• September 27, 2022

মাঙ্কিপক্স – এক নতুন অশনি সংকেত?

 মাঙ্কিপক্স – এক নতুন অশনি সংকেত?

ডঃ জয়ন্ত ভট্টাচার্য
২৩শে জুলাই, ২০২২, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ঘোষণা করল মাঙ্কিপক্স একটি পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি। WHO-র টেকনিক্যাল ভাষায় বললে Public Health Emergency of International Concern (PHEIC)। WHO-র তরফে এটা সপ্তম রোগ সংক্রান্ত ইমার্জেন্সির ঘোষণা। এর আগে ২০২০-র গোড়ায় কোভিড-১৯ সংক্রমণের সময় এরকম ইমার্জেন্সির কথা স্মরণ করতে পারব। কিন্তু এবারের ঘোষণাটি চরিত্রের দিক থেকে ভিন্ন ছিল। WHO-র ইমার্জেন্সি কমিটির ১৫ জন সদস্যের মধ্যে ৬ জন এ ঘোষণাকে সমর্থন করেছিল, ৯ জন এর বিরোধিতা করে। তা সত্ত্বেও হু-র মহাসচিব ডঃ টেড্রোস তাঁর ক্ষমতা প্রয়োগ করে মাঙ্কিপক্সকে পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি হিসেবে বিশ্ববাসীর সামনে ঘোষণা করলেন। ডঃ টেড্রোস তাঁর ঘোষণার পক্ষে তিনটি কারণ বলেছিলেন – “এমন একটি সংক্রমণ যা সমগ্র বিশ্বে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, নতুন পথে সংক্রমণ ঘটছে যা আমরা খুব কমই বুঝে উঠতে পারছি, এবং সংক্রমণটি ইন্টারন্যাশলান হেলথ রেগুলেশনের সে সমস্ত মানদণ্ড আছে তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।” (ল্যান্সেট, “Monkeypox: a global wake-up call”, জুলাই ৩০, ২০২২, পৃঃ ৩৩৭)
২২ জুলাই, ২০২২ পর্যন্ত মাঙ্কিপক্সে মোট ৭৫টি দেশে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১৬,০১৬। এখন প্রশ্ন উঠবে মাঙ্কিপক্স কি? কেন হয়? কেমন এর উপসর্গ? চিকিৎসাই বা কি? প্রসঙ্গত বলে রাখি, এই ভাইরাসটি একটি মোড়কে মোড়া (এনভেলপড) ডিএনএ ভাইরাস (জীববিজ্ঞানের পরিভাষায় Orthopoxvirus genus of the Poxviridae family)। এ ভাইরাসের দুটি স্পষ্ট জিনগত ধারা (clade) রয়েছে – (১) মধ্য আফ্রিকার কঙ্গো বেসিন অঞ্চলের clade, এবং (২) পশ্চিম আফ্রিকার clade। একমাত্র ক্যামেরুনে এই দুটি clade-কেই একসাথে দেখা যায়। ১৯৭০ সালে প্রথম মাঙ্কিপক্সের সংক্রমণ কঙ্গোতে একটি ৯ মাসের শিশুর মাঝে দেখা গিয়েছিল। এতদিন পর্যন্ত এরা আফ্রিকার বিশেষ কয়েকটি অঞ্চলে মৃদুহারে সংক্রমণ ঘটাতো (endemic)। কিন্তু সেখান থেকে অতিমারি চরিত্র (pandemic) অর্জন করার জন্য ৭৫টি বা তার দেশে ছড়িয়ে পড়ার কৃৎ-কৌশল কি? পুরো চিত্র পৃথিবীর বিজ্ঞানী মহলে এখনো অজানা। তথ্য হিসেবে বলা যায়, ২০০৩ সালে আমেরিকায় এই ভাইরাস প্রায় ১০০ জনকে সংক্রামিত করে। পরে বোঝা যায় এক পোষা কুকুরের থেকে সংক্রমণ ছড়িয়েছিল। ২০১৮ সালে ইজরায়েলে নাইজেরিয়া থেকে আগত পর্যটকের মাধ্যমে এ সংক্রমণ ছড়ায়। ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল অব্দি বিভিন্ন সময়ে দেখা যায় ইংল্যান্ডে, ২০১৯ সালের মে মাসে সিঙ্গাপুরে এর হদিশ মেলে।
মাঙ্কিপক্স একটি ভাইরাল জুনোটিক সংক্রমণ – অর্থাৎ, প্রাণীদেহ থেকে মানুষের দেহে ছড়ায়, আবার মানুষ থেকে মানুষেও ছড়াতে পারে। প্রাণী দেহ থেকে মানুষে ছড়ায় এর অর্থ হচ্ছে যে প্রাণীদের স্বাভাবিক আবাস বনাঞ্চলের পরিবেশ কর্পোরেট পুঁজির উদগ্র লালসা থেকে শুরু করে বিভিন্ন কারণে বিঘ্নিত হচ্ছে। আফ্রিকাতে কাঠবেড়ালি থেকে ইঁদুর বিভিন্ন সংক্রামিত প্রাণী থেকে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা দেখা গেছে।
কোভিড-১৯ সংক্রমণের পরে বিজ্ঞান এবং জনস্বাস্থ্যের জগতে এটা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে বিভিন্ন ভাইরাসের সংক্রমণ প্রধানত বায়ু-বাহিত। মাঙ্কিপক্সের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। মানুষের থেকে মানুষে সংক্রমণ ছড়ানোর প্রধান রাস্তা হল যদি সুস্থ ব্যক্তি সংক্রামিত ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসে, বিশেষ করে শ্বাসনালীর বিভিন্ন নিঃসরণের। সামনে বসে মাস্কবিহীন অবস্থায় বেশ খানিকক্ষণ কথা বললেও সংক্রমণ ঘটবে। এছাড়াও সংক্রামিত ব্যক্তির বর্জ্য দ্রব্য যদি গ্লাভস না পড়ে কিংবা কোন সুরক্ষা ছাড়া ধরা হয়, পরিষ্কার করা হয়। এছাড়া দুজন বা একাধিক মানুষের মধ্যে যৌন সংসর্গ থেকেও এ সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
‘হু’ জানাচ্ছে – “the longest documented chain of transmission in a community has risen in recent years from 6 to 9 successive person-to-person infections.” এর সম্ভাব্য কারণ হল দুটি – (১) গোষ্ঠী-ইমিউনিটি কমে যাওয়া, এবং (২) ১৯৮০ সালের পর থেকে স্মল পক্সের টিকাকরণ বন্ধ হয়ে যাওয়া। গবেষণা দেখাচ্ছে, স্মল পক্সের প্রতিরোধী টিকা মাঙ্কিপক্সের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ ক্ষমতা দেয়।
মাঙ্কিপক্সের উপসর্গ মৃদু থেকে যথেষ্ট ভারী ধরণের হতে পারে। সাধারণ জ্বর, অল্প শরীর ব্যথা বা সামান্য দুর্বলতা এগুলো মৃদু উপসর্গ। ২ ধরণের জিনগত clade-এর ওপরে নির্ভর করে ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশ করার পরে ৫ থেকে ২১ দিন পর্যন্ত উপসর্গহীন অবস্থায় একজন রোগী থাকতে পারে। ৫ থেকে ২১ দিন সময়কে বলা হয় ইনকিউবেশন পিরিয়ড।
ভারী উপসর্গের ক্ষেত্রে জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, শরীরে অস্বাভাবিক দুর্বলতা, বিভিন্ন গ্ল্যান্ড ফুলে যাওয়া, শরীরে ব্লিস্টার তৈরি হওয়া ইত্যাদি হতে পারে। এগুলোর মধ্যে বিভিন্ন গ্ল্যান্ড ফুলে যাওয়া মাঙ্কিপক্সের বিশেষ লক্ষণ, বা অনেক ক্ষেত্রে শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য।

(ত্বকে মাঙ্কিপক্সের প্রকাশ। ডানদিকে, চোখে মাঙ্কিপক্সের চেহারা)
শরীরের গোটা ১ থেকে ৩দিন থাকতে পারে। হাতে পায়ে এবং মল বা মূত্রদ্বারের চারপাশ দিয়ে এই ব্লিস্টার বা গোটা দেখা যায়। শরীরের ওপরে সচরাচর কম দেখা যায়। ৯৫% ক্ষেত্রে মুখে দেখা যায়। চোখে ২০% ক্ষেত্রে, যৌনাঙ্গের চারপাশে ৩০% ক্ষেত্রে, মুখের ভেতরে ৭০% ক্ষেত্রে এবং হাতে বা পায়ের তালুতে ৭৫% ক্ষেত্রে দেখা যায়।
আমরা এবার জুনোসিস তথা প্রাণী থেকে মানুষে কেন এত ঘন ঘন ভাইরাস সংক্রমণ ঘটছে তার কারণ বোঝার চেষ্টা করি।
আইএমএফ এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের চাপে ১৯৯০-এর দশক থেকে শুরু হয় “স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম”। এর ফলে হাই-টেক যন্ত্রপাতি কেনা শুরু হয়৷ প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা একেবারে ভেঙ্গে যায়। যখন এবোলা শুরু হয়েছিল তখন স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে সামান্য গ্লাভস বা মাস্কও ছিল না।
কেনেথ শেরিল এবং ক্যারোলাইন সমারভিল তাঁদের “AIDS, Ebola, and Politics” প্রবন্ধে (আমেরিকান পলিটিক্যাল সায়ান্স-এর মুখপত্র পলিটিক্যাল সায়ান্স-এর ২০১৫ সালের জানুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত) বলেছিলেন যে সিয়েরা লিওন এবং লাইবেরিয়াতে গৃহযুদ্ধের ফলে এবোলা মারাত্মক চেহারা নেয় এবং এই গৃহযুদ্ধের প্রধান কারণ ছিল – “দুর্নীতি এবং কর্তৃত্ববাদী শাসন এবং তদুপরি ঠাণ্ডা যুদ্ধের পরিসমাপ্তিতে পশ্চিমী বিদেশী সাহায্য হারানো” এবং “আইএমএফ-এর তরফে স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট পলিসিসমূহকে চাপিয়ে দেওয়া।”
এর ফলশ্রুতিতে কয়েক হাজার মানুষ এবোলায় অসহায়ভাবে মারা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে তেলের দখল নেবার জন্য আমেরিকা যুদ্ধের জন্য ব্যয় করেছে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ম্যালেরিয়া নির্মূল প্রোগ্রামের জন্য বরাদ্দ ১০০ মিলিয়ন ডলার। আর এখন তো আমেরিকা চিনের সাথে “সখ্যের” অজুহাতে খোদ WHO ছেড়েই বেরিয়ে গেছে। যদিও সাম্প্রতিককালে আবার যোগ দিয়েছে।
১২ ডিসেম্বর, ১৯৯১, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ লরেন্স সামার্স একটি গোপন নোট তৈরি করে সহকর্মীদের মধ্যে বিলি করেন, মতামত চান। ১৯৯২-এর ফেব্রুয়ারি মাসে বিখ্যাত পত্রিকা The Economist নোটটি প্রকাশ করে দেয় “Let Them Eat Pollution (ওদেরকে দূষণ খেতে দাও)” শিরোনামে। নোটটির মোদ্দা কথা ছিল, ধনী বিশ্বের সমস্ত প্রাণঘাতী, দূষিত আবর্জনা আফ্রিকা বা কম উন্নত দেশগুলো তথা LDC (Less Developed Countries)-তে পাচার করতে হবে। এজন্য একটি স্বাস্থ্যের যুক্তিও দিয়েছিলেন সামার্স। তাঁর বক্তব্য ছিল আমেরিকার মতো দেশে ১,০০,০০০ জনে ১ জনেরও যদি দূষিত বর্জ্যের জন্য প্রোস্টেট ক্যান্সার হয় তাহলেও এর গুরুত্ব আফ্রিকার মতো দেশগুলোতে যেখানে ৫ বছরের নীচে শিশুমৃত্যুর হার ১০০০ শিশুতে ৫ জন তার চাইতে বেশি। এবং সেখানেই প্রথম বিশ্বের দেশের এই দূষণ পাচার করতে হবে, পাচার করতে হবে এই বিষাক্ত বর্জ্য। এরকম “চমৎকার ও অভিনব” ধারণার পুরস্কার হিসেবে ক্লিন্টন প্রশাসনে ৭ বছর U.S. Treasury Secretary পদে ছিলেন। সে মেয়াদ শেষ হলে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। এসব পুরস্কারের কথা থাক। সামার্স এখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বাইডেনের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা।
এই ভাইরাসের উৎস যে কর্পোরেট পুঁজির মুনাফা এবং প্রকৃতির উপরে প্রভুত্বের উদগ্র লালসা যেখানে মানুষ থেকে জীবজগৎ, বনাঞ্চল থেকে প্রতিটি প্রাকৃতিক সম্ভার কেবলমাত্র পণ্য হিসেবে গণ্য হয় – এ সত্যকে আড়াল করার হাতিয়ারও বর্তমান সময়ের বিভিন্ন ভাইরাস-ঘটিত সংক্রমণ। ২০০২-৩ এ সার্স-কোভ-১-এর অতিমারির পরে ২০০৯ সালে Predict Project বলে একটি প্রোজেক্ট তৈরি করা হয় প্রাণী জগৎ থেকে কি পরিমাণ নতুন ভাইরাস মানুষের দেহে এবং বসবাসের অঞ্চলে প্রবেশ করছে সেটা দেখার জন্য। মানুষ-প্রকৃতি-জীব জগৎ এই স্বাভাবিক ভারসাম্য অপূরণীয়ভাবে ভেঙ্গে যাবার ফলাফল হচ্ছে এই ভাইরাসদের মনুষ্য জগতে প্রবেশ। কিন্তু লস এঞ্জেলস টাইমস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী (২.০৪.২০২০) এই প্রোজেক্ট ট্রাম্প প্রশাসন বন্ধ করে দেয় – Trump administration ended pandemic early-warning programs to detect coronaviruses। য়ুহানে করোনার ভয়াবহতা শুরু হবার মুখে “the Trump administration ended a $200-million pandemic early-warning program aimed at training scientists in China and other countries to detect and respond to such a threat.” বন্ধ করে দেবার আগে USAID-এর সাহায্য পুষ্ট এই প্রোগ্রাম ১,২০০ বিভিন্ন ভাইরাসকে চিহ্নিত করে যার মধ্যে ১৬০টি নোভেল করোনাভাইরাস ছিল। য়ুহান সহ পৃথিবীর ৬০টি ল্যাবরেটরিতে বিজ্ঞানী এবং টেকনিশিয়ানদের ট্রেইনিং দেওয়াও শুরু করেছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন “শিব ঠাকুরের আপন দেশে / আইন কানুন সর্বনেশে”-র মতো কলমের এক আঁচড়ে এরকম একটি মূল্যবান প্রোজেক্ট বন্ধ করে দিল। বিজ্ঞানের ক্ষতি হল, ক্ষতি হল মানুষের।
২০১৪ সালে কয়েকজন গবেষক EcoHealth জার্নালে (২৩.০৫.২০১৪) এক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন “Anthropogenic Land Use Change and Infectious Diseases: A Review of the Evidence” শিরোনামে। এখানে দেখানো হয়েছে – “Land use change has the potential to impact disease dynamics directly and indirectly by changing the abundance, demography, behavior, movement, immune response, and contact between host species and vectors, as well as altering host community composition.”
জমির ব্যবহারে পরিবর্তন (ল্যান্ড ইউজ চেঞ্জ) কারা করলো? কি উদ্দেশ্যে? যে উদ্দেশ্যে (খনিজ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্পদের জন্য) ব্রাজিলের রেন ফরেস্টের ২৫% পুড়িয়ে দেওয়া হয় সে উদ্দেশ্যে। প্রকৃতির উপরে প্রভুত্ব এবং পুঁজির প্রয়োজনে যথেচ্ছ ব্যবহারের বিষময় ফল আমরা ভোগ করছি। নিউ ইংল্যান্ড জার্নালে প্রকাশিত (২.০৪.২০২০) “Escaping Pandora’s Box — Another Novel Coronavirus” প্রবন্ধে স্পষ্ট করে জানানো হচ্ছে – We have reached this point because of continuing increases in the human population, crowding, human movement, environmental alteration, and ecosystemic complexity related to human activities and creations.
নিওলিবারাল অর্থনীতি, অতিবৃহৎ বহুজাতিক সংস্থা, নিওলিবারাল অর্থনীতির বাহক ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন এবং পৃথিবীর বড়ো রাষ্ট্রগুলোর চাপে ‘হু’ নিজের অবস্থান বদলাতে বাধ্য হচ্ছে। “সকলের জন্য স্বাস্থ্য”, “স্বাস্থ্য আমার অধিকার” এবং “সংহত প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা”-র ধারণা ১৯৭৮ থেকেই নিঃসাড়ে বদলাতে শুরু করে। প্রথমে আসে “সিলেক্টিভ প্রাইমারি হেলথ কেয়ার (বেছে নেওয়া প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা)”, তারপরে এলো GOBI (growth monitoring, promotion of oral rehydration, promotion of breast feeding, immunization) এবং পরবর্তীতে খুব খোলাখুলি ভার্টিকাল বা রোগ-কেন্দ্রিক প্রোগ্রাম। কমিউনিটির অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি জীবন্ত ও সক্রিয় প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রোগ্রাম পরিত্যক্ত হল। এর বিষময় ফল আমরা এই অতিমারির সময়ে প্রত্যক্ষ করছি।
যদি একটি উজ্জীবিত, প্রাণবন্ত প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আমরা গত প্রায় ৫০ বছর ধরে তিলেতিলে মেরে না ফেলে, একটি কাঠামো-সর্বস্ব ব্যবস্থা হিসেবে না রেখে যেমনটা ১৯৭৮-এর আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ঘোষণা করা হয়েছিল যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাই হবে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রাথমিক ভিত্তি তাহলে একেবারে প্রাথমিক স্তরে আমরা করোনা আক্রমণের সময়ে “টেস্টিং, কনট্যাক্ট ট্রেসিং এবং আইসোলেশন”-এর কথা ভাবতে পারতাম। রোগী এবং সরকার উভয়েরই বিপুল খরচ বাঁচার সম্ভাবনা ছিল। আলমা-আটা সনদের ১০ নম্বর ধারায় যা বলা হয়েছিল তার মূল কথা ছিলো – পৃথিবীর দূরতম প্রান্তের স্বাস্থ্যের সুযোগহীন মানুষটির জন্যও প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা সুরক্ষিত করতে হবে এবং এজন্য স্বাধীনতা, শান্তি, দ্বিপাক্ষিক আলাপ-আলোচনা এবং নিরস্ত্রীকরণের নীতি গ্রহণ করতে হবে যার মধ্য দিয়ে একটি দেশের সুষম বিকাশের জন্য আরো বেশি মানবসম্পদ সৃষ্টি হতে পারে।
শেষ কথা
(১) মাঙ্কিপক্স নিয়ে আতঙ্কিত হবার কিছু নেই। এ রোগটি নিজের থেকেই ২ থেকে ৪ সপ্তাহের মধ্যে প্রাকৃতিক নিয়মে থেমে যায়।
(২) যেহেতু ভাইরাস কিভাবে ছড়াচ্ছে এ সত্য আমরা খানিকটা বুঝতে পেরেছি, সেজন্য কোভিডের জন্য যে যে সতর্কতা নেওয়া হয়েছিল সেগুলো নিতে হবে জনস্বাস্থ্যকে সুরক্ষিত রাখার জন্য – মাস্ক পরা, দূরত্ব রক্ষা করা, রোগীর পরিচর্যা করার সময় গ্লাভস, মাস্ক এবং, সম্ভব হলে, অ্যাপ্রন ব্যবহার করা।
(৩) আন্তর্জাতিকভাবে আবার স্মলপক্সের টিকাকরণ চালু করা।
(৪) সন্দেহ হওয়া মাত্র চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং PCR টেস্টের মতো টেস্ট করা। নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিন-এর মতো মান্য জার্নালে একটি প্রবন্ধে (“Tecovirimat and the Treatment of Monkeypox — Past, Present, and Future Considerations”, ৩ আগস্ট, ২০২২) বলা হয়েছে – “The CDC, the FDA, and the NIH will continue to work together to provide access to tecovirimat for compassionate use while appropriately evaluating its safety and efficacy in RCTs.” এ চিকিৎসা মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ ঠেকানোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
(৫)আতঙ্কিত না হওয়া, আতঙ্ক না ছড়ানো।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post