• August 18, 2022

বিষ তো মাথায় উঠেছে, তাগা বাঁধি ক্যামনে

 বিষ তো মাথায় উঠেছে, তাগা বাঁধি ক্যামনে

সুমন কল্যাণ মৌলিক

পয়গম্বর হজরত মহম্মদ প্রসঙ্গে একটি নিউজ চ্যানেলে নূপুর শর্মার কুকথা ও তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই বিশিষ্ট অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহের একটি সাক্ষাৎকার নজরে এল।তাতে এই বর্ষীয়ান অভিনেতা দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে আবেদন জানিয়েছেন এই সর্বব্যপ্ত ঘৃণার বমনকে রোখার জন্য কিছু সদর্থক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য। তার মতে প্রধানমন্ত্রীর এই মুহূর্তেই কিছু করা উচিত নাহলে অবস্থা আরো খারাপের দিকে যাবে।অভিনেতার সংবেদনশীলতা ও ঔচিত্যবোধ নিয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই কিন্তু আমার বিশ্বাস এই আবেদন একেবারেই অপাত্রে দান।কারণ যে আচরিত রাজনীতি ও সংস্কৃতি এই বিদ্বেষ ও ঘৃনার পরিমন্ডলকে সর্বব্যপ্ত করল তার কুশীলবদের কাছে বিষ ঝেড়ে ফেলার আবেদন সব বিচারেই অর্থহীন।আর একথাটাও অস্বীকার করার জায়গা নেই যে সংখ্যাগুরুর আগ্রাসী মৌলবাদের আগ্রাসনে আহত সংখ্যালঘু ভাবাবেগকে ব্যবহার করে তাদের মধ্যে মৌলবাদের বিষ আরো ভালো করে ঢুকিয়ে দিয়ে মেরুকরণের খেলাকে সুনিশ্চিত করার জন্য আরেক পক্ষ।সেই খেলার আরেক পরিণাম আমরা লক্ষ্য করছি পশ্চিমবঙ্গের কিছু জায়গায় গত কয়েকদিন ধরে চলমান নৈরাজ্যে।ভারতের মত দেশে সংখ্যাগুরু হিন্দু মৌলবাদ প্রধান বিপদ হলেও ইসলামিক মৌলবাদকে ছাড় দেওয়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না।ইতিহাস সাক্ষী আসলে এদেশে হিন্দু ও মুসলিম মৌলবাদ একে অপরের পরিপূরকের ভূমিকা পালন করে।
নূপুর শর্মার মন্তব্যের পর খনিজ তেল সমৃদ্ধ মধ্য প্রাচ্যের আরব দেশগুলির ( যাদের সবার রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম) হুমকি ও বিজেপির পক্ষ থেকে চটজলদি নূপুর শর্মা ও নবীন জিন্দালদের সাসপেনশন ও কিছু লোকদেখানো গ্রেপ্তারিকে যারা বিজেপির সাময়িক পিছু হটা ভাবছেন তারা আসলে বাস্তবতা থেকে আলোকবর্ষ দূরে বাস করেন।প্রথম কথা হল এই ইসলামিক দেশগুলোর প্রতিবাদ একাধারে অর্থনৈতিক দরকষাকষি প্রসূত ও নেহাৎই আলঙ্কারিক। যদি তারা সত্যই এদেশের মুসলমানদের প্রতি কণামাত্র সংবেদনশীল হত তাহলে ২০১৪ সাল থেকে ধারাবাহিক ভাবে চলে আসা সংখ্যালঘু পীড়ন প্রশ্নে হিরন্ময় নীরবতা পালন করত না।এই আরবদেশগুলো যাকে সবসময় গুরুঠাকুর মানে সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র দপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত ‘ রিলিজিয়াস ফ্রিডম রিপোর্ট -২০২১’ এ স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ আছে ভারতে ধারাবাহিক ভাবে সংখ্যালঘুদের উপর নিপীড়ন চলছে।এই ইসলামিক দেশগুলো কখনো প্রতিবাদে সরব হয় নি কারণ তাদের নিজেদের দেশগুলিতেও রাজধর্ম পালনের প্রশ্নে তারা ভীষণ রকমের অগণতান্ত্রিক ও সংখ্যালঘু পীড়ক।
নূপুর শর্মা প্রশ্নে বিজেপি কাদায় পড়েছে বা সব ধর্মকে দল সন্মান করে বলে বিজেপির বিবৃতি দেখে যারা আশাবাদী হচ্ছেন তাদের বলি অনুগ্রহ করে বিজেপি কে একটি স্বাধীন সত্তা বিশিষ্ট রাজনৈতিক দল ভাবার ভুল করবেন না।রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ নিয়ন্ত্রিত হাইড্রাসদৃশ কাঠামোর এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল বিজেপি।বিশ্ব হিন্দু পরিষদ,বনবাসী চেতনা সমিতি,দুর্গা বাহিনী,অখিল ভারত বিদ্যার্থী পরিষদ সহ এই বৃহত্তর সংঘ পরিবারের প্রত্যেকেরই দায়িত্ব, কর্তব্য ও শ্রম বিভাজন নির্দিষ্ট। রাজনীতির দাবা খেলায় বৃহত্তর লাভের লক্ষ্যে দু একটা ‘ বোড়ে’ বিসর্জন দেওয়া নতুন ঘটনা নয়।শুধু সংঘপরিবারের ইতিহাস স্মরণ করি তাহলে অনেকের মনে পড়তে পারে একদা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের আগুন ওগড়ানো নেতা প্রবীণ তোগাড়িয়ার পরিণতির কথা।তিনি বছর তিনেক আগে পুলিশে এই বলে এফ আই আর করেন যে বিজেপি সরকার তাকে এনকাউন্টার কিলিং করার পরিকল্পনা করছে।এই পয়গম্বর বিতর্কেও যাতে শেষবিচারে বিজেপি লাভবান হয় সেইভাবেই চিত্র নাট্যটা প্রস্তুত করা হচ্ছে। একদিকে বিশ্বের কাছে সাসপেনশনের বার্তা,অন্যদিকে চলমান বিশৃঙ্খলাকে ব্যবহার করে আরো বেশি হিন্দু মেরুকরণ সম্পূর্ন করা।
সত্যি কথা বলতে হলে নূপুর শর্মার কুকথার থেকে অনেক বেশি অপমান,দৈহিক ও মানসিক নির্যাতন প্রতিদিন ভারতের মুসলমানদের সহ্য করতে হচ্ছে। আমরা যদি একটু খানি স্মৃতির পাতা ওল্টাই তাহলে দেখতে পাব সংসদকে গণতন্ত্রের মন্দির আখ্যা দিয়ে ২০১৪ সালে নব নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শপথ নিচ্ছেন আর বিজেপির অন্যতম প্রধান নেতা রাজনাথ সিং হাস্যমুখে ঘোষণা করছেন যে ভারতে পৃথ্বীরাজ চৌহানের পর আবার প্রকৃত হিন্দু শাসন শুরু হল।এদেশে সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় প্রতিদিন মুসলমানদের ‘ অপর’ প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাদের শিক্ষা,সংস্কৃতি, খাওয়াদাওয়া,জীবন দর্শনের প্রতি প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেওয়া হচ্ছে। কোভিড কালে সারা দেশ যখন চিকিৎসার অভাবে মৃতপ্রায় তখন তবলিগি জামাতের নামে মুসলমানদের সম্ভাব্য করোনা ছড়িয়ে দেবার ষড়যন্ত্রকারী হিসাবে দেগে দেওয়া হচ্ছে। ইউ পি এস সি পরীক্ষায় মুসলিম যুবাদের সাফল্যকে এক গভীর চক্রান্ত হিসাবে প্রতিপন্ন করার জন্য পেটোয়া চ্যানেল সুদর্শন টিভিতে প্রচার করা হয়েছে ‘ ইউ পি এস সি জেহাদ’।
তবে এই ধারাবাহিক নির্যাতনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক উদাহরণ অবশ্যই হরিদ্বার ধর্মসংসদের হাড় হিম করা ‘ সুবচনী’ ( নাসিরুদ্দিন শাহ সঠিকভাবেই প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেছেন)।যতি নরসিংহানন্দ, স্বামী প্রবোধানন্দ গিরি,সাধ্বী অন্নপূর্ণা প্রমুখ হিন্দু ধর্মের স্বঘোষিত অভিভাবকেরা তাদের কল্পিত হিন্দুরাষ্ট্রের বাস্তবায়নে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়কে নিকেশ করার ফতোয়া দিয়েছেন। সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্থান গুঁড়িয়ে দিয়ে,তাদের খাদ্যাভাসে হস্তক্ষেপ করে,মুসলমান শাসকদের স্মৃতি বিজড়িত জায়গার নাম বদলে দিয়ে,প্রকাশ্যে ধর্মাচারণের বিরোধিতা করে এবং মুসলিম মহিলাদের নীলাম করার অ্যাপ বানিয়েও বিষয়টা হিন্দুত্বের কারবারিদের ঠিক মনঃপূত হচ্ছিল না তাই একেবারে গণহত্যার হুমকি,ফাইনাল সলিউশনের ব্যবস্থাপত্র।আর এই বিদ্বেষের গল্প আজ সরকার,মিডিয়া,প্রশাসন,এজেন্সি এমনকি বিচার ব্যবস্থারও চালিকাশক্তি।হাবভাব দেখে মনে হয় ‘ ধর্মনিরপেক্ষ ‘ ভারত এটা মেনেই নিয়েছে মুসলমানরা এদেশের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক এবং পৃথিবীর ‘ বৃহত্তম প্রজাতন্ত্রে ‘ তাদের উপস্থিতি অভিপ্রেত নয়।এই ঘৃণার বিপণন আজ ভারত আত্মার সারা শরীরে ছড়িয়ে গেছে।
তাই সত্যিই যদি বিষ নামাতে হয় তাহলে প্রচলিত রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির বিকল্পের সন্ধান করতেই হবে।কারণ সংসদীয় রাজনীতিতে যারাই নিজেদের মোদি- শাহদের বিকল্প বলে দাবি করেন তাদের রাজনৈতিক অনুশীলনও এক অর্থে নরম হিন্দুত্ব ও মুসলিমদের দৈহিক নিরাপত্তার আশ্বাস ব্যতীত কিছু নয়। আর তার ফলে মূলধারার সঙ্গে সর্বাত্মক বিযুক্তি আর্থ- সামাজিক – রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ধারাবাহিক ভাবে পিছিয়ে পড়া সংখ্যালঘুদের ঠেলে দেয় আরেক মৌলবাদের গহ্বরে। আজ সেই বিকল্পের সন্ধান করা শুধু সংখ্যালঘুদের দায় নয়,এ দায় সমস্ত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষদের।কারণ হিন্দু রাষ্ট্র শুধু সংখ্যালঘুদের নিকেশ করে না,সে স্থাপন করতে চায়আদ্যন্ত পিতৃতান্ত্রিক, ব্রাহ্মন্যবাদী,স্বৈরতন্ত্রী রাষ্ট্র যেখানে মুক্তচিন্তা প্রবেশ নৈব নৈব চ।

সুমন কল্যাণ মৌলিক : বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক এবং মানবাধিকার কর্মী।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post