• August 18, 2022

সীমান্ত বঙ্গের হাট

 সীমান্ত বঙ্গের হাট

তপন পাত্র

লোকসংস্কৃতি- লোকযানের নিরিখে সমগ্র বাংলাকে প্রধানত চারটি অঞ্চলে বিভক্ত করা যায় —পশ্চিম, উত্তর, উত্তরপূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত । পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে মেদিনীপুরের ঝাড়গ্রাম এলাকা তথা অধুনা ঝাড়্গ্রাম জেলার নয়াগ্রাম, গোপীবল্লভপুর, বিনপুর, শিলদা থেকে শুরু করে শালবনি , গোদাপিয়াশাল পর্যন্ত । বাঁকুড়া জেলার দক্ষিণ অংশ —রাণীবাঁধ, সিমলাপাল, রাইপুর, তালডাংরা, বিবড়দা, হাড়মাসড়া, খাতড়া, সুপুর, হাতীরামপুর, ইঁদপুর ,ছাতনা, শালতোড়া ইত্যাদি আর কাশীপুর-বেগুনকোদর -বাগমুন্ডি -ঝালদা -বরাবাজার- মানবাজার- রঘুনাথপুর- বান্দোয়ান সহ সমগ্র পুরুলিয়া জেলা । এছাড়া পুরুলিয়া ছোঁয়া ঝাড়খন্ডের পূর্বাঞ্চল । ভাষাতত্ত্বের বিচারে এই এলাকার মানুষ প্রধানত বাংলাভাষী কিন্তু সে ভাষা একটি স্বতন্ত্র উপভাষার বৈশিষ্ট্য সমুজ্জ্বল , তা-ও আবার দশ-বারো কিলোমিটার এলাকা পর পর ভিন্ন ভিন্ন রূপে অংশত রূপান্তরিত । সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল রূপেও এই ভূগোলসীমা স্বাতন্ত্র্যের অধিকারী ।

এই পশ্চিম-সীমান্ত-বঙ্গের অধিবাসীদের অধিকাংশই আদিবাসী । যাঁরা সুদীর্ঘকাল এই অরণ্যপর্বতময় কাঁকর ভূমিতে জড়িয়ে আছেন তাঁদের মধ্যে ভূমিজ, সাঁওতাল, হো , মুন্ডা প্রধান । এ ছাড়াও রয়েছেন বীরহোড়, কোড়া, খেড়িয়া-শবর, লোধা, মাহাত , বাউরী, বাগদি, দেশওয়ালি মাঝি, ডোম, রাজোয়াড়, সিং সর্দার , সুমন্ডল, গোপমন্ডল , ময়রা, জেলে, তাঁতি, কুমোর, কামার প্রমুখ প্রজাতির মানুষ । সামাজিক বিচারে বেশ কিছু উচ্চবর্ণের মানুষ যে নেই, তা নয়, তবে তুলনামূলকভাবে সংখ্যায় কম ।

ভৌগোলিক, প্রাকৃতিক, পারিপার্শ্বিক, ঐতিহাসিক এবং সম্প্রদায়গত কারণে এই এলাকার মানুষের জীবনযাপন সমগ্র বাংলার তুলনায় অনেকটাই আলাদা । এখানে “বারো মাসে তেরো পার্বন” যেমন দৈনন্দিন জীবনযাপনের ক্ষেত্রে একটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে , তেমনি নানা ধরনের হাট এই এলাকার মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাপনের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ । এলাকাবাসীর অর্থ-সামাজিক জীবনে গ্রামীণ হাটের ভূমিকাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । জল-মাটি -আলো-বাতাসের মতো “হাটবার” কথাটি তাই এই এলাকায় একটি অত্যন্ত পরিচিত শব্দবন্ধ । হাটবারে অর্থাৎ সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে একটি বিশেষ এলাকার মানুষ আটপৌরে ও সহজ-সরলভাবে নির্দিষ্ট হাট প্রাঙ্গণে বা হাট ময়দানে মিলিত হন । সপ্তাহের অন্যান্য দিনগুলির তুলনায় এই দিনটির গুরুত্ব জনজীবনে একটু পৃথক, স্বতন্ত্র । এ যেমন রুজি রোজগারের দিন , মাড়ভাতের লড়াইয়ের দিন, তেমনি আবার পশ্চিম -সীমান্ত-পল্লী-বাংলার শিথিল নর-নারীর জীবনে উষ্ণ রক্ত চলাচল অনুভব করার দিন । বর্ষা এলে যেমন আকাশের প্রসন্ন দাক্ষিণ্যে জলাশয় থৈ থৈ করে, ক্ষেত-বা’দ ষোড়শী তরুণীর মতো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে তেমনি হাট এলে এই পল্লীবাংলার মানুষ নিজের হৃদয়কে ও কর্মশক্তিকে হাট করে খুলে দেয় । হাট এলে পেট ভরে, মনও পূর্ণ হয় ।

হাটকে জড়িয়ে এই অঞ্চলে প্রচলিত একটি ঝুমুর গানে লোকসাধারণের আর্থ-সামাজিক জীবন প্রসঙ্গটি সুস্পষ্টভাবে চিত্রিত হয়েছে ।
” ঝাড়গাঁর হাট যাতে
(আর) বিহাইয়ে ধরল হাতে ।
ও বিহাই ছাড় হাত,
ঝুড়ি ঝাঁটি বিকেই সাঁঝের ভাত ।

ঝাড়গাঁর হাট যাতে
(আর) বিহানে ধরল হাতে,
ও বিহান ছাড় হাত
ঝুড়ি ঝাঁটি বিকেই সাঁঝের ভাত ।”

—এই অঞ্চলে বেয়াই-বেয়ানের সম্পর্কটি বেশ মধুর । একটু হাসি-স্ফূর্তি ঠাট্টা-মশকরা ইয়ার্কি-ফাজলামির সম্পর্কও বটে । ঝাড়গ্রামের হাটে চলেছেন বেয়াই , ফাঁকা রাস্তায় একা পেয়ে বেয়ান তার হাত ধরে পথ আটকায় অথবা হাটে চলেছেন বেয়ান, ফাঁকা রাস্তায় একা পেয়ে পথ আটকায় বেয়াই ; কিন্তু এই হাটে যাবার পথে স্বল্পকালও আনন্দ-বিনোদনে কাটলে হাটের বাজার ধরতে দেরি হয়ে যাবে । পেটের ক্ষুধার জ্বালায় বনের থেকে কাঠ কেটে এনে , কখনো বা বাঁশের ঝাঁটা-ঝুড়ি বানিয়ে হাটে বিক্রি করলে সেই টাকায় চাল কিনে এনে সন্ধাবেলায় তা সেদ্ধ করে খাওয়া দাওয়া । এই একটি অন্তরের যন্ত্রণার সাংগীতিক প্রকাশ স্পষ্ট করে দেয় পশ্চিম সীমান্ত বাংলায় হাটের গুরুত্ব ।

হাট এখানে দুটো রূপে হাজির হয় । একটি সাধারণ হাট, যেখানে শাকসবজি থেকে শুরু করে নুন মসলা, প্রাত্যহিক জীবন যাপনের নানা দ্রব্যাদি, কৃষি যন্ত্রপাতি, বস্ত্র-বসন, ভূষণ, ঘরকন্নার নানান সামগ্রী কেনাবেচা হয় । আরেক ধরনের হাট —পশুপক্ষীর হাট । তবে পশুপক্ষীর হাটে সাধারণ হাটের সমস্ত কিছুই ক্রয় বিক্রয় হয় তার সঙ্গে গরু- ছাগল- ভেড়া -মোষ- হাঁস -মুরগি-পায়রা-টিয়ে-ময়না -চন্দনা, শালিক পাখিও কেনাবেচা চলে । সাধারণ হাট সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিন , কোথাও আবার সপ্তাহে দু’দিন একটি নির্দিষ্ট প্রাঙ্গণে বসে । কিন্তু পশু-পাখির হাট সপ্তাহে একটি বারেই বসে ।

একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক শপিং মল, নেট-মার্কেটিং, অনলাইন মার্কেটিং এর দিনে সমগ্র দেশে সাপ্তাহিক অর্ধ -সাপ্তাহিক হাটের গুরুত্ব কমলেও সমগ্র পশ্চিম সীমান্ত বাংলায় আজও তিন শতাধিক সাধারণ হাট ও পঞ্চাশের অধিক পশুপক্ষীর হাট বসে এবং লোকসমাগম অর্থাৎ ক্রয়-বিক্রয়ের মানুষ দিন দিন বাড়ছে বৈ কমেনি ।

এই এলাকার সাধারণ হাটগুলিতে আজও বিক্রি হয় বিভিন্ন ধরণের শাকসবজি, শাক সবজির বীজ, ধান বীজ, গমবীজ, গুঞ্জা-তিল -তিষি-সর্ষে-খসলা -তিল ও অড়হর ডালের বীজ, আমড়ুর বীজ । হাতের নোয়া, বালা নরুণ, বঁটি ,কাটারি ,কুঠার,তাবলা, তরোয়াল ,ছুরি, কাঁচি ,ডাবু খুন্তি ,লোহার চামচ, দশন,টুয়া, দা বা কাস্তে , বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রপাতি ; বাঁশের তৈরি ঝুড়ি ,ঝাঁটা, টুকি, ডালা ; পোড়া মাটির জিনিসপত্র ভাঁড়, হাঁড়ি, হাঁড়া , কলসি, সানকি-সরা , জলের বোতল, প্রদীপ, প্রদীপ দানি ইত্যাদি । বিক্রি হয় খেজুর পাতার তালাই ,তালপাতার চাটাই, কাশি ও খেজুর পাতা দিয়ে তৈরি নানান আসবাবপত্র ও অলংকার; বিক্রি বাটা হয় খাটিয়া, খাটিয়া বোনার জন্য বাবুই ঘাসের দড়ি , পাটের দড়ি, সন দিয়ে তৈরি গরু-বাছুরের পাঘা, এখন অবশ্য নাইলন দড়িও নানা কাজে ব্যবহারের জন্য বিক্রি হচ্ছে । বিক্রি হয় শালপাতা, পলাশ পাতার খালা ও থালা , শাল দাঁতন, নিম দাঁতন , কখনো কখনো পা’না লতা, বন কাল্লা, ঘি কাল্লা , নানা ধরনের ছাতু । এছাড়া মনোহারী রকমারি জিনিসপত্র তো আছেই । থাকে ছেলেদের খেলনা, কুটির শিল্পজ দ্রব্যাদি, তাঁতের তৈরি শাড়ি -জামা-কাপড় -গামছার দোকান । সেইসঙ্গে নানান জড়িভুটি ,কবিরাজি ঔষধও বিক্রি হয় । বিক্রি হয় মাছ ধরার জাল, ছিপ, সুতো-কাঁটা,চুঁই, পোলুই,ঘুগি, শিয়াড়া, ঘুনি,খালই ইত্যাদি ।

হাত দেখার জন্য তথাকথিত হস্ত বিশারদরাও এসে হাজির হন । হাজির হন আয়ুর্বেদিক ঔষধ প্রচারের ও বিক্রয়ের লোকজন । সরকারি ও বেসরকারি লোটারির টিকিট বিক্রেতারাও আসেন। পশরা জমান ছোটখাটো মাপের জাদুকর ।

পল্লীবাংলার নিস্তরঙ্গ জীবনে সবদিক থেকেই হাট প্রাণের জোয়ার বয়ে আনে । ময়রারা সপ্তাহে এলাকার একটি কি দু’টি হাটে চপ ,মুড়ি ,ঘুগনি; গুড়ের , চনার ও বোঁদের লাড্ডু ,রসগোল্লা, মনোহরা, জিলিপি, ভাবরা সহ অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য বিক্রয় করে, ভাতের হোটেল ক’রে সারা সপ্তাহের জীবিকা নির্বাহ করে । কৃষক নিজের উৎপাদিত শাকসবজি সেখানে গিয়ে নিঃসংকোচে বিক্রয় করে, জেলে এবং অন্যান্য জাতির মানুষজন, পুকুরের মালিক মাছ ধরে হাটে নিয়ে গিয়ে মাছ বিক্রি করে । শামুক, গেঁড়ি গুগলি, কচ্ছপ, বালি হাঁস ও বিক্রয় হয় ।

পশুপক্ষীর হাট গুলিতেও এই সমস্ত কিছুই বিক্রি হয় তারই পাশাপাশি গাই-গরু-বাছুর, মেষ, মোষ, ছাগল ,হাঁস ,মুরগি ও অন্যান্য পশুপক্ষী কেনাবেচা চলে । পাঁঠা ছাগল কে খাসি ছাগলের রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলে, গরু-মোষ কে জাত করা হয় অর্থাৎ তাদের পৌরুষত্ব হরণ করা হয় লাঙল ও গাড়ি চালায় উপযুক্ত রূপে করে তোলার জন্য ‌। এইসব কর্ম করেও একশ্রেণীর মানুষ আংশিক জীবিকা নির্বাহ করে । পশুপক্ষীর হাটকে নির্ভর করে পাইকার ও দালালরা জীবন যাপন করে, রুজি রোজগার করে । এক হাট থেকে অন্য হাটে গরু মোষ নিয়ে যাবার পথে তাদের অনেক জুলুমদারি সহ্য করতে হয়, পুলিশ -প্রশাসন, ক্লাব-সভা-সমিতির লোকজন, বিভিন্ন মেলা ও হরিনাম , রাধা নাম পরিচালন দল পথ আগলে দাঁড়িয়ে থাকে তাদের কাছ থেকে তোলা তোলার জন্য । আসলে কখনো কখনো নির্বিচারে নির্যাতন চলে অবলা পশুদের ওপর। এখানকার হাটগুলি থেকে বেআইনিভাবে বিদেশে পাচার হয়ে যায় পশুপক্ষী স্থলপথে ট্রাকে লোড হয়ে, কখনো বা জলপথে । তাই তোলাবাজদের বতর হয় তাদের ভয় দেখিয়ে তোলা তোলার ক্ষেত্রে ।

পুরুলিয়া, দক্ষিণ-বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম তথা পশ্চিম-সীমান্ত-বাংলার হাটগুলি শুধুমাত্র জীবিকাশ্রয়ী নয়, এগুলি আনন্দ -বিনোদনেরও পরম আশ্রয় । পশুপক্ষীর হাট মানেই হাটের দিনে মোরগ লড়াইয়ের উন্মাদনা মেলার রূপ নেয়, বিশেষ বিশেষ ঋতুতে পুতুল নাচের আসর বসে এবং অনেক হাটে ছোট ছোট নাগরদোলাও এসে যায় । ফিরফিরি, ফ্যাটফ্যাটি, রং- ফুল-ফিতি-আলতা-সিন্দুর-কিলিপ -চিরুনি কেনার জন্য ছোটরা ও মহিলারাও এসে হাজির হয় । হাঁড়িয়া ও মহুয়া ফুলের মদ বিক্রি হয় । বিক্রি হয় খেজুর ও তাল রসের তাড়ি । যারা সপ্তাহের অন্য দিনগুলি দিনমজুরের , ক্ষেত মজুরের কাজ করে , রোদে পুড়ে জলে ভিজে অক্লান্ত পরিশ্রম করে পথ নির্মাণ করে, পুকুর কাটে, বীজ বোনে, ধান লাগায়, ধান কাটে, ধান ঝাড়ে তারা সপ্তাহের এই একটা দিন কাজ বন্ধ করে হাট আসে মোরগ লড়াইয়ে অংশ নেয়, ঝুমুর হাঁকায়, মদ-তাড়ি-হাঁড়িয়া পান করে গতানুগতিক একঘেঁয়ে ক্লান্তি দূর করে, পরের দিনের কাজের জন্য উদ্বুদ্ধ হয়, বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসা পরিচিত আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব দের সাথে দেখা করে মন ফুরফুরে করে নেয় । আর সন্ধ্যার দিকে তুলনামূলকভাবে সস্তায় বিভিন্ন পশুপাখির মাংস কিনে নিয়ে মনের আনন্দে বাড়ি ফেরে ।

অসংখ্য সাধারণ সাপ্তাহিক-অর্ধসাপ্তাহিক হাটের মধ্যে মানবাজারের মঙ্গল বারের হাট, ঊর্মার শুক্রবারের হাট, বান্দোয়ানের বুধবারের হাট ,মহুলতলের শুক্রবারের হাট, চেপুয়া, সিন্দরী, পুঞ্চা, ডাঙরডি , খড়িদুয়ারা, দুয়ারসিনি, বারি , রাজনোওয়াগড় , ও কেশরগড় প্রভৃতি গ্রামের হাট খুবই জমকালো । পশু পাখির হাটগুলির মধ্যে কাশীপুরের বৃহস্পতিবারের হাট, পোড়াডির শনিবারের হাট, বল্লামপুরের (বলরামপুরের)মঙ্গল বারের হাট, ঝালদার মঙ্গল বারের হাট, পাথরকাটা বা চল্লার শুক্রবারের হাট, হলুদকানালি বা ঘড়াধরার শনিবারের হাট, সুনুকপাহাড়ির সোমবারের হাট, তালতলের রবিবারের হাট সারাবাংলায় সবিশেষ পরিচিত ।

এই অবাক করা ব্যস্তপূর্ণ, পারস্পরিক বিচ্ছিন্নময় যান্ত্রিক যুগেও সীমান্ত বঙ্গের হাটগুলির গুরুত্ব কমেনি । কিন্তু বিভিন্ন সময় হাট গুলির উপর খবরদারি কে কেন্দ্র করে নানান রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংঘর্ষ দেখা দেয় । তোলা আদায়, ছা’ড় কাটা, মাশুল আদায় কে কেন্দ্র করে কখনো কখনো গালমন্দ এমনকি হাতাহাতি-মারপিটের পর্যায়েও পৌঁছে যায়। ইতিহাসের প্রবাহমানতায় একটি বিশেষ কালে হাটের মাঠ সংকীর্ণ হয়ে গেছে কোথাও কোথাও । হাটের জায়গায় গড়ে উঠেছে পার্টি অফিস, পঞ্চায়েত অফিস, নাট্যমঞ্চ, কমিউনিটি হল, লাইব্রেরী, বিশেষ রাজনৈতিক দলের মদতপুষ্ট ক্লাব ঘর । এটি এক মারাত্মক আর্থ-সামাজিক ক্ষতি । ঐতিহ্যধারার অবক্ষয় ।

এই এলাকায় এখনো বিশেষ বিশেষ মরশুমে নির্দিষ্ট স্থানে হাট বসার বদলে স্থানীয় রাজবাড়ির খোলা মাঠে হাট বসে রাজার সম্মানের ধারাকে অব্যাহত রাখার জন্য । সেক্ষেত্রে কখনো চোঙা ফুঁকে, কখনো ঢোল বাজিয়ে ঢেঁড়া পিটিয়ে জনসাধারণকে জানান দেওয়া হতো এখন অটো বা টোটো তে চেপে মাইকে প্রচার করা হয় বিশেষ দিনের হাটের স্থান পরিবর্তনের খবরটি । যেমন ভাদু পরবের আগের হাট, পৌষ পরবের আগের হাট , মনসা পূজার আগের হাট , কালী পূজার আগের হাট, চৈৎ পরবের আগের হাট এক্ষেত্রে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ।

সমগ্র দেশের মধ্যে লোকসংস্কৃতি ,লোকযানের চর্চা যেমন আজও পশ্চিম -সীমান্ত-বঙ্গেই সর্বাপেক্ষা প্রাণবন্ত, তেমনি গ্রামীণ হাটগুলি এখনও এই এলাকায় সমান তাৎপর্যমণ্ডিত এবং প্রাণবন্ত বরং দিন দিন এইসকল হাটগুলির গুরুত্ব ও গরিমা বেড়েই চলেছে । আজও হাট কে ঘিরে রচিত ও গীত হচ্ছে নানা ধরনের গান —-
“লাগিলরে আমার টুসু পরবের হাট
লাগিল রে ।

কেউ বা লাচে কেউ বা গাহে
শাড়ির কত জাঁক,
মুনা’র মা’ঞও হাট চ’লেছে
আমি ত অবাক।।
ও হাট লাগিল রে ….”

তপন পাত্র : অধ্যাপক ও লোকসংস্কৃতি গবেষক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post