জানা যায়। হাড্ডাহাড্ডি লডাইয়ের খেলায় ফলাফল অমীমাংসিত হওয়ার দরুন এই খেলাটি তিনদিন অবধি গড়িয়েছিল।

১৯৬০ সালের ২ জুন থেকে ৫ জুন পর্যন্ত বিউসি’র বার্নপুর স্টেডিয়ামে আয়োজিত হয় জাতীয় স্তরের ফুটবল টুর্নামেন্ট ‘সন্তোষ ট্রফি’র পুর্বাঞ্চল রাজ্যগুলির মধ্যে কয়েকটি পুল ম্যাচ । অতঃপর ১৯৬১ সালে সন্তোষ ট্রফির বাংলা বনাম উত্তরপ্রদেশ একটি মাত্র খেলা বিউসি’র এই স্টেডিয়ামে আয়োজিত হয়েছিল। বার্নপুর স্টেডিয়ামে আয়োজিত সন্তোষ ট্রফির খেলায় অংশ নেন প্রদীপ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় (পিকে ব্যানার্জী), বলরাম, চুনী গোস্বামী ও জার্নেল সিংয়ের মতন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ফুটবল খেলোয়াড়েরা।

১৯৬২ সালে জাতীয় স্তরের জুনিয়র ন্যাশানাল চ্যাম্পিয়নশিপ ‘বিসি রায় ট্রফি’-র সমস্ত খেলাগুলি বিউসি’র বার্নপুর স্টেডিয়ামে হয়। বিসি রায় ট্রফিতে সর্বমোট অংশগ্রহণকারী রাজ্যের সংখ্যা ছিল সতেরো এবং ফাইনালে ঊড়িষ্যাকে পরাজিত করে বিজয়ী ট্রফি বাংলার খেলোয়াড়দের হাতে আসে। অশোক চট্টোপাধ্যায়, সন্তোষ মিত্র, সুভাষ ভৌমিক প্রমু্খ বিসি রায় ট্রফিতে বাংলা দলের হয়ে অংশ নেন এবং তারা সকলেই পরবর্তী সময়ে দেশের খ্যাতনামা ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে প্রসিদ্ধ। ১৯৬২ অসম রাজ্যে আয়োজিত ফুটবলের ‘ইনডেপেনডেন্স কাপ’ জয়লাভ বিউসি’র এক উল্লেখযোগ্য সাফল্য। ওই কাপের ফাইনাল খেলার ধারাবিবরণী অল ইন্ডিয়া রেডিও কর্তৃক সম্প্রচারিত হয়েছিল।

১৯৬৩ সালে প্রথম আন্তঃ ইস্পাত ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচটি হয়েছিল বিউসি’র বার্নপুর স্টেডিয়ামে। খেলায় বিউসি শক্তিশালী ফুটবল দল টিস্কো’কে ৩-০ গোলের ব্যবধানে পরাজিত করে। সে বছরেই পাটনা শহরে আয়োজিত ‘শ্রীকৃষ্ণ গোল্ড কাপ’-এর ফাইনালে জয়ী হয় বিউসি দল। সত্তরের দশকে বিউসি’র যে সমস্ত উল্লেখযোগ্য ট্রফি লাভ করে তার মধ্যে অন্যতম হল ১৯৭৭ সালে ‘অল ইন্ডিয়া বিশাকা ট্রফি’ । পরের বছর ১৯৭৮ সালে অসম রাজ্যে আয়োজিত ইনডেপেনডেন্স কাপে রানার্স হয় বিউসি। ১৯৮১ সালে বিউসি ফুটবল দল বাইরের রাষ্ট্র ভুটান থেকে নিয়ে আসে ‘থিমফু গোল্ড কাপ’। ইস্পাত নগরীর এই ফুটবল দল ডুরান্ড ও রোভার্স কাপেও অংশগ্রহণ করেছিল।

বিউসি’র বার্নপুর স্টেডিয়ামে মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, মহামেডান স্পোর্টিং সহ দেশের বিভিন্ন নামী ফুটবল দলের সঙ্গে প্রদর্শনী ফুটবল খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভ করার পর বাংলাদেশ নামে স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়। সে বছরেই বিউসির স্টেডিয়াম বাংলাদেশ একাদশ বনাম বিউসি একটি প্রদর্শনী ম্যাচের আয়োজন করা হয়েছিল। খেলায় বাংলাদেশ একাদশ ৪-৩ গোলে জয়লাভ করে। এছাড়া অতীতে বিউসির এই স্টেডিয়ামে বেশ কয়েকটি বিদেশী দলের সঙ্গে প্রদর্শনী ফুটবল খেলার কথা শোনা যায়। ১৯৬৯ সালে আন্তঃ ইস্পাত এথলেটিক প্রতিযোগিতার আসর বসেছিল বিউসি’র বার্নপুর স্টেডিয়ামে।

অতীতে বিউসি’র যে সমস্ত খেলোয়াড় ফুটবল দলকে সমৃদ্ধ করেছিলেন সেই উল্লেখযোগ্য নামগুলি হল – মহম্মদ সালাউদ্দিন, জগন্নাথ দত্ত, এস এন ব্যানার্জী (ফুটবলার প্রশাসক), ভুলি মজুমদার, নন্দ মিশ্র, ইন্দার বক্সি, জ্যোতিষ রায়, দুলাল চ্যাটার্জী, প্রদীপ দাসগুপ্ত, ডি ঘোষ, টুলটুল সেনগুপ্ত, শঙ্কর গাঙ্গুলী, চঞ্চল দাস, স্বপন গাঙ্গুলী, বিদেশ মিত্র, শিবদাস বাউরি, মলয় কবিরাজ, কুমারেশ মিত্র, দেবব্রত সরকার (মনা), দেবব্রত সরকার (ডাবলা), তারিখ মান্নান, আরিফ মান্নান, মানব চক্রবর্তী, যদুগোপাল আচার্য, সুমিত মৌলিক, সন্দীপ দাস, সমর রায় চৌধুরী, অমিতাভ বোস, বিশ্বজিৎ দাস, সুব্রত রায়চৌধুরী, রবিশঙ্কর দাস, রঞ্জিৎ কুমার হালদার, সুব্রত পাল প্রমু্খ। সুব্রত পাল ফুটবল খেলোয়াড় ছাড়াও তিনি একজন নামী অ্যাথলেট। কয়েক বছর আগে চীনে আয়োজিত ১১০ মিটার হার্ডলস-এ তিনি ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। প্রদীপ চৌধুরী বিউসি দলের এক অতি উল্লেখযোগ্য খেলোয়াড় যিনি ১৯৭৫ সালে ইস্কোর কলকাতার অফিসে যোগদান করেন। তিনি ভারতের জাতীয় ফুটবল দলের হয়ে দুইবার প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৭৭ সালে পেলে যখন কসমস ক্লাবের হয়ে খেলতে কলকাতা আসেন সেই সময় প্রদীপ চৌধুরী মোহনবাগান দলের অধিনায়ক ছিলেন।

ইস্কো চ্যালেঞ্জ ট্রফি, ইন্টার ডিপার্টমেন্ট টুর্নামেন্ট ও এনআর দত্ত ফুটবল টুর্নামেন্ট বিউসি’র উদ্যোগে নিয়মিত আয়োজিত হয়ে থাকে। বিউসি’র উদ্যোগে ইস্কোর সিএসআর প্রকল্পের মাধ্যমে ফুটবল ও কাবাডি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ্যাথলেট তথা ফুটবলার সুব্রত পাল বর্তমানে বিউসি’র ফুটবল সেক্রেটারির পদে নিযুক্ত। তিনি জানালেন, শিল্পাঞ্চল সহ আশপাশ জেলা পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ার বিভিন্ন স্থান থেকে স্বল্পবয়সী ফুটবল প্রতিভাদের তুলে নিয়ে আসে বিউসি। বিউসি ফুটবল দলে সামিল করার জন্য সিএসআর প্রকল্পের মাধ্যমে তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তিনি আরও জানালেন যে ইস্কোর সিএসআর প্রকল্পে বিউসি’র বার্নপুর স্টেডিয়াম ব্যতীত বর্তমানে শিল্পাঞ্চলে আরও তিনটি স্থানে ফুটবল প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।

তথ্য সূত্র:-
ইস্কো থেকে সেইল ইস্কো স্টীল প্ল্যান্ট, শ্যামল হোমরায়
বিশেষ কৃতজ্ঞতা :- সুব্রত পাল, তরুণ গোপাল চট্টোপাধ্যায় ও সুমিত মৌলিক

দুর্বাদল চট্টোপাধ্যায় : আসানসোল শিল্পাঞ্চলের ইতিহাস নিয়ে ক্ষেত্র সমীক্ষার কাজে যুক্ত।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post