• February 2, 2023

কৃষি ও কিছু কথা

 কৃষি ও কিছু কথা

সৈকত সরকার,সায়ন মণ্ডল

শত কৃষক ও কৃষিশ্রমিক ইউনিয়নের যৌথ সংগঠন সংযুক্ত কিষান মোর্চা টানা এক বছর ধরে আন্দোলন করার পর কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ‘তিনটি খামার বিল’ প্রত্যাহার করার জন্য নভেম্বর ২০২১ সালে ‘খামার আইন বাতিল বিল’ পাস করে । এর ফলে , কৃষক আন্দোলনের নেতাদের অন্যতম প্রধান দাবি মেনে নিল সরকার । তাদের অপর দাবি ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নিয়ে । কিন্তু কৃষকসমাজের সমস্যার জট আরও অনেক গভীর — সম্পূর্ণ পরিস্থিতি পরিক রচনা করলে মূল সমস্যার সমাধানের পথে এগোনো সহজ হবে ।

করোনা পরিস্থিতিতে , ২০২১ সালের আদমশুমারি পরিসংখ্যান ২০২৩ সালের আগে প্রকাশিত হবে না । ২০১১ সালের আমুদশুমারি অনুসারে , ভারতের জনসংখ্যার মোট ১২১.০৮ কোটির মধ্যে গ্রামীণ ভারতে প্রায় ৮৩.৩৭ কোটি মানুষ বাস করে , অর্থাৎ 68.9 শতাংশ ভারতবাসী গ্রামীণ সমাজের মানুষ ।
এখনো ভারতীয় জনসংখ্যার অধিকাংশের জীবিকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উৎস কৃষি- প্রাণীসম্পদ – মৎস্য – বনজসম্পদ । স্বাধীনতার পরে ১৯৫০ – ৫১ সালে এই খাতে মোট জিডিপির প্রায় ৫২% বরাদ্দ ছিল । ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক দ্বারা প্রকাশিত ‘ হ্যান্ডবুক অব স্ট্যাটিস্টিক্স অন দি ইন্ডিয়ান ইকোনমিক ২০২০-২১ ’ অনুসারে , ২০১৮-১৯ সালে মোট জিডিপি ছিল ১২৭,৪৪,২০৩ কোটি টাকা আর কৃষি ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে জিডিপি ছিল ১৮,৮৭,১৪৫ কোটি , অর্থাৎ কৃষি ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অবদান ১৪.৮% ।
ভারতে ২০১৮-১৯ সালে আনুমানিক মোট ১৩৩ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে, ৫৪.৪% অর্থাৎ ৭২.৩ কোটি মানুষের জীবিকা কৃষি এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের ওপর নির্ভরশীল ; এবং এর মধ্যে অন্তর্গত ৬০ কোটি মানুষ গ্রামীণ ভারতের বাসিন্দা।

স্বাধীনতা উত্তর ভারতের কৃষি – প্রাণিজসম্পদ – মৎস্য – বনজসম্পদ ক্ষেত্রে ৭৫ বছরে উৎপাদনশীলতার ধারাবাহিক বিকাশ হয়েছে এ নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই । ভারত সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত ‘এগ্রিকালচার স্ট্যাটিস্টিক্স অ্যাট এ গ্লানস ২০২০’ থেকে স্পষ্ট যে সব রকমের কৃষি উৎপাদনে বৃদ্ধি পেয়েছে , কিন্তু এই তথ্য থেকে পরিষ্কার করে বোঝা যায় না যে , এরই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে গ্রামীণ ভারতের আর্থসামাজিক এবং পরিবেশ সংক্রান্ত সমস্যা ।
স্বাধীনতার পর দুই দশকের বেশি সময় ধরে , কৃষি ক্ষেত্রে বেশ কিছু কাঠামোংগত সংস্কার করার চেষ্টা করা হয়েছিল । এই ব্যাপারে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ আইনটি ছিল জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি , যা কৃষক ও রাষ্ট্রের মধ্যে অবস্থানকারী তর্কে ছড়িয়ে দিয়ে প্রায় ২ কোটি কৃষককে কৃষি জমির ‘মালিক’ হিসেবে নথিভুক্ত করেছে । ১৯৫০ এর দশকের গোড়ার দিকে ভাড়া নিয়ন্ত্রণের জন্য আইন প্রণয়ন করে মোট উৎপাদনের ২০% থেকে ২৫% ভাড়া হিসেবে স্থির করা হয়েছিল । বাস্তবে ভারতের বেশিরভাগ রাজ্যে এই আইন গুলি খুব কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। তৃতীয় পদক্ষেপ ছিল জমির সিলিং আইন প্রথম পর্যায়ে ১৯৬১-৬২ সালের মধ্যেই সমস্ত রাজ্যে বিল পাস হয় , কিন্তু নানা রাজ্যে নানা রকম সিলিং সীমা থাকায় দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৯৭২ সালে সারা দেশজুড়ে অভিন্নতা আনতে জাতীয় নির্দেশিকা জারি করা হয়েছিল । এই পর্যায়েও বেশ কিছু বড় এস্টেট ভেঙে ফেলা হয়েছিল , কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এস্টেট মালিকরা আত্মীয়দের ‘বেনামী হস্তান্তর’ করনের মাধ্যমে জমির সঠিক হস্তান্তর রোধ করেছিলেন । ফলে আগের মতই কৃষি ক্ষেত্রেও কাঠামোগত সংস্কার অসম্পূর্ণ থেকে যায় ।
ড. আম্বেদকর একবার মন্তব্য করেছিলেন যে , স্বল্প মেয়াদি উন্নয়নের কথা না ভেবে শীতল মস্তিষ্ক দিয়ে বিচার বুদ্ধি করা অবশ্যক । ১৯৯১-৯২ সালের পর থেকে নয়া উদারবাদী ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির আমলে কৃষি ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র নিয়ে ভারত সরকারের মূল বক্তব্য ছিল যে অর্থনৈতিক উদারীকরণ কৃষি পণ্যের জন্য অনুকূল বাণিজ্যের সুযোগ দেবে এবং সেই লভ্যাংশ কৃষকরা জমিতে দীর্ঘমেয়াদী উন্নতি করতে বিনিয়োগ করবে । বাস্তবে পরবর্তী তিন দশকে কৃষি বাণিজ্যের কিছু উন্নতি হলেও তা আশানুরূপ হয়নি । ২০০০ দশকের গোড়ার দিকে , ভারত সরকার রাজ্য গুলোকে কৃষি ক্ষেত্রে সংস্কারের জন্য উৎসাহিত করেছিল , তবে রাজ্য গুলি এমন নীতি গ্রহণ করেছিল যা কৃষি ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী পুনর জীবনের জন্য অনুকূল ছিল না। ২০০০ সালে প্রণীত জাতীয় কৃষি নীতি (ন্যাশানাল এগ্রিকালচারাল পলিসি) কৃষি ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বার্ষিক চার পার্সেন্ট এর বেশি বৃদ্ধির হার স্থির করে । দশম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০০২-২০০৭) দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভূমি ও জল সম্পদের ওপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কৌশলগুলিকে আলাদা করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলেছিল , কৃষি জমিতে ‘ ক্রপিং ইনটেনসিটি ’ বৃদ্ধি , গ্রামীণ পরিকাঠামোর উন্নয়ন , কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং জনসাধারণের মধ্যে খাদ্যবন্টন ইত্যাদিকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল । একাদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতে (২০০৭-২০১২) কৃষি ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বার্ষিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করার জন্য বেশ কয়েকটি বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়ার প্রচেষ্টা হয়েছিল — অত্যাধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি , বেশি ভর্তুকি , উৎপাদনে বৈচিত্র্য , সহজ ঋণ ইত্যাদি । যে কারণেই হোক , অর্থনৈতিক উদারীকরণের পরে প্রায় ৫% ধনী কৃষিখামার মালিক ছাড়া কৃষি ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বিনিয়োগ খুব একটা বৃদ্ধি পায়নি । দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতে (২০১২-২০১৭) কৃষি ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র শেষ বারের মতো গুপ্ত সহকারে বিবেচিত হয় । বস্তুতপক্ষে বারংবার কৌশল বদলানো এবং আংশিক বাস্তবায়নের ফলে বেশ কিছু সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ভারতে , যার কয়েকটি হল :
(১) ১৯৫১ সালে ভারতে মাথাপিছু খাদ্য ছিল মোট দানাশস্য ৩৩৪.২ গ্রাম এবং মোট ডাল ৬০.৭ গ্রাম , যা পরবর্তীকালে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৯ সালে দাঁড়ায় মোট দানাশস্য ৪৪৭.৪ গ্রাম এবং মোট ডাল ৪৭.৩ গ্রাম । এটা কষ্ট যে বিগত ৭ দশক ধরে খাদ্যশস্য উৎপাদন সুষম হয়ে ওঠার বদলে ভারসাম্যহীন হয়ে উঠেছে যা নিম্ন আয়ের গ্রামীণ এবং শহুরে জনগণকে কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ করতে বাধ্য করে । ভারতে গরীব মানুষের মধ্যে অপুষ্টির জন্য এই ব্যাপারটি বহুলাংশে দায়ী ;
(২) অত্যাধিক পরিমাণে কীটনাশক ব্যবহার করার ফলে কৃষি জমি এবং জলের প্রবাহগুলি দূষিত হয়ে উঠেছে । অপ্রশিক্ষিত শ্রমিকদের দ্বারা কীটনাশক স্প্রে করার ফলে জমিতে বিষাক্ত পদার্থ পড়ে এবং জলের সঙ্গে মাটির ভিতরে চুনিয়ে ঢোকে । মানুষের স্বাস্থ্যের উপর ফসফামিডন , ট্রায়াজোফস এবং মোনোক্রোটোফসের মতো কীটনাশকের অত্যন্ত ক্ষতিকারক প্রভাব রয়েছে । এগুলির দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারে জমির উৎপাদনশীলতা হাস পায় এবং দূষণ বৃদ্ধি পায় ;
(৩) নাইট্রোজেনাস – ফসফেটিক – পটাশিক – রাসায়নিক সারের যথাযথ ছাড়াই সার প্রয়োগ করা হয় । যেহেতু এমনই আশার অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে সহজলভ্য সেটা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় , ফলে মাটির রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। রাসায়নিক সারের অত্যাধিক ব্যবহারের ফলে মাটির পুষ্টির ক্ষয় হয় ;
(৪) ব্যাপকভাবে সেচের ফলে কৃষি জমির ক্রমাগত ক্ষয় হয়েছে এবং সেই ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ জলস্তর অনেক নিচে নেমে গিয়েছে । উত্তর ভারতে ‘ ইরিগেশন ওয়াটার প্রোডাক্টিভিটি ’ ০.২২ কিলোগ্রাম/ঘনমিটার , যা থেকে বোঝা যায় জল সেচের কার্যকারিতা বেশ কম । অবাক হবার কিছু নেই যে বর্তমান ভারতে এক বিরাট সমস্যা জলের অভাব ।
কৃষি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের উপর আরো বড় আঘাত এনেছে ভারত সরকারের ১৯৯১ সালের পরবর্তী অর্থনৈতিক নীতির ফলে । কৃষি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে পরিকাঠামো তা কোনক্রমেই ভারতের কৃষক এবং কৃষি অর্থনীতির প্রতি সুবিচার করেনি। ‘মুক্ত বাজার’ অর্থনীতিতে ঝাঁপ দেওয়ার আগে হাজার ১৯৮০-৮১ থেকে ১৯৮৭-৮৮ অব্দি সরকারি উদ্যোগে মূলধনী বিনিয়োগ মোট বিনিয়োগের ৪২ থেকে ৫০ শতাংশ ছিল , অথচ ১৯৯২ এর পর থেকে ৩০ শতাংশ পার করেনি, বরং পরিস্থিতি আরো খারাপ হয় ২০১০ এরপর থেকে এই অনুপাত ২০ শতাংশের নিচে নেমে যায় ।
কোন কোন ফসলের ক্ষেত্রে অর্থনীতি ও পরিসংখ্যান দপ্তরের প্রকাশিত তথ্যের যথাযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে । আর উৎপাদনের ব্যয় কর্নাটকে চার বছর পরে প্রতি হেক্টরে ১০,০০০ টাকা কমে গেছে অথচ সব রাজ্যের সব ফসলের ব্যয় বৃদ্ধি হয়েছে—এই ধরনের অসামঞ্জস্যতা থাকলে তথ্য প্রকাশককে আরও খুঁটিয়ে দেখতে হবে ।
চার বছরের মধ্যে ভারতের কৃষি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে ব্যয় বৃদ্ধি যদি প্রায় 8 থেকে 12 শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে তাহলে ভারতে ৮৬ শতাংশ প্রান্তিক এবং ছোট কৃষক পরিবার অনুক্রমে কৃষিকার চালিয়ে যেতে পারে । কিন্তু এটা পরিষ্কার যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কৃষি কাজে ব্যয় বৃদ্ধি ও অধিক পরিমাণে হয়েছে এবং সহজ যুক্তিতে কৃষি ঋণ সহজলব্য না হওয়ায় , বিষয়টি কৃষক সমাজের মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিয়েছে ।
ভারতে ছোট কৃষক পরিবারের কৃষি কাজের আয়ের তেমন কোন নিশ্চয়তা নেই । স্বল্প পরিমাণ এবং অনিশ্চয়তার ভরা আয় কৃষিক্ষেত্রে দুরবস্থার অন্যতম প্রধান কারণ । ভারত সরকার কৃষকদের ফসলের লাভজনক মূল্য দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ব্যবস্থা করেছে — মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস (এমএপপি) , প্রাইস সাপোর্ট স্কিম ( পিএসএম) যার কার্যকারিতা সীমিত । ভারত সরকার পাঁচ দশকেরও আগে বাজারজাত খাদ্যশস্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করার নীতি গ্রহণ করেছিল যা দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের অন্যসংস্থানের জন্য উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ছিল । ‘সহায়ক মূল্য’ ব্যবস্থার মাধ্যমে ফসল উৎপাদকদের লাভজনক মূল্য প্রদান করে খাদ্যশস্য সংগ্রহ করা , গুদামজাত করা, ভর্তুকি দিয়ে স্বল্প মূল্যে সর্বজনীন বন্টন ব্যবস্থায় মাধ্যমে সমাজের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য খাদ্যশস্য বিতরণ করা—এই তিনটি কাজই ১৯৯২ সালের পর থেকে ক্রমাগত গুরুত্বপূর্ণ হারিয়েছে । প্রয়োজন ছিল পুরনো ব্যবস্থার পরিকাঠামো এবং পরিচালন পদ্ধতির উন্নতি , বাস্তবে দেখা গেল ২০১৯ সাল থেকে কৃষিতে সম্পূর্ণ বেসরকারিকরণ কৃষিজমির বাণিজ্যিকীকরণ ও ফসলের মজুদদারি বৈধকরণ ইত্যাদির জন্য প্রস্তুতি ।
গণবন্টন ব্যবস্থা—এটা আসন ব্যবস্থার সার্বিক পরিসংখ্যা তো রয়েছে । পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০০৪-০৫ সালে ৫৪% শস্য,২০০৯-১০ ৪০% শস্য মুক্ত বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয় । এই সময় কংগ্রেস নেতা রাজীব গান্ধী তার ব্যক্তিত্বতায় উল্লেখ করেছিলেন যে , সরকার জনগণের জন্য যদি 10 টাকা বরাদ্দ করে তাহলে প্রান্তিক জনগণের কাছে পৌঁছায় মাত্র ১ টাকা ।
প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য খাদ্য সুরক্ষা আইন সম্পর্কে যে বিভিন্ন বিতর্কে ঝড় উঠেছে তার মধ্যে অন্যতম হল খাদ্যের পরিবর্তে অর্থ হস্তান্তর ব্যবস্থা । ওদিও সে বিষয়টি যথেষ্ট বিবেচনাযোগ্য তবে সামগ্রিকভাবে ভারতের দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন ব্যবস্থার ফলে সেই বিষয়টি আদৌ ও কতখানি কার্যকরী হবে সে প্রশ্ন থেকেই যায় ।
‘তিনটি খামার বিল’ প্রত্যাহৃত হবার ফলে কৃষি ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র পূর্বপরিচিত অবস্থানে ফেরত এসেছে যেখানে ছোট ও মাঝারি আয়তনের প্লট , অপর্যাপ্ত জলসেচ , অন্যান্য পরিকাঠামোর অসম্পূর্ণতা , কৃষিকাজে ব্যয় বৃদ্ধি , সহজ চুক্তিতে ঋণের অভাব , যথাযোগ্য আয়ের অনিশ্চয়তা ইত্যাদি বিবিধ সমস্যা সর্বজনবিদিত । অথচ আমরা জানি যে , কৃষি এবং সম্পর্কিত ক্ষেত্রগুলি ছাড়া ভারতীয় গ্রামীণ সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের জীবনধারণের অন্য কোন সম্বল নেই । আর অতীতের দিকে দৃষ্টিপাত করলে বোঝা যায় ভারত সরকারের নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত কৃষি মন্থনালয় সার্বিকভাবে কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করতে ব্যর্থ হয়েছে ।
কৃষি বিজ্ঞানী নরম্যান বোরলগ বলেছেন— “এই পৃথিবীতে যত মানুষ জন্মেছে তাদের সকলেরই খাদ্য বাবার নৈতিক অধিকার রয়েছে ” । বোধ করি এই বক্তব্য জোর দিয়ে বলার সময় এসেছে যে , ছোট ও মাঝারি কৃষক পরিবারের সন্তানদের অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে ভারতের রাজনীতিতে ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে — সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার অভিজ্ঞ কৃষক নেতারা সত্যিকার অর্থে কৃষকদরদী রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দান করতেও এগিয়ে আসতে পারেন । অন্যথায় গ্রামীণ ভারত এবং কৃষি ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং সেই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হবার আশা প্রায় নেই বললেই চলে ।

তথ্যসূত্র :
১/ ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক দ্বারা প্রকাশিত :
(১.১) হ্যান্ডবুক অফ স্ট্যাটিসটিকস অন দি ইন্ডিয়ান ইকোনোমি ২০২০-২১
(১.২) ইন্ডিয়া কে এল ই এম এস ডাটাবেস ২০২১
২/ নাবার্ড কর্তৃক প্রকাশিত :
(২.১) অশোক গুলাটি এবং সীমা বাথলা — ক্যাপিটাল ফর্মেশন ইন ইন্ডিয়ান এগ্রিকালচার ২০০২ রিপোর্ট
৩/ সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত :
(৩.১) এগ্রিকালচারাল স্ট্যাটিসটিকস এ্যাট এ গ্লানস ২০২০
(৩.২) অল ইন্ডিয়া রিপোর্ট অন এগ্রিকালচার সেনসাস : ১৯৯০-৯১ , ২০১০-১১ এবং ২০১৫-১৬
৪/ সম্পাদক : অমিত রায় , আন্তর্জাতিক পাঠশালা , অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০১৫ , জানুয়ারি-মার্চ ২০২২

সৈকত সরকার,সহকারী গবেষক ,
ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট , ব্যাঙ্গালোর
সায়ন মণ্ডল,অর্থনীতির ছাত্র, বিশ্ব ভারতী

Leave a Reply

Your email address will not be published.