• December 8, 2022

পটলডাঙ্গার টেনিদা

 পটলডাঙ্গার টেনিদা

সৌমিক কান্তি ঘোষ

উত্তর কলকাতার একটা জরাজীর্ণ বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে টেনিদা হাঁক দিতেন ‘ডি লা গ্রান্ডি মেফিস্টোফিলিস, ইয়াক ইয়াক।’ বেরিয়ে আসত প্যালা, হাবুল, ক্যাবলারা।

খুব দূর নয়।আমহার্স্ট স্ট্রিটের মোড় থেকে পোস্ট অফিসের দিকে একটু এগোলেই পড়বে পটলডাঙা স্ট্রীট। অবশ্য পঞ্চাশ ষাট দশকের পটলডাঙার সঙ্গে আজকের আকাশছোঁয়া বহুতলের ঘুপচি গলিতে পরিণত হওয়া পটলডাঙা স্ট্রীটের সাযুজ্য নেই বললেই চলে। তবু একটু কষ্ট করে উঁকি ঝুঁকি মারলে দু একটা জরাজীর্ণ রকের মধ্যে থেকে হয়তো আবিষ্কার করে ফেলবেন সেদিনের চাটুজ্জের রক। বাংলা সাহিত্যের রক কালচারের অন্যতম পীঠস্থান। এখানেই টেনিদার মুখেন মারিতং জগতং’ এর সঙ্গী ছিলো প্যালা, হাবুল ও ক্যাবলা। চেনা চেনা মুখ, চেনা চরিত্র যেন পাশের বাড়ির ছেলেগুলোর মতোই আর তাদের গুরু হলো ঐ বখাটে টেনিদা ( সে ম্যাট্রিক দিয়েছে, কে জানে এন্ট্রান্সও দিয়েছে কিনা। মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালির কাছে এ হেন ছেলে বখাটে তো হবেই)

বাঙালীকে চেনা যায় তার নিজস্ব জীবন বৈচিত্র্যে। কখনো মাছে-ভাতে, কখনো মিষ্টান্ন প্রিয়তায় আবার কখনো বা দুর্গাপূজোয় আর অবশ্যই রোয়াকের বৈঠকি আড্ডায়, যে আড্ডা আজ আমাদের জীবনে প্রায় অবলুপ্ত। বেঁচে থাকার প্রাত্যহিক ইঁদুর দৌড়ে এবং গনজ্ঞাপনের বিভিন্ন বৈদ্যুতিন অন্তর্জালে বয়ে যাওয়া জীবনে রকে বসে আড্ডার অবকাশ নেই বললেই চলে। এক সময় যে রকে সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম, রাজনীতি আলোচিত হতো, জীবন্ত হয়ে উঠতো তৎকালীন আর্থসামাজিক প্রেক্ষিত এবং পাড়া কালচার – যা মধ্যবিত্ত বাঙালীর ব্যাক্তিচেতনায় দাগ রেখে যেতো আজ তা অন্তমিত। আর এই রক কালচারের আপন অস্তিত্ব তো লুকিয়ে আছে টেনিদার সৃষ্টিশীলতায়। তাই বাংলা সাহিত্যের রক কালচারে তিনি আজও প্রাসঙ্গিক, চিরস্মরণীয়। আর কিশোর পাঠককে কেন্দ্র করে লেখা হলেও টেনিদা দাদুরও দাদা নাতিরও দাদা। এই কারনেই হয়তো টেনিদা সমগ্রের সম্পাদক প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায় বলেন ” এ কথা অবিসংবাদিত রুপে সত্য যে, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ছোটোদের লেখা মাত্রেই দারুন উপভোগ্য। কিন্তু টেনিদার ক্ষেত্রে তার মাত্রাটা যেন কূল-ছাপানো”।

টেনিদাকে উপলক্ষ্য করে লেখক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় গল্প, উপন্যাস, নাটিকা ইত্যাদি বিভিন্ন আঙ্গিকে সাহিত্য রচনা করেছেন। এই সকল রচনাগুলিতে অ্যাডভেঞ্চারের রোমান্টিকতা ও ভাষার চমৎকারিত্ব থাকলেও এগুলির মূল আধার হল কৌতুকরস। আর এই কৌতুকরসকে কেন্দ্র করে নিরন্তর সাহিত্বস্বাদ সৃজন করতে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের জুড়ি মেলা ভার। যতদূর জানা যায় পাঁচের দশকের শেষ দিকে ‘শিশু সাথী’ পত্রিকাতে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ধারাবাহিক ভাবে ‘চারমূর্তি’ উপন্যাসটি লিখতে শুরু করেন। এই সময়ই ( ১৯৪৬ সাল নাগাদ) লেখক কলকাতার পটলডাঙায় বসবাস শুরু করেন। ল্যান্ডলর্ড ছিলেন প্রভাত মুখোপাধ্যায়। অনেকেই মনে করেন টেনিদা হিসাবে লেখক তার ল্যান্ডলর্ড কেই কল্পনায় বেঁধেছিলেন।

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় টেনিদাকে কেন্দ্র করে পাঁচটি উপন্যাস, তেত্রিশটি গল্প ও একটি নাটিকা রচনা করেন। সমস্যা হল গল্প, উপন্যাসগুলির রচনাকাল সঠিকভাবে জানা সম্ভব হয়নি বলে এগুলিকে কালানুক্রমিক ভাবে সাজানো কঠিন।টেনিদার উপন্যাস- চারমূর্তি, চারমূর্তির অভিযান, কম্বল নিরুদ্দেশ, টেনিদা আর সিন্ধুঘোটক, ঝাউ বাংলোর রহস্য।

টেনিদার গল্পগুলি হল- একটি ফুটবল ম্যাচ, দধীচি, পোকা ও বিশ্বকর্মা, খটাঙ্গ ও পলান্ন, মৎসপুরাণ, পেশোয়ার কী আমীর, কাক কাহিনী, ক্রিকেট মানে ঝিঁ ঝিঁ, পরের উপকার করিও না, চেঙ্গিস আর হ্যামলিনের বাঁশিওলা, ঢাউস, নিদারুণ প্রতিশোধ, তত্ত্বাবধান মানে জীব প্রেম, দশানন চরিত, দি গ্রেট ছাটাই, ক্যামোফ্লেজ, কুট্টিমামার হাতের কাজ, সাংঘাতিক, বন ভোজনের ব্যাপার, কুট্টিমামার দত্ত কাহিনী, প্রভাত সঙ্গীত, ভজহরি ফিল্ম কর্পোরেশন, চামচিকে আর টিকিট চেকার, ব্রহ্মবিকাশের দন্তবিকাশ, টিকটিকির ল্যাজ, বেয়ারিং ছাঁট, কাঁকড়া বিছে, হনোলুলুর মাকুদা, হালখাতার খাওয়া দাওয়া, ঘুটেপাড়ার সেই ম্যাচ, টেনিদা আর ইয়েতি, একাদশীর রাঁচি যাত্রা, ন্যাংচাদার হাহাকার, ভজগৌরাঙ্গ কথা।

টেনিদাকে নিয়ে নাটিকাঃ পরের উপকার করিও না

(গল্প ও উপন্যাসগুলির রচনাকাল ঠিকমত জানা সম্ভব হয়নি বলে এগুলিকে তো কালানুক্রমিকভাবে সম্ভব হয়নি।)

টেনিদার গল্প একা টেনিদাকে নিয়ে নয়। ‘দাদাগিরি’ ফলানোর জন্য টেনিদার তিনজন সাগরেদ রয়েছে। তারা হলেন ঢাকাই বাঙাল হাবুল সেন, হতচ্ছাড়া ক্যাবলা আর পিলের জ্বরে বছরের বারোমাস কাতরানো প্যালারাম। প্যালার জবানীতেই টেনিদার কাহিনিগুলি বর্ণিত। টেনিদা সহ পটলডাঙার চারমূর্তি প্রত্যেকেরই একটা ভালো নাম রয়েছে। ‘চারমূর্তির অভিযান’ উপন্যাসে স্বয়ংস্রষ্টা এই নামের জটিলতা পাঠকের কাছে নাটকীয়ভাবে উন্মোচন করেছেন।

“ভজহরি মুখার্জি – স্বর্ণেন্দু সেন- কুশল মিত্র কমলেশ ব্যানার্জী – নামগুলো শুনে চমকে উঠছ তো? ভাবছ-এ আবার কারা? হুঁ হুঁ ভাববার কথাই বটে। এ হল আমাদের চারমূর্তির ভালো নাম- আগে স্কুলের খাতায় ছিল। এখন কলেজের খাতায়। ভজহরি হচ্ছে আমাদের দুর্দান্ত টেনিদা। স্বর্ণেন্দু হল ঢাকাই হাবুল, কুশল হচ্ছে হতচ্ছাড়া ক্যাবলা। আর কমলেশ? আন্দাজ করে নাও।”

আন্দাজ করে নিতে কষ্ট হয়না এই কমলেশ ব্যানার্জিই গল্পকথক প্যালারাম। মূলত পটলডাঙার চাটুজ্জ্যেদের রকে বসে চারমূর্তি আড্ডা দেয়, কিন্তু কলকাতার চেনা জানা অনেক জায়গায় এদের ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। আর শুধু কলকাতাই বা কেন, অভিযানের উদ্দেশ্যে এদের একাধিকবার নানান জায়গায় ভ্রমণ করিয়েছেন স্রষ্টা। ‘চারমূর্তি’ উপন্যাসে প্যালা বলেছে, লেখাপড়ায় ক্যাবলা সবচেয়ে ভালো, হেডমাস্টার বলেছেন ও নাকি স্কলারশিপ পাবে। ঢাকাই বাঙাল হবুল সেনটাও পেরিয়ে যাবে ফার্স্ট ডিভিশনে। কিন্তু প্যালা থার্ড ডিভিশনে পাশ করলেও করতে পারে। টেনিদা? তার কথা না বলাই ভালো। সে ম্যাট্রিক দিয়েছে কে জানে এন্ট্রান্সও দিয়েছে কি না। এখন স্কুল ফাইনাল দিচ্ছে এরপরে হয়তো হায়ার সেকেন্ডারিও দেবে। স্কুলের ক্লাস টেন-এ সে একেবার মনুমেন্ট হয়ে বসে আছে তাকে সেখান টেনে এক ইঞ্চি নড়ায় সাধ্য কার। তবে পরবর্তী উপন্যাসে বলা হয়েছে- “আমরা চারমূর্তি – পটলডাঙার সেই চারজন; টেনিদা, হাবুল সেন, ক্যাবলা আর আমি…… চারজনেই এবার স্কুল ফাইনাল পাশ করে ফেলেছি। টেনিদা আর আমি থার্ড ডিভিশন, হাবুল সেকেন্ড ডিভিশন, আর হতচ্ছাড়া ক্যাবলাটা শুধু যে ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করেছে তা-ই নয়, আবার একটা স্টার পেয়ে বসে আছে। শুনেছি ক্যাবলা নাকি স্কলারশিপও পাবে।…..

কলেজে ভর্তি হয়ে খুব ডাঁটের মাথায় চলাফেরা করছি আজকাল। কথায় কথায় বলি, আমরা কলেজ স্টুডেন্ট আমাদের সাথে চালাকি চলবে না – হুঁহুঁ।”মুখে ডাঁটে’র কথা বললেও আদতে এদের ডাঁট আছে বলে পাঠকের বিশ্বাস হয় না। এমনকি দাদাগিরি ফলানো টেনিদা বা বুদ্ধি বিবেচনায় এগিয়ে থাকা ক্যাবলার মধ্যেও আমিত্ববোধ লক্ষ্য করা যায়না। চারমূর্তির দলে সর্বদাই একজন অপরজনের পিছনে লেগে থাকে, সময় বিশেষে টেনিদাকেও দুকথা শোনাবার ক্ষমতা এদের আছে। এদের মধ্যে ঠুকঠাক লেগে থাকলেও হিংসা বা দ্বেষ নেই, রয়েছে নিছক ছেলেমানুষি ও বন্ধুত্ব। বয়সে বড়ো হলেও টেনিদার মধ্যে সারল্য রয়েছে বলেই সে অবলীলায় এদের উপর দাদাগিরি ফলাতে পারে। কথা বলা ও হাত চালানো উভয়ক্ষেত্রেই টেনিদা অদ্বিতীয়।

টেনিদার শাসনের ভাষায় তার দাদাগিরি চোখে পড়ার মতো। শাসনকর্তা টেনিদার মুখের বুলি অবিস্মরণীয়। এই সুযোগে স্রষ্টা তাঁর ভাষা ব্যাবহারের ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে যথেচ্ছ কৌতুকরস সৃষ্টি করেছেন। টেনিদাকে প্রায় বলতে শোনা যায়, ‘এক চড়ে নাক নাসিকে পাঠিয়ে দেবো’ বা ‘কান কানপুর কি কর্ণাটকে পাঠিয়ে দেবো’। টেনিদার শাসনবাক্যের বহুল ব্যবহার এমন একটা প্রবচনের স্তরে পৌঁছে গেছে যে অনেক সময় টেনিদার মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই ভক্তরা বাকি অংশ সমাপ্ত করে দিয়েছে, প্রয়োজনে কিছু অতিরিক্ত সংযোজনও করেছে। দাদাগিরি ফলাতে গিয়ে টেনিদা তার ভক্তদের দু-চারটে রাম গাট্টা দিলেও তার ভৈরবভয়ঙ্কর উপস্থিতির সামনে বাকি তিনজন একেবারে নিশ্চুপ। টেনিদার বর্ণনা দিতে গিয়ে এক জায়গায় বলা হয়েছে

“টেনিদাকে তোমরা চেনো না। ছ হাত লম্বা, খাড়া নাক, চওড়া চোয়াল। বেশ দশাসই জোয়ান, হঠাৎ দেখলে মনে হয় ভদ্রলোকের গালে গাল পাঞ্চা থাকলে আরও বেশী মানাতো। জাঁদরেল খেলোয়াড় গড়ের মাঠে তিন-তিনটে গোরার হাটু ভেঙে রেকর্ড করেছেন। গলার আওয়াজ শুনলে মনে হয় ষাঁড় ডাকছে।”

কাজ আদায় করতে টেনিদা প্রতিশ্রুতি দেয় বটে কিন্তু কাজ হাসিল হওয়ার পরে তা পালন করতে তার আর মনে থাকে না। তবে আমরা তাকে কথার খেলাপ করতে দেখিনি। নিজেকে বা নিজের ভক্তদের কেউ অপমান করলে বা ধোঁকা দিলে টেনিদা তার প্রতিশোধ নিতে ছাড়েনা। বহু চেষ্টায় ম্যাট্রিক পাশ করলেও টেনিদার স্মৃতিশক্তি নিছক মন্দ নয়। কথার খেলায় সে সাবলীল, বাইরের জগতের জ্ঞান যে তার একদম নেই তা নয়, টেনিদা দিব্যি দলপতিত্ব করতে পারে, গুরুজনরা তার প্রতি রুষ্ট নয়, মাঝে মাঝে তার মুখে বিদেশি ভাষাও শোনা গেছে। টেনিদা বলে, এক ক্লাসে একাধিক বার থাকার যথেষ্ট প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কিন্তু এ কি তার অজুহাত? নাকি সত্যি কোন নতুন ধারার দৃষ্টিভঙ্গি?

টেনিদা কি সাহসী? নাকি ভীতুর একশেষ? টেনিদার মুখের কথা শুনে তাকে অসীম সাহসী মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু টেনিদাকে নানানসময়ে যে ধরনের প্রতিক্রিয়া করতে দেখা গেছে কোনো সাহসী লোকের অভিধানে তা থাকতেই পারে না। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় টেনিদা রাম ভীতু, ‘মুখেন মারিতং জগত’ তার সার, কাজের বেলা সে অষ্টরম্ভা। তবে দলের অন্য কোনো সদস্য যখন বিপদে পড়েছে তখন টেনিদা তাকে ছেড়ে পালায়নি। নিজে থেকে যেচে এগিয়ে না গেলেও যে মুহূর্তে তাকে তার কর্তব্যকর্ম সম্পর্কে সচেতন করে দেওয়া হয়েছে সে মুহূর্তেই টেনিদা ঋজু মেরুদণ্ডে বুক ফুলিয়ে মোকাবিলা করতে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছে। টেনিদা বক্সিং জানে, জুডো জানে, কুস্তি জানে; প্রয়োজনে তাকে তা ব্যাবহারও করতে দেখা গেছে। প্যালার ভাষায় – “টেনিদার মজাই এই। ঠিক যেন হাওড়া স্টেশনের গাড়ীগুলোর মতো। লিলুয়া পর্যন্ত যেম চলতেই চায়না…. তারপর একবার দৌড় মারল তো পাঁই পাঁই শব্দে সোজা বর্ধমান……. তখন আর কে তার পাত্তা পায়। এই গুণের জন্যই তো টেনিদা আমাদের লিডার। ” দ্য গ্রেট টেনি শৰ্মা।আসলে বয়স বাড়লেও টেনিদার মধ্যে একটা কিশোর মন রয়ে গেছে। তার উক্তি ও কার্যকলাপ, শিশুর মতো কেঁদে ফেলা, ভয়ে চমকে ওঠা সব মিলে মিশে টেনিদার চরিত্রকে লেখক সর্বজনীন করে তোলেন।

আমরা আগেই বলেছি যে পটলডাঙার ল্যান্ডলর্ড ছিলেন প্রভাত মুখোপাধ্যায় যাকে কল্পনা করে লেখক টেনিদা সৃষ্টি করেন। এ প্রসঙ্গে প্রভাতবাবু নিজেই বলেছেন “ওর স্বভাবের সঙ্গে টেনিদার কিন্তু অনেক মিলও ছিল। হান করেঙ্গা, ত্যান করেঙ্গা বলে উনি খুব লাফাতেন। কিন্তু আসলে তো ভিতু, তাই যেই বলা হয় যাও না, কর না, কী করবে। অমনি উনি কোন এক ছুতোয় ছাদে উঠে বসে থাকতেন। নারায়ণদা সবই লক্ষ্য করতেন। “

এই প্রভাত মুখোপাধ্যায়েরই এক ভাইয়ের নাম ছিলো ক্যাবলা এবং আরেক ভাইয়ের নাম হাবু। হাবু-র সঙ্গে ‘ল’ যোগ করে লেখক তাকে হাবুল বানিয়ে ছিলেন। আর প্যালা? সে তো স্বয়ং লেখক নিজেই। তিনি তো এখানে নিজেকে নিয়েই হাস্যরস পরিবেশন করে গেছেন গল্পের পর গল্পে। এ প্রসঙ্গে দীপংকর চক্রবর্তীর মূল্যায়ন প্রণিধানযোগ্য। তিনি মনে করেন বরিশালের বাঙাল নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ভাষায় বৈচিত্র্য আনতে খাঁটি কলকাতার পরিবেশে এক কাঠ বাঙালকে এনেছেন। নাম ক্যাবলা। তাকেই বুদ্ধিমান ও সাহসী করে বাকীদের থেকে একটু এগিয়ে রেখেছেন। ক্যাবলাকে তিনি পশ্চিমে বড় করে তুলেছেন। তাই ক্যাবলা কথায় কথায় হিন্দি ভাষার প্রয়োগ করে থাকে। অপরদিকে হাবুলের মধ্যে নিজস্বতা কম। সে দুপক্ষের মন জুগিয়ে চলতে পারে আর প্যালা পেট রোগা। টেনিদার উপর মাঝে মাঝে মনঃক্ষুণ্ন হলেও সে ভীষনভাবেই টেনিদার বাধ্য। তাই প্যালাকে ছাড়া টেনিদার চলে না। এই চারমূর্তির প্রত্যেকের মানসিক, শারিরিক, ভাষাগত তথা আচরণগত আপাত বিরোধের মধ্যে দিয়েই সাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় প্রতিটি চরিত্র জীবন্ত করে তুলেছেন।

আসলে টেনিদা মানেই পটলডাঙার রোয়াক, টেনিদা মানেই দাদাগিরি, টেনিদা মানেই কথার খেলা, অসীম তার কল্পনা, অদ্ভুত তার উদ্ভাবনী বাক্য আর অতুলনীয় তার বর্ণনা কৌশল।

আজ কোথায় সেই রক? কোথায় সেই আড্ডা? আধুনিক জীবন যাত্রায় সময়ের দৈন্যতায় বাঙালীর রক কালচার আজ কালের অতলে হারিয়ে গেছে। সংস্কৃতির বিবর্তনে রক রুপান্তরিত হয়েছে ‘সি সি ডি’ ক্যাফেতে। পটলডাঙা স্ট্রীটের ঘুপচি গলিতে তখন সন্ধের আলো-আঁধারির খেলা। দূর থেকে মনে হলো একটা রকে যেন কয়েকজন বৃদ্ধ জড়ো হয়ে বসে। কে জানে ওদের মধ্যেই হয়তো কেউ হাবুল কিংবা প্যালা, এখুনি হয়তো আর এক সত্তোরোর্ধ বৃদ্ধ এসে চেঁচিয়ে উঠবে- ‘ডি লা গ্রান্ডি মেফিস্টোফিলিস’, বাকিরা বলবে ইয়াক ইয়াক।

সৌমিক কান্তি ঘোষ : অধ্যাপক ও লেখক।

3 Comments

  • অপূর্ব সৌমিক। আমাদের ছোটবেলা, আমাদের সেই সময়ের আদর্শ গল্পই ছিল হয় টেনিদা আর নয় তো ঘনাদা। তুমি এক লহমায় সেই দিন ফিরিয়ে দিলে। তুমি এমনই লেখো কামনা করি।

    • Darun lekha. Chotobala ta fire pelam.

  • Khub Sundor Likhechis Kanti. Salute!

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post